আমার মে দিবস।। মোঃ জেহাদ উদ্দিন
- মো জেহাদ উদ্দিন
- May 2, 2021
- 10 min read
Updated: May 6, 2021

ব্যক্তিগত একটি অনুভূতি দিয়েই লেখাটি শুরু করতে চাই। সারাদিন রোজা শেষে ইফতারির পর স্বাভাবিকভাবেই শরীরটা খুব ভেঙে আসে, বিশ্রাম নিতে মন চাই। কিন্তু পারি না। কারণ, ইফতারের পর পরই অনলাইনে ক্লাস নিতে হয়। বর্তমানে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ট একাউন্ট্যান্ট অব বাংলাদেশ, ইনস্টিটিউট অব কস্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট একাউন্ট্যান্ট অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিতে এভাবে ক্লাস নিতে হচ্ছে। ৩০ এপ্রিল ক্লাস নেওয়ার পরদিন যথারীতি সন্ধ্যা ৭ টায় ল্যাপটপ নিয়ে বসলাম ক্লাস নেওয়ার জন্য। কিন্তু ক্লাসের কোন লিংক না দেখে অবাক হলাম। কী ব্যাপার! ফোন করলাম আইসিএমএ’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে। তিনি আমাকে জানালেন, ‘স্যার আজ পহেলা মে উপলক্ষে ক্লাস বন্ধ!’ আনন্দে মনটা নেচে উঠল। এই তো আমার মে দিবস! শ্রমিকের মে দিবস!! * আমার দাদা মরহুম মৌলভী আব্দুল করিম মাস্টার (রহ) একজন নামজাদা শিক্ষক ছিলেন। ব্রিটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ-তিন সরকারের অধীনে তিনি শিক্ষকতার মহান পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি নিজ হাতে কৃষি কাজ করতেন। তিনি বলতেন, মানুষের আদি পিতা ও প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ) কৃষি কাজ করতেন। সুতরাং এ কাজের মধ্যে অন্যরকম মর্যাদা রয়েছে। শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষি কাজ করার কারণে একদিকে যেমন আমাদের পারিবারিক ঐশ্বর্য বৃদ্ধি পেয়েছে, অপরদিকে আমার মরহুম দাদার ভাষায়, ‘পরিবেশ, প্রকৃতি, পশু-পাখি এবং মানবকল্যাণে তা বিশেষভাবে ইতিবাচক অবদান’ রেখেছে। * আমার মরহুম দাদার উত্তরাধিকার আমি বহন করে যাচ্ছি যতটা পারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তৎকালীন পজিট্রন কোচিং সেন্টারে নিয়মিত ক্লাস নিয়েছি। প্রতিটি ক্লাসের জন্য ৩০০ টাকা করে পেতাম। প্রতিদিন গড়ে চারটি ক্লাস নেওয়া হতো। সেই যে শিক্ষকতা আরম্ভ হয়েছিল আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একেবারে ঊষালগ্ন থেকে, তা আজও অব্যাহত আছে বললে মনে হয় ভুল বলা হবে, বরং দিনে দিনে তা বেগবান হচ্ছে। তবে এসবই আমার মূল কাজ তথা চাকুরিকে ব্যাহত না করে, বরং তাতে অধিকতর বেশি মূল্য সংযোজন করার জন্য। অর্থাৎ আমি যা জানি বা আমি যা করি তা আমার শিক্ষার্থী বা প্রশিক্ষণার্থীদের সাথে শেয়ার করে তাদেরকেও সমৃদ্ধ করার একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। অন্যভাবে যাকে বলা যায় নলেজ শেয়ারিং। আমার এ অক্লান্ত পরিশ্রমের প্রেরণা আমি পেয়েছি আমার পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে, পেয়েছি আমার ধর্মগ্রন্থ থেকে। * আজ মে দিবসে আমার ক্লাস বন্ধ থাকায় আমি যে ছুটির আনন্দ পেয়েছি তা এককথায় স্বর্গীয়। এই সুযোগে আমি মে দিবস নিয়ে একটু পড়াশোনারও সুযোগ পেয়ে গেলাম। প্রথমে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার মে দিবসের সম্পাদকীয়টি পড়লাম। পত্রিকাটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লেখাটি সম্মানিত নিম্নে হুবহু উদ্ধৃত করছি: "সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই কর্ম বিভাজন শুরু হল। এক শ্রেণি কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্রমিক ও অপর শ্রেণি ভূস্বামী বা জমির মালিক। ধীরে ধীরে সমাজে তৈরি হয়ে গেল শ্রেণি বৈষম্য। কিছু সুবিধাভোগী মানুষ এটা বেশ বুঝে গেলেন, বিনা পরিশ্রমে কেবল বুদ্ধি খাটিয়ে অপরের শ্রমের উপরে নির্ভর করে দিব্যি সুখে থাকা যায়। এই ধারণা থেকেই পরবর্তী কালে বিশেষত প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় দাসপ্রথা গড়ে উঠেছিল। ক্রমশ বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে উন্নত ও পরে স্বল্পোন্নত দেশগুলিতে কলকারখানা গড়ে উঠল। সেই সব জায়গায় রুটিরুজির জন্য বহু শ্রমিক নিয়োজিত হলেন। বহু দশক জুড়ে এ ধরনের শ্রমিকদের নির্দিষ্ট শ্রমদিবস ছিল না। মালিকের প্রয়োজন অনুযায়ী, তাঁদের কাজ করতে হত। দৈনন্দিন চাহিদার তুলনায় পারিশ্রমিক ছিল নগণ্য। উনবিংশ শতকের শেষার্ধে এ ধরনের শ্রমজীবী মানুষেরা প্রাণের দায়ে ক্রমশ একত্রিত হতে থাকলেন। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ দানা বাঁধতে বাঁধতে ধীরে ধীরে শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন বাড়তে থাকল। আমেরিকায় শ্রমিকদের মধ্যে থেকে গড়ে উঠল সমাজবাদী, বামপন্থী, ট্রেড ইউনিয়ন, ক্লাব ইত্যাদি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উত্তর গোলার্ধে মে মাসের প্রথম দিবসটি উদ্যাপিত হত ‘বসন্ত আবাহন দিবস’ উপলক্ষে। যার মধ্যে এই ব্যঞ্জনা নিহিত ছিল যে, অন্ধকারাচ্ছন্ন তীব্র শীতের অবসানে একটু উষ্ণতার উৎসব। বিশেষত, কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষদের কাছে বসন্তের আগমন ছিল ঈশ্বরের আগমনের মতো। যাঁরা প্রাসাদ বা দুর্গে বসবাসের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন এবং নিতান্ত কুটিরে বসবাস করতেন, এটা ছিল তাঁদের কাছে এক পরম পাওয়া। পক্ষান্তরে দক্ষিণ গোলার্ধে এর বিপরীত অর্থাৎ, গ্রীষ্মের অবসানে শীতের আবাহন হিসেবে ‘মে দিবস’ পালিত হতো। কিন্তু মে দিবস একটি রাজনৈতিক সংগ্রামে পরিণত হল বিশেষত, আমেরিকার সংগ্রামী শ্রমজীবী মানুষের কাছে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে যে দিন শ্রমিকেরা সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে মহামিছিল সংগঠিত করেছিলেন আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেট স্কোয়ারে। দাবি ছিল, শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম ও বাকি আট ঘণ্টা খেলাধুলোর সুযোগ করে দেওয়া। এই দাবি স্বাভাবিক ভাবেই পুঁজিপতিদের আঘাত করল। যাঁরা এতকাল শ্রমিকদের সব রকমের চাওয়া-পাওয়া থেকে বঞ্চিত করে এসেছিলেন। প্রতিটি বিপ্লবেরই প্রতি-বিপ্লব থাকে। সুতরাং, ওই নিরীহ মিছিলের উপর বর্বরোচিত আক্রমণ নেমে আসে। পুঁজিপতি শ্রেণি স্থির করেছিল যে ভাবে হোক এই শ্রমিক নেতাদের দমন করতেই হবে, যাতে গণশ্রম আন্দোলন ফের মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। ফলস্বরূপ, ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে শুরু হওয়া শ্রমিক ধর্মঘটে সামিল হন। তার প্রতিক্রিয়ায় নিরস্ত্র মানুষের উপরে গুলি চালানো হয়। পুলিশের গুলিতে শ্রমিকদের কয়েক জন মারা যান। বহু শ্রমিক আহত হন। অনেক শ্রমিক কারাবরণ করেন এবং পরের বছর শিকাগোর এক শ্রমিক নেতার ফাঁসি হয়। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে ১ মে ফের আমেরিকায় দেশব্যাপী শ্রমিক ধর্মঘট আহূত হয়। সেই থেকে প্রায় পৃথিবী ব্যাপী ‘মে দিবস’কে শ্রমদিবস হিসেবে পালনের রীতির সূত্রপাত। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ‘মে দিবস’কে শ্রম দিবস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারতবর্ষে চেন্নাই শহরের মেরিনা বিচে ১৯২৩ সালে প্রথম ‘মে দিবস’ পালিত হয়। বর্তমানে ‘মে দিবস’ আরও পাঁচটা প্রচলিত উৎসবের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ মানুষদের আর্থিক ও অন্য সহায়তা দানের কাজ বহু দিন আগেই করে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অবিভক্ত বাংলার শিলাইদহে জমিদারি দেখাশোনার ফাঁকে তিনি গ্রামের দুঃস্থ, অসহায়, খেতমজুর, শ্রমজীবী মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে বহু সামাজিক কাজ করেছিলেন। দরিদ্র মানুষের জন্য সমবায় ব্যাঙ্ক, কৃষিঋণের ব্যবস্থা, সামান্য খরচে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার উদ্দেশে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। সাম্প্রতিক কালে সেই কাজের ধারাকে ‘বীজমন্ত্র’ হিসেবে গ্রহণ করে ‘মাইক্রোফিনান্স’ চালু করে অধুনা বাংলাদেশে এক ব্যাপক কর্মক্ষেত্র গড়ে তুলেছিলেন মহম্মদ ইউনুস, যার ফলস্বরূপ তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। শ্রেণিহীন সমাজের কথা কেবল বামপন্থীরা বলেছেন এমনটা নয়। আজ থেকে পাঁচশ বছর আগে শ্রীচৈতন্য ধর্মীয় ভাব আন্দোলনের মাধ্যমে সাম্যবাদের প্রচার করে গিয়েছেন। রামকৃষ্ণ ভাব আন্দোলনের পুরোধা স্বামী বিবেকানন্দ শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ সকল প্রকার ভেদাভেদ দূর করার জন্য আমৃত্যু কাজ করে গিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, ধরিত্রী কি আজও প্রকৃত সাম্য লাভ করেছে? এখনও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিশু, নারী শ্রমিক, কৃষকদের কী চরম অবমাননার শিকার হতে হয়। ভারতের আনাচেকানাচে নজর ফেললেই শিশু-শ্রমিকের দেখা মেলে। অবিভক্ত সোভিয়েত দেশে শ্রমের যথাযথ মর্যাদা দিয়ে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও বেশি দিন সফল হয়নি। সোভিয়েত দেশগুলি খণ্ড খণ্ড হয়ে পড়েছে। কাজেই জোর করে সাম্য বা অসাম্য কোনওটাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত রূপে ধরে রাখা সম্বভ নয়। এটাই বাস্তব। তারই মধ্যে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যকে সামনে ধরে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ ভেদাভেদ মুক্ত সমাজের কল্পনা করেন বহু মানুষ। তাই মানুষ আজও ‘মে দিবস’ উদ্যাপনে এগিয়ে আসেন। (বাঁকুড়া জেলা সারদামণি মহিলা মহাবিদ্যাপীঠের অধ্যক্ষ) (https://www.anandabazar.com/editorial/history-and-the-significance-of-may-day-1.986917)"। * আনন্দবাজার পত্রিকার লেখাটির একটি বিশেষ অংশ আমি ইটালিক/বোল্ড করে চিহ্নিত করেছি। সেই অংশটিতে ভারতবর্ষে শ্রমজীবীদের অধিকার ও কল্যাণার্থে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকাকে মুখ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ‘বীজমন্ত্র’ও সেখানেই নিহিত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ লেখাটি যদি নোবেল লোরিয়েট ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস পড়তেন তাহলে তিনি কি মন্তব্য করতেন তা আমাদের জানা নেই। তবে বিষয়টি যে অন্যদিকে গড়াতো তা ধারণা করা যায়! তবে আমার পর্যালোচনার বিষয় অন্যদিকে। * বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে একমাত্র নোবেল লোরিয়েট। সাহিত্যিক পরিচয়ের বাইরে তাঁর আরেকটি পরিচয় তিনি জমিদার। বর্তমান বাংলাদেশে তাঁর জমিদারী ছিল। জমিদার হিসেবে তিনি জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা বর্তমান স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে। জমিদার হিসেবে রাজস্ব আহরণ করা যেমন তাঁর অধিকারের মধ্যে পড়ে, ঠিক তেমনি প্রজাদের জন্য কাজ করা তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সেই দায়িত্ব তিনি কতটুকু কিভাব পালন করেছেন তা-ও আমার আলোচ্য বিষয় নয়। তবে আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে তাদের অনুগামী জমিদার শ্রেণি যে কেবল মরিয়া হয়ে (কিংবা প্রজাদের মারিয়া) রাজস্ব আহরণ করেছেন তা নয়, তাঁরা কখনও কখনও প্রজাদের কল্যাণে অনেক ভালো ভালো কাজও করেছেন। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাঁরা গড়ে তুলেছেন। আমি নিজেও এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছি (সরাইল এস্টেটের জমিদার রায়বাহাদুর অন্নদা প্রসাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়)। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জমিদারী এলাকায় কি কি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তা আমার জানা নেই (আমার অজ্ঞতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী)। * আনন্দবাজার পত্রিকার লেখাটি পড়ে আমি থমকে গেছি যেসব কারণে সেগুলোর মধ্যে আমি কেবল নজরুল বিষয়ে একটু বলতে চাই। কেননা, শ্রমজীবীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে যখন এবং যেখানেই আলোচনা হবে সেখানেই আবশ্যিকভাবে কাজী নজরুল ইসলামের নামটি আসতে হবে। সৃষ্টিলগ্ন থেকে পৃথিবীর মানুষ দুইভাগে বিভক্ত-শোষক আর শোষিত। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সর্বদাই শোষিতের পক্ষে। পৃথিবীর সকল শোষিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের পক্ষে নজরুলের অবস্থানকে William Race মূল্যায়ন করেছেন এভাবে: ‘Nazrul will be found wherever poetry has been used to fight against oppression…..his appeals were general…’ Sampling the poetry of Nazrul: William Race, Nazrul: An Evaluation, Nazrul Institute (2000), page 102 অর্থাৎ অর্থাৎ নিপীড়নের বিরুদ্ধে যেখানেই কবিতা ব্যবহৃত হবে, সেখানেই নজরুলকে দেখা যাবে।.....আসলে তাঁর আবেদন সর্বজনীন। কাজী নজরুল ইসলাম সকল শ্রমজীবী মানুষকে মানুষের মর্যাদা প্রদান করেছেন। তাদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের মূলমন্ত্র তিনি দান করেছেন। তাদেরকে আপন শক্তিতে বলীয়ান হতে শিখিয়েছেন। অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের জন্য তিনি শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ রাজনৈতিক দল গঠন করেন। শ্রমজীবী মানুষ তথা সর্বসাধারণের মুক্তির মুখপত্র হিসেবে লাঙল, গণবাণী পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাঁর একেকটি কবিতা, একেকটি লেখা, একেকটি সম্পদকীয়, একেকটি রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বক্তৃতা বিশ্বের সকল শ্রমজীবী মানুষের যেন মুক্তির হাতিয়ার। শ্রমজীবীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠাকল্পে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নজরুল নিজের নামে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার প্রকাশ ও প্রচার করেছিলেন। সেদিন ভারতে এ কাজের জন্য নজরুল ছাড়া দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি ছিলেন না। ‘কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল সং’-কে কবি ‘অন্তর ন্যাশনাল সঙ্গীত’ রূপে ভারতবাসীরে সামনে তুলে ধরেন যা এখানে পত্রস্থ করা হল: জাগো– জাগো অনশন-বন্দী, ওঠ রে যত জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত! যত অত্যাচারে আজি বজ্র হানি’ হাঁকে নিপীড়িত-জন-মন-মথিত বাণী, নব জনম লভি’ অভিনব ধরণী ওরে ওই আগত।। আদি শৃঙ্খল সনাতন শাস্ত্র-আচার মূল সর্বনাশের, এরে ভাঙিব এবার! ভেদি’ দৈত্য-কারা! আয় সর্বহারা! কেহ রহিবে না আর পর-পদ-আনত।। কোরাস্ : নব ভিত্তি ’পরে নব নবীন জগৎ হবে উত্থিত রে! শোন্ অত্যাচারী! শোন্ রে সঞ্চয়ী! ছিনু সর্বহারা, হব’ সর্বজয়ী।। ওরে সর্বশেষের এই সংগ্রাম-মাঝ, নিজ নিজ অধিকার জুড়ে দাঁড়া সবে আজ! এই ‘অন্তর-ন্যাশনাল-সংহতি’ রে হবে নিখিল-মানব-জাতি সমুদ্ধত।। ‘ফণিমনসা’ (১৯২৭ খ্রি.)/সঞ্চিতা সভ্যতা বিনির্মাণে শ্রমিকদের ভূমিকা, তাদের অধিকার ও মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হওয়ার করুণ-গাঁথা, তাদের প্রতি পুঁজিবাদী ধনিক শ্রেণির শোষণ-নিপীড়ন ইত্যাদি এমনভাবে নজরুলের কবিতা, গান তথা তাঁর সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে ওঠে এসেছে যা এককথায় অতুলনীয়। পাশাপাশি তাঁর কাছে থেকে পৃথিবীর সকল শ্রমজীবী মানুষ পেয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর নিরন্তর অনুপ্রেরণা। কেবল ‘কুলি-মজুর’ কবিতাটি এখানে উদ্ধৃত করছি যার দ্বিতীয় নজির বিশ্বসাহিত্যে আছে কি না তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে: দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে! চোখ ফেটে এল জল, এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল? যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে, বাবু সা’ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে। বেতন দিয়াছ?-চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল! কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল্? রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে, রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে, বল ত এসব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা কার খুনে রাঙা?-ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি হঁটে আছে লিখা। তুমি জান না ক’, কিন্তু পথের প্রতি ধূলিকণা জানে, ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে! আসিতেছে শুভদিন, দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ! হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়, পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়, তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি, তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি; তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান, তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান! তুমি শুয়ে র’বে তেতালার পরে আমরা রহিব নীচে, অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে! সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটির মমতা-রসে এই ধরণীর তরণীর হাল রবে তাহাদেরি বশে! তারি পদরজ অঞ্জলি করি’ মাথায় লইব তুলি’, সকলের সাথে পথে চলি’ যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি! আজ নিখিলের বেদনা -আর্ত পীড়িতের মাখি’ খুন, লালে লাল হ’য়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ! আজ হৃদয়ের জমা-ধরা যত কবাট ভাঙিয়া দাও, রং-করা ঐ চামড়ার যত আবরণ খুলে নাও! আকাশের আজ যত বায়ু আছে হইয়া জমাট নীল, মাতামাতি ক’রে ঢুকুক্ এ বুকে, খুলে দাও যত খিল! সকল আকাশ ভাঙিয়া পড়ুক আমাদের এই ঘরে, মোদের মাথায় চন্দ্র সূর্য তারারা পড়-ক ঝ’রে। সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি’ এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী। একজনে দিলে ব্যথা- সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা। একের অসম্মান নিখিল মানব-জাতির লজ্জা-সকলের অপমান! মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান, উর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান!
নজরুলকে যদি বলা হয় একজন শ্রমজীবি তাতে ভুল বলা হবে না। তিনি শিশু বয়সে বাস্তব প্রয়োজনেই কর্মের পথ বেছে নেন। তাঁর জন্ম ১৮৯৯ সালে, আর তাঁর পিতা মারা যান ১৯০৮ সালে। শিশু বয়সে পিতাকে হারিয়ে তিনি কেবল এতিম হন নি, তাঁর মা ও ভাই-বোনকে নিয়ে মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়ে যান। কিন্তু অতি স্বাভাবিক ব্যাপার হ’ল, যে মহামানব পরিণত বয়সে সমাজের হাল ধরবেন, সেই মহামানব তাঁর পরিবারের প্রতিও দায়িত্বশীল হবেন-তা যত অল্প বয়সেই হোক না কেন! নজরুল তাই করেছেন। মক্তবে শিক্ষকতা, মসজিদ ও দরগা’র খাদেমগিরি, লেটোদলে যোগদান এবং পরবর্তী সময়ে রুটির দোকানে চাকরি-এত বৈচিত্র্যময় কর্মময়তা দিয়েই কিন্তু এই মহামানবের মহাজীবনের সূচনা। পৃথিবীর কোন্ কবি-সাহিত্যিকের জীবন এমন বৈচিত্র্য এবং বাস্তবতায় ভরা? সম্ভত একজনেরও না!
কর্মময় জীবনের কঠোর বাস্তবতা থেকে নজরুল রস নিংড়ে এনেছেন এবং গোটা মানব সভ্যতার জন্যে তা অকাতরে বিলিয়েছেন। বিশ্বের সকল শ্রমজীবি মানুষ তাঁর কাব্য থেকে রস ও শক্তি আহেরণ করে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর নিরন্তর প্রেরণা লাভ করে থাকে। তাঁর সর্বহারা, কৃষাণের গান, শ্রমিকের গান, ধীবরদের গান, ফরিয়াদ, কুলি-মজুর কবিতা, অসংখ্য গান, অনেক প্রবন্ধ, অভিভাষণ, সম্পাদকীয় ইত্যাদি মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠতম সম্পদের মধ্যে অগ্রগণ্য যেগুলোর মাধ্যমে বিশ্বের নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। এদিক থেকে নজরুল বিশ্ব মানবতার অন্যতম শ্রেষ্ঠতম বন্ধু-যে অভিধায় বিশ্বের খুব কম সংখ্যক কবি-সাহিত্যিককে অভিহিত করা যায়।
নজরুল সাম্যের কবি। অন্যভাবে বলতে গেলে পৃথিবীর কোন কবি-সাহিত্যিক তাঁর মতো করে সাম্যের এমন জয়-গান গাইতে পারেন নি। নজরুলকে যদি বিশ্বসমাজ অধিকতর আবিষ্কার, লালন ও ধারণ করতে পারে তবে সাহিত্যের মধুর অস্ত্রে বিশ্ব সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবার সুযোগলাভে ধন্য হবে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, সাহিত্য যদি নির্যাতন-নিপীড়িন বন্ধের হাতিয়ার আর সকল মানুষের অধিকার ও সাম্য প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেক্ষেত্রে বিশ্বে প্রথম স্থানে থাকবেন একজন-যিনি বাংলা মায়ের তিলকরত্ন, আমাদের প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
*
কাজী নজরুল ইসলাম জমিদার ছিলেন না। জমির মালিক তিনি ইচ্ছে করেই হননি। বরং তাঁর সকল অর্জন, সকল উপার্জন মানুষের জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মাত্র ২২ বছরের সক্রিয় কর্মকালে তিনি শ্রমজীবী ও তাঁদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য একটি নৈশ ্বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, নজরুলের এসব কর্মকাণ্ড ও অবদান নিয়ে তেমন কোন অলোচনাই হয় না।
*
মে দিবসের এ লেখাটির শুরুতেই আমি উল্লেখ করেছিলাম যে, যে সব নিয়ামক আমাকে শ্রমনির্ভর জীবন গড়তে এবং শ্রম ও শ্রমজীবীদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে দিক-নির্দেশক হিসেবে কাজ করে তার মধ্যে অন্যতম হল আমার ধর্ম ইসলাম। ইসলামে শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা অতুলনীয়। শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় পবিত্র কোরআন ও মহানবী (সাঃ) এর হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যা কিছু গড়ে উঠেছে তা সবই শ্রমের ফল এবং শ্রমিকের কৃতিত্ব। ইসলাম শ্রমিক এবং শ্রমকে যথার্থ মূল্যায়ন করেছে। একমাত্র ইসলাম ধর্মই শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করতে মূলনীতি ও বিধান প্রবর্তন করেছে।
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন মজিদে আল্লাহ তা'লা বলেন- ‘অতপর নামাজ সমাপ্ত হলে জীবিকা উপার্জনের জন্য তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’
(সূরা আল জুমা, আয়াত: ১০)। ’
আল্লাহ পাক আরও বলেন- ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।’
(সূরা বালাদ, আয়াত: ৪)।
পৃথিবীর সর্ব প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে বহু নবী-রাসূল এমনকি সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মোহাম্মদ (সা.)-ও শ্রমজীবী ছিলেন। নবী-রাসূল এবং সাহাবায়ে কেরামগণ নিজ হাতে কাজ করে জীবিকা উপার্জন করেছেন। হযরত আদম (আ.) ছিলেন দুনিয়ার প্রথম কৃষক, হজরত শুয়াইব (আ.) ও হজরত হারুন (আ.) এর পেশা ছিল পশু পালন ও দুধ বিক্রি। হজরত মুসা (আ.) ছিলেন একজন রাখাল। হজরত লুত ও হজরত শিস (আ.) ছিলেন কৃষক, হজরত ইদরিস (আ.) ছিলেন দর্জি, হজরত নুহ (আ.) ছিলেন কাঠমিস্ত্রি, হজরত ইবরাহিম (আ.), হজরত ইয়াকুব (আ.), হজরত হুদ (আ.) সালেহ (আ.) ছিলেন ব্যবসায়ী। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন ব্যবসায়ী।
মহানবী (সা.) বলেছেন- আল্লাহ দুনিয়াতে এমন কোন নবী-রাসূল পাঠান নি যিনি ছাগল ও ভেড়া চড়ান নি। তখন সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে রাসূল (সা.) আপনিও? রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, হ্যাঁ! আমিও মজুরীর বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল ও ভেড়া চড়াতাম। (বুখারি, হাদিস নং: ১৩৪০)।
হজরত আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন- ‘অধীনস্থদের সাথে দুর্ব্যবহারকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (ইবনে মাজাহ)।
মহানবী (সা.) শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি গুরত্ব দিয়ে মালিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে বলেন- ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দাও’। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৮১৭)।
*
পরিশেষে, পৃথিবীর সর্বত্র সকল শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক এই হোক মে দিবসের প্রতিশ্রুতি।
(ঢাকা, ০১ মে, ২০২১)
Comments