top of page

ঝিমায় আকাশ কাঁদে পবন

Updated: Jun 28, 2021


সুবহে সাদিকের সময়টা আদিলের খুব ভাল লাগে। রাতের আঁধার ভেদ করে আলোর রেখা ফুটে ওঠে পূব আকাশে। দিনের পূর্বাভাষ এটি। তারপরই কাছে-দূরের মসজিদসমূহ থেকে ভেসে আসে ফজরের আযান।

হাইয়্যা আলাস সালাহ-সালাতে জন্যে এসো

হাইয়্যা আলাল ফালাহ-কল্যাণের পথে এসো

আসসালাতু খায়রুম মিনাননৌম-নিশ্চয়ই ঘুম হতে সালাত উত্তম।

এ আহ্বান ভাল লাগে আদিলের।

ঘুম থেকে ওঠে পড়ে। ছোট বেলায় হাদিসের কিতাবে সে পড়েছিল, শয়তান এ সময় কর্ণকুহরে প্রস্রাব করে দেয় যা ঘুমের বটিক হিসেবে কাজ করে। শয়তানের অনুসারীরা তখন ঘুমায়।

আবার ছোটবেলার সেই পড়াও তার মনে গেঁথে আছে-আরলি টু বেড এন্ড আরলি টু রাইজ, মেইকস অ্যা ম্যান হেলদি ওয়েলদি এন্ড ওয়াইজ-অর্থাৎ আগে আগে শুতে গেলে এবং সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলে একজন মানুষ সুস্বাস্খ্যের অধিকারী, সম্পদশালী ও জ্ঞানী হয়।

আদিল এ কথাগুলো মেনে চলে। তবে কোন কিছু পাবার লোভে নয়। মনের তাগিদে।

আজও সে সকালে ঘুম থেকে ওঠেছে। তারপর ফজরের সালাত আদায় করে সামান্য একটু নাস্তা মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। ড্রাইভারকে আগেই বলা ছিল। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি হাঁকিয়ে ঢাকা পূর্বাচল হয়ে নরসিংদি পাড়ি দিয়ে ভৈরবে মেঘনা নদীর উপর সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর টোল প্লাজা পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় লাগল মাত্র দেড় ঘন্টার মতো।

ড্রাইভার এত সময় আদিল সাহেবকে ডাকে নাই। এখন সেতু পার হতে টোল দিতে হবে তাই তার মালিককে ডাকল। অবশ্য টোল প্লাজায় মালিকের অফিসের পরিচয় দিলে টোল না দিলেও নাকি চলে-এমন একটি বিষয় একদিন তার মালিকের কাছে জানতে চেয়ে সে বেশ ধমক খেয়েছিল। তার মালিক তাকে শিখিয়েছিলেন, আইন সবার জন্য সমান। কারোর কোন বিশেষ অধিকার বলে কিছু নেই। বিশেষ কোন সুবিধাও নিতে নেই। আর সেতুর টোল হল জনগণের অধিকার। কোন অবস্থাতেই জনগণের অধিকার ক্ষু্ন্ন করতে নেই।

এরপর থেকে জুয়েলের মাথায় এ বিষয়গুলো একপ্রকার গেঁথে গেছে বলা চলে। সেও মানুষের কোন হক নষ্ট করে না।

সেতু পার হতে হতে জুয়েল তার মালিককে বলে, স্যার এত বড় একটি সেতুর নাম নজরুল ইসলামের নামে!

এইটুক বলে জুয়েল আর কিছু বলে না। মালিকের উত্তরের অপেক্ষায় থাকে।

আদিল সাহেব বুঝেন তার ড্রাইভার কেন এ কথার অবতারণা করেছে।

কিন্তু আদিল সাহেব এ বিষয়ে কিছুই বলছেন না। ব্রিজ পেরিয়ে তার আনমনা দৃষ্টি নদীর নীল পানিতে। বেদনার রঙও নাকি নীল। তার বেদনার নীল রঙের সাথে মেঘনার নীল বর্ণের পানির সাযুজ্য খুঁজে বেড়াচ্ছেন হয় তো।

আস্তে করে ড্রাইভারকে বললেন, গাড়ি থামাও।

গাড়ির আস্তেই চলছিল। হুকুমের সাথে সাথেই তা থেমে গেল। আদিল সাহেব গাড়ি থেকে নামলেন। সেতুর রেলিং ধরে উত্তর দিতে তাকিয়ে রইলেন যতদূর চোখ যায়। মেঘনার নীল পানি তার কাছে আজ অন্য বার্তা দিচ্ছে।

একটু পর জুয়েলকে কাছে ডাকলেন। জুয়েল গাড়ি থেকে নেমে তার কাছে এসে দাঁড়াল।

-নদীর পানি নীল, তাই না জুয়েল?

-জি¦ স্যার।

-আচ্ছা, জুয়েল, তুমি যে নজরুলের কথা মনে করেছ ইনি সেই নজরুল নন। এই সেতুটি যাঁর নামে তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নন। ইনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি উজ্জ্বল নাম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাঁর ছেলে বর্তমান সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রী। সরকার দলের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন।

কথাগুলো শুনতে শুনতে জুয়েলের মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। গোপালগঞ্জের ছেলে সে। মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনলে তার শরীরে একটি বাড়তি আবেগ দোলা দেয়। কিন্তু এখন কেন তার মনটা ছ্যাঁৎ করে ওঠল?

মনের অজান্তেই সে তার মালিককে বলে ওঠল, স্যার, মন খারাপ করবেন না। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক হবেই।


সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু পেরিয়ে আদিল সাহেবের গাড়িটি এসে থামল সোহাগপুর আব্বাসউদ্দীন খান কলেজের সামনে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে কলেজটি নিজের নামে গড়ে তুলেছেন স্থানীয় একজন চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট। একসময় তিনি সরকারের মালিকাধীন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালক (অর্থ) ছিলেন। কলেজের ঠিক উল্টোপাশে গ্রামের দিকে চলে গেছে একটি রাস্তা-যার নাম ‘আব্বাসউদ্দীন খান সড়ক’। এ সড়ক দিয়ে গ্রামে ঢুকলে তার একপ্রান্তে সোহাগপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়-যেখানে একবার এসেছিলেন আদিল সাহেব।

সময়টি ছিল ১৯৯১ খ্রি.। জনাব হেদায়েত উল্লাহ সাহেব তখন এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি ১৯৮৩ খ্রি. পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বেড়তলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আদিল সাহেব তখন সে বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়েন। ১৯৮৩ সালের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র আদিল সাহেব ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে তার সেদিনের সেই মহান শিক্ষককে সালাম করতে এসেছিলেন সোহাগপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

ছাত্র-শিক্ষকের সেদিনের সেই সাক্ষাৎপর্ব সে এলাকায় আজও যেন কিংবদন্তী হয়ে আছে। মানুষ গড়ার কারিগর সেই হেদায়েত উল্লাহ স্যার ইন্তেকাল করেছেন বেশ কয়েক বছল হল। কিন্তু তাঁরই ছাত্র আদিল সাহেব সময়-সুযোগ পেলেই তাঁর শিক্ষকের স্মৃতিধন্য বিদ্যালয়ে আসেন, কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে কিছু বলেন।

আদিল সাহেবের আজকের আগমন একেবারে বিনে নোটিশে। বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক অনেকটা শরমিন্দা হয়ে বলেই ফেললেন, ‘আপনি সরকারের এত বড় একজন কর্মকর্তা, অথচ আপনাকে আমরা কোন সমাদরই করতে পারি না।

আদিল সাহেব হেসে বললেন, স্যার, একজন ছাত্র তাঁর শিক্ষকের কাছে সব সময়ের জন্যেই ছাত্র। আমি তো আসি আমার শিক্ষকগণের কাছে, আমার কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে। আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার কোন কারণ নেই। আমি আপনাদেরই সন্তান।

ততক্ষণে ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষক-অভিভাবকগণের মধ্যে এক ধরণের প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়ে গেছে। প্রধান শিক্ষক বললেন, স্যার, আপনাকে যেহেতু পেয়েই গেলাম, আপনার উপস্থিতিতে আমরা এবারের পঞ্চম শ্রেণির বিদায়ী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত দোয়ার অনুষ্ঠান করতে চাই।

এইসব বিষয়ে আদিল সাহেবকে জোরালোভাবে কিছু বলতে হয় না। কেননা তিনি এইসব বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন।

২০০৬ সালে তিনি ভারত সফরকালে তখনকার ভারতের রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আবদুল কালামের সাথে বৈঠককালে তাঁর কাছে জানতে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ভারতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ কি? জবাবে সেই মহামানব বলেছিলেন, তরুণদের স্বপ্ন দেখানোই তাঁর প্রধান কাজ।

তরুণদের সবাই স্বপ্ন দেখাতে পারে না। যাঁরা পারেন তাঁরাই আমাদের কাছে বরেণ্য, আমরা তাঁদেরই অনুসরণ করে হই ধন্য।

আদিল সাহেব আজও সে কথাটিই বারবার করে ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলছিলেন। আর বরাবরের মতোই তাঁর আলোচনায় বারবার উঠে আসছিলেন তারুণ্যের প্রাণ-সঞ্জীবনী শক্তি কাজী নজরুল ইসলাম।



বেলা দুপুর গড়ানোর আগেই আদিল সাহেব সোহাগপুর থেকে বিদায় নিলেন। মায়ের সাথে দুপুরের খাবার খেতে হবে। কতদিন মায়ের রান্না খাওয়া হয় না। মাকে নিয়ে আদিলের একটি বিশেষ গর্ব হল নজরুলের মায়ের নাম এবং তার মায়ের নাম এক। জাহেদা খাতুন। ক’জনের ভাগ্যে এমন মিল হয়!

গাড়ি মহাসড়কে ওঠে বামদিকে যাত্রা শুরু করেছে। সামনে বাহাদুরপুর, কামাউড়া, খড়িয়ালা, বগইর গ্রাম। তারপরই বেড়তলা। আদিল সাহেবের গ্রামের বাড়ি। সুন্দর গ্রাম। আদর্শ গ্রাম। গর্ব করার মতো অনেক কিছুই আছে এ গ্রামে। আবার চাঁদের কলংকও যে নেই তা-ই বা বলি কি করে! ভাল-মন্দ মিলিয়েই আমাদের সমাজ।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক গ্রামটিকে দু’ভাগ করেছে। মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে বেড়তলা বাজার, কবরস্থান, ঈদগাহ মাঠ, বেড়তলা রাহমানিয়া মাদ্রাসাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। বাজারটি পার হলেই মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে আদিল সাহেবের বাড়ি। আশপাশের কয়েকটি বাড়ি নিয়ে গড়ে ওঠেছে গুলবাগিচা। নজরুলের ছোঁয়া আছে এর সর্বত্র।

গ্রামের বেশ কয়েকজন তরুণ আগে থেকেই গুলবাগিচায় অপেক্ষা করছিল আদিল সাহেবের জন্য। গত রাতেই তারা খবর পেয়েছিল যে, তিনি বাড়ি আসছেন। সবাই অসম্ভব ভালবাসে তাকে। তিনিও সবাইকে প্রাণভরে ভালবাসেন।

গাড়ি থেকেই নামতেই নাঈম দুর্জয়, আশিক, বাক্কি, সিরাজ, রাজু এগিয়ে এল। কুশলাদি বিনিময়ের আগেই তারা বলে ওঠল-

-‘ভাই! আমরা ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখেই সড়কের নামকরণ করব। আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিন শুধু। আমরা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছি।’

-‘না। একদম না।’

আদিল সাহেব তাদের মুখের দিকে না তাকিয়েই বলে দিলেন।

আদিল সাহেবের এ জবাব তাদের প্রত্যাশিত ছিল না। যেন বড় একটা হোঁচট খেল ওরা।

আদিল সাহেব মুহুর্তেই সহাস্যে ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, চিন্তা করো না। চল আগে মায়ের হাতের খাবার খেয়ে নিই। নজরুলের মা বলে কথা!

সবাই আদিল সাহেবকে অনুসরণ করল। টেবিলে খাবার সাজানোই ছিল। আদিল সাহেব ভেতরের কক্ষে গিয়ে জামা-কপড় পবির্তন করে এলেন। এবার তাকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে তিনি শহরে থাকেন কিংবা এত বড় পদে চাকুরি করেন।

তারপর যা হবার তা-ই হল। খাওয়া শেষ করেই খালি পায়ে বেরিয়ে পড়লেন। হাতে মাছ ধরার ফিলুইন আর একটি ডেক্সি। জমিতে গিয়ে মাছ ধরবেন।

কিন্তু কোথায় বর্ষা, কোথায় পানি?

বছরের এ সময়টিতে পানিতে মাঠ-ঘাট থৈ থৈ করার কথা। প্রায় মাস তিনেক মাঠে পানি থাকত। সেই পানিতে ঢেউ খেলত। কত দূর-দূরান্ত থেকে নৌকাযোগে মানুষ আসা-যাওয়া করত! পানির সাথে মিতালি করে পাটগাছগুলো জেগে থাকত। যখন পাট কাটার সময় হতো তখন কৃষকের চোখে-মুখে সে কি আনন্দ! তাদের আনন্দের সাথে বিকেলের রোদে চিক চিক করে লাফালাফি করত কাটারি আর চাপিলা মাছ। আহা রে সেই দিনগুলো কোথায় গেল! আদিল সাহেবের দীর্ঘশ্বাস যেন চারিদিকে হাহাকার করে ফেরে।

এই বার খানিকটা বৃষ্টি হয়েছিল। তাই মাঠে একটু পানি দেখা যাচ্ছে। সেই পানিকেই বর্ষা ভেবে আদিল সাহেবের মাঠে নামা। সাথে নেমেছে সেই তরুণেরাও।

তিনি বলছেন, জান? বর্ষার পানিতে আমরা কত মজা করতাম?

না। ওরা জানবে কেমন করে। ওদের কারোর বয়সই ত্রিশ অতিক্রম করে নি। গত ত্রিশ বছরে তো বর্ষার দেখাই মেলে না!

কেন বর্ষা আসে না? বৃষ্টি তো বাংলাদেশে কম-বেশি অনেকটা আগের মতোই হচ্ছে। তাহলে বৃষ্টির অভাবে বর্ষা হচ্ছে না এ কথা বলা যাবে না। মূল কারণটি তাহলে কি?

দুই তিন কানি জমির পর দেখা যাচ্ছে এ গ্রামের বয়োবৃদ্ধ কৃষক তোতা মিয়াকে। আদিল সাহেব সেইদিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

-নাতি, মাছ ফাইবা ক্যামনে? এ তো মেঘের (বৃষ্টির) পানি। দুইদিন পর সব শুকাইয়া যাইবো।’

-জ্বি, নানা, আসসালামু আলাইকুম। ছোট বেলায় তো দেখতাম বর্ষার পানি মাঠে আসা শুরু করলেই মাছের আনাগোনাও শুরু হয়ে যেত।’

-‘হাছা কথাই কইছ। কিন্তু তহন তো আছিল জোয়ারের পানি। অহন জোয়ার ফাইবা কই? উজানে পানি আটকাইয়রা রাখলে ভাটিতে তো আমরা হুককাইয়াই মরুম।’

নানা কি বুঝাতে চাইলেন তা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয়নি। তবে বছরখানেক আগে সুনামগঞ্জে হঠাৎ উজানের পানি এসে যখন কৃষকদের পাকা ধান ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তখন একজন স্বনামধন্য পানি বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, জলবায়ুর বৈরি আচরণই এরজন্য দায়ী।

আজ মনে হচ্ছে আমাদের এই নানা তাদের মতো শিক্ষিত না, তবে তাদের মতো বাটপারও না! বরং প্রকৃতির শিক্ষায় বেড়ে ওঠা একজন নিখাদ মানুষ। কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে মনে পড়ছে:

মানুষের প্রিয় প্রিয় মানুষের প্রাণে

মানুষের হাড়ে রক্তে বানানো ঘর

এই ঘর আজো আগুনে পোড়ে না কেন?


ঘুণপোকা কাটে সে-ঘরের ম‚ল-খুঁটি

আনাচে কানাচে পরগাছা ওঠে বেড়ে,

সদর মহলে ডাকাত পড়েছে ভর দুপুরের বেলা

প্রহরীরা কই? কোথায় পাহারাদার?


ছেনাল সময় উরুত দ্যাখায়ে নাচে

নপুংশকেরা খুশিতে আত্মহারা ।


বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে

রাজনীতিকের ধমনী শিরায় সুবিধাবাদের পাপ

বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে

বুদ্ধিজীবীর রক্তে স্নায়ুতে সচেতন অপরাধ

বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে

জাতির তরুণ রক্তে পুষেছে নির্বীর্যের সাপ-


উদোম জীবন উল্টে রয়েছে মাঠে কাছিমের মতো।


-নানা, চলেন কাছি টানি!

আদিলের কথায় তোতা মিয়া অবাক হলেন না। কারণ তিনি জানেন, তার এ নাতিটি এমনই। গ্রামের সবার আপন।

হেসে ওঠলেন তিনি। বললেন, কাছি টাইন্যা মাছ ধরবার দিন তো শেষ রে নাতি!

আদিল সাহেবও জানেন যে সেই দিন আর নেই। তবুও স্মৃতি নিয়ে কাতরতা আর কি!

সাথের তরুণদের নিয়ে কাদা-মাটিতে কিছু সময় গড়াগড়ি করলেন আর গুণ গুণ করে গাইলেন নজরুলের সেই অমর গান:

একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লাী জননী

ফুলে ও ফসলে কাদা-মাটি জলে টলমল করে লাবণী।

মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল দুটি ধবল বক। হয় তো খাবারের সন্ধ্যান করছে-ছোট ছোট দু’একটি মাছ যদি মেলে! কিন্তু কোথায় পাবে মাছ?


গ্রাম রক্ষার মহান ব্রত নিয়ে ২০০৩ সালে আদিল সাহেবরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেভ দ্য ভিলেজ সংগঠন। এটি এক হিসেবে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত পানিশ্বর উত্তর ইউনিয়ন ছাত্র ঐক্য সংস্থারই ধারাবাহিকতায় আসে। সারাজীবন তো আর আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্র থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু গ্রামের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হবে সারাজীবনই। সেই চিন্তা থেকেই সংগঠনের নামটি পরিবর্তন করা হয়েছিল। নতুন নামটি আদিল সাহেবেরই দেয়া।

সেভ দ্য ভিলেজকে যে পর্যায়ে নিয়ে যাবার স্বপ্ন ছিল তা হয়ে ওঠেনি। সেই দুঃখ আদিল সাহেবের রয়েই গেল। ছাত্রদেরকে এর সাথে আরও সক্রিয় করার জন্য একটি আলাদা ছাত্র ইউনিট গঠন করা হয়েছে। ওরা বেশ তৎপর। কিন্তু এই গ্রামের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠে এখন যারা বড় হয়েছে এমন অনেকেই গ্রামমুখি হচ্ছে না। তাদেরকে কিভাবে আকৃষ্ট করা যায় এ নিয়েও আজকের সভায় আলোচনা হবে।

ইতোমধ্যে সভার প্রায় সকল সদস্যই এসে পড়েছেন। সবার চোখে-মুখে কি যেন অব্যক্ত ক্ষোভ। আদিল সাহেব বুঝতে পারছেন। কিন্তু কিছুই বলছেন না।

সভাস্থলে হঠাৎ বাদলের প্রবেশ। নীরবতা ভেঙে সে বলে উঠল, আদিল ভাই, এজেন্ডাটি আমাদের। আপনি আমাদেরকে আমাদের মতো কাজ করতে দিন। বাধা দিবেন না দয়া করে।

বাদল পানিশ্বরের ছেলে। ঢাকা কলেজ থেকে হিসাব বিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে সম্মানসহ ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছে। ছাত্র রাজনীতির সাথে সরাসরি য্ক্তু। পানিশ্বর ছাত্র কল্যাণ পরিষদের নেতৃস্থানীয় মুখ।

আদিল সাহেব বললেন, ভাই, তুমি বস। দূর থেকে এসেছ। একটু বিশ্রাম নাও।

বাদলের চোখে-মুখে তখন পর্যন্ত বেশ অস্থিরতা। সে বলতে লাগল:

ভাই, আপনারা কি করবেন জানি না। ২০১৫ সালে আমাদের অনুষ্ঠানে মাননীয় সংসদ সদস্য রাস্তাটির নামকরণ করেছেন ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক’। শত শত মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সবাই হর্ষধ্বনিতে করতালিতে মুখরিত করেছিলেন সেদিনের পানিশ্বরের আকাশ-বাতাস। জাতীয় কবির প্রতি সকলের কি অনির্বাণ টান!

বাদল একটানা বলেই যাচ্ছিল। ওর কথা শেষ না হতেই উপস্থিত সকলে একযোগে বলে ওঠল, আমরা রাস্তার নামকরণের বাস্তবায়ন চাই। দু’একজনের বিরোধিতার কারণে এমন মহতী একটি আয়োজন ভেস্তে যেতে পারে না!

-‘সুপ্রিয় সভ্যবৃন্দ!’....

আদিল সাহেব দাঁড়িয়ে বলা শুরু করলেন, ‘আপনাদের আবেগের সাথে আমি সম্পূর্ণ একাত্মতা পোষণ করছি। তবে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আমরা এখন যদি কাজটি বাস্তবায়ন করতে চাই তবে এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশংকা রয়েছে। সবদিক বিবেচনা করে আমি আপনাদেরকে এই বিষয়ে আর অগ্রসর না হতে এবং ধৈর্য্যধারণের পরামর্শ দিচ্ছি।’

-বাদল বসে পড়ল। সকলে নীরব। এ নীরবতা ঝড়ের পূর্বে নি¤œচাপের মতো। কিন্তু ঝড় যেন না ওঠে সেই চেষ্টাটিই করে যাচ্ছেন আদিল সাহেব।

তিনি সেভ দ্য ভিলেজের জেনারেল সেক্রেটারীকে আলোচ্যসূচি অনুযায়ী সভার কাজ আরম্ভ করার জন্য অনুরোধ করলেন।

অভিজ্ঞ জেনারেল সেক্রেটারী প্রথমেই বিগত সভার কার্যবিবরণী সকলকে পাঠ করে শোনালেন। তারপর সকলের সম্মতিতে তা পাশ হল।

সেই সভার একটি সিদ্ধান্ত ছিল ২২ সেপ্টেম্বর এমপি সাহেব রাস্তার নামকরণ উপলক্ষে যে সভার করবেন তাতে সেভ দ্য ভিলেজ সার্বিক সহযোগিতা করবে।

এ সিদ্ধান্তের সূত্র ধরে সবাই আবার একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। আদিল সাহেব আবার ফ্লোর নিয়ে বললেন, দেখুন, আপনাদের মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমরা অসহায়। কিছুই করার নেই আমাদের। আর আমাদের সিদ্ধান্তটি ছিল একেবারেই এমপি সাহেবের উপর নির্ভরশীল। এখন তিনিই যদি অনুষ্ঠান করতে না চান তবে কি আমাদের কি করণীয় কিছু থাকে?’

-‘তা থাকে না বটে। তবে এমন কি কোন আভাষ পাওয়া গেছে’?

জানতে চাইলেন ভাইস চেয়ারম্যান জনাব আইয়ুব খান।

আদিল সাহেব বললেন, ধরে নিন পরিস্থিতি এরকমই!

সবাই যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল। আদিল সাহেবের দীর্ঘশ্বাস আরও দীর্ঘ হল।


বাদল সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ সে বাড়ি যাবে না। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক নামকরণ নিয়ে ২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত যতগুলো ঘটনা ঘটেছে সবই আদিল সাহেবের সাথে শেয়ার করবে।

জ্যোৎ¯œাভেজা রাত। আকাশে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। রাতের খাবার নামাজ শেষ করে উঠোন পেরিয়ে পুকুরের দক্ষিণ পাশে একটি পাটি বিছিয়ে বাদলকে নিয়ে বসলেন আদিল সাহেব। আকাশের দিকে আনমনে তাকিয়ে তিনি ভাবছেন, এত সুন্দর চাঁদেরও তো কষ্ট আছে যা ধরা দিয়েছে নজরুলের সঙ্গীতে-‘আমি চাঁদ নহি অভিশাপ.......’

এমনরাতে এসময়ে সবারই ঘুমিয়ে পড়ার কথা।

কিন্তু হঠাৎ মনে হল কিছু পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে যা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

-‘চোর না তো?’

বাদল নড়ে-চড়ে বসল।

আদিল সাহেব বললেন, না, আমাদের গ্রামে চোর আসবে কোথা থেকে?

-‘তাই? আপনাদের গ্রামে বুঝি চোর নেই!’-- বাদলের চোখে-মুখে রহস্যের হাসি!

কিছুক্ষণের মধ্যেই রহস্যের জট খুলে গেল। কুমিল্লা থেকে এসেছেন হোসেন সাহেব। আদিল সাহেবের সাথে কিছু কথা-বার্তা আর কাজ আছে। তাই নিজের বাড়ি না গিয়ে সোজা এখানে চলে এসেছেন। খবর পেয়ে তার সাথে গ্রাম থেকে এসে যুক্ত হয়েছে সোহেল, সিরাজ, শাকিল।

সবাই পাটিতে বসে পড়ল।

-‘আসলে পানিশ্বরের অনুষ্ঠানেই আদিল সাহেবের যাওয়া ঠিক হয় নি।’

হোসেন সাহেব এ কথা বলেই বাদলের দিকে তাকালেন।

বাদল রেগে গেল।

-কেন, তা হবে কেন? আদিল ভাই কি আপনাদের একার নাকি? তিনি আমাদের সবার প্রিয়। শিশু-কিশোর, ছাত্র-তরুণ সমাজ তার কাছ থেকে উৎসাহ অনুপ্রেরণা লাভ করে। বয়স্করাও তাকে পছন্দ করেন। পানিশ্বরের ছাত্রদের অনুষ্ঠানে উনি যাবেন না তো কে যাবেন?

হোসেন সাহেব বাদলের পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, রাগ করছ কেন?

-‘রাগ করব না কেন? অসভ্যদেরকে ধরে পেটানো দরকার। আপনাদের গ্রামে এমন জীবাণু আপনারা পোষেন কেমন করে? জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে আমাদের এলাকায় একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে, আর তাতে পাগলা কুত্তার মতো ঘেউ ঘেউ করছে জানোয়ারগুলা। ওরা কি চিনে কাজী নজরুল ইসলামকে? ওরা জানে জাতীয় কবি কি? ওরা কি জানে আমাদের এই বাংলাদেশ নাম কার দেয়া? স্বাধীনতার অন্তত পঞ্চাশ বছর আগেই কে অতি মমতার সাথে তাঁর সাহিত্যে বারবার বাংলাদেশ শব্দ ব্যবহার করেছেন? জয়বাংলা শব্দ কার ওরা কি তা জানে? ওরা কি জানে বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন হবার পরপরই কাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করেন?’

বাদল আরও কি যেন বলতে যাচ্ছিল। হোসেন সাহেব তাকে থামালেন। বললেন,

‘বাদল, আমার কাছে কিছু তথ্য প্রমাণ আছে যা দেখলে তুমি অবাক হবে ওরা জাতীয় কবি সম্পর্কে কি ধরনের অপপ্রচারণা চালাচ্ছে।’

বাদল বলল, ‘এ প্রমাণ আমার কাছেও আছে। আর এ জন্যেই তো আমার এখন মাথা গরম। অপরাধীদের শাস্তি হওয়া দরকার।

-‘আমার কাছেও কিছু প্রমাণ আছে।’

-‘আমার কাছেও আছে।’

-‘আছে আমার কাছেও।’

সোহেল, সিরাজ, শাকিলও বলে ওঠল।

বিষয়টি জানেন আদিল সাহেবও। কিন্তু বলতে চাইছিলেন না নানাবিধ কারণে।

-‘ভাই, এই দেখুন ওরা ফেইসবুকে জাতীয় কবি সম্পর্কে কি ধরনের অপপ্রচারণা চালাচ্ছে।’ বলেই বাদল ওদের ফেইসবুক স্ট্যাটাসের কয়েকটি স্ক্রিনশর্ট সবার সামনে তুলে ধরল।

চাঁদের জ্যোৎস্নার সাথে মোবাইলের আলো মিলিয়ে লেখাগুলো সবাই পড়ে নিল।

সবাই বাকরুদ্ধ।

মানুষ এত নীচে নামতে পারে? ওরা কি বাংলাদেশের মানুষ? বাংলাদেশের জাতীয় কবিকে নিয়ে ওদের এত এলার্জি কেন? ওদের কি ক্ষতি করেছেন কবি? যে কবির গান-কবিতা ছিল আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণশক্তি সেই কবিকে নিয়ে ওরা তুচ্ছ-তাচ্ছি¡ল্য করছে? প্রকারান্তরে তাঁর কবিতা-গান পুড়িয়ে ফেলার কথা বলছে? তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্রে কলংক আরোপ করছে?

সবার মুখে প্রতিবাদের ভাষা।


কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (কবিছাস) এর ২০১৫ সালের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের কথা আজ বারবার মনে পড়ছে আদিল সাহেবের। এলাকার ছাত্র-ছাত্রী তরুণ সমাজ তাকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তিনি সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন বিশেষ অতিথি হিসেবে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ যারা জাতীয় পর্যায়ে উচ্চতর অবস্থানে আছেন তাঁরা প্রায় সবাই ছিলেন এ অনুষ্ঠানে। বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু সাহেবও ছিলেন এ অনুষ্ঠানে। স্থানীয় সংসদ সদস্য অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে আদিল সাহেব তার বক্তব্যে একটি দাবী জানিয়েছিলেন। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এর বেড়তলা থেকে বিটঘর হয়ে পানিশ্বর পর্যন্ত সড়কটি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে নামকরণ করার জন্য তার এ দাবীর প্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য তা গ্রহন করেন এবং জনসমুদ্রের মাঝে ঘোষণা দেন যে, আজ থেকে এ সড়কের নামকরণ করা হল ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক’।

এ এলাকাটি একসময় কুমিল্লা জেলার অন্তর্গত ছিল। ১৯৮৪ সালে ব্রহ্মণবাড়িয়া জেলার আওতায় চলে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লাগোয়া মুরাদনগরের দৌলতপুরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথমা স্ত্রী নার্গিসের বাড়ি। তাঁর অনেক সৃষ্টি-স্মৃতি রয়েছে দৌলতপুরকে ঘিরে। নজরুলের মতো কর্মতৎপর মানুষ মাসের পর মাস দৌলতপুর থেকে এর আশেপাশের জায়গাসমূহে আসেন নি সেই কথাই বা বলি কি করে! কারণ সারা বাংলায় তিনি স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়েছিলেন। পরাধীন ভারতকে স্বাধীন করার জন্য তিনি বাংলার মাটি চষে বেড়িয়েছেন।

কথাগুলো এজন্যে আদিল সাহেবের বেশি বেশি মনে পড়ছে যে, বশির নামে একটি ছেলে ফেইসবুকে জাতীয় কবিকে তুচ্ছ¡-তাচ্ছি¡ল্য করে স্ট্যাটাস দিয়ে এমন কথাও লিখেছে যে, বেড়তলা কি নজরুলের আত্মীয়-স্বজন আছে নাকি যে তার নামে রাস্তার নামকরণ করতে হবে?

আদিল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আর আনমনে বলেন, নজরুলের আত্মীয় তো আমার সবাই। মানুষ মানেই নজরুলের আত্মীয়।

‘গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান।

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ অভেদ ধর্মজাতি

সবদেশে সবকালে ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।

নজরুল-বিদ্বেষী কুলাঙ্গারদের ফেইসবুক স্ট্যাটাসের স্ক্রিনশটের প্রিন্ট দিয়ে গেছে বাদল। সেগুলোর দিকে আদিল সাহেব বারবার চোখ বুলাচ্ছিলেন।

মাঝে মাঝে বাচ্চাদের কথাও মনে পড়ছে। সকাল থেকে এই নিশি রাত অবদি একবারও ফোনে খোঁজ নেয়া হয় নি ওদের। এতক্ষণে নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বাচ্চাদের একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, আমার জন্য মন খারাপ করো না। আমি তো দেশের সকল শিশুর মুক্তির জন্য, সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। তাই তোমাদেরকে ঠিকমতো সময় দিতে পারি না। এখন রাত। ঘুমিয়ে পড়। ঘুমের মধ্যে তোমাদের চুমু দিয়ে যাব।

হায় রে! কি মানুষ ছিলেন নজরুল। আগা-গোড়া সলিড মানুষ। কোন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নাই অপশক্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন। তখনকার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরাশক্তি ব্রিটেনকে তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। জেল খেটেছেন। সব ধরনের জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছেন। নিজে তাঁরই সম্পাদিত অর্ধ সাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকায় ১৯২২ সালের ১৩ অক্টোবর সর্বপ্রথম লিখিতভাবে ভারতের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। আর সেই মানুষটিকে আমরা এখন মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছি? ছি! ছি!

ভাবতে ভাবতে আদিল সাহেব বিছানা থেকে ধপাস করে ওঠে পড়লেন। পাশেই ছোট ভাই তাহের শুয়েছিল। ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলল, চিন্তা কইরেন না তো। আপনি বলেন, আমরা কাল রাস্তার উপর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম বসিয়ে দেই।

-‘না। কবিকে আমরা বিতর্কের বিষয় করতে পারি না।’

-‘ভাই, যে কয়েকটি লোক কবিকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিই।’

তাহেরের কথা শোনে আদিল সাহেব ওর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে থাকালেন। তিনি ভাবছেন, জাতীয় কবির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো তো রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ। জাতীয় প্রতীকসমূহের প্রতি অসম্মান জানানো কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

এর মধ্যে তার মনে পড়ছে রাজন দেবনাথের কথা। খুব ভাল একটি ছেলে। ফেইসবুকের মাধ্যমেই পরিচয়। অসাধারণ লিখে ছেলেটি। সত্যপ্রকাশে অদম্য সাহসী। আজই সে তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছে জাতীয় কবির স্বীকৃতি সংবিধানে দিতে হবে।

আদিল সাহেব ভাবছেন, তাই তো! আমাদের সংবিধানে তো বিষয়টি আসে নাই। শুধু তাই নয়। জাতীয় কবি সংক্রান্ত আলাদা কোন আইনও নেই। একটি দেশের জাতীয় কবির নাম সংবিধানে আসা আবশ্যক।

কিন্তু তাই বলে জাতীয় কবিকে নিয়ে বিষোদগার করবে? তাও আবার শিক্ষিত লোক হয়ে? প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে?

কি জানি?

সজনীকান্তরা তো শিক্ষিতই ছিল। মাত্র কয়েকটি লোক বাঙালির জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠে-পড়ে লেগে গেল। অথচ গোটা বাংলা নজরুলকে অন্তর থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করত। ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কবিকে কলকতার এলবার্ট হলে জাতীয় কবির সংবর্ধনা দিল। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু পরিস্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন, নজরুল একটা জ্যান্ত মানুষ। নজরুলের স্বপ্ন গোটা বাঙালি জাতির স্বপ্ন। আমরা যখন যুদ্ধে যাব নজরুলের গান গাইব। সব সময় নজরুল আমাদের অনুপ্রেরণা যোগাবেন। নজরুলের দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার গানকে শ্রেষ্ঠতম জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে অভিহিত করলেন। আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় সভাপতির বক্তব্যে জানিয়ে দিলেন, নজরুলকে ধারণ করতে পারলে প্রতিটি বাঙালি একেকজন মহামানবে পরিণত হবে।

সেই নজরুলকেও কিন্তু সজনীকান্তরা ছাড়েন নাই। শনিবারের চিঠিতে নজরুলকে গালাগালি করত।

সজনীকান্তরা বংশপরম্পরায় থাকবে এটিই স্বাভাবিক।

ভাবতে ভাবতে আবার শুয়ে পড়লেন আদিল সাহেব। মনের তন্ত্রীতে বাজছে নজরুলের গান:

‘নিশি ভোর হল জাগিয়া

পরাণ প্রিয়া.....


২০১৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর যেদিন জাতীয় কবির নামে সড়কে নামকরণ করা হয়েছিল সেদিন কেবল পানিশ্বর, বেড়তলা, বিটঘরই নয়, বরং বিভিন্ন এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে মুহুর্তের মধ্যেই দেশ-বিদেশে খবরটি ছড়িয়ে পড়েছিল।

বিকেলেই ফোন এল প্রথম আলোর সিনিয়র সাংবাদিক জাহাঙ্গীর শাহ কাজলের। অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানালেন। সেই সাথে স্মরণ করিয়ে দিলেন, এলাকার বিভিন্ন স্থাপনা, ছোট-খাট রাস্তা কবির বিভিন্ন গ্রন্থের নামে করে ফেলার জন্য।

বড় মাপের মানুষ কাজল সাহেব। বন্ধু আদিল সাহেবকে তিনি প্রায়ই বলেন, ‘আপনার এলাকায় কবে নিয়ে যাবেন?’ ‘আপনার এলাকায় এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন যাতে সারা দুনিয়া অবাক হয়ে যায়। যেদিকে যে কেউ তাকাবে দেখবে নজরুলকে।’

তার বাড়ি নরসিংদির রায়পুরায়। তারপরই ভৈরব। ভৈরবের সন্তান এবং প্রথম আলোর আরেক প্রথিতযশা সিনিয়র সাংবাদিক ফখরুল ইসলাম হারুণও আদিল সাহেবকে নজরুল চর্চায় দারুণ উৎসাহ দিয়ে থাকেন।

এমপি সাহেব সড়কের নামকরণের ঘোষণা দেয়ার পর আদিল সাহেব সেভ দ্য ভিলেজের সভা আহŸান করলেন। তিনি জানালেন, ইউনিয়ন পরিষদে একটি লিখিত প্রস্তাব পাঠানো দরকার।

-‘নামকরণ তো হয়েই গেছে। আবার লিখিত প্রস্তাব কেন?’

জেনারেল সেক্রেটারি শাহ আলী সাহেব জানতে চাইলেন।

-‘লাগবে। কিছু আনুষ্ঠানিকতা আছে।’ বললেন আদিল সাহেব।

-‘আমার জানামতে এলাকায় যত রাস্তাঘাটের নামকরণ হয়েছে কেউ কোন নিয়ম কানুনের ধার ধারে নাই। কারো সাথে কেউ আলোচনাও করে নাই। নিজের টাকায়ও করে নাই......

থামুন। আমরা সবই জানি। এই বলে দপ্তর সম্পাদককে থামিয়ে দিলেন আদিল সাহেব।

-‘অতএব আজকের সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরা পানিশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের নিকট লিখিত প্রস্তাবনা পাঠাচ্ছি যে, এই রাস্তার নামকরণ হবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে।’

আদিল সাহেব সভার সিদ্ধান্ত সবাইকে পাঠ করে শোনালেন।

সেভ দ্য ভিলেজের সদস্য তৌহিদ মেম্বার লিখিত প্রস্তাবনা নিয়ে গেলেন পানিশ্বর ইউনিয়ন পরিষদে। পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম সাহেব সাদরে তা গ্রহণ করলেন। এরপরই পরিষদের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি পাস হয়।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে আদিল সাহেব ফোনে বিষয়টি জানিয়ে রেখেছেন। কারণ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বিষয়টি যাবে উপজেলা পরিষদে। তারাও যেন দ্রæত কাজটি করে দেন এই ছিল তার অনুরোধ। পরবর্তীতে তিনি একবার ফোনে জানিয়েছিলেন যে, কাজটি তারা করে দিয়েছেন।

তারপর থেকে মুখে মুখে প্রচলিত যে, এটি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক।

সেই সড়কেই একদিন দেখা হল বীর মুক্তিযোদ্ধা শাফি উদ্দীন সাহেবের সাথে। পিঠ চাপেেড় বললেন, ‘পুত্রা, একটা কাজের কাজ করেছ।’ বলেই তিনি চোখ মুছতে লাগলেন।

-‘কি হয়েছে তাঐ সাহেব?’ আদিল সাহেব তাকে হাত ধরে বাজারে একটি চায়ের দোকানে একসাথে বসলেন।

-দেখ, বাবাজি, আমরা তো গুণী লোকের কদর কম বুঝি। একাত্তর সালে যখন দেশের স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করেছি তখন নজরুলের গান ছিল আমাদের অনুপ্রেরণা। আমার সহযোদ্ধা তোমার ভাই লিয়াকত আলী আজ বেঁচে থাকলে আরও বলতে পারত। দুর্গম গিরি গানটি বেজে ওঠলে আমরা কেউ বসে থাকতাম না। উঠে দাঁড়িয়ে জাতীয় পতাকাকে স্যালুট করতাম।’

বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদেই ফেললেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাফি উদ্দীন সাহেব।

-‘আমার নেতা বঙ্গবন্ধু তাঁকে চিনেছিলেন। আজ এই সড়কে দাঁড়িয়ে এই দুই মহান বাঙালিকেই খুব বেশি মনে পড়ছে।’

আরও কি বলতে চাইছিলেন তিনি। কিন্তু আবেগে তার চোখ-মুখ ভারী হয়ে আসছে।

আনোয়ারের চায়ের দোকানে একটি টিভি শোভা পাচ্ছে। চায়ের দোকানে টিভি থাকলে চা পানকারীদের সুবিধা হয়। সময় নিয়ে চা খায় আর টিভি দেখে। কিন্তু সহজে চেয়ার ছাড়তে চায় না। ফলে দোকানীর একটু অসুবিধাই হয়। তবুও আনোয়ার তা মেনে নিয়েছে। কারণ টিভি থাকার কারণে আদিল সাহেবের অনুষ্ঠানগুলো নিয়মিত দেখার সুযোগ হয়।

আদিল সাহেব বাংলাদেশে নজরুল চর্চায় একটি জোয়ার এনেছেন। টেলিভিশনে শত শত অনুষ্ঠান করে যাচ্ছেন। দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষ এসব অনুষ্ঠান দেখেন। তার এলাকার লোকজনও দেখেন। বিভিন্ন চায়ের দোকানে একসাথেও দেখেন অনেকেই।

চা চলছে। সেই সাথে টিভির দিকেও চোখ যাচ্ছে কারো কারো। যদিও এখন আদিল সাহেবের কোন অনুষ্ঠান হবার কথা নয়। তবে টিভির সংবাদের দিকেও অনেকের নজর। দেশ-বিদেশের কোথায় কি হচ্ছে তার খোঁজ-খবর আজকাল গ্রামের লোকজনও রাখেন।


বিটঘরের আয়াতুল্লাহ শাহের মাজারে ওরশ উপলক্ষে প্রতিবছরই বেশ লোকসমাগম হয়ে থাকে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গান-বাজনা থেকে আরম্ভ করে নানা ধরনের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে অনেক লোক।

উত্তর বেড়তলার একটি বিশেষ মহল্লার কিছু লোক এ আয়োজন কখনও মিস করে না। এ বছরও তারা গিয়েছে। তবে এবার তাদের নজর অন্যদিকে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে সড়কের নামকরণ ঠেকানোর জন্য তারা একটি ফন্দি বের করেছে। ‘মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসলে নজরুল-টজরুল কোথায় ভেসে যাবে’-এ মন্ত্র তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে তাদের থিংকট্যাংকখ্যাত বিজু আলী।

আদিল সাহেব ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন, মাননীয় এমপির অভিপ্রায় অনুযায়ী খুব শীঘ্রই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়কের নামফলক স্থাপন করা হবে, ঠিক তার পরদিনই বিজু আলী ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিল: ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে এই সড়কের নামকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

আদিল সাহেব বিজু আলীর এই স্ট্যাটাস দেখে চমকে উঠলেন। ছেলেটি বলে কি? তিন বছর আগে জনসম্মুখে সেটেলড একটি বিষয়কে নিয়ে তার এ কি ধরনের তামাশা!

সাথে সাথে তিনি ফেইসবুকে তাকে বিষয়টি মনে করিয়ে দিলেন। কিন্তু সে কোন রেসপন্স করেনি। তার কাছের অপর একজনকে তিনি মেসেঞ্জারে মেসেজ দিলেন। বিস্তারিত লিখলেন যাতে করে সে বিজু আলীকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে পারে। পরে তাকে ফোনেও বিষয়টি তিনি ব্রিফ করলেন। কিন্তু কোন কাজ হল না।

বেড়তলা উত্তর পাড়ার বিশেষ একটি বাড়ির এইসব লোক আজ বিটঘর এসে প্রথমেই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের খোঁজে বের করল। একসাথে তারা জলপান আর হাসি-তামাশা করে নিল। চেয়ারম্যান-মেম্বার সবাই তাদেরকে আশ্বাস দিল, আজই পরিষদের সভা করে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়কের প্রস্তাব পাস করা হবে।

-‘চেয়ারম্যান সাহেব, আপনি কিন্তু এমপি সাহেবের অনুষ্ঠানে ছিলেন এবং তিনি আপনাকেই দায়িত্ব দিয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়কের নামকরণ উপলক্ষে অনুষ্ঠান করার জন্য।’

একজন মেম্বার এ কথা সাহস করে বলেই ফেললেন, কারণ তিনি ২০১৫ এবং ২০১৮ এ দুটি অনুষ্ঠানেই ছিলেন। তাই তার কাছে এখন বেশ খারাপই লাগছে।

-‘আরে রাখ মিয়া!’ ধমক দিলেন চেয়ারম্যান সাহেব।

-‘জাতীয় কবির নামে সড়ক করে আমরা কি বিপদে পড়ব নাকি?’

চেয়ারম্যানের ধমক খেয়ে মেম্বার সাহেব যে একদম চুপ হয়ে গেলেন তা নয়। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা এই ইউনিয়ন পরিষদ কিন্তু ২০১৫ সালে সর্বসম্মতিক্রমে এই সড়কের নামকরণ করেছে ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক’। তার কি হবে?’

-‘জানি না। আমাদের কাজ আমরা করব। তাতে কার কি?’

বেড়তলার বিজুর ভাই বিটঘরের আরও কিছু লোককে ইতোমধ্যে ফোনে ডেকে এনেছে। তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল, ‘মিয়া সাহেবরা, এই রাস্তাটি যদি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে হয় তাহলে আপনারা খুশি হবেন না?’

কেউ কেউ মাথা নাড়াল। কেউ কেউ চুপ থাকল। ভাবতে লাগল, আচ্ছা! মুক্তিযুদ্ধে আমাদের গ্রামের বেশ কিছু লোক গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন। তাঁদের স্মরণে এই বিটঘরে স্মৃতিচিহ্নও নির্মাণ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কাজ করার সময় আদিল সাহেবই আমাদের জন্য বেশকিছু কাজ করেছেন। এখন আমরা এমন কিছু করছি না তো যা আদিল সাহেবকে কষ্ট দেবে? কারণ তিনি তো কখনও কারো অমঙ্গল চান না।

আবার কেউ কেউ এমনও ভাবছে, মহান মুক্তিযুদ্ধে বেড়তলা গ্রামের একজন লোকও তো শহীদ হন নি। তবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু যারা শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে রাস্তার নামকরণ করার জন্যে কাদাজল খেয়ে লেগেছে ওদের কারো মধ্যে তো মুক্তিযুদ্ধের ‘ম’-ও নেই। বরং ওদের বংশ, পেশা......

ওদের যে অন্য মতলব আছে তা বুঝতে কারোরই বাকি নেই। তবুও ইউনিয়ন পরিষদ তার ২০১৫ সালরে সদ্ধিান্ত বাতলি না করইে ২০১৮ সালে আরকেটি সদ্ধিান্ত নলি য,ে বড়েতলা-বটিঘর-পানশ্বির রাস্তার নামকরণ করা হল ‌শহীদ মুক্তযিোদ্ধাদরে নাম।ে

-বিজয় উল্লাসে বেড়তলার এই গুটি কয়েক লোক বাড়ি ফিরছে।

কাইছন হঠাৎ বলে উঠল-‘ভাই, সীতাহরণের উপর দিয়ে আসা যাওয়া করতে আমার কেমন যেন লাগে।’

তার এ কথার অর্থ ওরা সবাই বুঝে। তারপরও নিজেদের কিছুটা সামলে নেয় ওরা।

কাইছনকে ধমক দিয়ে লিকু বলল, ‘তুই এত কথা বলিস কেন?’ তোর জন্ম তো ঐ ঘটনার অনেক পরে। অতীত ভুলে যা।’

-‘কিন্তু চাইলেই কি অতীত ভোলা যায়?’ বলল জুলমত আলী।

জুলমত আলী নিজে দেখেছে সেই ঘটনা।

লিকু বলল, ‘দিন এখন আমাদের। গত নির্বাচনে কেমন করে মেম্বার হয়ে গেছিলাম দেখিস নি? এখনকার চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কেমন করে কাবু করে আসলাম দেখলি তো?’

জামুল বলল, ভাই, অনেকদিন ধরে আমি কিন্তু চেষ্টা করতেছি। মেম্বার, চেয়ারম্যান যে কোন একটি আমাকে হতেই হবে।

জুলমাত বলল, তুই তো দুধের শিশু থেকেই চেষ্টা শুরু করে দিলি! যাক, আশায় থাক। বিটঘর আমাদের হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আমরা বলতে পারতেছি।’

-আমাদের মাঝে কোন মুক্তিযোদ্ধা আছে নি?’- এ কথা বলে কাইছন হো হো করে হেসে উঠল।

-‘উল্টা-পাল্টা কথা বলবি না। এক চটকানা দেব।’ লিকু এবার তেড়ে এল কাইছনের দিকে। বলল, ‘সারাদিন তো ফেইসবুক লইয়া পইড়া থাকিস। লিখতে পারিস না, আমাদের বাপ-চাচা আসলে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হইছিল!’

লিকু কথাটি মন্দ বলে নি। কিছুদিন আগে ওদের সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তিটি এ ধরনে একটি পোস্ট দিয়েছিল। তবে বেশি সময় ধরে রাখতে পারে নি। মুছে দিয়েছিল নিজেই।

লিকুর কথায় কাইছন আজ থেকে পণ করল ফেইসবুককে সে নিজেদের কাজে লাগাবে।


প্রচন্ড হট্টগোল চলছে বেড়তলা উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভায়। লিকু এক পর্যায়ে সভা থেকে বের হয়ে গেল।

-‘আবার যদি আদিল সাহেবকে এই বিদ্যালয়ের কোন অনুষ্ঠানে আনা হয় তাহলে আমি পদত্যাগ করব।’ এই কথা বলতে বলতেই তার চলে যাওয়া।

প্রধান শিক্ষকের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠল। ‘রাম, রাম! একি বিপদের ঘনঘটা।’ চাকুরি করতে এসেছেন এখানে। সবার মন জুগিয়ে চলতে না পারলে বেসরকারী বিদ্যালয়ে টিকে থাকা মুশকিল।

তিনি দৌঁড় দিলেন। ততক্ষণে লিকু বাড়ি চলে গেছে।

-‘স্যার, বিনীত অনুরোধ, আপনি ফিরে আসুন। আপনার ইচ্ছার বাইরে আমরা কিছুই করব না।’

প্রধান শিক্ষকের মিনতি আর চাপাচাপাতি লিকু ফিরে এল। কিন্তু রাগে গোঁ গোঁ করছে।

পরিষদের একমাত্র মহিলা সদস্য তাঁর বক্তব্য অব্যাহত রেখেছেন। বলছেন, ‘এই বিদ্যালয়ে আমরা জায়গা দান করেছি বটে, কিন্তু বিদ্যালয়টি আজকে এ পর্যায়ে এসেছে কার প্রচেষ্টায়? অনেকের বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে এই বিদ্যালয়কে ২০০৯ সালে এমপিওভুক্ত করার ক্ষেত্রে কার অবদান সবচেয়ে বেশি? কে তার কাজ-কর্ম ফেলে বারবার ছুটে আসে এ বিদ্যালয়ে? বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাট করে দিয়েছে কে? কার মুখের কথা শুনে ছাত্র-ছাত্রীরা অনুপ্রাণিত হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর সবাই জানেন। কিন্তু আজ সেই ব্যক্তিকে বিদ্যালয়ে অবাঞ্চিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই।’

পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি এ বক্তব্যকে কেবল সমর্থনই করলেন না। তিনি চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘দেখ! আদিল আমার ছাত্র। তার মতো ভাল ছাত্র, ভাল ছেলে আমার শিক্ষকতা জীবনে পাইনি। যারা না বুঝে তার বিরোধিতা করছে তাদের সুমতি আসুক। বিদ্যালয়ে সে বারবার আসতে চাইবে। কারণ এটি তার নেশা। আর আমার যদি শক্তি থাকত তবে তার নামে আমি এলাকার বড় কোন স্থাপনার নামকরণ করতাম। তোমরা গুণীর কদর করতে শিখলে না!’

সেদিনের সভা কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হল।

বেড়তলা গ্রামে একটি উচ্চ বিদ্যালয় কিভাবে হল তা এলাকার সকলেই জানে। কিন্তু সকল সত্য সব সময় উদ্ভাসিত হয় না। মিথ্যার স্রোতে অনেক সত্যই আজ ভেসে যাচ্ছে।

বেড়তলা সেভ দ্য ভিলেজ মডেল পাঠাগারে বসে সে কথাই ভাবছিলেন হোসেন সাহেব। স্কুল প্রতিষ্ঠায় কার কি অবদান তা তিনি ভাল করেই জানেন। একসময় স্বেচ্ছাশ্রমে শিক্ষকতাও করেছেন এ বিদ্যালয়ে। আনোয়ার সাহেব টিন দিয়েছিলেন, শাহ আলী সাহেব বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে নিজে বাঁশ কেটে কাঁধে বোঝা বয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছেন। ছিদ্দিকুর রহমান স্যাররা স্কুলের জন্য জায়গা দান করেছেন। স্কুলটিকে এমপিওভুক্ত করার কাজে সাহায্য চাওয়া হয়েছিল সরাইলের কয়েকজন নেতার কাছে। তারা তা করেনি। বরং উল্টো কাজ করেছিল। বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের মহাসচিব অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজুর কাছে ছুটে গিয়েছিলেন আদিল সাহেব। যথেষ্ট সহায়তা তিনি করেছিলেন।

পাঠাগারে বসে আদিল সাহেবের জন্য অপেক্ষা করছিলেন হোসেন সাহেব। তার আজ পেছনের অনেক কথাই মনে পড়ছে। এই মডেল পাঠাগারটি আদিল সাহেবের প্রচেষ্টার ফসল। নানার কাছ থেকে তিনি দান হিসেবে পাঠাগারের জন্য জায়গা নেন। এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরির পেছনেও রয়েছে এলাকার বহু তরুণের শ্রম।

-‘আসসালামু আলাইকুম, কাকা।’ বলে হাসতে হাসতে ঢুকলেন আদিল সাহেব।

আদিল সাহেবের মুখের হাসি দেখে বোঝার উপায় নেই যে, তিনি কষ্টে আছেন কি সুখে আছেন। তার কথা হল, জাতীয় কবি সবসময় হাসিমুখে থাকতেন।

‘হাসি দিয়ে যদি লুকালে তুমি সারাজীবনের বেদনা

তবে আজও হেসে যাও, বিদায়ের বেলা কেঁদো না।’।

নজরুলের অমরবাণী তার অবলম্বন।

হোসেন সাহেব বললেন, পানিশ্বর ইউনিয়ন ছাত্রকল্যাণ পরিষদ একটি বিবৃতি দিয়েছে। এই নাও-বলে তিনি তা এগিয়ে দিলেন। আদিল সাহেব তা মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন:

“বিশেষ বিবৃতি

গত ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০১৫ ইং তারিখে পানিশ্বর ইউনিয়ন ছাত্রকল্যাণ পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী-২০১৫ অনুষ্ঠানে এক প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে বেড়তলা থেকে বিটঘর হয়ে পানিশ্বর দেওবাড়িয়া পর্যন্ত আন্ত:ইউনিয়ন সংযোগ সড়কটির নাম "জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক" নামকরণ করার ঘোষণা দেন ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব এড. জিয়াউল হক মৃধা এমপি। তিনি উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

তারই ধারাবাহিকতায় গত ০৮ই অক্টোবর ২০১৫ ইং তারিখে পানিশ্বর ইউনিয়ন পরিষদে তৎকালীন পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব নুরুল হক এর সভাপতিত্বে সকল ইউপি সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়, যা পরবর্তীতে বাস্তবায়নের জন্য রেজুলেশন উপজেলা পরিষদে এবং মাননীয় এমপি মহোদয়োর দপ্তরের পাঠানো হয়।

আপনারা সবাই অবগত আছেন যে, বেড়তলা থেকে বিটঘর হয়ে পানিশ্বর দেওবাড়িয়া পর্যন্ত আন্ত: ইউনিয়ন সংযোগ সড়কটির নাম " জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক" এবং সরাইল থেকে বিটঘর হয়ে পানিশ্বর পর্যন্ত সড়কটির নাম "শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়ক" নামকরণ করার জন্য পানিশ্বর ইউনিয়ন ছাত্রকল্যাণ পরিষদ কাজ করে যাচ্ছে।

সংগঠনের সদস্যদের একটি প্রতিনিধি দল গত ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং তারিখে মাননীয় এমপি মহোদয়ের সাথে দেখা করতে গেলে মাননীয় এমপি মহোদয় আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং তারিখ রোজ শনিবার রাস্তার নামফলকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করার নির্দেশ দেন এবং আরো অবহিত করেন উক্ত অনুষ্ঠানে সংগঠনের প্রস্তাবেই মাননীয় এমপি মহোদয় সরাইল-পানিশ্বর সড়কটির নাম "শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়ক" ঘোষণা করবেন।

মাননীয় এমপি মহোদয়ের নির্দেশে এবং উনার নির্ধারিত ২২শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ইং তারিখে "জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক" নাম ফলকের জাঁকজমকপ‚র্ণ ও জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করতে যাচ্ছে পানিশ্বর ইউনিয়ন ছাত্রকল্যাণ পরিষদ।

অত্র ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণের সার্বিক সহযোগিতা ও উপস্থিতি একান্ত কাম্য।


কার্যকরী সদস্যদের পক্ষে

সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক

পানিশ্বর ইউনিয়ন ছাত্রকল্যাণ পরিষদ। ”

হোসেন সাহেব পুরো সময়টিই আদিল সাহেবের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিলেন। চোখ তার ছল ছল করছে। বিবৃতিটি পড়া শেষ হলে হোসেন সাহেব বললেন, ‘পানিশ্বরের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রাণভরে দোয়া করছি। তাদের এই বিবৃতির পর আর কোন সমস্যা থাকার কথা না।’

কিন্তু আদিল সাহেব কি নিয়ে যেন চিন্তা করছেন। দৃষ্টি তার বাইরে। আনমনে দক্ষিণে কবরস্থানের দিকে তাকিয়ে আছেন।

-‘কি, কথা বলছ না যে?’ আদিল সাহেবের হাতে ঝাঁকুনি দিলেন হোসেন সাহেব।

এবার আদিল সাহেব মুখ খুললেন।

-‘কাকা, আজকের একটি ফোন আমার সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে।’ এই বলে তিনি হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেললেন।’

কান্না করা ভাল। অধিক শোকে মানুষ পাথর হয়ে যায়। আর তখনই বিপদ। সকল কষ্ট যদি কান্না হয়ে বেরিয়ে যায তবে কিছুটা রক্ষা। কিন্তু কষ্ট কি তাতে লাঘব হয়?

না। তবে কষ্টের চেহারাটা বদলায়।

আদিল সাহেব বললেন, ‘কাকা, ২০১৫ সালে সেটেলড হওয়া একটি বিষয়। ২০১৮ সালে এমপি সাহেব কেন অনুষ্ঠান করার কথা বললেন? হ্যাঁ, আমি বুঝি। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথেই কথাটি বলেছিলেন। তিনি চাইছিলেন যে, তার এলাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে যে সড়কটি হয়েছে তা বিশ্ববাসী জানুক।’

কিন্তু তা আর হল কোথায়? বরং এই কাজটি করতে গিয়ে এখন আদিল সাহেবকে নিয়ে কেউ কেউ এমন এমন কথা ফেইসবুকে লেখার সুযোগ পাচ্ছে যা ভাবতেও অবাক লাগে।

অবশ্য তা নিয়ে আদিল সাহেবের কোন আক্ষেপ নেই। তিনি বারবার হোসেন সাহেবকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘আচ্ছা কাকা! ওরা কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আপত্তিকর কথা কেন বলছে?’

হোসেন সাহেব বললেন, ‘আমি নিজেও বুঝতে পারছি না মানুষ এত নীচে নামে কি করে।’

‘আচ্ছা, তোমার চাকুরির কোন অসুবিধা হবে না তো?’ হোসেন সাহেব জানতে চান আদিল সাহেবের কাছে।

-‘কেন, কাকা?’

-ও মা, তুমি জান না, ওরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে যে, তুমি নাকি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সড়কের নামকরণের বিরোধিতা করছ’!

-‘কি বলেন, কাকা? কে কিসের বিরোধিতা করছে? আমরা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়কের বিরোধিতা করছি? এত বড় ভয়াবহ মিথ্যাচার? কে না জানে যে, ওরা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে অসম্মান ও অপদস্থ করার জন্য পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের মতো মহান একটি ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসছে? ওরা স্বাধীনতার কবিকে মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে!’

এই সব বলতে বলতে আদিল সাহেব দাঁড়ানো অবস্থা থেকে ঘাসের উপরই ধপাস করে বসে পড়লেন।

হোসেন সাহেব তাকে সান্ত¦না দিতে লাগলেন। বললেন,

‘এই যে দেখ, এলাকার সবাই চাচ্ছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক।’ এই বলে মেঘনা সমাজ কল্যাণ সমিতির একটি বিবৃতি তিনি আদিল সাহেবের হাতে দিলেন।

আদিল সাহেব নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে কাগজে চোখ বুলালেন।

মেঘনা সমাজ কল্যাণ সমিতির সভাপতি সামসুজ্জামান এবং সাধারণ সম্পাদক ডাঃ আব্দুল কুদ্দুস স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে পরিস্কারভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, তারা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আছে। তারা জাতীয় কবির কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক নামকরণের বাস্তবায়ন দ্রæত দেখতে চায় মর্মে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

আদিল সাহেব এ দু’জন লোকের প্রতি মনে মনে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। সেই সাথে সমিতির সকল সদস্যের প্রতিও তিনি মনে মনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ভাবতে তার ভাল লাগে যে, সত্যের পক্ষে বলিষ্ঠ অবস্থান নেয়ার মতো লোক আমাদের সমাজে এখনও আছেন।

আদিল সাহেবের মুখের দিকে হোসেন সাহেব তাকিয়ে ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বললেন, ‘মেঘনার মতো সেভ দ্য ভিলেজ কোন বিবৃতি দেবে না?’

আদিল সাহেব জবাবে বললেন, ‘এর সভাপতি আমি নিজে। আমি কেমন করে বিবৃতি দেই? তাছাড়া আমি তো চাই না কোন বিরোধে জড়াতে।’

হোসেন সাহেব বললেন, তোমার কথা বাদই দিলাম। এটি তো ব্যক্তিগত কোন বিষয় নয়। সংগঠনের বিষয়। সংগঠন কেন উদ্যোগ নেয় না?’

-‘জানি না।’ বলে আদিল সাহেব অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।



১০

রাজন দেবনাথের আজ বেড়তলা আসার কথা। সামনে দুর্গাপুজা। মূলত সেই নিমন্ত্রণ নিয়েই তারা আসার কথা রয়েছে। সে জেনেছে তার গুরু আদিল সাহেব বাড়ি এসেছেন।

ছেলেটির সাথে আদিল সাহেবের ফেইসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হলেও তা অনেকদূর বিস্তৃত হয়েছে। এখন মনে হয় দু’জনের মধ্যে কত যুগ-জনমের পরিচয়!

চারটার মধ্যেই হয় তো সে পৌঁছে যাবে। ইতোমধ্যে সে স্ট্যাটাস আপডেট করেছে-‘ক্রসিং বিশ^রোড মোড়; লিসেনিং নজরুল সং ‘বল রে জবা বল, কোন সাধনায় ফেলি রে তুই শ্যামা মায়ের চরণতল’।

নজরুল-পাগল বিশুদ্ধ একটি ছেলে রাজন। আদিল সাহেবের বাড়ি প্রবেশ করেই মুরুব্বীদের সালাম করে নিল। তারপর গুরুর সাথে কত কথা!

রাজন বলল, এইবারের পুজায় আপনাকে কয়েকটি নজরুল সঙ্গীত গাইতে হবে।

আদিল বললেন, নজরুলের গান গাইতে পারা তো ভাগ্যের ব্যাপার। নিশ্চয়ই আমি গাইব। তবে তুমি তো জান, আমি কণ্ঠশিল্পী নয়। তবুও আমি নজরুলের সৃষ্টিসমগ্র নিয়ে কাজ করি, কিছু বুঝার চেষ্টা করি। তার গান তো বাংলা সঙ্গীতে অমূল্য সম্পদ। তুমি বোধ হয় জান, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় বলে গেছেন, পৃথিবীতে বাংলা গান টিকে থাকবে নজরুলের গানের জন্যেই।’

-‘জি¦ গুরু। নজরুল বিষয়ক সাক্ষাতকার নামক একটি গ্রন্থে আমি মানবেন্দ্রের ঐতিহাসিক এ সাক্ষাতকারটি পড়েছি। অবশ্য আপনার কাছ থেকেই আমি বইটির খোঁজ পেয়েছিলাম’। এই বলে সে কৃতজ্ঞতার চোখে আদিল সাহেবের দিকে তাকাল।

আদিল সাহেব বললেন, দেখ, পৃথিবীতে তাঁর মতো দ্বিতীয় আর একজন কবি পাবে না যিনি সকল মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠতম সাহিত্য নিদর্শন রেখে গেছেন, যিনি বিশে^র সকল মানুষকে মুক্তির নিশানা দিয়ে গেছেন। আমার একটি লেখায় আমি একজনের একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছিলাম। আজ তোমাকে তা শুনাচ্ছি:

‘Nazrul will be found wherever poetry has been used to fight against oppression…..his appeals were general…’

Sampling the poetry of Nazrul: William Race, Nazrul: An Evaluation, Nazrul Institute (2000), page 102

অর্থাৎ নিপীড়নের বিরুদ্ধে যেখানেই কবিতা ব্যবহৃত হবে, সেখানেই নজরুলকে দেখা যাবে।.....আসলে তাঁর আবেদন সর্বজনীন।


রাজন বলল, আচ্ছা গুরুজি, আপনাদের গ্রামের ঐ গুটি কয়েক লোক কি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানে না? ওরা কি জানে না, নজরুল না এলে ভারত হয় তো পরাধীনই থেকে যেত? ওরা কি জানে না, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা ছিল নজরুলের গান?’

-‘শোন, ঘুমন্ত মানুষকে জাগানো যায়। কিন্তু যারা ঘুমের ভাণ করে থাকে তাদের তুমি জাগাতে পারবে না। ওরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে নজরুলের বিরুদ্ধে লেগেছে। আর সেই সাথে লেগেছে আমার বিরুদ্ধেও।’

আদিল সাহেবের এ কথা শোনে হতোদ্যম হল রাজন।

দু’জনের মধ্যে যখন কথা চলছিল ঠিক তখনই দেখা গেল হোসেন সাহেব আসছেন। দূর থেকেই হাতের ইশারায় সালাম বিনিময় হল।

হোসেন সাহেব এসেই আদিল সাহেবকে হাত ধরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, ‘কই, সেদিনের ফোনের বিষয়টি তো আর বললে না!’

আদিল সাহেব ইচ্ছে করেই বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তবুও হোসেন সাহেবের পীড়াপীড়িতে আজ কেবল এটুকুই বললেন যে, যিনি সড়কটিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি এখন আর তার আগের সিদ্ধান্তে থাকতে পারছেন না। ফোনে তিনি সরি বলেছেন।

এ কথা শোনে হোসেন সাহেবের মাথায় যেন বজ্রপাত হল। রাজনও হতভম্ব হয়ে গেল।

তাহলে কেন আমাদেরকে পথে নামানো হল?

কেন?

কেন?

এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মধ্যে। এলাকার প্রায় সকলের মধ্যে।


১১

আজ রাত অমাবস্যার। নিকষ কালো অন্ধকার চারিদিকে। প্রকৃতি যেন কালো সামিয়ানা বিছিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর উপরে।

রাতের পোকারা প্রতিযোগিতা করে ডাকছে। দূর থেকে দু’একটি কুকুরের ঘেউ ঘেউ শোনা যাচ্ছে। কাছে ঝোঁপ-ঝাড় থেকে জোনাক পোকার আলো ক্ষণে ক্ষণে দেখা যাচ্ছে। আলো বলতে এই যা। বিদ্যুৎ চলে গেছে। আজ রাতের শেষ দিকে হয়তো আসতে পারে-এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এর মাঝেই পুকুর পাড়ে আদিল সাহেবের সাথে বসা তাহের, কামরুল, নাঈম, রাজন, হোসেন সাহেব বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে।

আদিল সাহেব বললেন, আমাদের বাড়ি থেকে ঠিক দক্ষিণ দিকে দৌলতপুর গ্রাম যেখানে কাজী নজরুল ইসলাম কয়েক মাস বসবাস করেছেন। এ গ্রামের নার্গিসের সাথেই বিয়ে হয় কবির। যদিও সেই বিয়ের পর বাসর রাতেই কবি বিশেষ কারণে চলে গিয়েছিলেন।

সবাই আদিল সাহেবের কথা শুনছিলেন। তাহের বলল, ‘নজরুল আমাদের কেবল জাতীয় কবিই নন। তিনি আমাদের এলাকার জামাই-ও।’

-‘অবশ্যই। শুধু তাই নয়, তাঁর সাহিত্যে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আঞ্চলিক ভাষারও ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তাঁর অনেক বিখ্যাত রচনার সাক্ষী আমাদের মাটি।’ বললেন আদিল সাহেব।

হোসেন সাহেব বললেন, ‘যারা আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সগড়কের বিরোধিতা করছে, তারা কিন্তু নজরুলের বিয়ে নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্রে কালিমা লেপনের অপচেষ্টা করছে। এর কিছু নমুনা আমি ইনবক্সে আদিল সাহেবকে পাঠিয়েছি।’

আদিল সাহেব বিষয়গুলো দেখেছেন। তিনি বললেন, দেখুন, নজরুলের মতো সচ্চরিত্রের মানুষ অত্যন্ত বিরল। তাঁর বিয়ে নিয়ে দু’এক কথায় মন্তব্য করা সম্ভব না। শুধু এইটুকু বলি, বিয়ের পর তাঁকে ঘরজামাই হওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। তাঁর মতো স্বাধীনচেতা বিদ্রোহীর পক্ষে এমন অপমানজনক প্রস্তাব মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। তিনি তখনই তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী নার্গিসের হাত ধরে বলেছিলেন, চল আমরা বেরিয়ে পড়ি। এ বাড়িতে থাকা যাবে না। কিন্তু নার্গিসের পক্ষে কবির হাত ধরে বের হয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। অবশ্য যুক্তি নার্গিসের পক্ষেও আছে। সেই যুগে একটি মেয়ের পক্ষে এভাবে বের হয়ে যাওয়ার হয় তো সুযোগ ছিল না।’

আদিল সাহেবের কথা শেষ হলে কামরুল বলল, ‘ভাই, যারা আজ নজরুলের বিরুদ্ধাচারণ করছে এদেরকে যদি এই বিষয় আমরা বুঝিয়েও বলি তবুও ওরা তা কানে নিবে না। কারণ ওরা আসলে নজরুলকে সহ্য করতে পারে না।’

নাঈম বলল, ‘ভাই, মন খারাপ করবেন না তো। শয়তান যদি কাউকে ভাল বলে তাহলে বুঝতে হবে কেমন ভাল মানুষ তিনি। নজরুলের সংগ্রাম ছিল শয়তানের বিরুদ্ধে। সুতরাং শয়তান তো জ্বলবেই। বাদ দেন এ সব। আসুন আমরা কাজে মন দিই।’

ঠিক বলেছে রাজন। বিশেষ একটি কাজের জন্যেই এই রাতে এখানে বসা। ততক্ষণে আদিল সাহেব পাশে রাখা মোবাইল ফোনটি হাতে নিলেন। সবাইকে দেখালেন ফেইসবুকে গড়ে তোলা তার ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক’ গ্রæপ পাতাটি।

গ্রæপটি তিনি খুলেছিলেন জাতীয় কবির নামে সড়কের নামকরণকে বিশ্বাবাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য। বিশ্বের মানুষ দেখবে, গোটা মানুষের মুক্তির জন্য বাংলার জমিনে যে মহামানবকে আল্লাহ পাক পাঠিয়েছিলেন তাঁর আদর্শ-চেতনা ছড়িয়ে পড়ছে আনাচে-কানাচে।

এই গ্রæপকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নজরুলভক্তরা, মানবপ্রেমিকরা। ফ্রান্স থেকে খোরশেদ পাটোয়ারী সাহেব প্রতিনিয়ত খবর রাখছিলেন। অনুষ্ঠানের দিন যতই ঘনিয়ে আসছিল ততই যেন তার মধ্যে আনন্দের উত্তেজনা হু হু করে বাড়ছিল।

মহান এই নজরুল অনুরাগীর সাথে আদিল সাহেবের দেখা হয়েছিল প্যারিসে। কেবল দেখা হয়েছিল বললে ভুল হবে। আদিল সাহেব সেইবার সপরিবারে ইউরোপ সফরে গিয়েছিলেন। তার সফরসূচির মধ্যে প্যারিসকে তিনি যুক্ত করেছিলেন কেবল পাটোয়ারী সাহেবের সাথে দেখা করার জন্য। তাদের দু’জনের মধ্যে পরিচয়, বন্ধুত্ব আর আন্তরিকতার একমাত্র যোগসূত্র কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল প্রেমের এ বন্ধন যে কত সুদৃঢ় ও আবেগঘন হতে পারে তা সেদিন প্যারিস বিমান বন্দরে আদিল সাহেবের পরিবারের সদস্যবৃন্দ প্রত্যক্ষ করেছেন। কেউ কাউকে কোনদিন দেখেনি। কেবল ফেইসবুকে নজরুল বিষয়ক আলাপচারিতা। প্যারিস বিমান বন্দরে আদিল সাহেবদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য তিনি চলে আসেন। কিন্তু তথ্যগত বিভ্রাটের জন্যে আদিল সাহেবদের খুঁজে পেতে তার বেশ সময় লেগেিেছল। নতুন দেশ। নতুন জায়গা। অপরিচিত মানুষ। ফোনেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। আর কত সময় অপেক্ষা! মিসেস আদিল খানিকটা অধৈর্য্য হয়ে পড়ছিলেন। কিছুটা ভয়ও কাজ করছিল। তিনি বারবার বলছিলেন, চল আমরা অন্যন্য দেশে যেমনটি করেছি এখানেও তাই করি। অর্থাৎ বুকিং ডট কম থেকে হোটেল ঠিক করে ওঠে পড়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন মিসেস আদিল।

কিন্তু আদিল সাহেব তা করেননি। তিনি বারবার বলছিলেন, পাটোয়ারী সাহেবের সাথে আমার সম্পর্ক নজরুলকেন্দ্রিক। যারা নজরুলের সন্ধান পেয়েছেন তার বিশুদ্ধ মানুষ। নিশ্চয়ই পাটোয়ারী সাহেব আসবেন। আমরা অপেক্ষা করি।

এইসব বলে আদিল সাহেব বিমান বন্দরের বাইরে পায়চারি করছিলেন। অনেক্ষণ পর হঠাৎ দেখা গেল, দূর থেকে একজন লোক দৌঁড়ে আসছেন। তবে কি তিনিই পাটোয়ারী সাহেব? তিনিও একটু একটু করে অগ্রসর হলেন। মোটামুটি নিশ্চিত হলেন ইনিই পাটোয়ারী সাহেব। এবার আদিল সাহেব তার দিকে দৌঁড় দিলেন। তারপর দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরলেন। কত কথা, কত আবেগ, কত উচ্ছ¦াস! নজরুলের দুই প্রেমিকের আবেগ-উচ্ছ্বাসের সাক্ষী হয়ে আছে প্যারিসের আকাশ-বাতাস।

সেই পাটোয়ারী সাহেব জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়কের খোঁজ নিবেন না-এটি কি ভাবা যায়?

কিন্তু আজ যখন ফেইসবুক গ্রæপে আদিল সাহেব লিখবেন, অনিবার্য কারণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়কের নামকরণ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না, তখন কেমন লাগবে প্যারিস প্রবাসী খোরশেদ পাটোয়ারী সাহেবের, কেমন লাগবে ইয়াকুব আলী খান, জোসেফ কমল রড্রিক্স, করিম হাসান খান, হাজী রফিক সুলায়মানের মতো ব্যক্তিত্বদের? কেমন লাগবে অগণিত নজরুল ভক্তের?

কিন্তু তবুও যে তা লিখতে হবে আদিল সাহেবকে। কেননা, আজই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান তাকে ফোন করে জানিয়েছেন যে, সড়কটির নাম তারা শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করে দিয়েছেন।

হোসেন সাহেব বললেন, এলাকায় কতজনের নামে কত রাস্তার নাম আছে সেইসব নিয়ে হারামজাদারা কোনদিন টুঁ শব্দটিও করেনি। কেউ কারো কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে সেই সব নাম দিয়েছে বলেও মনে হয় না। অথচ আজ কেবল জাতীয় কবির নামটি মুছে দেয়ার জন্য শয়তানগুলো ওঠে-পড়ে লেগেছে!

আদিল সাহেব বললেন, যারা নজরুল এবং মুক্তিযুদ্ধকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে ওরা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কোন ধারণা রাখে না। যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে তারা জয় বাংলা স্লোগান/ দিয়ে করেছে। বঙ্গবন্ধু জয় বাংলা শব্দযুগল নজরুল সাহিত্য থেকে নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনসম্মুখে বহুবার বিষয়টি বলেছেন। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাঁরা নজরুলের অমর গান থেকে শক্তি সঞ্চয় করেছেন, যেমন- দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুন্তর পারবার, এই শিকল পরা ছল আমাদের এই শিকল পরা ছল, চল চল চল, কারার ঐ লৌহ কবাট ভেযে ফেল কর রে লোপাট ইত্যাদি।

আদিল সাহেব আরও বলেন, তোমরা কি সত্তরের সেই সিনেমাটি দেখেছ? জীবন থেকে নেয়া? নজরুলের কারার ঐ লৌহ কবাট ভেযে ফেল কর রে লোপাট গান গেয়ে কিভাবে মাহন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছিল বাংলার আপামর জনগণ!

দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু তো আর এমনি এমনি নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন নি! তিনি পরিস্কার ভাষায় বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন:

‘বাঙালির স্বাধীন জাতিস ঐতিহাসিক রূপকার হলেন কাজী নজরুল ইসলাম।’

এসব বলতে বলতে আদিল সাহেবের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমরা হারিনি। নজরুল হারে না। নজরুলের নামে এলাকার রাস্তার নামকরণ করতে পারলে এই এলাকা ধন্য হয়ে যেত। যারা এর বিরোধিতা করেছে তাদের প্রতি আমরা তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা প্রকাশ করছি। আমাদের কাজ থেমে থাকবে না। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক গ্রæপটি নিবেদিত থাকবে নজরুল চর্চায়, যদিও আমাদের আরেকটি গ্রæপ আছে নজরুল স্টাডি সেন্টার নামে। প্রিয় কবির নামে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে যা কিছু আছে সেই সব তথ্য-উপাত্ত থাকবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক গ্রুপে। এ কাজে সময় ও শ্রম নিবেদন করার জন্য আমি সকলের প্রতি আহŸান জানাচ্ছি।’

আদিল সাহেবের কথায় সায় দিলেন সবাই।

তারপর সবাই রওনা করলেন সেই রাস্তার দিকে যার বুকে জয়টিকা লাগার কথা ছিল। সবাই দেখত অতুলনীয় একটি নামফলক ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক’। সেটি হয় নি তো কি হয়েছে? নজরুল থাকবেন সবার হৃদয়ে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে তারা হাঁটছেন। দু’তিন মিনিট হাঁটলেই বেড়তলা বাজার। বাজারের মসজিদ থেকে কান্নার মতো অস্ফূট ধ্বনি ভেসে আসছে।

তারা কান পেতে রইলেন।

কে যেন গুণ গুণ করে বলছে আর অঝোর ধারায় কাঁদছে:

‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই.

যেন গোরে থেকেও

মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই..

আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজীরা যাবে,

পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি

এ বান্দা শুনতে পাবে।

গোর আজাব থেকে এ গুণাহ্গার পাইবে রেহাই।


কত পরহেজগার খোদার ভক্ত, নবীজীর উম্মত..

মস্জিদে করে রে ভাই কোরান তেলাওয়াৎ।

সেই কোরান শুনে যেন আমি পরান জুড়াই।

কত দরবেশ ফকির রে ভাই মস্জিদের আঙিনাতে..

আল্লার নাম জিকির করে লুকিয়ে গভীর রাতে।

আমি তাদের সাথে কেঁদে কেঁদে

নাম জপতে চাই।

আল্লার নাম জপতে চাই।

আল্লার নাম জপতে চাই....

কে এই মানুষটি তা জানতে সবারই কৌতুহল হচ্ছে। আস্তে আস্তে মসজিদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তারা। অন্ধকারে কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। চন্দ্রিমা রাত হলে বুঝা যেত। তবে মহাসড়কে গাড়ি এলে তার আলোতে হয় তো চেনা যাবে তাকে।

কিন্তু একজন সাধকের সাধনায় ব্যাঘাত হতে পারে সেই বিবেচনায় আদিল সাহেব সবাইকে আস্তে আস্তে বললেন, এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না। পৃথিবীর আনাচে কানাচে এমন বহু মানুষ আছেন যাদের সাধনার অবলম্বন দিয়ে গেছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

তার আস্তে করে সেখান থেকে সরে গেলেন। রাজন বলল, গুরুজি,গভীর রাতে আমি কাজীদার একটি গান বারবার শুনি। যদি বলেন, এখন শুনাতেও পারি।

সবার মৌন সম্মতি পেয়ে সে গান ধরল:

নিশি ভোর হলো জাগিয়া, পরান-পিয়া

কাঁদে ‘পিউ কাহাঁ’ পাপিয়া, পরান-পিয়া।।

ভুলি’ বুলবুলি-সোহাগে

কত গুল্বদনী জাগে

রাতি গুলশানে যাপিয়া, পরান-পিয়া।।

জেগে রয়, জাগার সাথী

দূরে চাঁদ, শিয়রে বাতি

কাঁদি ফুল-শয়ন পাতিয়া, পরান-পিয়া।।

গেয়ে গান চেয়ে কাহারে

জেগে র’স কবি এপারে

দিলি দান কারে এ হিয়া, পরান-পিয়া।।

সবাই আনমনে শুনছিল রাজনের গাওয়া ঐশ্বরিক প্রেমের অমর এই নজরুল সঙ্গীতটি।


রাত দ্বি-প্রহর অতিক্রম করে গেছে। কোথাও কেউ নেই। সবাই ঘুমের ঘোরে। এর মাঝেই এ ক’জন নজরুল ভক্ত তাদের হৃদয়ের সকল আকুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বেড়তলা থেকে বিটঘরের দিকে নেমে যাওয়া মফস্বলের এই সড়কটির উপর। মোবাইলের অডিও প্লেয়ারে বাজছে নজরুলের আকুতি:

আমি চিরতরে দূরে চলে যাব

তবু আমারে দেব না ভুলিতে

আমি বাতাস হইয়া জড়াইব কেশ

বেণী যাবে যবে খুলিতে।।


তোমার সুরের নেশায় যখন

ঝিমাবে আকাশ কাঁদিবে পবন

রোদন হইয়া আসিব তখন

তোমার বক্ষে দুলিতে।।


আসিবে তোমার পরমোৎসব-

কত প্রিয়জন কে জানে,

মনে প’ড়ে যাবে কোন্ সে ভিখারি

পায়নি ভিক্ষা এখানে।

তোমার কুঞ্জ-পথে যেতে হায়

চমকি’ থামিয়া যাবে বেদনায়

দেখিবে কে যেন ম’রে মিশে আছে

তোমার পথের ধূলিতে।।

------------


০৪ অক্টোবর ২০১৮, ঢাকা



Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page