একটি নজরুল-সন্ধ্যা এবং অনেক আলো...।। আমিনুল ইসলাম
- আমিনুল ইসলাম
- Jun 4, 2022
- 5 min read
গতকাল। ৩ জুন। ২০২২। সন্ধ্যা।
আমন্ত্রণ পত্র অথবা ইনভাইটেশন মেসেজ-- কোনোটাই পাইনি। কেন পাইনি? সুহৃদ রুমানা ইয়াসমিন ফেরদৌসী ফোন করে জানালেন আয়োজনটির কথা। প্রিয়কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। আয়োজনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। থাকবেন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। সংগীত পরিবেশন করবেন ফাতেমাতুজ জোহরা এবং ইয়াসমিন মুশতারী--- দুই জীবন্ত কিংবদন্তী নজরুলশিল্পী। বাসার কাছেই। হাঁটলে ১০/১২ মিনিট। আমন্ত্রণ পাইনি তো কী হয়েছে! চাঁদ কি আমন্ত্রণ পত্র পাঠায় কোনোদিন? কিন্তু তার জোছনার মাহফিলে যোগ দিতে তো ভুল হয় না আমার। নদী দেখলেই নদীর কিশোপ্রেমিক হয়ে উঠি: আমার একটা নদী ছিল জানলো তো কেউ।
উদ্বোধনী বক্তব্য শোনা হয়নি। যখন প্রবেশ, তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক প্রখ্যাত কবি এবং চিরদিনের নজরুলকর্মী মুহম্মদ নূরুল হুদা বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি প্রধান বক্তা। পেছনে বসলাম। চিনতে পেরে একজন জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে সামনের সারিতে বসালেন। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার বক্তব্য নজরুল বিষয়ে উচ্চারিত বিশ্বকোষ। আকাশ বাতাস সমুদ্র জংগল কাল মহাকাল অতীত ভবিষ্যৎ এই মহাদেশ অই মহাদেশ সবখানেই তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন নজরুলকে অথবা তাঁর কণ্ঠে সবখানেই সরব হয়ে উঠছিলেন বিদ্রোহী কবি প্রেমের কবি সাম্যের কবি, নারী জাগরণের কবি, সাম্প্রতিক সম্প্রীতির কবি, মহামিলনের কবি অতীতের কবি বর্তমানের ভবিষ্যতের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কথা বলার সময় জেগে উঠছিলেন, নেচে উঠলেন, হাঁটছিলেন, দৌড়াচ্ছিলেন নজরুল কর্মী মুহম্মদ নূরুল হুদা। আমরাও। তিনি কী করে মুখস্থ রাখেন এত এত কবিতা, গান আর প্রবন্ধের লাইন --- নজরুলের,---- সারাবিশ্বের অন্যান্য কবি-গবেষক- মনিষীদেরও? তিনি " পরাধীন পৃথিবীর স্বাধীন কবি " নজরুলকে যেভাবে উপস্থাপন করছিলেন নানামুখী আলোকে ও শতসূত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত করে, মনে হচ্ছিলো তিনি বিশ্বের সাড়ে সাতশ' কোটি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের সকলের উদ্দেশ্যে কথা বলছেন! এই মুহূর্তে এমন খাঁটি নজরুলপ্রেমী এবং এমন গভীর নজরুলবোদ্ধা আর আছে কি?
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব জনাব মোঃ আবুল মনসুর। আমার স্নেহাভাজন। অমায়িক ভদ্র মানুষ। প্রধান অতিথির সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। তিনি এসময়ের নজরুল চর্চ্চায় ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেন।
সভাপতি। জ্ঞানের বাতিঘর, জ্ঞানের ফেরিওয়ালা--- অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি মূলত রবীন্দ্রনাথে মুগ্ধ মানুষ। তাঁর শারীরিক ফিটনেস কম ছিল। মাথাব্যথার কথা বলছিলেন। কিন্তু যখন নজরুলকে ধরলেন কণ্ঠে, অডিটোরিয়াম কেঁপে উঠলো, নড়ে উঠলো, নেচে উঠলো তাঁর জোয়ারমাখা উচ্চারণ আর ঢেউঢেউ শারীরিক ভাষার সাথে। কী অনন্য তাঁর বক্তৃতার শৈলী! " তোরা সব জয়ধ্বনি কর, তোরা সব জয়ধ্বনি কর / ঐ নুতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়", " কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট", "ভূলোক দুলোক গোলক ভেদিয়া /খোদার আসন আরশ ছেদিয়া / উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!...." তিনি এসব উচ্চারণ করছিলেন শতভাগ মুখস্থ, তাঁর ডান হাত উঠে যাচ্ছিল উঁচুতে ভেদ করে অডিটোরিয়ামের ছাদ! মনে হচ্ছিলো, এই তো নজরুল! এই তো বিদ্রোহী কবি! নজরুল বলেছেন,
"বৃদ্ধ তাহারাই ---যাহার নব অরুণোদয় দেখিয়া নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে দ্বার রুদ্ধ করিয়া পড়িয়া থাকে। আলোর-পিয়াসী, প্রাণ-চঞ্চল শিশুদের কলকোলাহলে যাহারা বিরক্ত হইয়া অভিশম্পাৎ করিতে থাকে, জীর্ণ পুঁথি চাপা পড়িয়া যাহাদের নাভিশ্বাস বহিতেছে, অতি জ্ঞানের অগ্নিমান্দ্যে যাহার আজ কঙ্কালসার---- বৃদ্ধ তাহারাই। ইহাদের ধর্মই বার্ধক্য। বার্ধক্যকে সবসময় বয়সের ফ্রেমে বাধা যায় না। বহু যুবককে দেখিয়াছি--- যাহাদের যৌবনের উর্দির নীচে বার্ধক্যের কঙ্কাল মূর্তি। আবার বহু বৃদ্ধকে দেখিয়াছি--- যাঁহাদের বার্ধক্যের জীর্ণাবরণের তলে মেঘ-লুপ্ত সূর্যের মতো প্রদীপ্ত যৌবন। তরুণ নামের জয়-মুকুট শুধু তাহার----যাহার শক্তি অপরিমাণ, গতি-বেগ ঝঞ্ঝার ন্যায়, তেজ নির্মেঘ আষাঢ়-মধ্যাহ্নের মার্তণ্ড-প্রায়, বিপুল যাহার আশা, ক্লান্তিহীন যাহার উৎসাহ, বিরাট যাহার ঔদার্য, অফুরন্ত যাহার প্রাণ, অতল যাহার সাধনা, মৃত্যু যাহার মুঠিতলে।"
আমি নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় নজরুলের এই " তরুণের সাধনা" নামক প্রবন্ধটি পড়েছিলাম। এখনও পড়ি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা এই মুহূর্তে আশি পেরিয়ে আসা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদকেই আমার নজরুল কর্তৃক সংজ্ঞায়িত " তরুণ " বলে মনে হয়। নজরুলের কথা ধার করে তাঁকে "বক্তৃতার বখতিয়ার খলজি " হিসেবে অভিহিত করা যায় নিঃসংকোচে। তাঁর বক্তৃতা শেষ না হলে কেউ কি রাত ঘন হয়ে এসেছে ভেবে অডিটোরিয়াম থেকে বের হয়ে আসতেন ? আসতেন না বলেই মনে হয়েছিল আমার।
অতঃপর নজরুল সংগীত। ইয়াসমিন মুশতারী। করোনা ভাইরাসের ধক্কল রয়ে গেছে তাঁর প্রাণে। কিন্তু নজরুল যার চেতনায় ও ভালোবাসায়, তাকে আটকিয়ে রাখবে কে? তিনি তাঁর গভীরভাবে সাধিত ও মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠে নিলেন--" সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি আমারে ছুঁইয়াছিলে।" আমার অনুরোধ ছিল " আমার নয়নে নয়ন রাখি পান করিতে চাও কোন অমিয় "। অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের অনুরোধ ছিল, " আসলো যখন ফুলের ফাগুন--- গুলবাগে ফুল চায় বিদায়/ এমন দিনে বন্ধু কেন বন্ধজনে ছেড়ে যায়"। ইয়াসমিন মুশতারী গাইলেন একে একে " সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি আমারে ছুঁইয়াছিলে...."; " হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে কুড়াই ঝরা ফুল..."; " আবার ভালোবাসার সাধ জাগে.... ", " আমার নয়নে নয়ন রাখি পান করিতে চাও কোন অমিয়... "," লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া মজনু গো আঁখি খোলো"; " আসলো যখন ফুলের ফাগুন গুলবাগে ফুল চায় বিদায়"; " কুহু কুহু কোয়েলিয়া কুহরিলো মহুয়া বনে.. "। সত্যি সত্যি তিনি সুর ও বাণীর মালা দিয়ে ছুঁয়েছিলেন শ্রোতাভর্তি সান্ধ্য অডিটোরিয়ামকে। আমি কবি নূরুল হুদা ভাইয়ের কানে কানে বলছিলাম, নজরুলের জন্ম না হলে, সুরের এত বেশি বৈচিত্র্য আর বাণীর বৈভবে ভরা এমন সংগীত-সমুদ্র কোথায় পেতাম আমরা? তিনি বলছিলেন, পেতাম না।
বাচিকশিল্পী গোলাম সারোয়ার। তিনি নিয়ে এলেন বিদ্রোহী কবির " প্রতিভাষণ "। সেদিন ১৫ ডিসেম্বর। ১৯২৯ সাল। কলকাতার অ্যালবার্ট হল। " কবি সংবর্ধনা "। সভাপতি---বিজ্ঞানী আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। উপস্থিত নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস এবং অনেক কবি লেখক রাজনীতিক। " অভিনন্দন-পত্র" টি পাঠ করেন সাহিত্যিক এস ওয়াজেদ আলী। সেই " অভিনন্দনের জবাব " দিয়েছিলেন সেদিনের সমগ্র বাঙালীর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। গোলাম সারোয়ার শোনালেন। মুখস্থ পুরোটাই দাড়ি, কমা, সেমিকোলন-সহ।, মনে হচ্ছিল, আবৃত্তি নয়, পাঠ নয়, স্বয়ং বিদ্রোহী কবি কথা বলছেন যৌবনের সবখানি তেজ আর প্রেম-বিদ্রোহের সমস্ত আবেগ মিশিয়ে! আমার শরীরের প্রতিটি লোম খাড়া হয়ে উঠছিল। পাশে উপবিষ্ট কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, নাট্যকার খায়রুল আলম সবুজ, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ --- সবাই মন্ত্রমুগ্ধ ছবি! নজরুলকে কতটা ধারণ করলে এমনভাবে উচ্চারণ করা যায় তার কবিতা অথবা অভিভাষণ!
অতঃপর ফাতেমাতুজ জোহরা। আমাদের টগর আপা। ফিরোজা বেগমের পর সবচেয়ে বেশি মেধা ও সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন-- নজরুল সংগীতের মঞ্চে। আমরা কতটুকু নিতে পেরেছি তাঁর কাছ থেকে? তিনি এসময়ের ব্যান্ড-শিল্পীদের সাথে পাল্লা দিয়ে নজরুলের গান করেন। সেই স্টাইলে গাইলেন একে একে " দৃষ্টিতে আর হয় না সৃষ্টি আগের মতো গোলাপ ফুল / কথায় সুরে ফুল ফুটাতাম হয় না এখন আর সে ভুল", " কোথায় তুই খুঁজিস ভগবান সে যে রে তোরই মাঝে রয়", " এসো প্রিয়, মন রাঙায়ে ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙায়ে/ মন মাধবী বন দুলায়ে,দুলায়ে, দুলায়ে।। "," তেপান্তরের মাঠে বঁধু হে একা বসে থাকি", " নাচের নেশায় ঘোর লেগেছে নয়ন পড়ে ঢুলে হে নয়ন পড়ে ঢুলে.."। নজরুল কত আধুনিক কত চির আধুনিক তার গান, ফাতেমাতুজ জোহরা গাইছিলেন আর সেই প্রশ্নের জবাব হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল তার উচ্চারণ,গায়নশৈলী এবং কী-বোর্ড আর তবলার সঙ্গত।
বাঙালিকে নজরুলের মতো নাচাতে পারে আর কে? "আমি যার নূপুরের ছন্দ বেণুকার সুর কে সেই সুন্দর কে "। গতি, শক্তি সুস্থতা ও সৌন্দর্যের উপমা হয়ে নাচে নাচে মাতোয়ারা --- যুবতী বীথি। অতঃপর " প্রভাত-বীণা তব বাজে হে "। ধ্রুপদী নাচে দক্ষ--- সুন্দর যুবক---- ববি। সবশেষে " মেঘলা নিশি ভোরে মন যে কেমন করে তারি লাগি গো মেঘবরণ যার কেশ।" যৌথ নৃত্য। বীথি আর ববি। আমার ইচ্ছা করছিল, ববি-বীথির সাথে নাচতে। সে সুযোগ ছিলো না বটে কিন্তু আসনে বসে বসেই নাচছিল আমার সবখানি অস্তিত্ব।
এক বিদ্রোহী কবিতেই কত আনন্দ! কত প্রাণ! কত মুক্তি! তিনি সেই " প্রতিভাষণে বলেছিলেন, " যাঁরা আমার নামে অভিযোগ করেন তাঁদের মতো হলুম না বলে----তাঁদেরকে অনুরোধ, আকাশের পাখীকে, বনের ফুলকে, গানের কবিকে তাঁরা যেন সকলের করে দেখেন। এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলে শুধু এই দেশের এই সমাজের নই। আমি সকল দেশের সকল মানুষের।....আমি যেটুকু দিতে পারি, সেটুকুই প্রসন্নচিত্তে গ্রহণ করুন।.... আমি ধন্য করতে আসিনি, ধন্য হতে এসেছি আজ।" কিন্তু নজরুল আমাদের ধন্য করেছেন, করে চলেছিলেন যেভাবে চাঁদনীরাতের চাঁদ ধন্য করে রাতের পৃথিবীকে। নজরুলের কথা যত বলি, যত শুনি তাঁর গান, যতটুকু ধারণ করতে পারি তাঁর প্রেমময় সাম্যবাদী মহামানবিক চেতনা, ততোই ধন্য হই আমরা, ততোখানি আলোকিত হয় আমাদের হৃদয় মন ও মনন।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আয়োজনটি ছিল কয়েক ঘণ্টার -- সন্ধ্যা৬.৩০টা থেকে রাত ১০.৩০টা। কিন্তু এটুকু সময় ধারণ করেছিল প্রায় সমগ্র নজরুলকে। পরিমাণে নয়। সংখ্যায় নয়। গুণে ও মানে। চেতনার উদ্ভাসনে। ভালোবাসার সচ্ছল বহিঃপ্রকাশে। অনুষ্ঠানটি ছিল এক খণ্ড মিনি নজরুল। দর্শক শ্রোতাগণ ছিলেন নজরুলীয় ভালোবাসায় সমর্পিত ও মুগ্ধ। হয়তোবা সেটাও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আলোকিত মানুষ গড়ে তোলার সাফল্যের আরেকটি দিক।
বিনা আমন্ত্রণে গিয়ে এতটা আনন্দ! এত এত মহৎ আনন্দ! তো আমন্ত্রণ পাইনি বলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ওপর অভিমান করে দূরে থেকে কী লাভ! আবার আয়োজন হবে; আবারও যাবো অনিমন্ত্রিত বা নিমন্ত্রিত প্রতিবেশীর পায়ে।
সাধুবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র!
জয়তু নজরুল!
Comments