top of page

গাজী মাজহারুল আনোয়ার স্মরণে।। মোঃ জেহাদ উদ্দিন


২০১৩ সালে গাজী মাজহারুল আনোয়ার-এর সাথে লেখক (বাম দিক থেকে তৃতীয়)

২০১৩ সালের কথা। অনুজপ্রতিম ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান তাঁর একটি অনুষ্ঠানে আমাকে দাওয়াত করল। অনুষ্ঠানটি ছিল ঐ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সকল মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে তাদেরকে সংবর্ধনা প্রদান। ব্যারিস্টার জিয়া এ কাজটি সব সময় করে থাকে। ছাত্রজীবন থেকেই তার ‘আইকন’ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং সেন্টার রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সব সময় এ সংবর্ধনা প্রদান করা হয়ে থাকে।

২০১৩ সালের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মানবাধিকার কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান এবং কিংবদন্তিতুল্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গাজী মাজহারুল আনোয়ার-এর মতো বিখ্যাত মানুষদের সাথে আমার মতো একজন ক্ষুদ্র মানুষকে দাওয়াত করা হয়েছিল। আমি তখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উপ কর কমিশনার। অনুষ্ঠানটি হয়েছিল ঢাকার শিশু একাডেমি মিলনায়তনে।

গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে ২০১৩ সালে ঐ অনুষ্ঠানেই আমি প্রথমবারের মতো এতো কাছে থেকে দেখি। অনেক কথা হয়েছিল তাঁর সাথে। তিনি কুমিল্লার সন্তান। আমার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া—অর্থাৎ বৃহত্তর কুমিল্লায়। আমি নজরুল নিয়ে কাজ করি শুনে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। নজরুলের উপর আমাদের অনেক কাজ করার উপর তিনি বারবার গুরুত্বারোপ করছিলেন।


গাজী মাজহারুল আনোয়ার আমাদের আবহমান সংস্কৃতির অন্যতম কাণ্ডারি একজন ক্ষণজন্মা মানুষ ছিলেন। তাঁর ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করছি এবং তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

ব্যারিস্টার জিয়ার কাছে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমাকে এমন একটি সুন্দর অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য এবং সেই অনুষ্ঠানের কয়েকটি ছবি শেয়ার করার জন্য।


***

কিংবদন্তিতুল্য গীতিকার, সুরকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক গাজী মাজহারুল আনোয়ার ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ খ্রি. সকালে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। তিনি একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার ছাড়াও আরো অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর ইন্তেকালে সকল মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ।

এক শোক বার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, “গাজী মাজহারুল আনোয়ার তার সৃষ্টির মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছেন দেশের সংস্কৃতিকে। তার মৃত্যু দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন, বিশেষ করে সংগীতাঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।”

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ইন্তেকালে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন। এক শোক বার্তায় তিনি বলেছেন, “বিখ্যাত এই গীতিকার তার কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে এদেশের মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।”

গাজী মাজহারুল আনোয়ার স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম নিয়ে অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান লিখেছেন। তিনি ২০০২ সালে বাংলাদেশের একুশে পদক এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।

গাজী মাজহারুল আনোয়ার ১৯৪৩ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার তালেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৪ সাল থেকে রেডিও পাকিস্তানে গান লেখা শুরু করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই নিয়মিত গান ও নাটক রচনা করেন। প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য গান লেখেন ১৯৬৭ সালে আয়না ও অবশিষ্ট চলচ্চিত্রের জন্য। ১৯৬৭ সালে চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত হওয়ার পর থেকে কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও গান লেখাতেও দক্ষতা দেখান তিনি। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র নান্টু ঘটক ১৯৮২ সালে মুক্তি পায়। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ৪১ টি।

২০ হাজারের বেশি গান রচনা করেছেন তিনি। বিবিসি বাংলা তৈরিকৃত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশটি বাংলা গানের তালিকায় রয়েছে তার লেখা তিনটি গান। এগুলো হল-

জয় বাংলা বাংলার জয়

১৯৭০ সালের মার্চ মাসে গানটি লেখেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বঞ্চনা-দুর্দশা আর স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষাকে ছন্দময় গীতে প্রকাশ হয় এই গানে। অমর এই গানটিতে সুর দিয়েছেন আনোয়ার পারভেজ। শাহনাজ বেগম ও আব্বুল জব্বার দিয়েছেন কণ্ঠ। ‘জয় বাংলা’ চলচ্চিত্রের জন্য গানটি লেখা হলেও মুক্তিযুদ্ধকালে বাঙালির সাহস ও স্বপ্নের প্রতীক হয়ে ওঠে গানটি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের সঙ্গেও গানটি জড়িয়ে আছে। বিবিসির জরিপে সেরা ২০ গানের মধ্যে এই গানটির অবস্থান ছিল ত্রয়োদশ।

একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়

গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা গানটি দেশাত্মবোধক গানে আরেক সংযোজন। এই গানেরও সুর করেছেন আনোয়ার পারভেজ। গেয়েছেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। বিবিসির সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় ‘একবার যেতে দে না’ গানের অবস্থান ছিল পঞ্চদশ।

একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল

গাজী মাজহারুল আনোয়ার-আনোয়ার পারভেজ-শাহনাজ রহমতুল্লাহ ত্রয়ীর আরেক সৃষ্টি ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল।’ বিবিসির সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় গানটি উনবিংশ স্থানে উঠে আসে।

তাঁর অসংখ্য গান মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। যেমন-

আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার

১৯৭৮ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহার করা হয়। আলাউদ্দিন আলীর সুরে গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন সৈয়দ আব্দুল হাদী। পর্দায় ঠোঁট মিলিয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন। ছবিটি মুক্তির পর দ্রুত গানটি দেশব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

আকাশের হাতে আছে এক রাশ নীল ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’ গানটি ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ সিনেমার। চিরসবুজ গান হিসেবে এখনও শ্রোতাদের পছন্দের তালিকায় গানটি। গানটিতে সুর করেছিলেন সত্য সাহা। শিল্পী ছিলেন বশীর আহমেদ ও আনজুমান আরা বেগম। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পাওয়া আয়না ও অবশিষ্ট সিনেমায় অভিনয় করেন আজিম, সুজাতা, সুচন্দা।


নীল আকাশের নিচে

গাজী মাজহারুল আনোয়ারের আরেকটি জনপ্রিয় গান ‘নীল আকাশের নিচে আমি রাস্তা চলেছি একা’। ‘নীল আকাশের নিচে’ সিনেমায় গানটি গেয়েছেন খন্দকার ফারুক আহমেদ। গানটির সুর করেছেন সত্য সাহা।

এছাড়াও গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘চক্ষের নজর এমনি কইরা’, ‘কারো আপন হইতে পারলি না অন্তর’, ‘হয় যদি বদমান হোক আরো’, ‘দুনিয়াটা মস্ত বড়’সহ অনেক গান।

Commentaires


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page