কোভিডে শিশুদের মানসিক যত্ন।। অর্পিতা দাশ
- অর্পিতা দাশ
- May 11, 2021
- 3 min read
Updated: May 11, 2021
বর্তমান কোভিড পরিস্থিতিতে আমাদের বাচ্চাগুলোর মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে আমাদের বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। কয়েকজন বন্ধু এবং পরিচিতদের সাথে টেলিফোন আলাপের পর আমার মনে হলো অনেক বাচ্চাই বেশ খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে সময় কাটাচ্ছে। একজন মা এবং একজন কাউন্সেলর হিসেবে তাই এই বিষয়টা নিয়ে দুটো কথা না লিখে থাকতে পারছি না।
একটা উদাহরন দিই। এক ছোট বোন ফোন করে জানালো তার ছেলেটাকে নিয়ে সে ইদানিং কিছু সমস্যায় পড়েছে। সে ব্যাপারে আলোচনা করতে। যা জানা গেল তা মোটামুটি এরকম।
ছেলের বয়স ৯ বছর। পড়ে ক্লাস টু তে, আজকাল পড়াশোনায় মনোযোগ নেই। সারাক্ষণ স্ক্রিনে থাকে। মা ১০ বার ডাকলে একবার রেসপন্স করে। ছোট ভাই আছে, বয়স ২ বছর তাকে সহ্য করতে পারে না। কোন সিস্টেম বা সময় সূচী মেনে চলছে না। মা ভাবছে ছেলের নিশ্চয়ই কোনো মানসিক সমস্যা হয়েছে। তাকে কোন একজন কাউন্সেলর এর কাছে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। তাই কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে ইত্যাদি জানতেই আমাকে ফোন দেয়া। মায়ের কাছ থেকে যে তথ্যগুলো পাওয়া গেলো, তা হলো, মা করপোরেট জব (Grameen phone) করেন যিনি কিনা ওয়ার্ক ফরম হোম (work from home) করেন।এই কোভিড মহামারীতে ওয়ার্ক ফরম হোম এর নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচী নেই,রোজার সময়ে ৩.৩০টায় অফিস ছুটি হবার কথা থাকলেও প্রায় প্রতিদিনই সেটা ৫.৩০ টায় গিয়ে দাড়ায়। তাছাড়া রাতে ও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারনে অনলাইনে বসার প্রয়োজন হয়। বাসায় অন্য কোন কেয়ার গিভার যেমন- দাদী,নানী,ফুফু,খালা এমনকি একজন ফুলটাইম কাজের লোক ও নেই। তার উপরে বাবা চাকরীসূত্রে সিলেট থাকেন, সপ্তাহে একবার ঢাকায় আসেন। মা যেটুকু সময় বের করতে পারেন সে সময়ে তিনি রান্না করেন, ছোটবাচ্চাটার কিছু প্রয়োজন মেটান আর এই ছেলেটিকে পড়াশোনা আর হোমওয়ার্ক দেখান। মায়ের নিজের দিকে তাকাবারও কোনো ফুরসৎ নেই। এমতাবস্থায় ছেলে যখন এককথা ১০ বার বললেও শুনছে না মা তখন রেগে গিয়ে মার ও দিয়ে ফেলেন। মা দিশেহারা। আমি কি করবো? এখন দেখুন , ৯ বছরের একটা বাচ্চার কি মায়ের ব্যস্ততার যৌক্তিকতা বুঝতে পেরে মন থেকে মেনে নেয়ার কথা? মোটেও না। ওর প্রয়োজন খেলার সাথী, বাড়ীতে যেহেতু আর কেউ নেই তাই মায়ের কাছ থেকেই সেটা সে চাইবে। আর মা যখন সেটা দিতে পারছে না সে মায়ের উপর অভিমান করছে। তার উপরে সে দেখছে মা যতটুকু সময় ম্যানেজ করতে পারছে তা ভইকে দিচ্ছে তাই শিশু মন হয়তো ভেবে নিয়েছ মা আমাকে কম ভালোবাসে এবং কম গুরুত্ব দিচ্ছে। এমনকি সে ভিতরে ভিতরে অসহায় বোধ করছে কারন তার আবেগীয় চাহিদা মেটানোর জন্য বিকল্প কেউ নেই। পেনডামিকের কারনে স্কুল ও বন্ধ। স্কুল খোলা থাকলে সে তার চাহিদার কিছুটা বন্ধু ও শিক্ষকের কাছ থেকেও পুরন করতে পারতো। তার উপর মা আবার মাঝে মাঝে মারও দিচ্ছে, মায়ের এই আচরন তাকে আরও অসহায় করে তুলছে। তাই সে হয়ে উঠেছে উদাসীন ও অভিমানী। এদিকে মায়ের বক্তব্য হলো, আমি অফিস নিয়ে এতো চাপের মধ্যে থাকি! বাসায় তাকে সাংসারিক কাজে সাহায্য করার মতো কেউ নেই। রান্না করা, ক্লিনিং করা, বাজার করা, বাচ্চাদের দেখভাল করা সব তার একার উপর! উপরন্তু বাচ্চাদের বাবাও এখানে নেই। সে একা আর কত দিক সামলাবে?
সব সব ঠিক আছে। মায়ের vulnerability আমরা বুঝতে পারছি, কিন্তু সেটা তো একটা শিশুর উপর চাপানো যাবে না। শিশু মনের আবেগকে আমাদের প্রাধান্য দিতে হবে। কোনো বিকল্প পন্থা খুঁজে বের করতেই হবে। আমরা যদি শিশুকে attention দিই তাহলে একটা না একটা বিকল্প অবশ্যই বের করতে পারবো। মা কে আগে মানসিক ভাবে শক্ত হতে হবে। তাকে চিন্তা করতে হবে কি ভাবে বা কার সাহায্য তিনি নিতে পারেন। শিশুর স্ক্রিনে নির্ভরতা কমানোর জন্য তাকে ক্রিয়েটিভ খেলনা কিনে দেয়া যেতে পারে। ছোট বাচ্চাটাকে তিনি যে সময়টা দিচ্ছেন সেখানে দুইজনকে ই যুক্ত করা যেতে পারে। বচ্চা কে পর্যবেক্ষন করলেই তিনি বুঝতে পারবেন বাচ্চাটা ঠিক কি পেলে ভালো থাকবে। মায়ের attention আর কিছুটা সময় বোধ হয় তার চাওয়া। তবে, অবশ্যই প্রয়োজনে আমরা প্রফেশনাল কাউন্সেলর এর সহযোগীতা নিতে পারি। পরিবারের মধ্যে ও যদি শিশুরা ভালো থাকতে না পারে তাহলে সে অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়বে, পরবতী সময়ে আরো বড় মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আমাদের শিশুদেরকে আমাদের ভালো রাখতেই হবে, মহামারীর এই দুঃসময় আমাদেরকে পাড়ি দিতেই হবে। সকলের সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।
লেখক: সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর
Комментарии