top of page

ইসলাম ও নজরুল মানস মো. জেহাদ উদ্দিন

ইসলাম ও নজরুল মানস।। মো. জেহাদ উদ্দিন

 


মাটি থেকে মানুষকে সৃষ্টির পর আল্লাহ পাক ফেরেশতাকুলকে নির্দেশ দিলেন এরা যেন সকলে তাকে সম্মানসূচক কুর্নিশ করে। এর মাধ্যমে স্রষ্টা বিশ্ব জগতকে জানান দিলেন যে, মানুষ হল সকল সৃষ্টির সেরা, তার সম্মান সকলের ঊর্ধ্বে, সে আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে মাথা নত করবে না, তার শির থাকবে চির উন্নত। সে কারও দাসত্ব করবে না; বরং সে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করবে। তবেই তো সার্থক হবে মানব জনম। কিন্তু নানাবিধ বিভ্রান্তির মধ্যে পতিত হয়ে মানুষ যখন দাসত্ব শৃংখলে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলে তখন তার সহজাত মর্যাদার আসনটি সে হারিয়ে ফেলে, শুরু হয় চরম গøানিকর জীবন। মানবতার এহেন বিপর্যয় ব্যথায় ব্যথিত স্রষ্টা অপেক্ষা করেন মানুষ কখন মুক্তির গান গাইবে, কখন তার মর্যাদার জায়গাটিতে সে ফিরে আসবে। মানুষকে মুক্তির স্বাদ দিতে অর্থাৎ সমস্ত দাসত্ব শৃংখল থেকে মুক্ত করতে যুগে যুগে কত না মহামানব কাজ করে গেছেন। তারা মানুষকে মুক্তির গান শুনিয়েছেন, অন্ধকার থেকে আলোকের পথে আনার চেষ্টা করেছেন। বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়কর প্রতিভা কাজী নজরুল ইসলাম কী এমনই একজন মহামানব, নাকি প্রচলিত অর্থে কেবলই একজন সাহিত্যিক? বিংশ শতকের গোড়ার দিকে ভূ-ভারতের চরম অরাজকতা আর অস্থিরতার সময়টিতে, মানবাত্মার চরম গøানিকর পরিস্থিতিতে যিনি বাংলার আকাশে ধূমকেতুরূপে উদয় হয়ে ঘোষণা দিলেনÑ ‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু...’ -সেই নজরুল কি কেবল মহাশূন্যের ধূমকেতু, নাকি মর্ত্যলোকের আলোকদিশারী? যার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে পরম আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণÑ ‘বল বীর বল চির উন্নত মম শির শির নেহারি আমারি, নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির!’ সেই নজরুল কী আমিত্বের ঠুনকো গান গেয়েছেন নাকি মানবাত্মার মুক্তির জয়ধ্বনি উচ্চারণ করেছেন যার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনেন স্বয়ং বিধাতাও। সর্বসাধারণের কাছে নজরুলের প্রথম পরিচয় তিনি বিদ্রোহের কবি, যদিও এটি তাঁর সামগ্রিক পরিচয়ের অংশবিশেষ মাত্র। তবুও একথা মানতেই হয় যে, মানবাকাশে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ তুর্য’ হিসেবেই। এই তুর্যবাদক তাঁর বিদ্রোহী কবিতায় গগনবিদারী যে আওয়াজ তুলেছেন তা মানবাত্মার মুক্তির আপোষহীন শৈল্পিক আওয়াজ বৈ কিছু নয়। কিন্তু নজরুলের এই বিদ্রোহী সত্তা যখন ‘খোদার আসন আরশ ছেদিয়া উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রীর’ হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করে তখন তার সঠিক বার্তাটি উপলব্ধি করতে অনেকেই ব্যর্থ হন। বিশেষত এ ধরনের রচনা প্রকাশের প্রথম দিকে অনেক সাধারণ মুসলমান মৌলানা-মৌলভী তো নজরুলকে কাফের উপাধি পর্যন্ত দিয়ে ফেলেছিলেন। ‘আর ভগবান বুকে এঁকে দেই পদচিহ্ন’ পড়ে তো হিন্দুদের একটি অংশও তাঁকে যবন, অস্পৃশ্য ইত্যাদি বলে একেবার সমাজচ্যুত করে ফেলেছিল। এ সবই ছিল তাঁর প্রতি চরম অবিচার। জাতীয় কবির প্রতি এ ধরনের অবিচার তখন যেমন হয়েছে, এখনও হচ্ছে। কেবল বদলেছে অবিচারের রকম ফের। মোট কথা, নজরুল মানস পুরোপুরি আবিষ্কার ও আত্মস্থ করার সৌভাগ্যের কোঠায় আমরা এখনও পৌঁছুতে পারিনি। ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক লিখেছেনÑ ‘বাংলা-সাহিত্যে নজরুল ইসলামের আবির্ভাব একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা, একেবারেই অভাবিত ব্যাপার। রাবীন্দ্রিক কাব্য-কৌমুদী-পরিপ্লাবিত বাংলা সাহিত্যেও কোন ক্ষেত্রে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় কেহ স্বতন্ত্র আসন দাবী করিতে পারেন, এই কথা কোন বাঙালী তখন ভাবিতেও পারিতেন না। অথচ নজরুল ইসলাম যেন এক দিনে বিনা আয়াসে ‘বিদ্রোহী’ নামক মাত্র একটি কবিতায় রবীন্দ্রনাথ হইতে একটি স্বতন্ত্র আসন দখল করিয়া বসিলেন। রবীন্দ্রনাথের গীতি কবিতার মৃদু মধুর গুঞ্জন ধ্বনিতে মুখরিত বাংলায় নজরুল ইসলাম যখন অত্যদ্ভুত জোরালো ভাব ও ভাষায় ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশ করিলেন, তখন মহাযুদ্ধের দূরাগত কামান-গর্জনের ন্যায় যে গম্ভীর নিনাদ শ্রæত হইল, তাহাতে ভাব-বিহŸল বঙ্গ সচকিত চিত্তে বুঝিল ও বিস্মিত নয়নে দেখিল যে, বাংলা-সাহিত্যাকাশে হঠাৎ একটি ধূমকেতুর আবির্ভাব ঘটিয়াছে।’... ...‘মোটের উপর, রবীন্দ্রনাথের পাশে নজরুল ইসলামের আবির্ভাবেই জাতির মনে মানুষরূপে বাঁচিবার আশা জাগিল, ভাষা স্ফূরিত হইল। নজরুলের আবির্ভাবে বাংলার লোক আত্মসম্ভিৎ ফিরিয়া পাইল, আত্মসচেতনতায় উদ্বুদ্ধ হইল, ভাবলোকের জীব হইয়াও মর্ত্যে মাটির মানুষরূপে বাঁচিবার উদগ্র বাসনায় উদ্দীপ্ত হইল। রবীন্দ্রনাথও জাতির আত্মসচেতনতার ব্যাপার সম্বন্ধে সজাগ হইলেন, তাঁহার এই অনুভূতি অভিব্যক্ত হইল-নজরুলের নামে তাঁহার ‘বসন্ত’ নাটকের উৎসর্গে।’ ‘এমন করিয়া জাতীয় জীবনের উদগাতারূপে নজরুল ইসলামের আবির্ভাব হওয়ায়, বাংলা-সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়া গেল। তাঁহার মতো এমন করিয়া মনে-প্রাণে, কাজেকর্মে কোন বাঙালি কবি নিজের দেশকে এবং দেশের জনগণকে ভালবাসিতে পারেন নাই। কবি যে ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করিলেন, তাহাই বাংলা-সাহিত্যে নূতন যুগের ভিত্তি প্রোথিত করিল; তাঁহার পরবর্তী সাহিত্যে এই বিদ্রোহের সুরই সর্বত্র অনুরণিত হইয়াছে। নিত্য নূতন পথে কত সাহিত্যিক যে অভিনব উপায়ে অভিযান শুরু করিয়াছেন, তাহার প্রকৃত হিসাব এখনও নির্ণীত না হইলেও, এই কথা সর্ববাদিসম্মত যে, তাহার পুরোভাগে যুগপ্রবর্তক কবিরূপে নজরুল ইসলামই দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন।’ (মুসলিম বাংলা-সাহিত্য : ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক, পৃ. ২০৯-২১০) নজরুল মানুষের কবি, মানবতার কবি, সাম্যের কবি, ন্যায়ের কবি, স্বাধীনতার কবি, মাটির এ পৃথিবীর কবি। সাহিত্য যে সর্বসাধারণের জন্যে তা নজরুল না এলে এতোটা ভালোভাবে বুঝা যেত না। কবি সাহিত্যিকেরা সাধারণত এমন এক ধূম্রজালপূর্ণ জগৎ তৈরি করেন যেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। সাহিত্য সমাজের দর্পণ বটে, তবে তা কদাচিৎই কোন সমাজকে বদলে দেবার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবার সৌভাগ্য অর্জন করতে পেরেছে। প্রকারান্তরে অধিকাংশ সাহিত্যই ব্যবহৃত হয় আত্মগোপন, আত্মতৃপ্তি কিংবা কখনও কখনও আত্মপ্রবঞ্চনার মাধ্যম হিসেবেও। নজরুল সাহিত্য এসবের ব্যতিক্রম, একেবারেই ব্যতিক্রম। তাঁর সাহিত্যকে অবলম্বন করে সমাজ বদলে যায়, দেশ স্বাধীন হয়, অনাকাক্সিক্ষত সব শৃংখল থেকে মানবাত্মা মুক্ত হয়। ‘সাহিত্যে তিনি যে ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহা চারণ কবির ভূমিকাই বটে। বাংলা হিন্দু ও মুসলমানদের দেশ, তাই কবিকে হিন্দু ও মুসলমানÑ এই দুই সমাজকে এক সঙ্গে জাগাইয়া তুলিবার ভার গ্রহণ করিতে হইয়াছে। এই দায়িত্ব যে তিনি অত্যন্ত যোগ্যতার সহিত সম্পাদিত করিয়াছেন, সে বিষয়ে এখন আর কাহারও মতভেদ নাই।’ (মুসলিম বাংলা-সাহিত্য : ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক, পৃ. ২১০) ‘মানুষকে মানুষ হিসাবে মানুষেরই মর্যাদা দিতে হইবে, এই সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নজরুল একদিন বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়াছিলেন। তিনিই জাতিকে রণক্ষেত্রে দণ্ডায়মান নির্ভীক সেনাপতির মত আদেশ দিয়াছিলেনÑ মৃত্যুর আতঙ্ক ত্যাগ কর, সংস্কারের বন্ধন ছিন্ন কর, মিথ্যার মায়াজাল ভেদ কর, তোমরা মেষ নও, মানুষ হও। আজও বাংলা-সাহিত্যের দিক্-দিগন্তে কবির এই বজ্র-নির্ঘোষ ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হইতেছে, আর আমরা উপলব্ধি করিতে চেষ্টা করিতেছি যে, ইহাই নবজাগ্রত ইসলামের সনাতন বাণী। সাহিত্যের ক্ষেত্রে নজরুল তাঁহার পূর্ববর্তী প্রাচীন ও আধুনিক মুসলিম সূরীদের অনুসৃত নীতি মোটামুটি অনুসরণ করিলেও, ধর্ম ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাঁহার উপলব্ধি সরল ও বলিষ্ঠের যৌবন-সুলভ উপলব্ধি। তাই দেখা যায়, Ñ ইসলাম দুর্বল নহে, শৌর্য, বীর্য ও পৌরুষই ইহার প্রাণ; সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব ও প্রেমই ইহার সৌন্দর্য; অধিদেশীয়, অধিবর্ণীয় এবং অধিকালীন প্রকৃতিই ইহার পরম বৈশিষ্ট্য, এই সত্য অতি প্রাচীন হইলেও, নজরুলের সাহিত্য-সাধনায় নূতন রূপ ও অভিনব মূর্তি ধারণ করিয়াছে। এতদিন বাংলার মুসলিম সাহিত্যিকেরা যে ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছিলেন, তাহাতে ধর্ম ছিল, সমাজ ছিল, ইতিহাস ছিল, সংস্কৃতিও ছিল; কিন্তু পূর্ণাঙ্গ, প্রকৃত ‘সাহিত্য’ ছিল না। তাঁহারা যে পরশমণির সন্ধানে যুগযুগান্তর কাটাইয়াছিলেন, হঠাৎ বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় আসিয়াই যেন নজরুলের মধ্যে তাহা আবিষ্কার করিলেন। তাঁহার সংস্পর্শে সমস্তই যেন এক নিমেষে সোনা হইয়া গেল, জিয়ন-কাঠির ছোঁয়ায় সাহিত্য জীবন-লাভ করিয়া প্রাণ-চঞ্চল হইয়া উঠিল। মোট কথা, তিনিই বাংলা-ভাষায় এক নব্য ইসলামী-সাহিত্যের ভিত্তি প্রোথিত করিলেন। তাঁহার ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ-দহম’, ‘মোর্হরম’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘নতুন চাঁদ’, ‘খালেদ’, ‘কোরবানী’, ‘চিরঞ্জীব জগলুল’, ‘আমানুল্লাহ’ প্রভৃতি বহু কবিতায় ইসলাম নূতন রূপ লাভ করিয়াছে।’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ২১০-২১১) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বলা হয় বাংলার মুসলিম শাসকদের। ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বঙ্গবিজয় বাংলার আকাশে ইসলামের সুমহান সাম্য-শান্তির বাণীই বয়ে আনেনি, এর মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নবতর বিকাশের দুয়ার উন্মোচিত হয়। বাংলার তুর্কী আমলের পর আমরা মুখোমুখি হই স্বাধীন মুসলিম বাংলা আমলের যার সময়কাল ১৩৫০ থেকে ১৫৭৫খ্রি.। এ সময়ের শাসকেরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কতখানি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদর্শন করেছেন তা ইতিহাস ও সাহিত্যের পাঠকমাত্রই অবগত আছেন। বাংলা-সাহিত্যের অনেক বিখ্যাত বই-পুস্তক সেই সময়ের রচনা। মুসলিম শাসকগণ এতটাই উদারতার পরিচয় দেন যে, তারা হিন্দু ধর্মের বড় বড় বই সেই সময় বাংলায় তর্জমার ব্যবস্থা করেন। বাংলা ভাষার প্রতি মুসলিম শাসকদের সুনজর শেষ দিন পর্যন্ত বলবৎ ছিল এবং তাদের সীমাহীন সেই দরদ ও পৃষ্ঠপোষকতার ফলেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে। বাংলার মুসলিম বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় কোন পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি; সংস্কৃত ছিল এখানকার রাজ রাজরাদের ভাষা, দরবারী ভাষা। শুধু তা-ই নয়, ধর্মীয় ভাষাও ছিল সংস্কৃত। সংস্কৃত ভিন্ন অন্য কোন ভাষায় স্রষ্টার আরাধনাও ছিল নিষিদ্ধ। এ সকল নেতিবাচক পরিবেশ ও পরিস্থিতির কবলে পড়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আঁতুর ঘরেই মৃতপ্রায় অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিলÑ যেখান থেকে একে উদ্ধার করে পূর্ণ যৌবন দান করে গেছেন বাংলার মুসলিম শাসকেরা। তবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক মুসলিম শাসকগণ হলেও বাংলা সাহিত্যে ইসলাম তার স্বীয় রূপ-লাবণ্য নিয়ে আবির্ভূত হতে পারেনি নজরুল-পূর্ব সাহিত্যে। বাংলার মুসলিম শাসকগণ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন বটে, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে ইসলামের রূপ-রস-প্রবাহিত করতে তাঁরা খুব একটা সচেষ্ট ছিলেন বলে মনে হয় না। যদি তা করা হত তবে বাংলার ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে নির্মিত হতো, বাংলা সাহিত্য-সৌধের রূপ-লাবণ্য হয়তো অন্যভাবে বিকশিত হত। বাংলার মুসলমানদের অধঃপতন কোন কোন পথে নেমে এসেছিল এবং রঙ্গমঞ্চের অন্তরাল থেকে কোন অশুভ শক্তি ইন্ধন যোগাচ্ছিল, তা সম্যক উপলব্ধি করতে হলে আমাদের জানতে হবে সমকালে তাদের ধর্মবিশ্বাস, সমাজ ও সংস্কৃতি কতখানি বিকৃত হয়ে পড়েছিল। প্রকৃতপক্ষে বাংলার মুসলমানদের আকীদাহ বিশ্বাস, সমাজ ও সংস্কৃতিতে পৌত্তলিকতার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল বাংলার শাসনকর্তা আলাউদ্দীন হোসেন শাহের সময় থেকে। হিন্দু রেনেসাঁ আন্দোলনের ধারক ও বাহকদের দ্বারা পরিপূর্ণ ও পরিবেষ্টিত মন্ত্রিসভা দ্বারা পরিচালিত হোসেন শাহ শ্রীচৈতন্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ঐতিহাসিকগণের বর্ণিত এ কথা সত্য হলে অতঃপর হোসেন শাহের তৌহিদের প্রতি বিশ্বাস কতটুকু ছিল তা সহজেই অনুমেয়। তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় বৈষ্ণববাদের প্রবল প্লাবন বাংলার মানব সমাজকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। নিম্নশ্রেণীর হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত মুসলমানকে সহজেই আকৃষ্ট ও প্রভাবিত করেছিল হিন্দু তান্ত্রিকদের অপরাধমূলক অশ্লীল ও জঘন্য সাধন পদ্ধতি, বামাচারীদের পঞ্চতত্ত¡ অর্থাৎ যৌনধর্মী নোংরা আচার অনুষ্ঠান, বৈষ্ণবদের প্রেমলীলা প্রভৃতি। এসব আচার অনুষ্ঠান ও প্রেমলীলা হিন্দু সামাজের পবিত্রতা, রুচিবোধ ও নৈতিক অনুভূতি বহুলাংশে বিনষ্ট করলেও নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গের এ অস্ত্র দ্বারাই মুসলমানের ধর্ম ও তমদ্দুনকে তক্ষ-বিক্ষত করা হয়েছে। মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসে ঘূণ ধরিয়েছিল এ সময়ের মুসলিম নামধারী কবি-সাহিত্যিকগণÑ যাদেরকে কাঠের পুতুল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, বাংলা ভাষার উন্নয়নের নামে প্রকৃতপক্ষে হিন্দু রেনেসাঁ আন্দোলনের ধ্বজাবাহীগণ। দ্বিতীয় যুগের হিন্দু কবিগণকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে এসব মুসলিম কবিগণ হিন্দু দেবদেবীর স্ত‚তিমূলক কবিতা, পদাবলী ও সাহিত্য রচনায় প্রবৃত্ত হয়। তারা শ্রীকৃষ্ণের প্রণয়লীলা, যৌন আবেদনমূলক কীর্তন, মনসার ভাসান সংগীত, দুর্গা ও গঙ্গার স্তোত্র ও হিন্দুদের পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে বহু পুঁথিপুস্তক রচনা করেন। শেখ ফয়যুল্লাহ ‘গোরবিজয়’ নামক একখানি মহাকাব্য রচনা করে বাংলার নাথ স¤প্রদায় ও কোলকাতার কালীমন্দির প্রতিষ্ঠাতা গোর নাথ ও তার নাথ মতবাদের স্ত‚তি কীর্তন করেন। জাফর খান অথবা দরাফ খান হিন্দুধর্মের প্রতি অনুরক্ত হয়ে সংস্কৃত ভাষায় গঙ্গাস্তোত্র রচনা করেন (সূত্র. বঙ্গভাষা ও সাহিত্য : দীনেশ চন্দ্রসেন)। অনুরূপভাবে আব্দুস শুকুর ও সৈয়দ সুলতান শৈব ও তান্ত্রিক মতবাদে আকৃষ্ট হয়ে সাহিত্য রচনা করে (গোলাম রসূল কর্তৃক প্রকাশিত শুকুর মাহমুদের পাঁচালি দ্রষ্টব্য) কবি আলাউল ও মীর্জা হাফেজ যথাক্রমে শির ও কালীর স্তবস্তুতি বর্ণনা করে কবিতা রচনা করেন (বঙ্গভাষা ও সাহিত্য : দীনেশ চন্দ্র সেন)। সৈয়দ সুলতান নবী বংশের তালিকায় ব্রহ্ম, বিষ্ণু, শিব ও কৃষ্ণকে সন্নিবেশিত করেন (ব্রিটিশ পলিসি ও বাংলার মুসলমান : এ আর মল্লিক)। হোসেন শাহের আমলে সত্য নারায়ণকে সত্যপীর নাম দিয়ে মুসলমানগণ পূজা শুরু করে দিয়েছিল। উপর্যুক্ত কবি-সাহিত্যিকগণের ধর্মমত ও জীবনবৃত্তান্ত সম্পর্কে কিছু জানার উপায় নেই। সাহিত্যক্ষেত্রে শুধু তাদের নাম পাওয়া যায়। হয় তো তারা ধর্মান্তরিত মুসলমানের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন মাত্র এবং পরিপূর্ণ হিন্দু পরিবেশে তাদের জীবন গড়ে উঠেছে; অথবা মুসলমান থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে হরিদাসের ন্যায় মুরতাদ হয়ে গেছে। তবে তাদের কবিতা, সাহিত্য, পাঁচালী, সংগীত-প্রভৃতি তৎকালীন মুসলিম সমাজ ও সংস্কৃতির উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। পরবর্তীকালে ইসলাম-বৈরীগণ বাদশাহ আকবরকে তাদের অভীষ্ট সাধনে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। জয়পুরের রাজা বিহারীমলের সুন্দরী রূপসী কন্যা যোধবাই আকবরের মহিয়ষী হিসেবে মোগল হারেমের শোভাবর্ধন করে। আকবরের একাধিক হিন্দু পতœী ছিল বলে জানা যায়। সেকালে হিন্দু রাজাগণ আকবরের কাছে তাদের কন্যা স¤প্রদান করে তাঁকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। এসব হিন্দু পতœীকে রাজপ্রাসাদের মধ্যে মূর্তিপূজা ও যাবতীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়। মুসলমান মোগল বাদশাহের শাহী মহল মূর্তিপূজা ও অগ্নিপূজার মন্দিরে পরিণত হয়। এভাবে আকবরের উপরে শুধু হিন্দু মহিয়ষীগণেরই নয়, হিন্দু ধর্মেরও বিরাট প্রভাব পড়েছিল। এসব মহিয়ষীর গর্ভে যেসব সন্তান জন্মগ্রহণ করে এহেন পরিবেশে জ্ঞানচক্ষু খুলেছে, পালিত-বর্ধিত হয়েছে, তাদের মনমানসিকতার উপর পৌত্তলিকতার প্রত্যক্ষ প্রভাব কতখানি ছিল তা অনুমান করা কঠিন নয়। এর স্বাভাবিক পরিণাম হিসাবে আমরা দেখতে পাই, আকবর দীন-ই-ইলাহী নামে নতুন এক ধর্ম প্রবর্তন করেন, ইসলামের মূলোৎপাটনে সব ধরনের অপপ্রয়াসে সমর্থন দেন। মানবমুক্তির হেরার রাজতোরণ ইসলাম কালক্রমে এভাবে ভূ-ভারতে কার্যত নামসর্বস্ব খোলসে পরিণত হয়। মুসলমানগণ চিহ্নিত হয় আত্মবিস্মৃত আত্মপ্রবঞ্চক আত্মঘাতি এক জাতি হিসেবেÑ যার চিহ্ন বাংলা সাহিত্যে প্রকটভাবেই রয়ে গেছে। বাংলা সাহিত্যে নজরুল সবচেয়ে শক্তিশালী ও সর্বাপেক্ষা বিস্ময়কর প্রতিভা, বিশ্বসাহিত্যেও তিনি অদ্বিতীয়। তবে একই সঙ্গে তিনি সাহিত্যের সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত প্রতিভাও। সাহিত্যের এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে তিনি তাঁর বিস্ময়কর ও অতুলনীয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেননি। কাব্য, সংগীত, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, নাটক, পত্র সাহিত্য, অভিভাষণ, অনুবাদ সাহিত্য ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি অতুলনীয় অবদান রাখেন। তিনি সাহিত্যিক, সমাজকর্মী, রাজনীতিবিদ, সংবাদপত্রের সম্পাদক ও প্রকাশক, চলচ্চিত্রকার, নাট্যকার, ভারতে ব্রিটিশ-রাজত্বের যবনিকা ঘোষণাকারীÑ লিখিতভাবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ঘোষণাকারী। মূলত তিনিই বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রযুগের সদর্প যবনিকা টানেন। তা-ও আবার খোদ রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায়ই। সাহিত্য যদি হয় জীবনের জন্যে, মানবতার জন্যে, তাহলে নজরুলের তুল্য দ্বিতীয় কোন প্রতিভা কেবল বাংলা সাহিত্যে কেন, বিশ্ব সাহিত্যেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আসলে তিনি ছিলেন মহামানব। কেবল সাহিত্যে তিনি নিজেকে আবদ্ধ করে রাখেননি। আমরা আগেই বলেছি, তিনি একাধারে সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক, ধর্ম সংস্কারক, চলচ্চিত্রকার, আরও কত কী। অথচ কার্যত তাঁর কর্মকাল মাত্র ২২ বছরের। জীবনের শেষ ৩৪ বছর তিনি বিধাতার অদৃশ্য হাতের ইশারায় বাকরুদ্ধ জীবন যাপন করেন। এত অল্প কর্মকালে তিনি যে সম্পদ পৃথিবীকে দিয়ে গেছেন তার তুলনা মহাবিস্ময়কর। কিন্তু আমাদের চরম দুর্ভাগ্য, নজরুল সম্পদের অধিকাংশ বিষয়ই আমাদের অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে এবং তাঁর সম্পদের যথার্থ কদর আমরা এখন পর্যন্ত করতে পারি নি। নজরুল প্রতিভার স্বরূপ যথার্থভাবে উন্মোচিত হলে তা হবে আমাদের সৌভাগ্য ও মঙ্গলের কারণ। নজরুলের বয়স যখন মাত্র ৩০ বছর সেই সময় অর্থাৎ ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে তৎকালীন জাতীয় শ্রেষ্ঠ মনীষীগণের আয়োজনে তিনি জাতীয় কবিরূপে সংবর্ধনা লাভ করেন। নজরুলের শ্রেষ্ঠতম কীর্তি তাঁর গান। এ বিষয়ে তাঁর নিজের উক্তিÑ ‘কাব্যে ও সাহিত্যে আমি কি দিয়েছি, জানি না; ...কিন্তু সঙ্গীতে যা দিয়েছি, সে সম্বন্ধে আজ কোনও আলোচনা না হলেও ভবিষ্যতে যখন আলোচনা হবে, ইতিহাস লেখা হবে, তখন আমার কথা সবাই স্মরণ করবেন, এ বিশ্বাস আমার আছে।’ নজরুলের এ উক্তির কারণে এ কথা মনে করার কোন কারণ নেই যে, মহান এ স্রষ্টার অন্য কীর্তিগুলো তুলনামূলকভাবে গৌণ। বরং এ কথা অবিসংবাদিত সত্য যে, নজরুলের প্রতিটি সৃষ্টিই স্ব স্ব মহিমায় শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত। আসলে নজরুল যেন প্রতি মুহ‚র্তে নিজেকেই অতিক্রম করেছেন। নজরুলের উপমা নজরুলই, নজরুলের প্রতিদ্ব›দ্বী নজরুলই। নজরুল বাংলা গানের চির বন্ধ্যাত্ব ঘুচিয়েছেন, বাংলা সংগীত শিল্পকে বিশ্বের দরবারে চিরস্থায়ী অহংকারের আসনে বসিয়েছেন। আর অমর এ কাজটি তিনি করেছেন বাংলার মা-মাটি মানুষের একান্ত আপনার হয়ে; মায়াবনে বিচরণকারী কোন কল্পনাবিলাসী স্রষ্টা হয়ে নয়; বরং বাস্তবতার ভেতরে অবস্থান করে গণমানুষের একান্ত আপনজন হিসেবে তিনি বাংলা সংগীতের এক মহাবিশ্ব রচনা করেছেন। তাঁর এ সঙ্গীত মহাবিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে শাশ্বত-চিরন্তন ও পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা ইসলাম ও তার অনুসারীদের কথা। নজরুল নিজে একজন খাঁটি মুসলমান ছিলেন। ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য তিনি হৃদয়ঙ্গম করেছেন এবং তার সেই হৃদয়নিঃসৃত চেতনা দিয়ে তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা কেবল বাংলা সাহিত্যের নয়; বিশ্ব সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, বিশ্ব মুসলিমের অতুলনীয় অহংকার। কিন্তু নজরুল মানসের এই দিকটির উপর যেটুকু আলোচনা-পর্যালোচনা বা দৃষ্টিপাত প্রদান করা আবশ্যক ছিল কিংবা বিষয়টি যতটা পরিচর্চার দাবী রাখে তার অংশবিশেষও এখন পর্যন্ত হয়নি বলে আমি মনে করি। আমার এ প্রয়াস এ বিষয়ে খানিকটা মূল্য সংযোজন করতে পারবে বলেও আমি মনে করি না, নজরুল পাঠক এবং বিশেষত একজন মুসলমান হিসেবে এ আমার দায়মুক্তির সামান্যতম প্রয়াসমাত্র। তবে নজরুল-মানস সম্পর্কে সর্বাগ্রে একটি কথা স্মরণ রাখা আবশ্যক যা সুসাহিত্যিক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেনÑ ‘রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ঐতিহ্যের রূপকার, ইকবাল মুসলিম ঐতিহ্যের, কিন্তু নজরুল ইসলাম এই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে গেছেন। এই দিক দিয়ে তাঁর আবেদন বিস্তৃততর, তাঁর ক্ষেত্র প্রশস্ততর, তাঁর সম্পর্ক মধুরতর।’ ভারতীয় উপমহাদেশের তিন প্রধান কবি সম্পর্কে এ মন্তব্যটি বিশেষ গুরুত্বের দাবী রাখে। নজরুল তাঁর জীবনের শুরু থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত সকল পর্যায়েই ইসলাম-রূপ সুধা আকণ্ঠ পান করেছেন। তাঁর অসা¤প্রদায়িক চেতনা, সাম্যবাদ, মানবতাবাদ, সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এ সবই যেন ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষারই প্রতিফলন। বাল্যকাল থেকেই তিনি ইসলামী ঐতিহ্যকে হৃদয়ে লালন করে আসছেন। নজরুল ১৯০৮ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতাকে হারালে প্রচণ্ড আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন সত্য, কিন্তু সুশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হন নি মোটেই। বরং জীবনের নানাবিধ অভিজ্ঞতা ও ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই যেন তাঁকে বৃহত্তর কর্মের উপযোগী রূপে তৈরি করে নিচ্ছিলেন। অতি অল্প বয়সেই তিনি হন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, মক্তব ও দরগাহের খাদেম, লেটো দলের গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও দলনেতা। এমন বহুমুখী কর্মকাণ্ড ও প্রতিভা স্ফূরণের উপমা ইতিহাসে বিরল। আমরা এ ক্ষেত্রে কেবল লেটো প্রসঙ্গে দু’একটি কথার উল্লেখ করছি। নজরুল তাঁর শৈশবে লেটো জীবনে অসংখ্য নাটক, গল্প, গান রচনা করেছেন। শিশু নজরুল লিখেছেন নিম্নরূপÑ ‘নজরুল এসলাম বলে, কর ভাই বন্দেগী খোয়াইও না আজন্ম গোনাহতে জিন্দেগি শারমেন্দাগি হবে হাশরের মাঝে।’ নজরুলের একান্ত শিশু বয়সের এসব রচনায় কার না তাক লাগে। যে সময়টি একজন শিশুর বাল্যশিক্ষা গলাধঃকরণ করে পার করার কথা, নজরুলের সেই সময়ের সৃষ্টি তো রীতিমত অনবদ্য ব্যাপার। তাঁর সে সময়ের রচনায় ইসলামের মৌলিক উপাদান ও শিক্ষা যেরূপ নিপুণতার সাথে ফুটে ওঠেছে তা বড়দের ভাবনার রাজ্যেও রীতিমত তোলপাড় সৃষ্টি করে। এসব লেখায় যেমন রয়েছে গভীর দর্শন, তেমনি রয়েছে ইসলামের শাশ্বত ও চিরন্তন শিক্ষার প্রতিফলন। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেনÑ দুনিয়া হল আখিরাতের শস্যক্ষেত্র স্বরূপ। আর নজরুলের ‘চাষার সঙ’ গানের মূল সুরও তাই। গানটি নিম্নে উদ্ধৃত হ’লÑ চাষ করে দেহ জমিতে হবে নানা ফসল এতে। নামাজে জমি ‘উগালে’ রোজাতে জমি ‘সামালে’, কলেমায় জমিতে মই দিলে চিন্তা কি হে এই ভবেতে\ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাতে বীজ ফেল তুই বিধি-মতে, পাবি ‘ইমান’ ফসল তাতে আর রইবি সুখেতে \ নয়টা নালা আছে তাহার ওজুর পানি সিয়াত যাহার, ফল পাবি নানা প্রকার ফসল জন্মিবে তাহাতে\ যদি ভালো হয় হে জমি হজ জাকাত লাগাও তুমি, আরো সুখে থাকবে তুমি কয় নজরুল ইসলামেতে\ নজরুলের মতে, দেহরূপ জমিতে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বা তৌহিদরূপ ঈমানের বীজ বপন করতে হবে এবং নামাজ রোজার মধ্য দিয়ে দেহরূপ জমিতে চাষবাস করতে হবে। তবেই সফলতা আসবে, সুখ-শান্তি মিলবে। যেমনটি কুরআনে বলা হয়েছেÑ তারা সেখানে দুঃখিত হবে না আর তাদের জন্যে রয়েছে অফুরন্ত প্রশান্তি। নজরুল তাঁর ‘চাষ কর দেহ জমিতে’ শীর্ষক লেটো গানে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভকে অত্যন্ত সুচারুরূপে তুলে ধরেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিনের প্রেরিত বার্তাবাহক সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল, সকল জাহানের করুণার আধার হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনÑ ‘ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই বলে সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনই মা’বুদ নেই, আর মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসুল, সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা, হজ্জ করা এবং রমজান মাসে সাওম পালন করা।’ (হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, বুখারী ও মুসলিম শরীফ দ্র.) মহানবী (সা.)-এর উপর্যুক্ত হাদীসের সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে নজরুলের শিশুকালে লেখা চাষ কর দেহ জমিতে গানে। নজরুল তার এই গানে কেবল সাদামাটাভাবে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের উল্লেখ করেননিÑ তিনি এগুলো বাস্তবায়নের রূপরেখা অতি চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন। একজন শিশু কবির পক্ষে এরকম বিস্তৃত ও সুগভীর চিন্তা সমৃদ্ধ রচনার উপমা বিশ্ব সাহিত্যে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না। লেটো জীবনের আরেকটি গান ‘নজরুল ইসলাম বলে, কর ভাই বন্দেগী’। এতে কুরআনের সেই কথারই প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়Ñ ‘নিশ্চয়ই আমি জ্বিন ও মানবজাতিকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যেই সৃষ্টি করেছি।’ ‘নামাজ পড় মিঞা ওগো নামাজ পড় মিঞা।’ নজরুলের শিশু জীবনের আরেকটি অসাধারণ রচনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআন শরীফে নামাজ প্রতিষ্ঠা ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন একবার দু’বার নয় বরং ৮২ বার। ইসলামে নামাজের গুরুত্ব অত্যধিক। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন : ‘তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।’ অর্থাৎ সকলে যেন জামাতবদ্ধ হয়ে নামাজ পড়ে। নবীজী (সা.) বলেছেন, আজান শোনার পর যে ব্যক্তি ঘরে বসে থাকে, অর্থাৎ মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে নামাজ পড়ে না, তার ঘরবাড়ি আমি জ্বালিয়ে ফেলার আদেশ দিতাম যদি না সেখানে শিশু, বৃদ্ধ এবং মহিলারা থাকত। নজরুলের লেখা ইসলামের শাশ্বত নির্দেশনারই প্রতিধ্বনি। নজরুল তাঁর শিশু বেলায় এই সত্যটি যে কেবল হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন তা নয়, তিনি নামাজের মর্মার্থ এতটা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যা পরম বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। ক্রমশ... Jehad

Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page