চলচ্চিত্রে নজরুল
- মো জেহাদ উদ্দিন
- May 27, 2021
- 3 min read
‘ধ্রুব’ সিনেমায় নারদ’র চরিত্রে অভিনয় করেন নজরুল। ২০ থেকে ২১টি সিনেমার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি
চলচ্চিত্র অঙ্গনে কাজী নজরুল ইসলাম একাধারে গীতিকার, সংগীত পরিচালক, কাহিনিকার, সুরকার ও নির্মাতা হয়ে কাজ করেছেন। অভিনয় করেছেন দাপটের সঙ্গে। তাই শুধুই অভিনয় আর পরিচালনা নয়, রীতিমতো প্রশিক্ষকের কাজ করতেন নজরুল। সহশিল্পীদের অভিনয় শেখাতেন, গান তুলে দিতেন শিল্পীদের। এমনকি উচ্চারণও ঠিক করে দিতেন। ত্রিশের দশকে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটার্সের ‘সুর ভান্ডারি’ পদে নিযুক্ত হন। এই পদটি ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪১ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় নজরুল ‘বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স’ নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গঠন করেন।
শুরুতে অভিনেতা নজরুলের কথা বলি। ধ্রুব চলচ্চিত্রে তিনি নারদের চরিত্রে অভিনয় করেন এবং একটি গানে কণ্ঠ দেন।
১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি নজরুল অভিনীত ‘ধ্রুব’ মুক্তি পায়। স্বর্গের সংবাদবাহক এবং দেবর্ষি নারদের চরিত্রে সব সময় দেখা যায় জটাধারী, দীর্ঘ শ্মশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধ একজনের চেহারা। কিন্তু নারদ নজরুল ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। তাঁর নারদ এক সুদর্শন যুবক। হাসি হাসি মুখ, ঝাঁকড়া চুল, ক্লিন শেভড। পরনে সিল্কের লম্বা কুর্তা, গলায় মালা। নারদ চরিত্রে নজরুলের সাজসজ্জা নিয়ে সে সময় পত্রিকায় সমালোচনা হয়েছিল যথেষ্ট। পাত্তা দেননি নজরুল। নজরুল তাঁর জবাব দেন। তিনি বলেন, ‘আমি চিরতরুণ ও চিরসুন্দর নারদের রূপই দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’
নজরুল নিজে পরিচালনা করেছেন ‘ধূপছায়া’ এবং বিষ্ণুর চরিত্রে অভিনয়ও করেন তিনি। সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাইষষ্ঠী’তে সুরকারের ভূমিকায় কাজ করেন নজরুল যা ১৯৩১ সালের ১১ এপ্রিল মুক্তি পায়। একই বছর বাংলা সবাক চিত্র ‘জলসা’য় নজরুল নিজের একটি গান গেয়েছিলেন এবং ‘নারী’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন।
১৯৩৯ সালে মুক্তি পায় ‘সাপুড়ে’। এর কাহিনিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল। বেদে সম্প্রদায়ের জীবনভিত্তিক এ সিনেমা দারুণ ব্যবসাসফল হয়েছিল। বেদেজীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য নজরুল বেশ কিছুদিন বেদে দলের সঙ্গে ছিলেন। ‘সাপুড়া’ নামে সিনেমাটির হিন্দি রিমেকও হয়েছিল। তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন নজরুল।
১৯৩৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাতালপুরী’ সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেন নজরুল। সিনেমাটি কয়লাখনির শ্রমিক ও সেই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম নিয়ে নির্মিত হয়েছিল। এ ছবির জন্য ‘ঝুমুর’ সুরে গান রচনা করেন নজরুল। তিনি কয়লাখনি অঞ্চল সম্পর্কে জানার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ১৯৩৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গৃহদাহ’ সিনেমার সুরকার ছিলেন নজরুল। ১৯৩৭ সালে মুক্তি ‘গ্রহের ফের’। এ ছবির সংগীত পরিচালক ও সুরকার ছিলেন নজরুল।
১৯৩৭ সালের আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বিদ্যাপতি’। কবি বিদ্যাপতির জীবনীভিত্তিক এ ছবির মূল গল্প ছিল নজরুলের। মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির বিভিন্ন কবিতায় নজরুলের সুরদানের কাজ ছিল অসাধারণ। বাংলা ‘বিদ্যাপতি’র সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে হিন্দিতে নির্মিত হয় ‘বিদ্যাপতি’। সে ছবিও ব্যবসাসফল হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৩৮ সালে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র ‘গোরা’। ছবিটির সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। বিশ্বভারতী আপত্তি করে যে ছবিটিতে সঠিকভাবে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া হচ্ছে না। নজরুল তখন সোজা চলে যান কবিগুরুর কাছে। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে সমর্থন করেন এবং বিশ্বভারতীর সমালোচনা করে বলেন, ‘আমার গান কীভাবে গাইতে হবে, সেটা কি তোমার চেয়ে ওরা ভালো বুঝবে?’ এ সিনেমায় তিনি রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি নিজের লেখা একটি গান ব্যবহার করেন। সে সময় মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাল বাংলা’ নামে আরেকটি চলচ্চিত্রের গানেও সুর করেছিলেন নজরুল। চলচ্চিত্রে কৌতুকময় একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ও করেন তিনি।
১৯৪২ সালে নির্মিত ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। পরে ‘চৌরঙ্গী’ হিন্দিতে নির্মিত হলে সে ছবির জন্য সাতটি হিন্দি গান লেখেন নজরুল। একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিলরুবা’ চলচ্চিত্রের গীতিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল।
১৯৪১-৪২ সালে ‘মদিনা’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। এ সিনেমার জন্য তিনি ১৫টি গান লেখেন। কিন্তু ১৯৪২ সালে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়ায় সিনেমাটি আর মুক্তি পায়নি।
নজরুল ২০-২১টি ছবির সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। এসব ছবির মধ্যে রয়েছে : জলসা (আবৃত্তি ও গান), ধূপছায়া, প্রহলাদ, বিষ্ণুমায়া, ধ্রুব, পাতালপুরী, গ্রহের ফের, বিদ্যাপতি (বাংলা), বিদ্যাপতি (হিন্দি), গোরা, সাপুড়ে (বাংলা), সাপেড়া (হিন্দী), নন্দিনী, চৌরঙ্গী (বাংলা), চৌরঙ্গী (হিন্দি)।
অবিভক্ত বাংলায় ব্যবসায়িক ভিত্তিতে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করে পারসি চিত্র প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটারস। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে কলকাতায় প্রথম নির্বাক বাংলা ছবি ‘বিল্বমঙ্গল’ নির্মিত হয় ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে। ম্যাডান থিয়েটারসই ১৯৩০-৩১ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম সবাক বাংলা ছবি নির্মাণেরও উদ্যোগ নেয় বাণিজ্যিক কারণে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নজরুলকে ম্যাডান থিয়েটারস ‘সুরভাণ্ডারি’ নিযুক্ত করে। নজরুলের সুরভাণ্ডারি নিযুক্ত হওয়ার সংবাদটি কলকাতার দৈনিক ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ১৯৩১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় ছাপা হয়। সুরভাণ্ডারি হিসেবে নজরুলের দায়িত্ব ছিল সবাক চিত্রে অংশগ্রহণকারী নট-নটীদের কণ্ঠস্বর পরীক্ষা করা। উল্লেখ্য, সুরভাণ্ডারি পদটি সংগীত পরিচালকেরও ওপরে। ম্যাডান থিয়েটারসে সুরভাণ্ডারি হিসেবে নজরুলের যোগদানের পরই পরীক্ষামূলকভাবে ৩০-৪০টি সবাক খণ্ডচিত্র নির্মিত হয়। এগুলো ‘জলসা’ নামে মুক্তি পায় ১৯৩১ সালের ১৩ মার্চ। সম্ভবত এই চিত্রে নজরুল তার ‘নারী’ কবিতাটি আবৃত্তি ও একটি গান পরিবেশন করেছিলেন। ১৯৩১ সালে ‘প্রহাদ’ এ সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন নজরুল। ১৯৩৩ সালে নির্মিত ‘কপাল কুণ্ডলা’র যুক্ত ছিলেন গীতিকার হিসেবে। ১৯৩৪ সালে সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে যৌথভাবে ‘ধ্রুব’ পরিচালনা করেন নজরুল। এতে তিনি নারদের চরিত্রে অভিনয় করেন। ওই ছবির গীতিকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন তিনি। ১৮টি গানের মধ্যে ১৭টি গান ছিল নজরুলের লেখা। ৩টি গানে কণ্ঠও দিয়েছিলেন তিনি। ‘ধ্রুব’ মুক্তি পায় ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি। ১৯৩৮ সালে কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি ‘বিদ্যাপতি’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ১৯৩৫ সালে ‘পাতালপুরী’ ছবির সুরারোপ ও সংগীত পরিচালনা করেন। ১৯৩৭ সালে ‘গ্রহের ফের’ ছবির সংগীত পরিচালনা করেন। ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন নজরুল। এতে রবীন্দ্রনাথের গানে তিনি সুরাপোরপ করেন। সিনেমাটির পরিচালক ছিলেন নরেশ মিত্র। ১৯৩৮ সালে নির্মিত ‘সাপুড়ে’ ছবির চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছিলেন নজরুল। ১৯৪২ সালে নির্মিত ‘চৌরঙ্গী’ ছবিতে নিজের লেখা ৮টি গানে সুর ও সংগীত পরিচালনা করেন নজরুল।
コメント