জলাতঙ্ক রোগ।। ডাঃ সাবরিনা শাওন
- ডাঃ সাবরিনা শাওন
- Jun 15, 2021
- 3 min read
১.জলাতঙ্ক বলতে কি বুঝায়?
উত্তরঃ জলাতঙ্ক হলো ভাইরাসজনিত এক ধরনের জুনোটিক রোগ যা, প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। রেবিজ ভাইরাস নামক একধরনের এনভেলপ, নিউরোটক্সিন ভাইরাস দিয়ে এই রোগ হয়ে থাকে। লিভিং বডির বাহিরে বেশিক্ষণ এই ভাইরাস বাঁচে না। কোনোভাবে রেবিজ আক্রান্ত প্রাণীর খাবার খেলেও ওই খাবারে এই ভাইরাস বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে না।যেখানে মৃত্যুহার ১০০%। কোনো এন্টিভাইরাল এর বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে না।
২.কোন কোন প্রাণীর মধ্যে এই রেবিজ ভাইরাস থাকে?
উত্তরঃ সাধারণত কুকুর, শেয়াল,বাঁদর ইত্যাদি উষ্ণ রক্তের প্রাণীদের মধ্যে এই ভাইরাস দেখা যায়। আক্রান্ত গাভীর কাঁচা দুধ, কাঁচা মাংস খেলেও জলাতঙ্ক হতে পারে। রেবিজ ভাইরাস যেহেতু তাপে মারা যায়, তাই দুধ ফুটিয়ে এবং মাংস সিদ্ধ হলে জলাতঙ্ক হওয়ার সম্ভাবনা আর থাকে না। এখন মনে হতে পারে গাভী থেকে কিভাবে জলাতঙ্ক ছড়ায়? গাভী থেকেও হতে পারে, যদি গাভীকে কোনও রেবিজ আক্রান্ত প্রাণী কামড় দেয়। আবার অনেকক্ষেত্রে প্রাণীর বৈশিষ্ট্য দেখেও বুঝতে পারা যায়, সেই প্রাণীগুলো রেবিজ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত কি না। যেমনঃ যদি কামড় দেয়ার একদিনের মাঝেই প্রাণীটা মারা যায়, পোষা প্রাণী না হলে, প্রাণী যদি হিংস্র হয়, কামড় দেয়ার প্রবণতা যদি বেড়ে যায়, প্রাণীর মুখ দিয়ে যদি লালা পড়তে থাকে, নাক দিয়ে যদি পানি পড়তে থাকে।
৩.কিভাবে হয়?
উত্তরঃ রেবিস আক্রান্ত প্রাণীর লালা থেকে জলাতঙ্ক হয়।
৪.কিভাবে ছড়ায়?
উত্তরঃ আক্রান্ত প্রাণীর কামড়ে চামড়া বা মিউকাস আবরণ ছিদ্র হলেই শুধুমাত্র ট্রান্সমিশান হবে। ওরাল বা মুখ দিয়ে লালা প্রবেশ করলেও মানুষের শরীরে জলাতঙ্ক ছড়ায় না।কারণ-পাকস্হলীতে যে এসিড থাকে, সেই এসিড রেবিজ ভাইরাসের এনভেলভ বা আবরনে মেরে ফেলে, ফলে জলাতঙ্ক ছড়া না।জলাতঙ্ক হতে হলে অবশ্যই parenteral মানে ওরাল (মুখ) রোট বাদের বাকী সব রোট দিয়ে লালা শরীরে প্রবেশ করতে হবে এবং যে কোনও উপায়ে তা রক্তের সংস্পর্শে আসতেই হবে।
৫.জলাতঙ্ক রোগের লক্ষ্মণ কি কি?
উত্তরঃ রোগী পানি খেতে পারবে না। এমনকি পানি গ্লাসে পানি দেখলেই ভয় পাবে।জ্বর,মাথা ব্যাথাও থাকতে পারে।
৬.কিভাবে নিরাময় করা যাবে?
উত্তরঃ প্রতিরোধ করার উপায় হলো টিকা দেয়া।অনেক ধরনের টিকা রয়েছে। তারমধ্যে হিউমেন ডিপ্লয়েড সেল ভ্যাক্সিন (HDCV) হলো সব থেকে বেশি নিরাপদ।
৭.কাদের টিকা দিবো?
উত্তরঃ কুকুর, বিড়াল,শিয়াল বেঁজি,বানর,বাদুর যদি কামড় দেয় বা গৃহপালিত পশু যেমন-গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, ঘোড়া ইত্যাদি যদি রেবিস আক্রান্ত পশুর দ্বারা কামড় খায়, সেইক্ষত্রেও টিকা দিতে হবে। আমাদের দেশে ৯৫%কুকুর দিয়েই জলাতঙ্ক ছড়ায়। ইঁদুর, চিকা, খরগোশ গুইসাপ, কাঠবিড়ালি, মানুষের কামড়ে জলাতঙ্ক ছড়ায় না। তাই টিকাও দেয়ার দরকার হয় না। তবে যে কোনও অবস্থায় টিকা দিয়ে দেয়াই ভালো।
৮.টিকা দেয়ার নিয়ম কি?
উত্তরঃ দুইভাবে টিকা দেয়া হয়। ইন্ট্রামাসকুলারলী (৫টা টিকা দিতে হবে যেমম ০, ৩, ৭, ১৪, ২৮ দিনে এবং ইন্ট্রাডার্মালী ৪টা টিকা দিতে হবে যেমন- ০, ৩, ৭, ২৮ দিন। কোনও টিকা মিস গেলে আবার নতুনকরে শুরু করাই ভালো।
৯. রেবিস আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়কে কয়টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায় এবং কোন ক্ষেত্রে কি করণীয়?
উত্তরঃ রেবিস আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়কে তিনটা ক্যাটাগরিতে ভাগ করতে পারি। ক্যাটাগরি- একঃ সামান্য রক্তপাতহীন ক্ষত বা আঁচড় বা লোহন। এখানে কাপড় কাঁচা সাবান দিয়ে ঘসে ঘসে ১৫-২০মিনিট পানি দিতে হবে। প্রশ্ন হতে পারে সাবান পানি দিয়ে কেন ধুবো? সাবান রেবিস ভাইরাসের আবরণকে ধ্বংস করে ফেলে। ফলে ভাইরাস আর সারভাইভ করতে পারে না। তাছাড়া এন্টিসেপ্টিক ক্রীমও ব্যবহার করে ক্ষতস্হানটা পরিষ্কার করতে পারি। ক্যাটাগরি-দুইঃ যে কোনও পরিমাণের রক্তাক্ত ক্ষত। এক্ষেত্রে ক্ষত স্হান সাবান-পানি দিয়ে ধোয়া, পরিষ্কার করা এবং টিকা দিতে হবে। ক্যাটাগরি-তিনঃ মারাত্মক ধরনের ক্ষত। এক্ষেত্রে সাবান পানি দিয়ে ধোয়া+পরিষ্কার করা +টিকা+ইমিউনুগ্লোবিউলিন দিতে হবে। এছাড়াও এন্টিবায়োটিক এনটিটি টিকাও দেয়া যেতে পারে।
১০.টিকা কোথায় কোথায় পাওয়া যাবে?
উত্তরঃ সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল মহাখালী এবং দেশের সকল জেলায় সরবরাহ সাপেক্ষে বিনামূল্যে দেয়া হয়।
১১.যদি কারও টিকা সব দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে আবারও রেবিস ভাইরাসে আক্রান্ত প্রাণী দ্বারা কামড় খেলো, তখন কি আবার টিকা দিতে হবে কিনা?
উত্তরঃতিনমাস থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে আবার এমনটা হলে শুধু ৯০দিনে বোস্টার ডোজ বা ০,৩ দিনে দুইটা টিকা নিলেই হবে। কিন্তু পাঁচ বছর পর হলে আবার নতুন করে টিকা সব নিতে হবে। তার আগে হলে দিতে হবে না।টিকা নিলে যেহেতু কোনও সমস্যা নাই তাহলে কোনও অবস্হাতেই টিকা মিস না করাই ভালো।
ডাঃ সাবরিনা শাওন
রংপুর মেডিকেল কলেজ, রংপুর
Comments