একটি নজরুলসংগীত অথবা গভীর আধুনিক কবিতা।।আমিনুল ইসলাম
- আমিনুল ইসলাম
- May 21, 2021
- 3 min read
"আমার নয়নে নয়ন রাখি
পান করিতে চাও কোন আমিও।
আছে এ আঁখিতে উষ্ণ আঁখিজল,
মধুর সুধা নাই পরাণপ্রিয়।।
ওগো শিল্পী গলাইয়া মোরে
গড়িতে চাহ কোন মানস প্রতিমারে
ওগো ও পূজারী, কেন এ আরতি
জাগাতে পাষাণ প্রণয়-দেবতারে
এ দেহ ভৃঙ্গারে থাকে যদি মদ
ওগো প্রেমাষ্পদ, পিও গো পিও।।
আমারে কর গুণী, তোমার বীণা
কাঁদির সুরে সুরে কণ্ঠলীনা
আমার মুখের মুকুরে কবি
হেরিতে চাও কোন মানসীর ছবি
চাহো যদি মোর কর গো চন্দন
তপ্ত তনু তব শীতল করিও।।"
নজরুলের এই গানটি রাগপ্রধান অঙ্গের একটি অসাধারণ গান। অথচ বাণীবৈভব ও কাব্যিক সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ। গানের নায়িকার গভীর উপলব্ধি ও অন্তদর্শনে প্রতিভাত হয়েছে যে নায়ক তার কাছে এলেও, তাকে প্রেয়সীর মতো আদর যত্ন করলেও, নায়কের হৃদয়ের তলদেশ জুড়ে আছে অন্য এক নারী; নায়ক সে নারীকেও ভুলতে পারেন না বলেই নায়িকার মধ্যে তাকে আবিস্কার করতে চান। তবে অতি সঙ্গোপনে। অথচ তা ধরা পড়ে যায় নায়িকার হৃদয়ের গভীর ছবির আলোকসম্পাতে। তারপরেও নায়িকা নায়ককে তার সবটুকু উজাড় করে দিতে চান দেহ মন সবই। এমনকি নায়কের নিবিড় গভীর মনোবেদনারও অংশীদার হতে চান। একথার শিল্পসুন্দর ও কাব্যনিবিড় প্রকাশ---‘আমারে কর গুণী তোমার বীণা/কাঁদিব সুরে সুরে কণ্ঠলীনা’। এই চরণ দুটেতেই গানটি মানুষের হৃদয় ও ব্যক্তিত্বের কয়েকটি গভীর আড়াল দিককে উদ্ভাসিত করে তুলতে চেয়েছে। মানুষ তার মনের মানুষ বা ভালোবাসার মানুষকে সহজে ভুলতে পারে না। নতুন মানুষ এসে শারীরিক-সাংসারিক শূন্যতা পূর্ণ করলেও মানুষের মানস-অঙ্গনে শূন্য আসন শূন্য রয়ে যায়। আবার জীবন কারো জন্যেই থেমেও থাকে না। জীবন বহতা নদীর মতো বলেই তার নানা ঘাটে নানা মিলন, নানা বিচ্ছেদ। পুরাতন প্রেমিকা হারিয়ে গেছে কিংবা তার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেছে; নায়কের জীবনে প্রবেশ ঘটেছে অন্য এক নারীর । নায়ক তাকে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়নি। কারণ, জীবন থেমে থাকতে পারে না। জীবনে কষ্ট, বিচ্ছেদ, বেদনা আসে, তবু জীবনকে যাপন করতে হয়। গানের নায়িকাও অসাধারণ জীবনের বাস্তব প্রতিনিধি। নায়কের হৃদয়ে, স্মৃতিতে অন্য নারীর প্রবল উপস্থিতি জেনেও তিনি সটকে যেতে চাননি, নিজের সবটুকু আনন্দ-রসের পেয়ালা নায়কের হাতে তুলে দিতে চেয়েছেন বারবার। শুধু তাই নয় নায়কের অন্তরঙ্গ বেদনার গভীর-নিবিড় সঙ্গীও হতে চেয়েছেন। বিরহী পুরুষকে গতানুগতিক ফর্মুলায় ঘৃণাভরে বা অবিশ্বাসের তাড়নায় অস্বীকার না করে তার দুঃখ-কষ্টকে ভাগ করে নিতে চেয়েছে সে নারী। নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়ে তার মুখে হাসিতে ফোটাতে চেয়েছে যে নারী---নিঃসন্দেহে তিনি অসাধারণ মানুষ।
" এ দেহ ভৃঙ্গারে থাকে যদি মদ ওগো প্রেমাস্পদ পিও গো পিও " " তপ্ত তনু তব শীতল করিও" চরণগুলো রোমাণ্টিক শুচিবায়ুগ্রস্ততা অতিক্রম করে মনের পিপাসার সাথে শারীরিক চাহিদাকে প্রকাশ্যে ও সাহসের সাথে স্বীকৃতি দিয়েছে যা আধুনিকতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্মণ।
গানটির বিষয়ও একেবারে আধুনিক। নায়িকা হারিয়ে গেছে। নায়ক তার বিরহে বিলীন থেকে যেতে চাননি। তাকে হৃদয়ে ধারণ করেই সঙ্গিহীন সারাজীবন কাটিয়ে দেয়ার রোমান্টিক পণ করেননি। অন্য নারীর জন্য জীবনের দরোজা চিররুদ্ধ করে দেননি। দ্বিতীয় নারী এলে তার জন্য খুলে দিয়েছেন দুয়ার। কিন্তু প্রথম প্রেম আর প্রথম নারীকে ভুলে যেতে পারেননি। বরং দ্বিতীয় নারীকে জীবনের সঙ্গি হিসাবে গ্রহণ করে তারই মাঝে প্রথমজনকে আবিস্কার করার গোপন চেষ্টা করেছেন। দ্বিতীয়জনকে প্রথমজনের মতো করে দেখার ও সৃষ্টি করার সঙ্গোপন সাধনা করেছেন। সেকথাও দ্বিতীয় নারীর কাছে বেশিদিন গোপন থাকেনি। আর দ্বিতীয় নারী নায়কের নানাবিধ অভিব্যক্তিতে সেসব উপলব্ধি করার পরও নায়কের সাথে থেকে যেতে চেয়েছেন। আসলে এটি আধুনিক অনেক মানুষের নিয়তি। বুকের মানুষকে বুকে রেখে সঙ্গোপনে অন্য মানুষের সাথে কাটিয়ে দিতে হয় দিন-মাস-বছর-যুগ। এটা একধরনের অভিনয়ও। এবং সে অভিনয় বড়ই কঠিন--- বড়ই বেদনাঘন।
জীবনের এমন অবস্থা –ভালো না মন্দ, নৈতিক না অনৈতিক, এসব ভেবে বিবৃতি দেওয়া যায় কিন্তু তাতে করে প্রেম কে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। আধুনিক মানবজীবন বহুমাত্রিক; এমন জীবনকে একরৈখিকতার বেঁধে রাখা যায় না। সৃজনশীল মানুষদের জীবনে এমনটি ঘটে বেশি। নজরুলের এই গানে সেই আধুনিক জীবনেরই কাব্যনিবিড় ছবি দেখা যায়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই গানটির ভাবসম্পদ অনুসরণপূর্বক কিছুদিন পরে রচিত হয়েছিল আরেকটি আধুনিক গান : " জানি বাহিরে আমার তুমি অন্তরে নও "( প্রণব রায়) এবং একটি আধুনিক কবিতা " দুই মেয়ে " (আহসান হাবীব) । কিন্তু কোনোটিই নজরুলের এই গানের দুরন্ত আধুনিকতা এবং কাব্যিক গভীরতাকে সবখানি ধারণ করতে পারেনি।
আমিনুল ইসলাম, কবি ও প্রাবন্ধিক, নজরুল গবেষক। মহাপরিচালক, সমবায় অধিদপ্তর, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
Kommentare