top of page

অপহরণ


ক্লাস শেষ। চা বিরতি। বন্ধু সফিক পাশে এসে বসল।

কি রে বেটা, চোখ দুটো আঁঠার  মতো ম্যাডামের উপর আটকে রেখেছিলি কেন ? তোর তো  দেখি ‘পড়ে না চোখের পলক’ গানের মতো অবস্থা।

ক্লাস নিচ্ছিলেন একজন মহিলা শিক্ষক। মহিলা না বলে তাকে মেয়ে বলাই ভালো। আমাদের মতই হবে বয়স। একটু দেরিতে ক্লাসে প্রবেশের কারণে তার পরিচয় নিশ্চিত হতে পারিনি।

আরে, ম্যাডাম যে রকম রূপের পসরা সাজিয়ে ‘হাট বাজার’ এর উপর লেকচার দিচ্ছিলেন তাতে চোখের আর দোষ কি ? চোখ আঁঠার মতো কেন, সুপার গ্লুর ন্যায় আটকে থাকা তো স্বাভাবিক, আমি বললাম।

তুই মেয়েটিকে চিনিস না ?

চিনব না কেন ? সে তো একাডেমিরই একজন কর্মকর্তা।

আরে, আমি তা বলছি না। সে তো আমাদেরেই ব্যাচ মেট।

বলিস কি? আমাদেরই ব্যাচমেট? নাম কি ওর ?

ওর নাম মায়িশা।

বলিস কি ওর নাম তো শুনেছি। কিন্তু আমার পোস্টিং নর্থে হওয়ায় ওর সাথে দেখা হয়নি।

তা ও কি ম্যারিড নাকি রে?

বেকুবের মতো কথা বলিস কেন? ওর মতো সুন্দরী মেয়ে রূপের পসরা মেলে তোর মতো হাদারামদের জন্য বসে থাকবে নাকি?

তুই রাগছিস কেন? তুই তো ব্যাটা বিয়ে সাদি করে পোলা মাইয়া পয়দা করে বসে আছিস। অন্য কোন মেয়ের উপর তোর কি কোন হক আছে? পর নারীর  দিকে তাকালে ভাবি তোর চোখ গলে ফেলবে না।

আমি অন্য কোন দিকে তাকাবো কেন? আমার বউ কি এর চেয়ে কম সুন্দরী?

তাতো নয়, তাতো নয়। ভাবি তো মাশাল­াহ গায়ে গতরে চেহারা সুরতে একবারেই হুরে আরব! তারপরও তো তুই একজন বিবাহিত পুরুষ। বিবাহিত পুরুষরা তো সারাক্ষণ চুক চুক করতে থাকে। তা আমি জানি না। মিজাইন্যার কথাই ধর। সুন্দরী বউ ঘরে রেখে ব্যাটা বিবাহিতা হেলেনের সাথে লটকা লটকি করছে, কি ভয়ানক ব্যাপার!

তোর ইচ্ছা হলে তোকে ওর সাথে ঝুলিয়ে দিই।

ধুর ব্যাটা কি কস! আমি তো একটা কুমার ছেলে। আর আমি কি না ঝুলে যাব আধা বুড়ি এক বাচ্চার মায়ের সাথে।

এক বাচ্চার মা যে কি জিনিস তুই বুঝবি কী!

আমার বুঝার দরকার নাই, তুই বুঝতে থাক।

ওই যে কুমারী সুন্দরী জুলেখা এদিকে আসছে।

হাই,বয়েজ, কী করছো তোমরা?

নাহ, কিছু করছি না। তবে বলাবলি করছি এই আর কি!

তা কী বলাবলি হচ্ছে, শুনতে পারি?

অবশ্যই, অবশ্যই শুনতে পার।

সব এডাল্ট কথাবার্তা আর কী! শুনে তুমি কানে হাত দিয়ে না পালালে বলতে পারি? আমি বললাম।

ও, অসভ্যতা হচ্ছে, না? তোমাকে তো ভাল ছেলেই বলে জানতাম। ক্লাসে তো মুখে ছিপি এটে বসে থাক। সফিকের পাল­ায় পড়ে গোল­ায় যাচ্ছ নাতো? হাসতে হাসতে আমাকে লক্ষ্য করে বলে জুলেখা।

কি বলাবলি করছিলাম তা নাইবা শুনলে। তবে এ বিষয়ে একটি জোক শুনতে পার।

ভালগার কোন জোক নয় তো?

না না, একেবারে দুগ্ধপোষ্য নন ভেজ জোক।

তাহলে বলে ফেল।

দুই বান্ধবী বসে গল্প করছে। আচ্ছা বলতো লিনি, ছেলেরা নিজেদের মধ্যে যখন কথা বলে তখন তারা কি বিষয় নিয়ে কথা বলে?

লিনি বলল কেন আমরা যে সমস্ত বিষয় নিয়ে কথা বলি ছেলেরাও সে সব বিষয় নিয়ে কথা বলে। নীলা বলল, ছি! ছি! ছি ! ছেলেরা এত অসভ্য!

জোক শুনে জুলেখা হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ল। তোদের আলোচনার বিষয় বস্তু এবার বুঝতে পেরেছি।

এই জুলেখা, এ দিকে আয়না।

বুশরার ডাক শুনে জুলেখা চলে গেল।

তা দোস্ত কি বুঝলি? জুলেখা তো তোকে জানতে শুরু করেছে।

তাতে কি, জানা জানি হলে মিলামিলি হবে না । কারণ-

কারণ কি?

দুজনের রুচি-টুচি মিলে না যে।

এ সব কোন সমস্যাই না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

তা যা বলিস দোস্ত ও কিন্তু যথেষ্ঠ সুন্দরী এবং একই সাথে তেজি। কাউকেই সে পাত্তা দেয় না। এমন ভাবে তাকায় যেন দৃষ্টি দিয়ে একবারে সবাইকে ভস্ম করে ফেলবে।

নারে এ সমস্ত মেয়ে খুবই সংসারী হয়।

কচু হয়। মেঘে মেঘে বেলা তো কম হলো না। তা এ সুন্দরীর বর জুটছেনা কেন রে?

জুটবে জুটবে। বিয়ের ফুল ফুটলেই বর জুটবে।

এভাবেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রুমমেট সফিকের সঙ্গে আলোচনা ও খুঁনসুটি চলতে থাকে।

পরদিন দুপুরের খাবার বিরতির সময় মায়িশার অফিস রুমে গেলাম। সংগে সফিক। সফিক পরিচয় করিয়ে দিল আমাকে।

এ হচ্ছে ফরহাদ। নর্থবেঙ্গলে পোস্টিং, সফিক বলল।

হ্যালো ফরহাদ, ক্যামন আছ?

ভালো আছি। তা তুমি কেমন আছ?

আছিরে ভাই কোন রকম। ট্রেনিং ইনস্টিউটে যেমনটা থাকা যায় আর কী! শুধু ব্যস্ততা আর ব্যস্ততা! এই কোর্স সেই কোর্স নিয়ে সবসময় ব্যস্ততা।

সেদিন আর বেশি কথা হলো না। মায়িশা  মাঝে মাঝে ক্লাস নেয়, কখনো কখনো ওর অফিসে তার সাথে দেখা করি।

কিছু দিনের মধ্যে মায়িশাকে নিয়ে ফিসফাস চলছে বুঝতে পারলাম।

কিরে দোস্ত। ঘটনা কি?

কোন ঘটনা?

ঔ যে মায়িশার ব্যাপারটা।

ওটা তো ওপেন সিক্রেট রে।

ওপেন সিক্রেটের মানে কি, বুঝিয়ে বলনা। সফিক যতটুকু জানে সে বলে আমাকে।

বলিস কি? শেষ পর্যন্ত ঐ বুড়োটার সাথে -

উনি বুড়ো বটে। কিন্তু উনার শক্তি এবং ক্ষমতা সম্পর্কে তোর কোন ধারণা আছে?

না তা নেই। কিন্তু তা বলে -

শোন মায়িশার বিয়ে হয়ে যায় অল্প বয়সেই তার এক আত্মীয়ের সাথে।

কিন্তু মায়িশা থেমে থাকেনি। সে লেখা পড়া করে ক্যাডার সার্ভিসে যোগদান করে। তার হাসব্যান্ড থেকে যায় একই জায়গায়। ফলে তাদের মধ্যে বোঝাপড়ার কিছুটা সমস্যা ছিল। তাদের একমাত্র সন্তনটিও মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। আর এ সুযোগটিই কাজে লাগায় বুড়োটা। বিদেশে একটি লোভনীয় পোস্টিংয়ের প্রলোভন দেখিয়েছে সে। এ নিয়ে তার স্বামীর সাথে প্রায়ই ঝগড়া-ঝাটি হয়।

ঘটনাটি কি সত্য?

সত্য হতে পারে আবার নাও হতে পারে, কে শার্লক হোমস হয়ে তা প্রমান করতে যাবে!

দশ পনের দিন পরের ঘটনা। একদিন সকালে নাস্তা খাচ্ছি ডাইনিং এ। হঠাৎ কান্না, চিৎকারের শব্দ। শব্দ আসছে একাডেমির কোয়াটার থেকে। অন্যান্যদের সাথে দৌড়ে সেখানে গেলাম।

‘মায়িসা ম্যাডামকে মেরে ফেলেছে, মায়িসা ম্যাডামকে মেরে ফেলেছে’-  চীৎকার করছে একজন স্টাফ ।

কে মেরে ফেলেছে?

ম্যাডামের হাসবে›ড উত্তর দিল স্টাফ টি।

ভীড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম একদলা রক্তের মধ্যে নিথর হয়ে পড়ে আছে আমাদের বন্ধু, আমাদের ব্যাচমেট মায়িসা। চোখ দুটি আধবুজা, ঠোঁট ইষৎ ফাঁকা। মনে হয় যেন সে বলতে চাইছে,  তোমরা আমাকে মেরে ফেলতে পারলে ?

পাশেই মাথায় গুলিবিদ্ধ মায়িসার হাজব্যান্ডের লাশ । আর লাশের উপর পড়ে রয়েছে লাইসে›সকৃত বন্দুকটি।

পড়াশুনার জন্য চলে এসেছি ইউকেতে। স্টাডি লিভ নিয়ে। উদ্দেশ্য দেশে আর ফিরব না। কাজ করি। মাঝে মাঝে পড়াশুনা। বাসার কাছেই লাইব্রেরী। বিনে পয়সায় মে¤¦ার হয়ে গেছি। দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারি মুফতে। ফলে দেশের পত্র-পত্রিকা পড়ে সব খবরই পাই।

একদিন পত্রিকা পড়ার সময় একটি নিউজ হেডলাইনে চোখ আটকে গেল। সফিক নামে একজন সরকারিী কর্মকর্তা বাস চাপায় নিহত। বিস্তারিত খবরে জানা গেল তখন সরকার বিরোধী আন্দোলন চলছে। বিরোধী দল হরতাল না কি একটা অসহযোগ আন্দেলনের ডাক দিয়েছে। গাড়ি ঘোড়া বন্ধ।বিশেষ ব্যবস্থায় কিছু বাস চলছে। সফিক’ দাঁড়িয়ে ছিল বাস স্ট্যান্ডে অফিসে যাওয়ার জন্য। বেপরোয়া গতির একটি বাস এসে সফিককে চাপা দেয়। ঘটনা স্থলেই সফিক মারা যায়।

নিউজ টি পড়ে খুবই খারাপ লাগলো। মনে হলো একটি বাস আমারই গায়ের উপর দিয়ে চলে গিয়েছে।কতইনা সম্ভাবনাময় ছেলে ছিল সফিক! চমৎকার নজরুলগীতি গাইত সে। যখন তখন সে গেয়ে উঠত ‘আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়’। আমরা ঠাট্রা করে বলতাম ‘কোথায় যেতে চাস রে দোস্ত?‘জবাবে মিটি মিটি হাসত সে। সে যেন জানতো কোথায় যেতে চায় সে।তারই গাওয়া গানের কথাগুলি তার জীবনে এত তাড়াতাড়ি সত্য হয়ে গেল!

 

Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page