কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবির গেজেট চেয়ে আইনী নোটিশ।। ইতিবাচক ফলের প্রত্যাশা
- বাঙলাকথা
- Jun 2, 2022
- 4 min read

আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই জানেন যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু তা কেবল লোকের মুখে মুখে এবং পরোক্ষভাবে বিভিন্ন কাগজ-পত্রে। এ সংক্রান্ত সরকারি কোনো গেজেট নেই। তাই দীর্ঘদিন যাবত সরকারের নিকট দাবি জানানো হচ্ছে যে, কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি ঘোষণা সংক্রান্ত সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হোক। ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে কবির ১২৩ তম জন্মজয়ন্তীতে এ দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। দাবি আদায়ের জন্য সর্বশেষ কয়েকজন আইনজীবী সরকারের উপর আইনী নোটিশ জারি করেছেন।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ‘জাতীয় কবি’ হিসাবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক বরাবর আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩১ মে) সুপ্রিম কোর্টের ১০ আইনজীবীর পক্ষে আইনজীবী মো. আসাদ উদ্দিন এ নোটিশ পাঠান। নোটিশ প্রেরণকারী অন্য আইনজীবীরা হলেন- মোহাম্মদ মিসবাহ উদ্দিন, মো. জোবায়দুর রহমান, আল রেজা মো. আমির, মো. রেজাউল ইসলাম, কে এম মামুনুর রশিদ, মো. আশরাফুল ইসলাম, শাহীনুর রহমান, মো. রেজাউল করিম ও মো. আলাউদ্দিন।
নোটিশ প্রেরণকারী আইনজীবী মো. আসাদ উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, কাজী নজরুল ইসলাম মৌখিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসাবে পরিচিত হলেও লিখিতভাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। বলা হয়ে থাকে, ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার আলবার্ট হলে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে সর্বভারতীয় বাঙালিদের পক্ষ থেকে কবিকে জাতীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। ওই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নজরুলকে ‘জাতীয় কবি’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে মুখে মুখে তিনি জাতীয় কবি হয়ে আছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকাবিভাবে তাঁকে জাতীয় কবি হিসাবে ঘোষণা করে কোনও প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। কারণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কোনও মৌখিক বিষয় নয়।
আইনজীবী মো. আসাদ উদ্দিন বলেন, ‘স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবিকে বাংলাদেশে আনা হয়। বসবাসের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ধানমন্ডিতে তাঁকে একটি বাড়ি দেওয়া হয়। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি-লিট উপাধিতে ভূষিত করে। এরপর ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়ে সরকারি আদেশ জারি করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ‘একুশে পদক’ দেওয়া হয়। সবকিছুরই ছবি, তথ্যসহ লিখিত দলিল আছে। কিন্তু নির্মম সত্য এটিই যে, ‘জাতীয় কবি’ হিসাবে সরকারি ঘোষণার কোনও লিখিত দলিল বা প্রমাণ নেই।’
বাংলাদেশের দু’টি আইনে জাতীয় কবি হিসাবে নজরুলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি আয়োজনে তাঁকে জাতীয় কবি হিসাবে উল্লেখও করা হয়। কিন্তু সবই পরোক্ষ স্বীকৃতি। এমন স্বীকৃতি কালের পরিবর্তনে মুছে যেতে পারে। আগামীর প্রজন্ম একদিন হয়তো না-ও জানতে পারে যে, আমাদের জাতীয় কবির নাম কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি আমাদের ইতিহাসের অংশ। ইতিহাস ও জাতীয় স্বীকৃতি কখনও অলিখিত থাকতে পারে না। অলিখিত ইতিহাস ও তথ্য সময়ের বিবর্তনে বিলীন হয়ে যায়। এ জন্য ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণে রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিতে হয়। এছাড়া নজরুলকে জাতীয় কবি হিসাবে ঘোষণার দাবিতে কবি পরিবারের পক্ষ হতে বারবার দাবি তোলা হয়েছে। নজরুল গবেষক এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকেও অনেক দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু অদ্যাবধি এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই দেশের সচেতন নাগরিক এবং উচ্চ আদালতের আইনজীবী হিসাবে এ আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশ প্রাপ্তির ৭ কর্মদিবসের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসাবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করতে অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যথায় নোটিশদাতারা উচ্চ আদালতের সম্মুখীন হবেন মর্মে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইতিবাচক ফলের প্রত্যাশা
বিভিন্ন মহলের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, কাজী নজরুল ইসলামের জাতীয় কবি ঘোষণা সংক্রান্ত আইনী নোটিশের পর ইতিবাচক ফলাফল প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও নজরুল স্টাডি সেন্টার ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্যানিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা মো. জেহাদ উদ্দিন বলেন, জাতীয় কবি সংক্রান্ত গেজেট অত্যন্ত যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় বিষয়। একটি দেশের জাতীয় কবি মোটেই গুরুত্বহীন কোনো বিষয় নয়। জাতীয় কবির রাষ্ট্রাচারের পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টিকর্ম ও জীবন-দর্শন যথাযথভাবে সংরক্ষণ, গবেষণা, চর্চা ও প্রচার-প্রসারের বিষয়সমূহও অত্যন্ত গুরুত্বের দাবি রাখে—যা সরকারি গেজেটের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টকরণ আবশ্যক।
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী সফিকুর রহমান বলেন, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জাতীয় কবি সংক্রান্ত গেজেট দ্রুত প্রকাশ করা আবশ্যক। এটি সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তিনি আশা করেন, সরকার দ্রুততম সময়ে তা বাস্তবায়ন করবে।
এদিকে বিশিষ্ট নজরুল গবেষক আমিনুল ইসলাম বলছেন, জাতীয় কবি বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারিতে আইনগত কোনো বাধা নাই। তিনি তাঁর ফেইসবুকে লিখেন:
“বাংলাদেশের জাতীয় কবি হচ্ছেন কাজী নজরুল ইসলাম। এটা কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন কিংবা ব্যক্তির দেওয়া অনানুষ্ঠানিক খেতাব নয়। এটা রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁদের লিখিত বাণীতে এবং ভাষণে কাজী নজরুল ইসলামকে ‘‘ জাতীয় কবি’’ বলে উল্লেখ করে আসছেন বছরের পর বছর।
ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম “ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়”।
কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদে পাসকৃত আইনের মাধ্যমে। সেভাবেই ময়মনসিংহের ত্রিশালে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপিত হয়েছে একটি আইনের মাধ্যমে; আইনটির নাম “জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৬’’ ( ২০০৬ সনের ১৮ নং আইন )।
এই আইনের ১ নং ধারায় বলা হয়েছে:
“ ১৷ (১) এই আইন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৬ নামে অভিহিত হইবে৷
(২) সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যে তারিখ নির্ধারণ করিবে সেই তারিখে এই আইন কার্যকর হইবে৷ “
এই আইনের ৯ নং ধারায় বলা হয়েছে যে এর চ্যান্সেলর হবেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বয়ং:
” ৯৷ (১) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হইবেন এবং তিনি একাডেমিক ডিগ্রী ও সম্মানসূচক ডিগ্রী প্রদানের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করিবেনঃ
তবে শর্ত থাকে যে, চ্যান্সেলর, ইচ্ছা করিলে, কোন সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করিবার জন্য অন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করিতে পারিবেন৷
(২) চ্যান্সেলর এই আইন বা সংবিধি দ্বারা অর্পিত ক্ষমতার অধিকারী হইবেন৷
(৩) সম্মানসূচক ডিগ্রী প্রদানে প্রতিটি প্রস্তাবে চ্যান্সেলরের অনুমোদন থাকিতে হইবে৷ “
‘‘ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ‘’-- প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আজ থেকে প্রায় ১৬ বছর আগে। আইনটি তখনই কার্যকর হয়েছে; গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়টির চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন; তিনি ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ দিয়ে আসছেন ; সরকার বাজেট বরাদ্দসহ সকল লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে আসছে। শিক্ষার্থীদের সনদপত্রে ‘‘ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়’’ নামটি লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সরকার বাজেট বরাদ্দসহ সকল পত্রে / আদেশে ‘‘ উল্লেখ করছে-- “ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ‘’।
আইনের খসড়া তৈরী করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়; সেটি ভেটিং করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়; তা অনুমোদন করে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা; পাস করে জাতীয় সংসদ; এবং তাতে স্বাক্ষর দিয়ে অনুমোদন প্রদান করেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। আর প্রজ্ঞাপন জারী করে শুধু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় উক্ত মন্ত্রাণলয়ের মাননীয় মন্ত্রীর অুনমোদন নিয়ে।
তো “জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৬ ‘’--এ অন্তর্ভুক্ত মাননীয় আইনমন্ত্রীর ভেটিং, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার অনুমোদন, জাতীয় সংসদে ‘‘পাস হওয়া’’ এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরযুক্ত অনুমোদন বলছে ‘‘ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম “ । অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতীয় কবি হচ্ছেন কাজী নজরুল ইসলাম।
এই অবস্থায় কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপন জারী করতে “আইনগত অথবা বিধিগত ” সামান্যতম বাধা নাই।”
এমজেইউ
Comments