top of page

আনন্দ ও বেদনার মাঝে আশুরা।‌‌। অধ্যাপক ডঃ যোবায়ের মুহাম্মদ এহসানুল হক


প্রতি বছর আমরা আশুরাকেন্দ্রিক কিছু আলোচনা-বিতর্ক শুনতে পাই। এজিদকে লানত দেয়া না দেয়া, তাজিয়া মিছিল করা না করাসহ বহু কিছু। এ বছরটিও ব্যতিক্রম নয়। পুরনো প্রসঙ্গের সাথে কিছু নতুন বিষয়ও যোগ হচ্ছে। একটি হল সীমাহীন এজিদবন্দনা, তাও বের হয়েছে মশহুর এক শায়খের মুখ হতে, এটিকে এজিদবন্দনায় ‘বিদআত’ বলে গণ্য করা যায়, এই অর্থে যে, ইতোপূর্বে কেউ এভাবে এজিদবন্দনায় মগ্ন হননি। আশুরা কি শোকের দিন না আনন্দের দিন। এটি তো পুরনো আলোচনা। আনন্দের দিন বলা হয়, এদিনের অনেক মুক্তিদায়ক ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে, যেমন ফিরআউনের কবল হতে মূসা (আ) ও বনি ইসরাইলের মুক্তি লাভ। মদিনার ইহুদিরা মুহাররমের দশ তারিখ এই আনেন্দের কৃতজ্ঞতা প্রকাশে রোযা পালন করত। নাবী (সা)ও মুসলিমদের রোযা রাখার নির্দেশ দেন, কারণ মূসা (আ) আমাদেরই নাবী, এই উপলক্ষ উদযাপনের আমরা অধিক হকদার। এই বিষয়টি আলোচনায় এনে অনেকে বলতে চান দশ মুহাররম তো আমাদের আনন্দের দিন, শোকের দিন নয়। এদিন হুসায়ন (রা) শহীদ হয়েছেন। তাই বলে বছরের পর পর শোক প্রকাশ করতে হবে? তিন দিনের বেশি তো শোক প্রকাশ করা যায় না। কই হুসায়ন (রা) চেয়ে যারা মর্যাদায় সেরা, যেমন ‘উমার ও আলী (রা)-এর শাহাদাতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করা হয় না? ভালো যুক্তি। কিন্তু দুষ্কৃতিকারীর চোরাগোপ্তা হামলা ও কারবালার ঘটনা কোনভাবেই তুলনীয় নয়। নবীদুহিতা ফাতিমা (‘আলাইহাস সালাম) এর পুত্র হুসায়ন (রা) এজিদের হাতে বায়আত না নিয়ে কুফায় যাচ্ছিলেন। তার সাথে তার পরিবারের নারী-শিশুরা ছিল। অস্ত্রশস্ত্র বা বাহিনী ছিল না। তাঁকে ফোরাত-তীরে আটকানো হয়। তিনি যখন বুঝলেন, কুফায় যাওয়ায় সম্ভব নয়, তখন তিনি শান্তির তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দেন: ক) তাকে মক্কায় ফেরত যেতে দেয়া হোক; বা খ) তাকে সীমান্তে চলে যেতে দেয়া হোক; বা (গ) তাকে দামেশকে এজিদের কাছে নিয়ে যাওয়া হোক। একটাও বিদ্রোহাত্মক প্রস্তাব ছিল না। তবুও শ খানেক মানুষের ওপর 3 হাজার সৈন্যের বাহিনী চাপিয়ে দেয়া হয়। তবুও তাকে হত্যা করা হয়। তার সাথীদের হত্যা করা হয়। এমনকি হুসায়ন (রা) সহযাত্রী পুরুষদের মাঝে আলী ইবনুল হুসায়ন ব্যতীত কেউ বেঁচে রইল না। তারপর নবীদৌহিত্রের মাথা কেটে নেয়া হল, যা কূফা হতে দামেশকে পাঠানো হয়। শহীদদের লাশ দাফন করা হয়নি। পরদিন বানু আসাদের কিছু মানুষ তাদের লাশ দাফন করে। মুহাম্মদ (সা)-এর আগমনের আগে আরবদের কি হাল ছিল? কে তাদেরকে চিনত? তাদের কোন রাজ্য ছিল না। ইসলাম গ্রহণের পর তারা অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হয়। রোমান ও পারসিকদের পরাজিত করে। উমাইয়া বংশ ক্ষমতা পায়। সেই মহানবী (সা)-এর দৌহিত্র ও তাঁর পরিবারের সদস্য ও মুষ্টিমেয় সহযাত্রীদের সাথে যে নির্মম, নির্দয় ও বীভৎস আচরণ করা জয়, তার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে থাকতে পারে, মুসলিমদের ইতিহাসে নেই। মনুষ্য পদবাচ্যধারী কেউ, সে মুসলিম হোক বা কাফির – কারবালার ঘটনায় ব্যথিত না হয়ে পারবে না। এহেন মর্মন্তুদ ও মর্মষ্পর্শী ঘটনায় কারো হিয়া ও নয়ন সিক্ত না হয় তাহলে নিশ্চয় সে এমন প্রাণী হবে, আল্লাহ যাকে মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেননি। আশুরা এলেই তাই কারবালার নির্মম ঘটনা আলোচিত হয়। হাজার হাজার বছর ধরে আলোচিত হওয়ারই মত ঘটনা। ঈদের দিনেও তো মানুষের মৃত্যু হয়। যার প্রিয়জন মারা গেল, সে আনন্দ কীভাবে করবে? আমাদের মনে দূর অতীতের আনন্দের স্মৃতির তুলনায় নিকট অতীতের বেদনা অনেক বেশি জাগরুক। ফলে আশুরার দিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবীদুহিতা (‘আলাইহাস সালাম)-এর প্রিয়পুত্র হুসায়নের শাহাদাতের কথা আমাদের মনে পড়ে যায়। তাই বলে আমি বলছি না, আমরা তাজিয়া বের করি, শৃঙ্খল দিয়ে পৃষ্ঠদেশ জখম করি। আমরা তাই করব, যা পূণ্যবান পুর্বপুরুষগণ করেছেন, আশুরার সিয়াম পালন করা। তাই বলে হুসায়ন স্মরণে আমাদের চোখ ভেজাতে পারব না?

Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page