কেমন ছিল বাংলা সাহিত্যের ধ্রুবতারা কবি আল মাহমুদের বিদায়বেলা
- মো জেহাদ উদ্দিন
- Mar 9
- 25 min read
।।১।।
২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ চলে গেলেন। বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তাঁর মৃত্যুতে বাঙালি জাতি শোকাচ্ছন্ন।
বার্ধক্যজনিত স্বাস্থ্যগত কিছু অসুবিধা তাঁর ছিল। বিশেষত, তিনি চোখে খুব কম দেখতেন এবং কানে কম শুনতেন। ২০১৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করান। কবির দীর্ঘদিনের চিকিৎসক অধ্যাপক আব্দুল হাই-এর তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা চলতে থাকে। উক্ত হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা চলাকালীন কবি আল মাহমুদ ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাত ১১ টা ০৫ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। এর আগে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়েছিল।
কবির মৃত্যুর খবর বিদ্যুৎ গতিতে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সর্বত্র নেমে আসে শোকের ছায়া। মাত্র আধা ঘন্টার ব্যবধানে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান সকল গণমাধ্যম ঢাকার ধানমণ্ডির ১৫/এ নম্বর সড়কে অবস্থিত ইবনে সিনা হাসপাতালে ছুটে আসে। বিভিন্ন টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার হতে থাকে অসহনীয় মুহুর্তসমূহ। কান্না করছে কবির ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্খীরা। কবির ছোট ছেলে আনিস আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে উঠলো-‘ভাই, আব্বা কি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন’? আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলের চোখে ঝরছে অশ্রু।
হাসপাতালের দু’তলায় অবস্থিত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র সংলগ্ন সুপ্রশস্ত করিডোরে মিডিয়া কর্মীদের তখন তিল ধারণের ঠাঁয় নেই। সাংবাদিক এবং শুভাকাঙ্খীরা স্রোতের মতো ছুটে আসছিলেন হাসপাতালে তাঁদের প্রিয় কবিকে একনজর দেখার জন্য। পরিস্থিতি সামাল দিতে সংবাদকর্মীগণকে হাসপাতালের নীচে নামিয়ে আনা হয়। সেখান থেকে কবির উপর বিভিন্ন সংবাদ পরিবেশন করতে থাকেন।
কবির নিথর দেহ ইসলামী রীতি অনুযায়ী গোসল করানোর জন্য ধানমণ্ডির তাকওয়া মসজিদে নেয়া হয়। ক্যালেন্ডারের হিসেবে তখন ১৬ ফেব্রুয়ারি ভোর রাত। তাকওয়া মসজিদ থেকে কবির লাশ ফ্রিজিং গাড়িতে করে তাঁর বাসা মগবাজারের আয়েশা-গোমতী ভিলায় নেয়া হয়। উল্লেখ্য এ বাসাটিই ছিল কবির শেষ ঠিকানা। বড় ছেলের সাথে কবি এখানে থাকতেন।
কবির মৃত্যুর সংবাদ সকল গণমাধ্যমে যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রচারিত হচ্ছিল। ব্রেকিং নিউজ হিসেব টেলিভিশনগুলো তা প্রচার করেছে। টেলিভিশনের স্ক্রলে আপডেট পাওয়া যাচ্ছিল। সর্বস্তরের জনতার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সকাল ১১ টায় কবির লাশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, ১২ টায় বাংলা একাডেমিতে এবং সাড়ে ১২টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে রাখার সংবাদ সম্প্রচারিত হচ্ছিল। পত্র-পত্রিকাসমূহের অনলাইন সংস্করণেও অনুরূপ সংবাদ প্রচারিত হচ্ছিল এবং কবি আল মাহমুদ সম্পর্কে মূল্যবান লেখা প্রকাশিত হচ্ছিল। কবির বিষয়ে কোন মিডিয়ার কোন কার্পণ্য চোখে পড়ে নি।
ইবনে সিনা হাসপাতাল থেকে গভীর রাতে আমি বাসায় চলে এসেছিলাম। তখনও কবির নিথর দেহ হাসপাতালেই এবং ভক্তবৃন্দের স্রোত চলমান। আমার সাথে ছিল দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া আমার ছেলে। কবি আল মাহমুদের প্রতি তার কী যে শ্রদ্ধা ও ভালবাসা তা ভাষায় ব্যক্ত করা যাবে না।
১৫ ফেব্রুয়ারি রাত ১০ টার দিকে কবির বেয়াই এবং তাঁর নিত্য সহচর আবুল হোসেন যখন আমাকে ফোন করে বললেন যে, কবির হৃদস্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে না এবং তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হচ্ছে, তখন আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। আমার শরীরটাও ভাল যাচ্ছিল না। এই রাতে হাসপাতালে যাব কি না বুঝতে পারছিলাম না। আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল আমার বড় ছেলে কিশোর শারাফি। সে আমাকে বলল, ‘চল আমরা এখনই যাই। কাল গিয়ে আর কি হবে?’
আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তবে কি নিষ্পাপ এ কিশোর অন্য কোন ইঙ্গিত পেয়েছে?
তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে দু’জনেই ছুটলাম হাসপাতালের দিকে। আমার বাসা থেকে কয়েকটি রাস্তা পরেই হাসপাতাল। তাই ৫ মিনিটের মধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেলাম। আমার ফোন পেয়ে শিক্ষাবিদ সাহিত্যিক হুমায়ুন কবির এবং অনুজপ্রতিম ¯স্নেহভাজন আবুল বাশার ততক্ষণে হাসপাতালে পৌঁছে গেছেন।
আমরা হাসপাতালে পৌঁছার আধা ঘন্টা পর রাত ১১ টা ০৫ মিনিটে কবি আল মাহমুদ ইন্তেকাল করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, কবির নিউমোনিয়া বৃহস্পতিবার থেকে বেড়ে গিয়েছিল। শুক্রবার সকাল থেকে নতুন করে প্রেসার কমে যেতে শুরু করে। তবে ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। এরপর রাতে হঠাৎ হৃৎপিণ্ড ঠিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তখন রক্তচাপ কমতে থাকে। এতে মস্তিষ্কসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন না পৌঁছায় তিনি মারা যান।
আমি, আবুল ভাই, হুমায়ুন ভাই, আবুল বাশার এবং আমার ছেলে রাজিন শারাফি সিসিইউ’র ভেতরে প্রবেশ করলাম। কবি চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন হাসপাতালের বিছানায়। এই তো মাত্র পাঁচ দিন আগে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে কবিকে একই বিছানায় দেখে গেলাম, পাশে রাখা মনিটর তাঁর সক্রিয় হৃদপিন্ডের কথা জানান দিচ্ছিল। এখন সব নীরব, নিস্তব্ধ।
আমরা নির্বাক তাকিয়ে আছি কবির নিথর দেহের দিকে। তাঁর চেহারাজুড়ে যেন নূর খেলা করছিল। এক স্বর্গীয় দ্যুতিতে আচ্ছন্ন কবির দিকে আমরা অপলক তাকিয়ে আছি। শব্দবিহীন অশ্রু ঝরছে আমাদের সবার চোখে। আমার মনে পড়ছে কবির সেই কবিতার কথা যেখানে তিনি শুক্রবারে মৃত্যু চেয়ে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করেছেন। মহান আল্লাহ পাক তাঁর মোনাজাত কবুল করেছেন। আজ তো শুক্রবারই। কবিতা নিম্নে তুলে দিলাম:
"কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে
মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;
অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
ভালোমন্দ যা ঘটুক, মেনে নেবো: এ আমার ঈদ।
"ফেলে যাচ্ছি খড়কুটো, পরিধেয়, আহার, মৈথুন –
নিরুপায় কিছু নাম, কিছু স্মৃতি, কিংবা কিছু নয়;
অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে জমে আছে শোকের লেগুন;
কার হাত ভাঙে চুড়ি? কে ফোঁপায়? পৃথিবী, নিশ্চয়।
"স্মৃতির মেঘলাভোরে শেষ ডাক ডাকছে ডাহুক,
অদৃশ্য আত্মার তরী কোন ঘাটে ভিড়ল কোথায়?
কেন দোলে হৃৎপিণ্ড, আমার কি ভয়ের অসুখ?
নাকি সেই শিহরণ পুলকিত মাস্তুল দোলায় !
"আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার
যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার।"
(স্মৃতির মেঘলা ভোর।। আল মাহমুদ)

।।দুই।।
কবির প্রতি সর্বস্তরের মানুষের অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা ছিল। তাই সর্বসাধারণ যেন কবিকে একনজর শেষ দেখা দেখতে পারেন সেজন্যে সিদ্ধান্ত নেয়া হল, ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১ টায় কবির লাশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। সেখান থেকে নেয়া হবে বাঙলা একাডেমিতে এবং তারপর জাতীয় ঈদগাহে কবির জানাজা হবে। লাশ দাফনের ব্যাপারে কবির পরিবারের প্রথম পছন্দ ছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মাজার সংলগ্ন্ গোরস্তান; দ্বিতীয় পছন্দ ছিল বুদ্ধিজীবী গোরস্তান। সেইভাবেই টেলিভিশনগুলো স্ক্রলে ব্রেকিং নিউজ প্রচার করছিল।
১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে আটটার দিকে আমি নাসিম আহমেদকে ফোন করলাম। নাসিম আহমেদ বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবী এবং বাংলাদেশ নজরুল আবৃত্তি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি আল মাহমুদকে নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। আল মাহমুদ তাঁর একটি বই নাসিম আহমেদকে উৎসর্গ করেছিলেন। বইটির নাম ‘ছোট-বড় (ছোটগল্পের বই)। নাসিম আহমেদ এবং শায়লা আহমেদ দম্পতিকে আল মাহমুদ এত ভালবাসতেন যে, দু’জনকে নিয়ে আলাদা দু’টি প্রবন্ধও লিখেন কবি আল মাহমুদ।
কবির দাফন-কাফনসহ অন্যান্য বিষয়ে নাসিম ভাইয়ের সাথে কথা বলছিলাম। নাসিম ভাই বললেন, শহীদ মিনারের নিয়ন্ত্রক হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের অনুমতি ছাড়া কবির লাশ শহীদ মিনারে নেয়া যাবে না। তিনি আমাকে বললেন, উপ-উপাচার্য আব্দুস সামাদ (তিনিও কবি) সাহেবের সাথে ফোনে কথা হয়েছে। অনুমতির বিষয়টি উপাচার্য এবং প্রক্টর দেখেন বলে সামাদ সাহেব জানিয়েছেন। তিনি এর বাইরে কিছু বলতে অপরাগ।
এসব বলে নাসিম ভাই আমাকে বললেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছি। আপনিও চলে আসুন।’
আমি কবির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করলাম। তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বরাবর লিখিত একটি আবেদন নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে চলে এলেন। কবির দ্বিতীয় কনিষ্ঠ ছেলে মীর মনির, মেয়ের জামাই, ছেলে মীর আনিস এর শ্বশুর আবুল হোসেন এবং সাথে আছেন কবির দীর্ঘদিনের অনুজপ্রতিম বন্ধু কবি জাকির আবু জাফর। আমিও ততক্ষণে পৌঁছে গেলাম। নাসিম ভাই আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন।
আমরা তাড়াতাড়ি সামাদ সাহেবের কক্ষে গেলাম। যেহেতু তার সাথে নাসিম ভাই ইতোমধ্যে কথা বলেছেন, তাই তার সাথেই আগে দেখা করা শ্রেয়।
সামাদ সাহেব কবির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। তিনি বললেন, ‘দেখুন, মাহমুদ ভাই আমাদের গণমাধ্যমে যে কভারেজ পেয়েছেন তা ক’জনের ভাগ্যে জোটে? আমি প্রো-ভিসি হিসেবে প্রতিদিন ৮টি সংবাদপত্র পেয়ে থাকি। আজ সকালে দেখলাম, ৮ টি সংবাদপত্রেরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ আল মাহমুদের মৃত্যুর বিষয়টি।’
ইতোমধ্যে তার কর্মচারী আমাদের জন্য ফল পরিবেশন করলেন। তারপর আসবে চা। আমরা বিনয়ের সাথে বললাম, ১১ টার মধ্যে লাশ শহীদ মিনারে আনা হবে মর্মে সকল মিডিয়ায় সংবাদ প্রচারিত হয়েছে এবং এখনও টেলিভিশগুলো স্ক্রল প্রচার করছে। আমাদের হাতে একদম সময় নেই। আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতির ব্যবস্থা করুন। এই বলে কবির ছেলে আবেদনখানা প্রো-ভিসির কাছে এগিয়ে দিলেন।
কিন্তু প্রো-ভিসি আগের মতোই বললেন, আপনারা ভিসির সাথে কথা বলুন।
এর মধ্যে জাকির আবু জাফরের একটি ফোন এল। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক তাকে ফোন করেছেন এবং কবির কফিন বাংলা একাডেমিতে নেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। জাকির ভাইয়ের কাছ থেকে পরে জানা গেল দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক এবং নাসির আলী মামুন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
প্রো-ভিসির সাথে আর সময় নষ্ট না করে আমরা ভিসির দপ্তরে গেলাম। ভিসির একান্ত সচিব আমাদের বসতে দিয়ে বললেন, স্যার রুমেই আছেন, তবে জরুরী মিটিং এ ব্যস্ত আছেন। আপনারা অপেক্ষা করুন।
কিন্তু অপেক্ষা করার যে সময় নেই আমাদের! আমরা একান্ত সচিবকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছিলাম আমাদেরকে দ্রুত ভিসি সাহেবের সাথে দেখা করিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু তিনি বারবার তার অপারগতার কথা বলছিলেন।
এর মধ্যে প্রক্টর সাহেব ভিসির কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসলেন। আমরা দ্রুত তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কবি আল মাহমুদের লাশখানা সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য অনুমতি চেয়ে আবেদনখানা তার সামনে ধরা হল। তিনি খুব ব্যস্ত। আধা মিনিটের মতো সময় দাঁড়িয়ে কিছুই না বলে হাঁটা ধরলেন। ধারণা করলাম, তিনি হয়তো তিনি অনুমতি দেবেন এবং তার কক্ষের দিকে যাবার ইশারা করেছেন। তাই আমরাও তার পিছু পিছু হাঁটছি। কিন্তু যখন দেখা গেল তিনি তার গাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন, তখন দ্রুততার সাথে আমরা আবার তার সামনে গিযে দাঁড়ালাম। এইবার তিনি মুখ খুললেন। বললেন, আমি কিছুই করতে পারব না। আপনারার ভিসি মহোদয়ের সাথে কথা বলুন। এই বলে এবং কোন প্রত্যুত্তর শোনার সময় না দিয়ে বাতাসের বেগে তিনি গাড়িতে ওঠে বসলেন। আর আমরা কবির ছেলে, জামাই, বেয়াই, শুভানুধ্যায়ীরা বেকুব আর বেহায়ার মতো আবার ছুটলাম ভিসির দরবারে।
ভিসির সাথে দেখা করতে আমাদের আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। ততক্ষণে আমরা বুঝে গেছি শহীদ মিনারের অনুমতি মিলবে না। এদিকে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে এগারটা পেরিয়ে যাচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শহীদ মিনারের পরিবর্তে বাংলা একাডেমিতে কবির লাশ নেয়া হচ্ছে। আর আমরা তীর্থের কাকের মতো বসে আছি ভিসির দপ্তরে। আমরা ভাবছিলাম, যদি অনুমতি মেলে তবে বাংলা একাডেমি থেকে কবির লাশ শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হবে এবং তারপর প্রেস ক্লাব।
শহীদ মিনারের প্রতি আমাদের একটা বিশেষ আগ্রহ ছিল মূলত: এই কারণে যে, কবি আল মাহমুদ একজন ভাষাসৈনিক। তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন এবং জেল খেটেছেন। একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে কী অসাধারণ কবিতা তিনি লিখেছেন!
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় ?
বরকতের রক্ত।
হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে !
প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।
চিনতে না কি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে ?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে
মুক্ত বাতাস কিনতে ?
পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,
ফেব্রুয়ারির শোকের বসন
পরলো তারই ভগ্নী।
প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী
আমায় নেবে সঙ্গে,
বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।
(একুশের কবিতা, আল মাহমুদ)
কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, ভাষা আন্দোলনের কবি, মহান মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মাহমুদের লাশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়ার অনুমতি মিলল না। ভিসির সাথে যখন আমরা দেখা করার অনুমতি পেলাম, তখন তিনি অবশ্য আমাদেরকে বেশ ভালভাবেই রিসিভ করলেন, বসতে বললেন, কিছুক্ষণ আল মাহমুদের গুণকীর্তন করলেন। এ-ও বললেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা একটি শোক বার্তা পাঠাব। (কিন্তু এ শোকবার্তা আমরা পরে কোথাও দেখতে পাইনি। হয় তো শোকবার্তা দেয়নি)। জাতীয় কবির পাশে আর কাউকে কবর দেয়া যাবে না মর্মে সিদ্ধান্ত আছে জানিয়ে ভিসি এ বিষয়েও অপারগতা প্রকাশ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যর্থ মিশন শেষে আমরা ভাঙা মনোরথে চললাম বাংলা একাডেমির দিকে। কবি একুশে পদক এবং বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত। বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের সামনে অবস্থিত নজরুল মঞ্চের সামনে কবির কফিন রাখা হয়। সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে এখানে। জনস্রোত সামাল দিতে হিমশিস খাচ্ছিল বাংলা একাডেমি। কবির প্রতি সম্মান জানিয়ে একমিনিট নীরবতা পালনশেষে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক আব্দুল মান্নান ইলিয়াস, কবি নুরুল হুদা, কবি আব্দুল হাই শিকদার, আনোয়ারা সৈয়দ হকসহ সর্বস্তরের মানুষ কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী এ সময় বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে কবি সম্পর্কে সাক্ষাতকার প্রদান করেন। ‘ধরে নেবেন রাষ্ট্রযন্ত্র তাকে মেনে নিয়েছে’। জনগণ যখন একজন কবিকে বিবেচনায় নেয়, কবি হিসেবে মানেন ধরে নেবেন রাষ্ট্রযন্ত্র তাকে মেনে নিয়েছে। রাষ্ট্রকে আলাদা করে দেখবেন না’ এমন মন্তব্য করে ‘বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেছেন, রাষ্ট্র এমন কোনো অবকাঠামো না যা জনগণের বাইরে।
বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে গতকাল কবি আল মাহমুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পর সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অমর একুশে গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব জালাল আহমেদ।
হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, আল মাহমুদ কবি ছিলেন। কবি হিসেবেই তিনি বাঙালির কাছে বেঁচে থাকবেন।
তিনি বলেন, ৪৭ সালের পরে পূর্ব পাকিস্তানে নব কবিতার যে আন্দোলন শুরু হয়, পঞ্চাশের দশকে আল মাহমুদ তার অগ্রগণ্য কবি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন। তার লোক-লোকান্তর থেকে শুরু করে সোনালী কাবিন সে সময় প্রকাশিত হয়। তার ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতি নব উত্থানের একটি পথ পায়। আল মাহমুদ আমাদের লোক জীবনকে শহর জীবনের কাছে যে মাত্রায় উপস্থাপন করেছেন তা এক অভিনব ব্যাপার ছিল। সে জন্যই আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের অনন্য কবি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিলেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন- ‘আগামী দিনে পরবর্তী প্রজন্ম তার পাঠের ভেতর দিয়ে বাংলা সাহিত্যের সারাংশ শুধু নয়, উপজীব্য বিষয়গুলো কিঞ্চিৎ হলেও লাভ করবে।’
এদিকে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে জানাজা এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন আছে জানতে পেরে কবি পরিবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, কবিকে সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই দাফন করা হবে যেখান থেকে তিনি বেড়ে ওঠেছেন, যেখানে তাঁর জন্ম, যেখানে শুয়ে আছেন তাঁর পিতা-মাতা। আর জানাজা হবে প্রথমে জাতীয় প্রেস ক্লাবে (কবি আল মাহমুদ একজন তুখোড় সাংবাদিক এবং সম্পাদক ছিলেন। সম্পাদক হিসেবে তিনি এক বছর জেলও খেটেছেন), দ্বিতীয় জানাজা হবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে এবং সবশেষ জানাজা হবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কবির বাড়ির পাশে অবস্থিত নিয়াজ মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। পরিবারের পক্ষ থেকে এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণ সহজেই অনুমেয়। তাঁরা আসলে কারো কাছে হাত পাতেন নি কোন দিন। । এই গুণটি তাঁরা পারিবারিক সূত্রেই পেয়েছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আল মাহমুদ নিজে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেননি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলতেন, আমি কারও কাছে হাত পাততে পারব না। স্মরণ করা যেতে পারে, মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের প্রতিরক্ষা বিভাগের তথ্য অফিসার ছিলেন কবি আল মাহমুদ।

।।তিন।।
আল মাহমুদ দীর্ঘ দিন সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক দৈনিক পত্রিকায় কাজ করেছেন তিনি। পাকিস্তান আমলে দৈনিক ইত্তেফাকের মফস্বল বিভাগ প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন আল মাহমুদ। স্বাধীনতার পর দৈনিক গণকণ্ঠ এবং চট্টগ্রামের দৈনিক কর্ণফুলীর সম্পাদক ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন আল মাহমুদ।
কবি আল মাহমুদের দ্বিতীয় জানাজা হয় জাতীয় প্রেস ক্লাবে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে। সেখানে কবি সাহিত্যিক সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের মানুষ এবং বেশকিছু রাজনৈতিক দল ও সংগঠন কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং জানাজায় অংশ নেন।
এ সময় ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘কবি আল মাহমুদ ছিলেন দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি এই সমাজকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার সে স্বপ্ন পূরণ হোক।’
গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘উনার মতো কবি সাধারণত সব সময় জন্ম হয় না। প্রতিটি ধারাতেই ওনার উপস্থিতি আমরা দেখেছি। এতে আমরা অভিভূত হয়েছি, অনুপ্রাণিত হয়েছি। সেই অনুপ্রেরণাটুকু উনি রেখে গেছেন আগামী প্রজন্মের জন্য।’
কবি আল মাহমুদের ছেলে মীর মোহাম্মদ মুনির বলেন, ‘উনার ইচ্ছা ছিল শুক্রবারে মৃত্যুবরণ করার। আল্লাহ উনার ইচ্ছা পূরণ করেছেন। তার অজান্তে কোনো ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে জানাজা শেষে কবির কফিন নেয়া হয় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। সেখানে যোহর নামাজ শেষে কবির জানাজা পড়া হয়। বায়তুল মোকাররমে তখন তিল ধারণের ঠাঁয় নেই। স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জানাজা শেষে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে কবি সস্পর্কে বক্তব্য রাখেন কবি জাকির আবু জাফর, কবির বেয়াই আবুল হোসেন প্রমুখ। সেখান থেকে কবির লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি রওনা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশ্যে। তখন বিকাল প্রায় তিনটা। কবির গাড়িকে অনুসরণ করে আরও কয়েকটি গাড়ি। নিথর কবির সাথে যান কবি পরিবারের সকল সদস্য, কবির বেয়াই এবং নিত্য সহচর আবুল হোসেন, আবিদ আযম প্রমুখ।
রাত আটটা দশ মিনিটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের দক্ষিণ মৌড়াইলের মোল্লা বাড়িতে অর্থাৎ কবির নিজ বাড়িতে কবির লাশবাহী গাড়ি পৌঁছালে সেখানে এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং পাশর্^বর্তী জেলাসমূহ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ এসে মিলিত হয়েছে কবির বাড়িতে কবিকে শেষ একনজর দেখার জন্য।
কবির বেয়াই আবুল হোসেন সেখান থেকে ফোনে একটা বিষয় জানতে চাইলেন। বললেন, সর্বস্তরের মানুষ তো কবিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসছে, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন আসবে কি না? মুক্তিযোদ্ধা কবিকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করা হবে কি না?
আমি তার কথার কি জবাব দেব বুঝতে পারছিলাম না।
কবির কবর খননের কাজ শুরু হয়ে গেল। পিতা-মাতার পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন বাংলা সাহিত্যের অমর কবি আল মাহমুদ।
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ রোববার বেলা সোয়া ১১টার দিকে কবির মরদেহ রাখা হয় কবির বাড়ির পশ্চিম পাশে অবস্থিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিয়াজ মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে। সেখানে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বাদ জোহর বিদ্যালয় মাঠে কবির তৃতীয় ও শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা আশেক উল্লাহ ভূঁইয়া জানাজা পড়ান। জানাজায় অংশ নেন লক্ষাধিক মানুষ। জানাজা শেষে বিকাল পৌঁনে তিনটার দিকে কবি আল মাহমুদকে তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আসলে তাঁর মতো কবিরা দিতে আসেন, নিতে আসেন না। তবে তাই বলে কি আমরা আমাদের কর্তব্য ভুলে যাব?
আল মাহমুদের বেলায় সর্বসাধারণ তাদের ভালবাসা প্রদর্শন করেছে নিঃসন্দেহে।
আব্দুল গাফফার চৌধুরী লিখেছেন:
কবি আল মাহমুদ আর নেই। লন্ডনের বাড়িতে শনিবার যখন খবরটা পেলাম, তখন আমি লিখতে বসেছি, ভাষা আন্দোলন নিয়ে। প্রথমে ভেবেছি, ভাষা নিয়ে লেখাটা বন্ধ করি। আল মাহমুদকে শ্রদ্ধা জানাই। পরে মনে হল আল মাহমুদ যে ভাষার একজন প্রধান কবি, সেই ভাষার আন্দোলন নিয়ে লেখাটা বন্ধ হওয়া উচিত নয়। আল মাহমুদকে নিয়ে লিখব, তবে শোকটা একটু থিতু হোক।
শোকটা থিতু হয়নি। দীর্ঘদিনের অদর্শনে আল মাহমুদ স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিলেন। মৃত্যুতে আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। ৮২ বছর বয়সে মৃত্যু অবশ্যই পরিণত বয়সের মৃত্যু। কিন্তু প্রকৃত কবিরা কখনও মনের বার্ধক্যে পৌঁছেন না। আল মাহমুদও পৌঁছেননি। তার সাম্প্রতিককালের কবিতা, উপন্যাস পড়েও মনে হতো না কবি বার্ধক্যে পৌঁছেছেন। তিনি নিজে বলতেন তার অসুস্থতার কথা, বার্ধক্যের কথা। কিন্তু তার কলমে তার পরিচয় পাওয়া যেত না। সেজন্যই তার মৃত্যুতে শোকাভিভূত হয়েছি। এতটা শোক পাওয়ার আরও বড় কারণ, রাজনৈতিক মতানৈক্য সত্ত্বেও আল মাহমুদ ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠজন, প্রিয় কবি।
আল মাহমুদ ছিলেন পঞ্চাশের নক্ষত্র। এই নক্ষত্রগুলোর অধিকাংশই ধীরে ধীরে কালের অতলে হারিয়ে গেছেন। হারায়নি তাদের মেধা ও প্রতিভার প্রখর দ্যুতি। তাদের শেষ দু’জনের মধ্যে শহীদ কাদরী কিছুদিন আগে চলে গেছেন। এখন গেলেন আল মাহমুদ। আমি নিজেও পঞ্চাশের দশকের লেখক। নিজের চোখের সামনেই একটা সবচেয়ে সৃষ্টিশীল যুগের অবসান প্রত্যক্ষ করছি।
যুগের অবসান হয়। কিন্তু অবসান হয় না সেই সৃষ্টিশীল যুগের সৃষ্টি ও কীর্তির। তাই অবিভক্ত বাংলার ত্রিশের দশক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি পালাবদলের যুগ হিসেবে এখনও ইতিহাসে জাগ্রত। কবি বিষ্ণু দে, সমর সেন, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, গোলাম কুদ্দুস, জীবনানন্দ দাশ- এই নামগুলো বর্তমানে এবং ভবিষ্যতেও কি কেউ ভুলে যাবে?
.......
আল মাহমুদ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। একাত্তর সালেই কলকাতায় তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। তখন তার কবিতা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে অগ্নিবর্ষী। এই কবিতাগুলোর কোনো সংকলন আমি দেখিনি। কলকাতায় পৌঁছার কিছুদিনের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক কবিকুলের কাছে আল মাহমুদ পরম সমাদৃত হন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাকে ‘বাংলা ভাষার একজন শক্তিমান কবি’ বলে কলকাতার পত্রপত্রিকায় মন্তব্য করেন।
ইউরোপের ফ্যাসিবাদ এবং হিটলার-মুসোলিনির অভ্যুত্থানকালে বিখ্যাত কবি এজরা পাউন্ড এবং বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ন্যুট হামসুন ফ্যাসিবাদকে সমর্থনদানের জন্য অভিযুক্ত হয়েছিলেন। এজন্য তৎকালীন ইউরোপীয় সরকারগুলো তাদের যথেষ্ট হেনস্থা করেছে, কিন্তু বিরাট প্রতিভাশালী কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে তাদের অবদান অস্বীকার করেনি, তাদের মর্যাদা কেড়ে নেয়নি। বাংলাদেশ সরকারেরও উচিত আল মাহমুদের শেষ বয়সের রাজনীতিকে নয়, তার অসাধারণ কাব্য প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেয়া এবং সম্মান জানানো। আল মাহমুদ আমার বয়সে ছোট। তবু তাকে আমার শেষ শ্রদ্ধা জানাই।
(দৈনিক যুগান্তর, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯)
আল মাহমুদকে এখনও যথাযথ সম্মানটুকু দেয়া হয়নি -এ বিষয়টি উঠে এসেছে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর লেখায়ও। তিনি আরও উল্লেখ করেন:
আল মাহমুদ অসাধারণ শক্তিশালী কবি ছিলেন, ‘সোনালী কাবিন’ তার প্রমাণ।
(দৈনিক যুগান্তর, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯)
কবি পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা প্রথমে নামাজে জানাজা জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে করতে প্রশাসনের অনুমতি চেয়েও পাননি। দাফনের জন্য চেয়েছিলেন কবি কাজী নজরুলের সমাধির পাশে অথবা বুদ্ধিজীবী কবরস্থান। কিন্তু তারো অনুমতি মেলেনি। যার কারণে কবির গ্রামের বাড়িতেই দাফনের সিদ্ধান্ত হয়। এমনকি দেশের প্রধান এই কবিকে সর্বশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মান গার্ড অব অনারও না দেয়ায় জানাজায় আসা মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, সরকারের উচিত ছিল কবি পরিবার ও কবিভক্তদের পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে ভাষাসৈনিক, মুক্তিযাদ্ধা, আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রধান পুরুষ কবি আল মাহমুদকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানো।
কবি আল মাহমুদকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। তিনি লিখেন:
জাফর ভাইকে (সিকান্দার আবু জাফর) আমি বলেছিলাম, আমি কবি আল মাহমুদের সঙ্গে পরিচিত হতে আগ্রহী। তিনি কি সমকালে আসেন?
জাফর ভাই বলেলেন, আসবে না মানে, আসতেই হবে।
জাফর ভাইয়ের কথার সত্যতা প্রমাণিত হলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। এক পড়ন্ত দুপুরের দিকে কবি আল মাহমুদ সশরীরে হাজির হলেন সমকাল কার্যালয়ে।
পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরা, গলায় ময়লা মাফলার জড়ানো, নিঃশব্দ চরণে সমকাল-এ প্রবেশকারী ওই আগন্তুককে দেখে আমি ভাবতেই পারিনি, ইনিই কবি আল মাহমুদ।
যদিও সমকাল কবিতা সংখ্যায় তার ছবি আমি দেখেছিলাম।
আগন্তুককে স্বাগত জানিয়ে জাফর ভাই বললেন, এই যে আল মাহমুদ, তোমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য এই তরুণ কবি অপেক্ষা করছে।
আল মাহমুদ? আমি চমকে উঠে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। কবি আল মাহমুদ হাত বাড়িয়ে আমার সঙ্গে করমর্দন করলেন। আমি মুগ্ধ হলাম তার সারল্যে।
তাঁকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে ভাবলাম, কোট প্যান্ট পরা আধুনিক কবিদের এই দাপটের যুগেও আল মাহমুদের মতো কবি হওয়া তবে এখনো সম্ভব!
আল মাহমুদ তখন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় অতি সামান্য বেতনে চাকরি করেন। তিনি উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত কেউ নন-- এটা জেনে আমি নিজের ব্যাপারে কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করি।
আমার প্রিয় কবির শিক্ষা ভাগ্য আমার শিক্ষা-দুর্ভাগ্যের বেদনাকে অনেকটাই লাঘব করে দিলো।
তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ "লোক লোকান্তর" আমি পড়েছি এবং ওই গ্রন্থের কিছু কবিতা আমার মুখস্থ আছে জেনে তিনি খুব খুশি হয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
(আল মাহমুদকে নিয়ে নির্মলেন্দু গুণের স্মৃতিচারণ, দৈনিক দেশ রূপান্তর, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ এর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে এক শোক বার্তায় ‘সোনালী কাবিন’ এর কবি আল মাহমুদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পাশাপাশি কবি আল মাহমুদের শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি খন্দকার দেলোয়ার জালালীর পাঠানো শোক বার্তায় সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, কবি আল মাহমুদের মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি হলো, যা সহসাই পূরন হবার নয়।
তিনি বলেন, আলোকিত মানুষ হিসেবে কবি আল মাহমুদ সাহিত্য-কর্মের মাধ্যমে আলো ছড়িয়েছেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, কবি আল মাহমুদ বেঁচে থাকবেন তার কর্মের মাঝে। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন কবির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে।

।। চার ।।
ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস আল মাহমুদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে। দূতাবাসের ফেসবুক পেজে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি পোস্ট দেয়া হয়। আল মাহমুদের ছবি যুক্ত ওই পোস্টে বলা হয়:
U.S. Embassy Dhaka is saddened to learn of the passing of Al Mahmud, one of the greatest Bengali poets of the 20th century. His writings on the Bengali Language Movement, nationalism, political and economic repression, and the struggle for independence were valued by his fellow Bangladeshis. We offer our condolences to his family, friends, and all those who admired his work.
অর্থাৎ, ‘বিশ শতকের অন্যতম মহান কবি আল মাহমুদের মৃত্যুতে মার্কিন দূতাবাস শোকাহত। বাংলা ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ এবং আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তার পরিবার, স্বজন, এবং ভক্তদের প্রতি আমাদের পক্ষ থেকে সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।’
প্রখ্যাত কবি আল মাহমুদের মৃতুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে জাতীয় সাংবাদিক ক্লাব। জাতীয় সাংবাদিক ক্লাব কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কাজী জহির উদ্দিন তিতাস, সিনিয়র সহ সভাপতি মো: হারুন অর রশিদ, সহ সভাপতি মো: রফিকুল ইসলাম জোমাদ্দার মিলন, সাধারণ সম্পাদক মো: হাসান আলী রেজা দোজা, সাংগঠনিক সম্পাদক আল মাহমুদ গভীর শোক প্রকাশ করেন ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
বিবৃতিতে তারা বলেন- কবি আল মাহমুদ ছিলেন এপার ও ওপার বাংলার বর্তমান শ্রেষ্ঠ কবি। তার মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারাল।
কবি আল মাহমুদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মহাজোটের অংশ, যুক্তফ্রন্টের শরীক ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা ও মহাসচিব মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা।
এক শোক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, ‘আল মাহমুদের মৃত্যুতে দেশ একজন দেশপ্রেমিক জনপ্রিয় কবিকে হারাল। তিনি কবিতায় আধুনিকতা এনেছিলেন, সাথে যুক্ত ছিল অগাধ দেশপ্রেম। জীবনের শেষ দিকে ইসলামের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিলেন। মৃত্যু কামনা করেছিলেন কোন না কোন শুক্রবারে। কবির শেষ ইচ্ছায় মহান রাব্বুল আলামীন কবুল করেছেন।’
বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, ‘কবির পরিবারের ইচ্ছায় তাঁর দাফন যদি বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে করা হয় তাহলে তাঁর ভক্ত, অনুরাগী ও শুভাকাঙ্খীরা আনন্দিত ও খুশি হবেন। সরকার একটু উদ্যোগ গ্রহণ করলেই কবির পরিবারের এই শেষ ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।’
আল মাহমুদ বিষয়ক সাক্ষাতকার
কবি আল মাহমুদ শুধু অনেক বড় মাপের একজন কবি ছিলেন না। সাহিত্যের অন্যান্য ধারা, যথা-গল্প, উপন্যাস, আত্মজীবনীসহ সকল ক্ষেত্রেই তাঁর সদর্প বিচরণ ছিল। তাঁর গল্প, উপন্যাস নিয়ে সিনেমা নির্মিত হয়েছে, নির্মিতি হয়েছে নাটক। তাঁর সম্পর্কে ভালভাবে জানার জন্য তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ যেভাবে বেড়ে উঠি সহ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন সাক্ষাতকার এবং বিভিন্ন টেলিভিশনে সম্প্রচারিত সাক্ষাতকারমূলক অনুষ্ঠানসমূহ বেশ সহায়ক।
কবি আল মাহমুদের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দৈনিক প্রথম আলো ২২ জুলাই ২০১৬ তারিখে ছেপেছিল। নাসির আলী মামুনের নেয়া এ সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ নিচে তুলে ধরা হল:
মামুন: আপনার ছোটগল্প, কথাসাহিত্য ও আত্মজৈবনিক উপন্যাস যেভাবে বেড়ে উঠির বিষয় ও ভাষাশৈলী নিয়ে প্রশংসা করেন অনেকে। কিন্তু দিনযাপন নামে শিল্পতরু থেকে একটি স্কেচধর্মী বই বেরিয়েছিল আপনার। বইটির বিষয় পরিকল্পনা, চিত্রকল্প, ভাষা প্রকৌশল মৌলিক ও অসাধারণ। এ ধরনের কাজ আর অব্যাহত রাখলেন না কেন?
মাহমুদ: আমার কাঁধে বিরাট সংসার। আমার রোজগার দিয়ে ছেলেমেয়েদের বড় করতে হয়েছে। ভালো কোনো চাকরি আমাকে কেউ দেয়নি। প্রচুর শ্রম দিতে হয়েছে। নানা ধরনের গদ্য লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু করতে পারলাম না। বন্ধুদের, কবিদের দেওয়া মানসিক চাপ উপেক্ষা করে সমাজে জায়গা করে নিতে হয়েছে আমাকে। কেউ কোনো স্পেস আমাকে দিতে চায়নি। অনেক ধাক্কা খেয়েছি, মুক্তিযুদ্ধ করেছি, জেলও খেটেছি। আমাকে বলো, একজন কবি আর কী কী করতে পারে? আমাকে স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়নি। এখন কোনো কিছুতেই আমার আর আফসোস নেই। কেউ কেউ এসে ইদানীং আমায় বলে, ভারত উপমহাদেশে আপনি এখন সব ভাষায় জীবিত কবিদের মধ্যে সবার ওপরে।
মামুন: শুনে বেশ খুশি হন?
মাহমুদ: বিশ্বাস করো, হই না। মনে হয় আমাকে উসকে দেওয়ার জন্য এগুলো বলে। আমি কোনো মন্তব্য করি না। কিছু বলি না।
মামুন: কারা বলে?
মাহমুদ: তোমাদের মতো আমার সঙ্গে যারা দেখা করতে আসে! আমার পাঠকেরা আমার সঙ্গে আছে—এইটুকু জানি, ব্যস।
মামুন: মৌলবাদী লেখক হিসেবে আপনার পরিচিতি থাকলেও এখন আপনার লেখার বড় অংশ প্রকাশিত হয় মূলত সেক্যুলার পত্রপত্রিকায়। আপনার কি মনে হয়, আদর্শের চেয়ে শিল্পকলাকে এখানকার পত্রপত্রিকাগুলো বেশি গুরুত্ব দেয়?
মাহমুদ: শিল্পকলাকে গুরুত্ব দেয় বেশি। আমি তো কোনো মৌলবাদী কাগজে লিখি না। বড় বড় নিরপেক্ষ কাগজ আমার লেখা এখনো প্রত্যাশা করে। আমি নিয়মিত লেখা দিতে পারি না। তারা বিশেষভাবে ছাপে আমার লেখা। সম্ভবত আমার কবিতা না পেলে অনেক সম্পাদকের মন খারাপ হয়ে যায়। ধর্মবিশ্বাসের আদর্শ ও শিল্পকলাকে এক করা ঠিক নয়। এই পার্থক্যটা অনেকে বুঝতে পারে না। ধর্মীয় বিশ্বাসকে সামনে টেনে এনে আমার সবকিছুকে যারা প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করতে চায়, খোঁজ নিয়ে দেখো তারা কারা। তাদের পরিচয় কী! আমি তো কাউকে ব্যারিকেড দিয়ে রাখতে চাই না। লেখা ছাড়া আর তো কিছু করি না। শুনেছি ঢাকায় এসে কলকাতার কেউ কেউ আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। কিন্তু তাদের যারা নিয়ে আসে, ভুলিয়ে-ভালিয়ে তারা ওই অতিথিদের আমার কাছে আসতে দেয় না।
মামুন: ওপার বাংলায় আপনার আদর্শ এবং লেখা নিয়ে লেখক-সাহিত্যিকদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানেন কিছু?
মাহমুদ: কলকাতায় গেলে আমাকে পরিচিত ও অপরিচিতজনেরা ঘিরে থাকে। তারা আমাকে পাঠ করে। তোমার জানা উচিত, ওখানকার বড় পত্রিকাগুলো আমার লেখা যেকোনো সময় ছাপাতে আগ্রহী। সেখানে আমার কবিতার অনেক পাঠক আছে। বাংলাদেশ থেকে ব্যক্তিগতভাবে তারা আমার বই পড়ার জন্য নিয়ে যায়। শিবনারায়ণ রায় শুধু নন, আরও কজন আমার লেখার উচ্চ প্রশংসা করেছেন। কলকাতায় তো আমাকে কেউ মৌলবাদী বলে না!
মামুন: মৃত্যু আপনার মধ্যে বেদনা তৈরি করে কি?
মাহমুদ: মৃত্যুচিন্তা আছে আমার। তবে মৃত্যুকে সমাপ্তি মনে করি না। মৃত্যুর ওপারে আরেকটা জীবন আছে এটা বিশ্বাস করি। কিন্তু মৃত্যু আমার মধ্যে বেদনা তৈরি করে। কারণ, মৃত্যু মানে বিচ্ছেদ, চূড়ান্ত বিচ্ছেদ।
।। পাঁচ।।
আল মাহমুদ ইন্তেকাল করেন ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে। ঠিক এর পর পরই প্রথম আলো, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ সংখ্যায় ‘কাবিনবিহীন হাতে মহাকাল ছুঁলেন কবি’ শীর্ষক এক নিবন্ধে ফারুক ওয়াসিফ লিখেন:
আজ আকাশ মেঘলা আর আল মাহমুদ নেই। কাবিনবিহীন হাতে মহাকাল স্পর্শ করতে চলেছেন এখন তিনি। রাত্রিশেষে কোনো শুভ শুক্রবারে তিনি বিদায় নিতে চেয়েছিলেন। প্রকৃতি তাঁর ডাক শুনেছে। শুক্রবার দিনশেষেই তিনি বিদায় নিলেন। আজ শনিবার ভোরে আকাশ মেঘলা। কবি তাঁর শেষ কল্পনা মাখিয়ে দিলেন আকাশে, চরাচরে, বাংলা ভাষাভাষীদের মনে। আজ নিখিল বাংলা শোক করুক। ভাষার প্রিয়তম সন্তানের জন্য, কবিতার সন্তপুরুষের জন্য শোক করুক। তাঁর শেষ ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে।
......
বিদায় নিলেন বসন্তে, ভাষার মাসে। এও যেন এক প্রাকৃতিক সংকেত। আজ আমাদের ছোট্ট পৃথিবীটা ফোঁপাচ্ছে। আজ বাংলা কবিতার চুলখোলা আয়েশা আক্তারেরা, আপনার কন্যারা চুড়ি ভেঙে ফেলছে শোকে।
আল মাহমুদ তিতাসপারের কবি, মেঘনার কিশোর। তাঁর বিখ্যাত একটি গল্পের নাম ‘পানকৌড়ির রক্ত’। সেই থেকে মেঘনার পানকৌড়ি দেখলে আপনার কথা মনে পড়ে কবি। গত কালবৈশাখীতে মেঘনায় ছিলাম। ছিলাম নৌকায়। শিলাবৃষ্টি। রাশি রাশি বরফখণ্ড নদীজুড়ে খই ফোটাচ্ছে। ভাতের বলকের মতো ফুটছিল নদী। আকাশে গুড়গুড় বাজ ও ঐশী আলোর চমকানি। ওই সর্বনাশী সুন্দরের মধ্যে একটা কালো পানকৌড়ি পানি ছুঁয়ে সমানে ডানা ঝাপটাচ্ছিল। নীড়ে ফিরতে না পারা পাখিটা! পাগলিনী বাতাস, বড় বড় বাতাসার মতো শিলাপাত। সেগুলোর একটা ঠিকমতো লাগলেই যথেষ্ট। যেদিকেই যাক, কমপক্ষে এক মাইল আকাশ উড়তে হবে পাখিটাকে। সহজাত প্রবৃত্তি তাকে শিখিয়েছে, এমন বিপদে স্থির থাকতে হবে। আমার তখন আল মাহমুদের কথা মনে পড়েছিল।
সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন, ‘বন্ধুদের, কবিদের দেওয়া মানসিক চাপ উপেক্ষা করে সমাজে জায়গা করে নিতে হয়েছে আমাকে। কেউ কোনো স্পেস আমাকে দিতে চায়নি। অনেক ধাক্কা খেয়েছি, মুক্তিযুদ্ধ করেছি, জেলও খেটেছি। আমাকে বলো, একজন কবি আর কী কী করতে পারে?’ (নাসির আলী মামুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকার, প্রথম আলো, ২২ জুলাই ২০১৬)
আরেক জায়গায় বলেছেন, ‘অনেক কষ্ট, অনেক দারিদ্র্য, অনেক দুঃখ পেয়েছি, আবার সুখও। জেল-জুলুম। কিছু লোক আছে, যে কবিদের প্রতারণা করে সুখ পায়। এসব প্রতারণার শিকার হয়েছি।’ (সাক্ষাৎকার, মাহবুব মোর্শেদ, দেশ রূপান্তর)
বাংলা কবিতার আহত পানকৌড়ি আল মাহমুদ। তবু কত অকপট,
আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনোকালে সঞ্চয় করিনি
আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি;
ভালবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্বন,
ছলনা জানিনা বলে আর কোনো ব্যবসা শিখিনি। (সোনালি কাবিন)
কবির পরকাল হলো ভাষা। তাঁর দৈহিক জীবন সমাপ্ত হলো। ভুল-সঠিকে ভরা জীবনের দেখার ইতি ঘটল। কিন্তু ভাষা তাঁকে ঠিক মনে রাখবে। সেই ভাষিক পরকালে মাত্র জেগে উঠলেন কবি। বাংলা ভাষা আপনাকে সব দায় থেকে মুক্ত করবে, কারণ আপনি এই ভাষার কবিতাকে স্ব-ভাবে ফিরিয়েছেন। আপনি বাংলার মাটির সৌরভ, নদীর কান্না, জাতির আত্মার বেদনা প্রকাশ করে গেছেন। জীবনানন্দ দাশের পর আর কেউ এতটা মায়া দিয়ে সৌন্দর্য দিয়ে দুঃখিনী বাংলার কথা বলেনি।
আল মাহমুদের অন্তিম অসুস্থতার খবরে একটা ছায়া ঘনিয়ে আসছিল মধ্যদিনে। প্রথমে কবি ও কবিতার ভক্তদের ্মধ্যে, তারপর এখন হঠাৎ সূর্যগ্রহণ। দুই বাংলার ভাবাকাশে আজ বড় বেদনা। আপনার প্রতিষ্ঠা ছিল না কিন্তু ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন আপনি। জীবন দুঃখ-দারিদ্র্যে গেছে, মসনদ আপনাকে কটাক্ষ করেছে, পরিত্যক্ত করে রেখেছে। দুঃখ-যন্ত্রণায় আপনি যাদের কাছে গেলেন, তারাও আপনাকে ব্যবহার করেছে। সেটা আপনার ভুল হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে তা আমাদের সমাজ-রাষ্ট্র আর সংস্কৃতির সওদাগরদেরও দায়। মৃত্যুতে আপনার নশ্বর দেহ আর আর মানবিক ভুলগুলো মুছে যাবে, জেগে উঠবে বাংলা কবিতার মাহমুদীয় চরাচর। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
........
তিনি বাংলাদেশি রকমের আধুনিক—যেখানে বোদলেয়রীয় ক্লেদজ কুসুমের তৃষ্ণা নেই, পাপের গরিমা গাওয়া নেই। ‘আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেছে ভাই’ লিখে আপনি আমাদের জাতীয় শোককে জাগিয়ে রেখেছেন। আপনি যখন লিখলেন, ‘সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়োনা হরিণী/যদি নাও দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দুটি,’ (সোনালি কাবিন) তখন ভূমিপুত্র হিসেবে বৃক্ষের মতো সাবলীল ভঙ্গিতে আমরা মাথা তুলতে পারি। যেন দুঃখী কবির রাজকীয় অভিষেক ঘটল। জানলাম হৃদয়ের কাছে কতটা সৎ হতে হয়, কতটা শুদ্ধ হাতে তুলে নিতে হয় কলম। কেননা, পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা;/দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা। (সোনালি কাবিন)
আল মাহমুদের মধ্যে ডান-বাম, এপার-ওপার সব বাংলা একাকার। এটা কবির অর্জন কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য এ এক বড় সম্পদ। ঔপনিবেশিকতার পরবাসী মন আর আধুনিকতার ঝুলন্ত মানিপ্ল্যান্ট কিংবা অহংবাদী মাকড়সার জালে বসা কবিতার কূলে আপনি ভেড়েননি। দুঃখী লোকের চরে ভিড়িয়েছেন আপনার নৌকা। আধুনিকতাকে পিছু ধাওয়া করতে করতে কিছুটা সে পথে গিয়েও ফিরে এসেছেন। কবিতার দেশে ফেরার খাতার খোঁজে, জগৎ-প্রকৃতি-মানুষের মায়ার আবেশ পেতে আপনাকে আমাদের লাগবেই। আপনার মধ্যেই খুঁজতে হয় জীবনানন্দ-পারের বাংলা কবিতার হারানো নোলক। নিজেরই সঙ্গে সংঘাতে গিয়ে আপনি দেখান, কবিতা থেকে মতবাদ আর রাজনীতির অসূয়াকেও সরাতে পারেন জাতকের হংসের মতো। দুধসাগর থেকে পানি ঝেড়ে শুধু ননি নিতে আপনি পারেন। লিখতে পারেন এমন অনায়াস আবেশে,
‘কী প্রপঞ্চে ফিরে আসি, কী পাতকে
বারম্বার আমি
ভাষায়, মায়ের পেটে
পরিচিত, পরাজিত দেশে?
বাক্যের বিকার থেকে তুলে নিয়ে ভাষার সৌরভ
যদি দোষী হয়ে থাকি সেই অপরাধে
আমার উৎপন্ন হউক পুনর্বার তীর্যক যোনিতে।
অন্তত তাহলে আমি জাতকের হরিণের মত
ধর্মগণ্ডিকায় গ্রীবা রেখে
নির্ভাবন দেখে যাবো
রক্তের ফিন্কিতে লাল হয়ে
ধুয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ নির্ভয়ে, নির্বাণে।’ (জতিষ্মর, সোনালি কাবিন)
কবিতার প্রাণভোমরা চলে গেছেন, আজ আর গান হবে না। আজ শুধু রোদন, আজ শুধু আল মাহমুদকে আবাহন। বিদায় বাংলা কবিতার সন্তপুরুষ, কৌম সমাজের শেষ কবি! ভাষার জননীর গর্ব আপনি। আপনাকে ওরা নিক বা না নিক, শহীদ মিনারে মা চার সন্তানকে নিয়ে আপনার জন্যই অপেক্ষা করছে। আপনাকে শেষ দেখা দেখবে বলেই সোনার নোলক হারানো দুঃখিনী মায়ের মাথাটা আরেকটু নত হয়ে আছে।
প্রথম আলো তার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখের সম্পাদকীয়তে লিখে:
“প্রয়াত কবির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা
‘স্মৃতির মেঘলাভোরে’ কবিতায় আল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে/ মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ/ অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে/ ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ’। কোনো এক শুক্রবার যদি মৃত্যু এসে ‘যাওয়ার তাকিদ’ দেয় তাহলে সেই মৃত্যুকে তিনি ‘ঈদ’ হিসেবে সানন্দে গ্রহণ করবেন। গত শুক্রবার মৃত্যু এসে নিয়ে গেছে তাঁরে।
১৯৩৬ সালে জন্ম নিয়েছিলেন মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। সেই তিনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ হিসেবে এই ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার মৃত্যুবরণ করলেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর জাগতিক ব্যক্তিসত্তার অবসান কিংবা বলা যায় চূড়ান্ত পরিণতি হলো। সেদিক থেকে তাঁর লৌকিক বয়স দাঁড়াল ৮৩ বছর। কিন্তু গত কয়েক দশকে তাঁর কবিসত্তার যে শৈল্পিক বিস্তার ঘটেছে, তার শিগগির অবসানের শঙ্কা নেই। তাঁর সৃষ্টিকর্ম যে কালোত্তীর্ণ হয়ে রয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।
আল মাহমুদের অমর কাব্যগ্রন্থ সোনালী কাবিন সমকালীন বাংলা কবিতার একটি বাঁকের নাম। বলা হয়ে থাকে, তিনি যদি শুধু এই একটিমাত্র কাব্যগ্রন্থ রেখে যেতেন, তাতেও বাংলা কবিতার রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে থাকতেন। কবি পরিচয়টি আল মাহমুদের ‘ট্রেডমার্ক’ হলেও তিনি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। তবে তাঁর কাব্য প্রতিভার কাছে অন্য সব পরিচয় ফিকে হয়ে যায়। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্ভঙ্গিতে সমৃদ্ধ করেছেন। পেশাগত জীবনে তিনি পত্রিকার প্রুফরিডার থেকে নিজেকে জাতীয় দৈনিকের প্রধান সম্পাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
একটি সাক্ষাৎকারে আল মাহমুদ বলেছিলেন, বাংলাদেশের বহু নদীর পানি স্বর্গীয় পীযূষজ্ঞানে আক্ষরিক অর্থেই হাতের আঁজলায় ভরে তিনি পান করেছেন। তাঁর এই মৃত্তিকাবর্তী মোহনীয় মানস তাঁর কবিতার মধ্যেও দেখা যায়। আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেও তিনি ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নর-নারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে কবিতায় অবলম্বন করেছেন। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তাঁর অনন্য কীর্তি। তাঁর জাদু স্পর্শে সৃষ্টি হয়েছে অনন্য পঙ্ক্তিমালা। যে মৃত্যু তাঁকে নিয়ে গেল, সেই মৃত্যু নিয়ে ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায় তিনি লিখে গেছেন: ‘প্রেম কবে নিয়েছিল ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ/ মরণের পরে শুধু ফিরে আসে কবরের ঘাস/ যতক্ষণ ধরো এই তাম্রবর্ণ অঙ্গের গড়ন/ তারপর কিছু নেই, তারপর হাসে ইতিহাস।’
এই কবির মৃত্যু যেন মৃত্যু নয়। এ যেন অমৃতের পথে মহাপ্রয়াণ। সেই অনন্ত যাত্রার যাত্রী, প্রয়াত কবির প্রতি শ্রদ্ধা।
কবির মৃত্যুতে সম্পাদকীয় এবং বিভিন্ন ধরনের প্রবন্ধ, নিবন্ধ, স্মৃতিচারণ ছেপেছে অন্য পত্রিকাগুলোও।
উইকিপিডিয়াতে কবি সম্পর্কে নিম্নরূপ তথ্য সন্নিবেশিত আছে:
মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ (১১ জুলাই ১৯৩৬ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) যিনি আল মাহমুদ নামে অধিক পরিচিত, ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্ভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ সমরেও অংশ নিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত সরকার বিরোধী হিসেবে পরিচিত দৈনিক গণকণ্ঠ (১৯৭২-১৯৭৪) পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
১৯৫০-এর দশকে যে কয়েকজন লেখক বাংলা ভাষা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদ, রাজনীতি, অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবং পশ্চিম পাকিস্তানী সরকার বিরোধী আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন তাদের মধ্যে মাহমুদ একজন। লোক লোকান্তর (১৯৬৩), কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৭৩) ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।
প্রারম্ভিক জীবন: আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মৌড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তার পিতার নাম মীর আবদুর রব ও মাতার নাম রওশন আরা মীর। তার দাদার নাম আব্দুল ওহাব মোল্লা যিনি হবিগঞ্জ জেলার জমিদার ছিলেন।
কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকু- হাই স্কুলে পড়ালেখা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনি মধ্যযুগীয় প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রমুখের সাহিত্য পাঠ করে ঢাকায় আসার পর কাব্য সাধনা শুরু করেন এবং একের পর এক সাফল্য লাভ করেন।
কর্মজীবন: সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে ১৯৫৪ সালে মাহমুদ ঢাকা আগেমন করেন। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। তিনি পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং যুদ্ধের পরে দৈনিক গণকণ্ঠ নামক পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সম্পাদক থাকাকালীন এ সময় সরকারের বিরুদ্ধে লেখার কারণে এক বছরের জন্য কারাবরণ করেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ দেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
সাহিত্যজীবন: ১৯৫৪ সাল অর্থাৎ ১৮ বছর বয়স থেকে তার কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত 'কবিতা' পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর (১৯৬৩) সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস (১৯৬৬), সোনালি কাবিন (১৯৭৩), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো (১৯৬৯) কাব্যগ্রন্থগুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৯৩ সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস কবি ও কোলাহল।
তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তার কবিতায় অবলম্বন করেন। নারী ও প্রেমের বিষয়টি তার কবিতায় ব্যাপকভাবে এসেছে। উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী হিসেবে নারীর যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা ও ভোগের লালসাকে তিনি শিল্পের অংশ হিসেবেই দেখিয়েছেন। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তার অনন্য কীর্তি।
১৯৬৮ সালে ‘লোক লোকান্তর’ ও ‘কালের কলস’ নামে দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তার সবচেয়ে সাড়া জাগানো সাহিত্যকর্ম সোনালি কাবিন। ১৯৯০-এর দশক থেকে তার কবিতায় বিশ্বস্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস উৎকীর্ণ হতে থাকে; এর জন্য তিনি প্রগতিশীলদের সমালোচনার মুখোমুখি হন। ১৯৯৩ সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস কবি ও কোলাহল। কোনো কোনো তাত্ত্বিকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিশ্বাসগ্রস্ততার কারণে তার বেশকিছু কবিতা লোকায়তিক সাহিত্যদর্শন দৃষ্টান্তবাদ দ্বারা অগ্রহণযোগ্য। তবে একথাও সত্য, কবিতায় দর্শন থাকে, কিন্তু দর্শন দ্বারা কবিতা নিয়ন্ত্রিত নয়, কবিতা আবেগের কারবার।
উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থ: লোক লোকান্তর (১৯৬৩), কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৭৩), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৭৬), আরব্য রজনীর রাজহাঁস, বখতিয়ারের ঘোড়া, অদৃশ্যবাদীদের রান্নাবান্না, দিনযাপন, দ্বিতীয় ভাঙ্গন, একটি পাখি লেজ ঝোলা, পাখির কাছে ফুলের কাছে, আল মাহমুদের গল্প, গল্পসমগ্র, প্রেমের গল্প, যেভাবে বেড়ে উঠি, কিশোর সমগ্র, কবির আত্মবিশ্বাস, কবিতাসমগ্র-১, কবিতাসমগ্র-২, পানকৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধ বণিক, ময়ূরীর মুখ, না কোন শূন্যতা মানি না, নদীর ভেতরের নদী, প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা, প্রেম প্রকৃতির দ্রোহ আর প্রার্থনা কবিতা, প্রেমের কবিতা সমগ্র, উপমহাদেশ, বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ, উপন্যাস সমগ্র-১, উপন্যাস সমগ্র-২, উপন্যাস সমগ্র-৩, তোমার গন্ধে ফুল ফুটেছে (২০১৫), ছায়ায় ঢাকা মায়ার পাহাড় (রূপকথা), ত্রিশেরা,উড়াল কাব্য, ছায়ার সাথে মায়ার লড়াই ইত্যাদি।
ব্যক্তিগত জীবন: আল মাহমুদ ব্যক্তিগত জীবনে সৈয়দা নাদিরা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে।
২০১৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ৮২ বছর বয়সে ঢাকার ধানমণ্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা: বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮), জয় বাংলা পুরস্কার (১৯৭২), হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭২), জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭২), কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৬), কবি জসীম উদ্দিন পুরস্কার, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), একুশে পদক (১৯৮৬), নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯০), ভানুসিংহ সম্মাননা পদক (২০০৪), লালন পুরস্কার (২০১১) ইত্যাদি।
সমালোচনা: অনেকেই সমালোচনা করেন যে, আল মাহমুদ ১৯৯০’র দশকে ইসলামী ধর্মীয়বোধের দিকে ঝোঁকে পড়েন। তার কবিতায় ইসলামী চেতনার প্রতিফলন ঘটতে থাকে। যদিও তিনি বিভিন্ন সময় তা অস্বীকার করে পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমি কবি। আমি কোন রাজনৈতিক দল করি না।’
ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়ার কারণে জেল এবং ফেরারি জীবন করা কবি আল মাহমুদ, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আল মাহমুদ স্বাধীন বাংলাদেশে এক বছর জেল খেটেছেন। তখন তিনি দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক। দৈনিক গণকণ্ঠ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বাঙলা ভাষায় প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকা। ১৯৭২ সালে ১০ই জানুয়ারী ঢাকা থেকে পত্রিকাটির প্রকাশনা শুরু হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক কবি আল মাহমুদ। এটি প্রকাশিত হতো জনতা প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজেস লিঃ থেকে। প্রকাশক হিসাবে নাম ছিল মনিরুল ইসলাম-এর। সম্পাদকীয় দপ্তর ছির রেংকিন স্ট্রীটে।
পত্রিকাটির সরকারী-বিরোধী সাহসী অবস্থান সকলের দৃষ্টি কাড়ে। পরবর্তীতে পত্রিকাটি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিশ্বাসীদের মুখপত্র বিশেষ করে জাতীয় সমাজতন্ত্রিক দল-এর মুখপত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৮ই মার্চ ১৯৭৪ সাল তারিখে সরকার পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। পত্রিকার সম্পাদক আল মাহমুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর ফলে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। সরকার ১৩ই এপ্রিল ১৯৭৪ তারিখে প্রতিকাটি পুনঃপ্রকাশের সুযোগ প্রদান করে। তিন দিন পর ১৮ এপ্রিল ১৯৭৪ তারিখে পত্রিকাটি চিরতরে বন্ধ করা দেয়া হয়।
পত্রিকা বন্ধের সংবাদ: দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকা বন্ধের বিবরণ তৎকালীন প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকায় নিম্নরূপ প্রচারিত হয়েছিলঃ
'গত ১৭ই মার্চ রাত ৩ টার সময় তিন ট্রাকবোঝাই রক্ষীবাহিনী ও পুলিশ দৈনিক গণকণ্ঠ কার্যালয়ে প্রবেশ করে এবং সোমবার প্রকাশিতব্য শেষ ফর্মা (১ম ও ৮ম পাতার) মেশিন হইতে নামাইয়া ফর্মাটি ভাঙ্গিয়া ফেলে। তারা কার্যালয়ের প্রতিটি কক্ষের জিনিসপত্র তছনছ করে এবং কর্মরত-কর্মচারীদের ওপর নির্যাতন চালাইয়া ৭ জনকে গ্রেফতার করে। একই সময় বাসভবন হইতে গণকণ্ঠ সম্পাদক কবি আল মাহমুদকেও গ্রেফতার করা হয়। একই সময় ছাপাখানা হইতেও সোমবারের শেষ ফর্মার সিলোফিন পেপারসহ প্লেটটি আটক করে। সোমবারের পত্রিকা প্রকাশ কার্যত বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। সোমবার ও মঙ্গলবার সারাদিন ও রাত ধরিয়া পুলিশ ও রক্ষীবাহিনী কিছুক্ষণ পর পর গণকণ্ঠ কার্যালয়ে যাইয়া সেখানে কর্মরত সাংবাদিক ও কর্মচারীদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হইয়াছে। পত্রিকার বার্তা সম্পাদকসহ অন্য সাংবাদিকরা বাড়ি-ঘর ছাড়িয়া অন্যত্র রাত কাটাইতে বাধ্য হইতেছেন। রিপোর্টাররা সংবাদ সংগ্রহ করিতে যাইয়া হুমকির সম্মুখীন হইতেছেন। কারাগারে গণকণ্ঠ সম্পাদকের সহিত সাক্ষাতের চেষ্টা ব্যর্থ হইয়াছে। তাহাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে রাখা হইয়াছে বলিয়া খবর পাওয়া গিয়াছে। তাহা ছাড়া মফস্বল সংবাদদাতাসহ গণকণ্ঠ কার্যালয় থেকে গ্রেফতারকৃতদের কোনো সন্ধান পাওয়া যাইতেছে না।
(দৈনিক ইত্তেফাক, ১ম পাতা, ২১ মার্চ ১৯৭৪)
পরবর্তীতে অবশ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি আল মাহমুদকে জেল থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করেন এবং শিল্পকলা একাডেমিতে নিযুক্ত করেন। এখান থেকেই কবি পরিচালক হিসেবে চাকুরি জীবন শেষ করেন।
কবি আল মাহমুদ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যেমন ফ্রান্সও রয়েছে। ইউরোপ যাবার সময় তাঁকে বলা হয়েছিল, আপনি ইচ্ছে করলে আপনার পরিবারের কাউকে সাথে নিতে পারেন। কিন্তু তিনি সে প্রস্তাবে রাজি হননি। কারণ, তাঁর মনে হয়েছিল, পরিবারের কেউ সাথে যাওয়া মানে সরকারের অর্থের অপচয় যা দুর্নীতির শামিল।
এই লেখকের সাথে তিনি প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, বিশেষত শীন নদী নিয়ে অনেক স্মৃতিচারণ করেছেন। এর বাইরেও কবির সাথে এই লেখকের অনেক স্মৃতি রয়েছে যা সময় ও সুযোগ করে প্রকাশ করা হবে।
কবি আল মাহমুদ মানুষের কবি, বাংলা ভাষার কবি, ভাষা আন্দোলনের কবি, মহান মুক্তিযোদ্ধা কবি। বাংলা ভাষাকে তিনি যা দিয়ে গেছেন সেই ঋণ এ জাতি কোনদিনও শোধ করতে পারবে না। যতদিন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য থাকবে ততদিন আল মাহমুদ নামক নক্ষত্রটি জ্বল জ্বল করবে। তাঁর উজ্জ্বলতা কোনদিন ম্লান হবে না, কেউ ম্লান করতে পারবে না।
Comentarios