আলমগীর কবির: বাংলার আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র।। মোঃ জেহাদ উদ্দিন
- মো জেহাদ উদ্দিন
- Jun 26, 2022
- 2 min read
আলমগীর কবির।
বাংলাদেশ, ফিলিস্তিন ও আজারবাইজানের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী দ্বিতীয় ব্যক্তি তিনি ছাড়া আর কেউ আছেন কি-না তা আমাদের জানা নেই।
বাংলাদেশের ইতিহাসের অপরিহার্য একটি নাম আলমগীর কবির। তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানতুল্য। মূলত: চলচ্চিত্রকার হিসেবে তাঁর পরিচিতি থাকলেও তাঁর প্রকৃত পরিচয় আরও ব্যাপক, আরও বিস্তৃত।
পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি যে বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান রেখেছেন তা তুলনাবিহীন। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা, ন্যায়নিষ্ঠ। পরাধীনতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল আপোষহীন। শুধু দেশীয় পরিমণ্ডলে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে অক্সফোর্ডে গমন করেন। লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি ইংগনমার বার্গম্যানের সেভেনথ সিল সম্পর্কে জানতে পারেন। অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে এ চলচ্চিত্রটি তিনি বেশ কয়েকবার দেখেন এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি এ সময়ে চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাস, চলচ্চিত্র পরিচালনা এবং কলাশাস্ত্রের উপর লন্ডনের অনেকগুলো প্রশিক্ষণ কোর্স সম্পন্ন করেন।
লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি ইংল্যান্ডের কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং কম্যুনিস্ট পার্টির খবরের কাগজ ডেইলি ওয়ার্কারের প্রতিবেদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কম্যুনিস্ট দৈনিকের প্রতিবেদক হিসেবে তিনি কিউবার রাষ্ট্রপতি ফিডেল ক্যাস্ত্রোর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন।
আলমগীর কবির ফিলিস্তীন এবং আলজেরিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। তিনি লন্ডনে ইস্ট পাকিস্তান হাউস এবং ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট নামের সংগঠন গড়ে তোলেন এবং জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখেন।
১৯৬৬ সালে আলমগীর কবির স্বদেশে ফিরে আসেন। বামপন্থী আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে আইয়ুব খান সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে তিনি একজন সাংবাদিক হিসেবে তাঁর পেশাজীবন শুরু করেন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে অত্যন্ত খ্যাতি লাভ করেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে আলমগীর কবির স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ইংরেজি বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধান প্রতিবেদক হিসেবেও কাজ করেন। এ সময় তিনি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্র পরিচালক জীবন শুরু করেন।
আলমগীর কবির নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য্য চলচ্চিত্র হলো-ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩), সূর্য কন্যা (১৯৭৫), সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭), রূপালী সৈকতে (১৯৭৯), মোহনা (১৯৮২), পরিণীতা (১৯৮৪) এবং মহানায়ক (১৯৮৫)।
আলমগীর কবির বাংলা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরোধা ব্যাক্তিত্ব। তাঁর নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হলো-লিবারেশন ফাইটার, পোগ্রম ইন বাংলাদেশ, কালচার ইন বাংলাদেশ, সুফিয়া, অমূল্যধন, ভোর হলো দোর খোল, আমরা দুজন, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, মণিকাঞ্চন, চোরাস্রোত।
শিল্পকলায় অসাধারণ অবদানের জন্য আলমগীর কবিরকে ২০১০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার হিসাবে পরিচিত “স্বাধীনতা পুরস্কার” প্রদান করা হয়। দেশে-বিদেশে তিনি বহু পুরস্কার ও পদকে ভূষিত হয়েছেন।
২০০৮ সালে পরিচালক কাওসার চৌধুরী আলমগীর কবিরের কর্মজীবন নিয়ে প্রতিকূলের যাত্রী নামে একটি প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করেন।
গুণী এ মানুষটির জন্ম ১৩ ডিসেম্বর ১৯৩৭ খ্রি. রাঙামাটি জেলায়। ১৯৮৯ সালের ২০ জানুয়ারি বগুড়া চলচ্চিত্র সংসদের উদ্বোধন ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আবর্তন’ এর উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণশেষে ঢাকায় ফেরার পথে নগরবাড়ি ফেরিঘাটে তাঁকে বহনকারী গাড়িটি বেপরোয়া একটি ট্রাকের ধাক্কায় যমুনা নদীতে পড়ে গেলে সেখানেই তাঁর সলিল সমাধি ঘটে। পরবর্তীতে তাঁকে মনসুর মঞ্জিল, মনসুর কোয়ার্টার, নবগ্রাম রোড, বরিশালে দাফন করা হয়।
আলমগীর কবির আমাদের আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁকে সঠিকভাবে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব।
(ঢাকা, ২৬ জুন ২০২২)
লেখক: উপসচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
প্রতিষ্ঠাতা: নজরুল স্টাডি সেন্টার; জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্যানিকেতন
תגובות