আচার্য ও নরসুন্দর।। শাহজালাল খান
- শাহজালাল খান
- Oct 2, 2021
- 3 min read

চুল অপসারণকারীকে আমাদের সংস্কৃতিতে নাপিত বলে । এটা যখন ব্যঙ্গ ও অপমানের হয়ে গেল , তখন আমরা বললাম নরসুন্দর । শরীরের উচ্ছ্বিষ্ট চুল অপসারণ না করলে দেহ-মনও ঘিনঘিন করে । শরীরের গোপন ক্ষৌরকর্মে আমরা সবাই স্ব-নাপিতের ভূমিকা পালন করে থাকি । কারো কারো কাছে শরীরের অন্দর- বহিরের চুলের সৌন্দর্যই আলাদা ।

তবে বিজ্ঞ জন কহেন , সবকিছুর মতোই বেশি লম্বা জিনিস ভালো না । লম্বারও মার্জিত রূপ আছে । চুলের ক্ষেত্রেও তাই । সে কারণে মধ্য পন্থা অবলম্বন করো ।

বিশ্ব সভ্যতায় নারীর চুল যত লম্বা, তত ভালো । পারলে সেটা ভাঁজ করে রাখো । আর পুরুষের চুলও লম্বা । অতীতে সভ্য মানুষ , জ্ঞানী মানুষ , বিজ্ঞ মানুষ বলতেই লম্বা লম্বা চুল । শিশু জন্ম গ্রহণ করার পর-পরই নানি দাদিরা মাথা ভর্তি চুলের গল্প করেন । কিন্তু কেন জানি , আমাদের যুবকদের মাথায় লম্বা চুল দেখা মাত্র পুরুষের মাথা গরম হয়ে যায় , নারীদের মাথা গরম হয়ে যায় । শিক্ষকের মাথা গরম হয়ে যায় , শিক্ষিকাদের মাথাও গরম হয়ে যায় । প্রশাসক , অভিভাবক সকলেই ছেলেদের মাথা পারলে ন্যাড়া বানিয়ে ছাড়েন । লম্বা চুল মানেই অসভ্য ছেলে !

ভারতীয় সভ্যতায়-ই কেবল ন্যাড়ার গল্প আছে সন্ন্যাসী হতে হলে চুল কামিয়ে মাথা ন্যাড়া করতে হতো এমন ভাবে যেন সেটা বেলের মতো দেখায় । এদের কাছ থেকেই বৌদ্ধ ভিখুরা ন্যাড়া মাথা গ্রহণ করেছে । ভারতীয় সভ্যতায় পণ্ডিত আর ন্যাড়া ছাড়া আর কোন সভ্যতায় পুরুষের মাথায় লম্বা চুলের শত্রু নেই ।
এ উপমহাদেশে পণ্ডিতেরা তাদের বিদ্যা জাহির করার জন্য মাথা ন্যাড়া করে রাখতো । তারা নিজেদেরকে ন্যাড়া ব্রাহ্মণ মনে করতো । তারা বিশ্বাস করতো ব্রহ্মার মস্তকের সর্বোচ্চ স্থান হতে তাদের জন্ম । সুতরাং সেই জায়গাটি পরিষ্কার করে রাখো । আবর্জনা জমতে দিওনা । সেই চেতনা দ্বারা প্রভাবিত আমাদের যারা গুরু বা শিক্ষক , কী হিন্দু কী মুসলিম , তারা তাদের ছাত্রদের মাথায় লম্বা চুল দেখা মাত্র হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন । মনে হয় তাদের রক্তের মধ্যে ন্যাড়া ব্রাহ্মণদের আদর্শ ঢুকে আছে । জীবনে বহু শিক্ষককে দেখেছি , ছাত্রদের মাথায় লম্বা চুল দেখলে তাদের হস্ত কম্পমান হয় । কাঁচি হাতে তেড়ে আসেন । ভাবটা এমন, উকুনের ঝাঁপাটানিটা উনার মাথার মধ্যে যেন ঝাঁপটাচ্ছে ।
এই ঝাঁপটা- ঝাঁপটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে হয়, সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটবে , তাও আবার প্রক্টরের হাতে , তাও আাবার উনি একজন মমতাময়ী । এটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার । রবীন্দ্রনাথের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের মতো চুল রাখলে আপনাদের গাত্রদাহ হবে কেন ! রবীন্দ্রনাথ, আলেকজান্ডার, নিউটনের এই নিচের ছবিগুলো দেখেনতো , কোথাও তাকে আপনার মতো কিংবা নারী বলে মনে হয় কিনা ? নজরুলের ঝাঁকড়া চুলটিও দেখে আসতে পারেন ।
বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতিতেও ব্রাহ্মণ সংস্কৃতি ঢুকে আছে । ইসলামি বিজ্ঞ জনেরা যতটা মুখে দাড়ি পছন্দ করেন , ,ততটা চুল পছন্দ করেন না । তারাও চুলের শত্রু । যত্রতত্র লম্বা চুলের বিরুদ্ধে তারা কঠিন হন. টানাটানি করেন, লাঠি ধরেন । অথচ যতটা তথ্য জানা যায় , নবীরা লম্বা চুল পছন্দ করতেন । ইসা ( আঃ) তথা মসীহের যে যে ছবি আমরা দেখি, ক্রুশ বিদ্ধ যিশু কিংবা লাস্ট সাফারে তেরো সঙ্গীর সঙ্গে যিশুর নৈশ ভোজন, সেখানেও ঈশা মসীহের চুল, পিঠ ছাপিয়ে গিয়েছে । একবার মহানবী (সঃ) মক্কায় যখন এসেছিলেন, তখন তাঁর মাথায় কেবল লম্বা চুলই ছিল না , উনার মাথার চুলে চারটি বেণী করা ছিল । ((মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত), আমাদের যারা ধর্ম শিক্ষা দেন, তাদের এই হাদিসকে অনুসরণ করতে এই জীবনে একজনকেও দেখিনি । কারণ ঐ যে বাঙালি ন্যাড়া ব্রাহ্মণদের প্রভাব রক্তের মধ্যে জেগে আছে !
বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য জননী ! পৌরুষের কিরণচ্ছটা যে সময় প্রজ্জ্বলিত হতে থাকে ,( বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ) সে সময়ে ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবেন না । পুরুষের মাথার চুল বেশি দিন থাকেনা । তিরিশের কোটার পর সে এমনিতেই ঝরতে শুরু করে । তাই আপানারা, আপনাদের আচার্য পেশা নিয়ে থাকুন , নাপিতের পেশা নরসুন্দরদের করতে দিন ।
প্রসঙ্গ - ( রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ফারহানা ইয়াসমিন কর্তৃক চৌদ্দ ছাত্রের চুল কর্তন )
১ অক্টোবর , ২০২১
শুক্রবার , বুড়িগঙ্গার তীর থেকে ।
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, মাসিক বাঙলাকথা
Comments