top of page

ডঃ আনিসুজ্জামান এবং বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক নজরুল-রবীন্দ্র চর্চা


*বাংলাদেশে নজরুলের নামে বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১টি

*রবীন্দ্রনাথের নামে আছে ৩টি

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডঃ আনিসুজ্জামান ১৪ মে ২০২০ খ্রিঃ তারিখ মোতাবিক ২০ রমজান ১৪৪১ হিজরি বিকাল ৪ টা ৫৫ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, রবীন্দ্র সংগঠক ও গবেষক হিসেবে তিনি স্বনামে সুপরিচিত। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর নাম অমর হয়ে থাকবে। বিশেষ করে বাংলাদেশে রবীন্দ্র চর্চায় তাঁর অবদান তুলনাবিহীন। সদ্যপ্রয়াত ডঃ আনিসুজ্জামান এর স্মৃতির প্রতি পরম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বাংলাদেশে রবীন্দ্র চর্চায় তাঁর অবদান নিয়ে আমার সীমিত ধারণা নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করব। প্রাসঙ্গিকভাবে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক নজরুল চর্চা সম্পর্কে খানিকটা আলোচনা হতে পারে।

প্রথমে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে ডঃ আনিসুজ্জামানের স্মৃতিচারণ পত্রস্থ করছি:

“নজরুল ইসলামকে ঢাকায় নিয়ে আসা হলো ১৯৭২ সালের ২৪ মে। উদ্ যোগটা সম্পূর্ণতই বাংলাদেশ সরকারের। কলকাতা থেকে যাঁকে তাঁরা সঙ্গে কিরে নিয়ে এলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় ছিল আমাদের বন্ধু মোস্তফা সারোয়ার। বিমানবন্দরে এবং তাঁর জন্য বরাদ্দ বাড়িতে বিপুল জনসমাগম হয়েছিল। পরদিন তাঁর জয়ন্তীও পালিত হয়েছিল জাঁকজমকের সঙ্গে। সরকারিভাবে কথাটা না বলা হলেও সবাই জানত যে, তিনি পাকাপাকিভাবেই এখানে থেকে যাবেন। তবু দ্রুত তাঁকে দেখার জন্যে মানুষের ছিল অদম্য উৎসাহ। সে-যাত্রা আমি আমি তাঁকে দেখতে যেতে পারিনি। বস্তুতপক্ষে তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম বেশ দেরিতে, তাও বেশিক্ষণ থাকিনি—আমার খুব অস্বস্তিবোধ হচ্ছিল। যদিও কলকাতায় অসুস্থ কবিকে দেখতে গিয়েছি একাধিকবার, এবারে খারাপ লাগছিল বেশি। সে কি আমার অনুভূতি আগের চেয়ে তীক্ষ্ণ হয়েছে বলে, না তাঁকে দেখার কৌতূহল আগেই মিটে গিয়েছিল বলে? কলকাতায় একবার দেখেছি তাঁকে একান্তে—পারিবারিক পরিমণ্ডলে, আরেকবার বহুজনের মধ্যে—জন্মোৎসবের উদ্দীপনায়। এবারে উপলক্ষ ছাড়াই অনেক অনুরাগীর দলভুক্ত হয়ে তাঁকে দেখলাম। এখানে তাঁর প্রাণধারণের উপকরণ উন্নত হয়েছে বটে, কিন্তু পারিবারিক পরিবেশ-রচনার প্রয়াস তত সফল হয়নি। পরে তাঁর জন্মদিনে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর সম্পর্কে কিছু বলার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। কিন্তু যেভাবে সেদিন গাড়ি থেকে টেনে-হিঁচড়ে তাঁকে বাংলা একাডেমির সভামঞ্চে তোলা হয়েছিল, তা দেখার বেদনায় আমার সৌভাগ্যলাভের আনন্দ ম্লান হয়ে গিয়েছিল।” (বিপুলা পৃথিবী, ডঃ আনিসুজ্জামান)

১২ খণ্ডে প্রকাশিত নজরুল-রচনাবলী বাংলা একাডেমির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে অগ্রগণ্য। ঐতিহাসিক এই কাজটি শুরু করেছিলেন নজরুল-স্নেহধন্য ও নজরুল-বিশেষজ্ঞ কবি আবদুল কাদির। তাঁর সম্পাদনায় পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় বাঙলা উন্নয়ন বোর্ড থেকে ‘নজরুল-রচনাবলীল তিনিটি খণ্ড প্রকাশিত হয় (১৯৬৬, ৬৭, ৭০)। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কেন্দ্রীয় বাঙলা উন্নয়ন বোর্ড বাংলা একাডেমির সাথে একীভূত হলে বাংলা একাডেমি থেকে আবদুল কাদির কৃত নজরুল-রচনাবলীর অবশিষ্ট চতুর্থ খণ্ড (১৯৭৭) এবং পঞ্চম খণ্ডের প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধ ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর কবি আবদুল কাদিরের মৃত্যু হলে নজরুল-রচনাবলীর কাজে ভাটা পড়ে। ১৯৯৩ সালে নতুন সম্পাদকমণ্ডলীর সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি থেকে ‘নজরুল-রচনাবলী’ সংশোধিত ও পরিবর্তিত হয়ে চার খণ্ডে নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ‘নজরুল-রচনাবলী’র এই সম্পাদনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন ডঃ আনিসুজ্জামান। পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি ‘নজরুল-রচনাবলী’র জন্মশতবর্ষ সংস্করণ প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং নতুন সম্পাদনা পরিষদের ওপর এই কাজের দায়িত্বভার অর্পণ করে। ডঃ রফিুকুল ইসলামকে এ সম্পাদনা পরিষদের সভাপতি করা হয়।

২০১২ সালে ডঃ আনিসুজ্জামান বাংলা একাডেমির সভাপতি নিযুক্ত হন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ পদে আসীন ছিলেন। তিনি সবচেয়ে বেশি সময় ধরে এ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এর আগে ২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে এবং ডঃ রফিকুল ইসলামকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে।

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক রবীন্দ্র চর্চা সম্প্রসারণে ডঃ আনিসুজ্জামানের অবদান অপরিসীম। বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে তিনি পাঁচ খণ্ডে রবীন্দ্রজীবনী প্রকাশের উদ্যোগ নেন। তাঁর সময়ে বাংলা একাডেমি চত্ত্বরের নামকরণ করা হয় রবীন্দ্র চত্ত্বর। এই শিক্ষাবিদের দায়িত্বপালনকালে বাংলা একাডেমির কাজ-কর্মে ব্যাপক গতি আসে। নানা অনুষ্ঠানে মুখর থেকেছে বাংলা একাডেমি। তাঁর সময়ে ২০১৫ সালের ৩ ডিসেম্বর মহাজাঁকজমকের সাথে বাংলা একাডেমির ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হয়। এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ প্রতিবেদনের অংশ প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এখানে পত্রস্থ করা হল:

“বৃহস্পতিবার (৩ ডিসেম্বর) গোটা দিনটাই ছিলো বাংলা একাডেমির। প্রতিষ্ঠার ছয় দশক পূর্তিতে হীরক জয়ন্তী উৎসবের আয়োজন করে বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক হয়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠানটি। কে না এসেছেন এদিন বাংলা একাডেমিতে! ভারতের চেন্নাইয়ের বিশিষ্ট লেখক-গবেষক ভি. বি গনেশন, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতি শাঁওলী মিত্র, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলকাতার সভাপতি বারিদবরণ ঘোষ ছিলেন উৎসবে। আর এপারের কবি-লেখক হিসেবে পরিচিত সব মুখতো ছিলেনই।

বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম শিল্প-সাহিত্যপ্রেমী বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও এসে স্মৃতি রোমন্থন করেছেন। উৎসবের বিকেলে একাডেমির এদিক থেকে ওদিক ঘুরেছেন আপনমনে। দেখেছেন, ছয় দশকে কত এগিয়ে গেছে তাদের হাতে গড়া এ প্রতিষ্ঠানটি। এদিন একাডেমির রবীন্দ্র-চত্বরে খোলা আকাশে বাংলা একাডেমির সদস্য-ফেলো-কবি-লেখক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মিলন মেলায় পরিণত হয় হীরক জয়ন্তী উৎসব। একাডেমি জুড়েই ফুল আর আলপনা। পুরো প্রাঙ্গণে স্লো ভলিউমে চলছে রবীন্দ্র সংগীতের মিউজিক।”

(বাংলানিউজ২৪.কম, বাংলাদেশ সময়: ২১২৩ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩, ২০১৫)

বাংলা একাডেমির সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় আয়োজন একুশে গ্রন্থমেলা তাঁর সময়ে আয়তনগত বিস্তৃতি লাভ করে। বাংলা একাডেমির মূল আঙ্গিনা ছাড়িয়ে রাস্তার অপর পার্শ্বে অবস্থিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলা একাডেমির বইমেলা বিস্তৃত হয়। অবশ্য এর সুবিধা-অসিুবিধা নিয়ে তর্ক-বিতর্কও আছে। বিশেষ করে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান নজরুল মঞ্চের পরিবর্তে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থানান্তরিত হওয়ায় নজরুল অনুরাগীদের মধ্যে আক্ষেপ আছে।

রবীন্দ্রসাহিত্যের গবেষণা এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতের আজীবন সাধনার জন্য বাংলা একাডেমি ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর রবীন্দ্র পুরস্কার প্রদান করে আসছে। ২০২০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৮-তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমি ২৫শে বৈশাখ ১৪২৬/৮ মে ২০১৯ বুধবার সকাল ১১:০০টায় একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে একক বক্তৃতা, রবীন্দ্র পুরস্কার-২০১৯ প্রদান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশ : শিক্ষা ও স্বদেশ ভাবনা শীর্ষক বক্তৃতা প্রদান করেন অধ্যাপক আনোয়ারুল করীম। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। স্বাগত ভাষণে হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, বাংলা একাডেমি গত এক দশক যাবত রবীন্দ্র-গবেষণা এবং রবীন্দ্রসংগীত প্রসারে অবদানের জন্য রবীন্দ্র-পুরস্কার প্রদান করে আসছে যা এদেশের রবীন্দ্রচর্চার প্রণোদনায় বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। তিনি বলেন, বাংলা একাডেমি পাঁচ খণ্ডে রবীন্দ্রজীবন প্রকাশের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে তিনটি খ- প্রকাশ পেয়েছে। আমরা আশা করি আহমদ রফিক প্রণীত রবীন্দ্রজীবন-এর বাকি দু’টো খণ্ড অচিরেই প্রকাশ পাবে।

সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনার মূলে ছিল আনন্দের ধারণা, যে শিক্ষা-কাঠামোয় কঠিন শাসনের পরিবর্তে ছিল উদারতার আবহ। রবীন্দ্রনাথ দেশপ্রেমে স্নাত ছিলেন তবে কোনোভাবেই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর মানবভাবনার মূলে ছিল অসাম্প্রদায়িক বিশ্বনাগরিকের সুদৃঢ় অবস্থান। (বাংলা একাডেমির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, অপরেশ কুমার ব্যানার্জী, পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ বিভাগ)

১১ জ্যৈষ্ঠ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২১তম জন্মজয়ন্তী। আর জ্যৈষ্ঠ মাস উঁকি দিতেই জাতীয় অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান এর অন্তিম ডাক এসে গেল! তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি বেঁচে থাকলে, সুস্থ থাকলে নিশ্চয়ই ১১ জ্যৈষ্ঠ তারিখে জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তীতে বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করতেন। এর আগের বছর তাঁর সভাপতিত্বে বাংলা একাডেমিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হয়। এ সংক্রান্ত বাংলা একাডেমির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটি নিম্নে পত্রস্থ করা হল:

“জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২০-তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমি আজ ১২ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬/২৬শে মে ২০১৯ রবিবার সকাল ১১:০০টায় একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে নজরুল বিষয়ক একক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের শুরুতে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করেন ডালিয়া আহমেদ এবং নজরুলগীতি পরিবেশন করেন শিল্পী ইয়াসমিন মুশতারী। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা শীর্ষক একক বক্তৃতা প্রদান করেন অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

স্বাগত ভাষণে হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, বাংলা একাডেমির সঙ্গে নজরুল জড়িয়ে আছেন নিবিড় একাত্মতায়। আমরা শীঘ্রই নজরুল স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউসের দোতলায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা নজরুল স্মৃতিকক্ষ পুনরায় চালু করতে যাচ্ছি। এছাড়া একাডেমি কর্তৃক বিশিষ্ট গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রণীত নজরুলের কয়েক খণ্ডের প্রামাণ্য জীবনী প্রকাশিত হবে।

অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর বলেন, নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা কখনও ফুরোবার নয়। কাল যতই অতিক্রান্ত হচ্ছে তাঁর কালোত্তর প্রাসঙ্গিকতা ততই নিবিড় করে অনুভূত হচ্ছে। নজরুলকে কেবল ‘বিদ্রোহী’ কবিতা-নির্ভর একজন কবি হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ তাঁর সামগ্রিকতা আরও বিচিত্র, ব্যাপক ও বর্ণাঢ্য। তিনি শাস্ত্রের ঊর্ধ্বে ওঠে মানবসুন্দরের গান গেয়েছেন। রক্ষণশীল সমাজের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে নারী-পুরুষ সম্পর্ককে তাঁর রচনায় দিয়েছেন ভিন্নতর, উদার ব্যঞ্জনা। তাঁর সামগ্রিক সৃষ্টিনন্দনে ‘আমি’র রূপকে মূলত সমষ্টিমানুষের অকথিত বাণী ব্যক্ত হয়েছে। প্রচলিত রাজনৈতিক ডামাডোলে বসবাস করেও তিনি রাজনীতিতে নিজস্ব বিপ্লবী, সমন্বয়বাদী চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটিয়েছেন অসমসাহসে। তিনি বলেন, আজকের সাম্প্রদায়িক চিন্তায় কলুষিত বিশ্বে চিরপ্রাসঙ্গিক, অসাম্প্রদায়িক নজরুলের অগ্রন্থিত লেখা দ্রুত উদ্ধার করে তাঁর রচনাবলি পূর্ণাঙ্গ করার যেমন জরুরি তার চেয়ে বেশি জরুরি নজরুল-চিন্তার আলোকে আমাদের সমাজ-রাষ্ট্র ও বিশ্বের মানবিক রূপান্তর সম্পন্ন করা।

সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, প্রত্যেক বড় সাহিত্যিকের রচনার মধ্যে চিরন্তনতা এবং সমকালীনতা- এই দুই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে। নজরুলের রচনায়ও আমরা প্রবল সমসাময়িকতা এবং চিরকালীনতা খুঁজে পাই। তাঁর কালজয়ী রচনায় যেসব মানবিক সমস্যার কথা উঠে এসেছে সে সবের অনেক কিছু এখনও বিরাজমান থাকায় নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা আরও বিশেষভাবে অনুভূত হয়।” (বাংলা একাডেমির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, অপরেশ কুমার ব্যানার্জী, পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ বিভাগ)

জাতীয় অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান কবি আবদুল কাদিরের পর ১৯৯৩ সালে গঠিত বাংলা একাডেমির নজরুল-রচনাবলীর নতুন সম্পাদনা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা একাডেমি জাতীয় কবির রচনাবলী প্রকাশ করে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে এবং এর গর্বিত অংশীদার হয়েছেন জাতীয় অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামানও। তবে বাংলা একাডেমি রবীন্দ্র পুরস্কারের মতো নজরুল পুরস্কার প্রবর্তন এবং রবীন্দ্র জীবনীর মতো নজরুল জীবনী প্রকাশ করলে দীর্ঘদিনের কিছু অপূর্ণতা পূরণ হবে।

প্রবন্ধের শুরুতেই একটি কথা বলেছিলাম। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক রবীন্দ্র চর্চা সম্প্রসারণে জাতীয় অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামানের অবদান অতুলনীয়। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর এইসব অবদান চিরদিন থেকে যাবে এবং তিনিও এইসবের মাঝে বেঁচে থাকবেন।

গত কয়েক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে রবীন্দ্র নামাঙ্কিত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১টি সরকারি এবং ২টি বেসরকারি। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠার পেছনেই রয়েছে জাতীয় অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান এর প্রত্যক্ষ অবদান।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে প্রতিষ্ঠিত রবীন্দ্র বিষয়ক বা রবীন্দ্র নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয় তিনটি হল-

১. রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজাদপুর, কুষ্টিয়া

২. রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয় (Tagore University of Creative Arts), ঢাকা

৩. রবীন্দ্র মৈত্রি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এটি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় অবস্থিত। ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষে ৩ টি বিভাগে ১০৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম চালু হয়। ২০১৫ সালের ৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

২০১০ সালের ৮ মে ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যাগ গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কুষ্টিয়া অভিবাসী তাদের এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার দাবি জানালেও বর্তমানে সেখানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক বিবেচনায় শাহজাদপুরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ভারতের শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর আদলে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২৫ বৈশাখ কবির ১৫৪তম জন্মবার্ষিকীতে ২০১৫ সালের ৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১১ মে ২০১৫ মন্ত্রী সভার বৈঠকে 'রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়,বাংলাদেশ আইন,২০১৫'-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বিল টি সংসদে উত্থাপন করার পর পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে জুলাই ২০১৭ তে 'রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়-বাংলাদেশ বিল-২০১৬’ সংসদে পাসের প্রস্তাব করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে অনার্স (স্নাতক) প্রথম বর্ষে ২টি অনুষদের অন্তর্ভুক্ত মোট ৩টি বিভাগে ১০৫ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করে। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার পৌর সদরের বিসিক বাসস্ট্যান্ডের পাশে অবস্থিত শাহজাদপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের নবনির্মিত ভবনে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাস হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

১১ জুলাই ২০১৭ সালে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষ এ কলা অনুষদের অধীনে রবীন্দ্র অধ্যায়ন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যায়ন এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে অর্থনীতি বিভাগ চালু হয়। প্রতি বিভাগে ৩৫ জন করে মোট ১০৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম শুরু করা হয়। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে ব্যবসা শিক্ষা অনুষদের অধীনে ৩৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিস বিভাগ শুরু হয়।

রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয় (Tagore University of Creative Arts)

জাতীয় অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামানের স্বপ্নের ঠিকানা রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয় (Tagore University of Creative Arts)। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এর ভাইস চেয়ারম্যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট (www.tuca.edu.bd) থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নিম্নরূপ তথ্য পাওয়া যায়:

“রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয় (Tagore University of Creative Arts) বাংলাদেশের একটি নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। সমাজ-সংস্কার, শিক্ষাচিন্তা, ব্যবস্থাপনা-ভাবনা, সংস্কৃতিচর্চা ও নানা উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে নোবেলবিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে জীবনদৃষ্টি ও কর্মপদ্ধতি তারই আলোকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্য পরিচালনা করা হবে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের উদ্ভাবনী পদ্ধতি অবলম্বনের পরিকল্পনা রয়েছে যাতে উচ্চশিক্ষাগ্রহণও আনন্দলাভ ও উৎকর্ষসাধনের বাহন হয়।

পটভূমি

একুশ শতকের জাতীয় ও বৈশ্বিক উভয় অর্থনীতিতেই সৃজনকলা-সম্পর্কিত শিল্প-বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ব্যাপক। জাতীয় জীবনে ললিতকলা, চারু ও কারুকলা, অলঙ্করণ ও গণমাধ্যমের প্রভাব গভীর হলেও আমাদের জীবিকা ও পেশাগতচর্চায় তা এখনও যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটেই রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি বিশেষায়িত আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। এখানে পাঠদান করা হবে দৃশ্যকলা ও পরিবেশনকলা, নকশা ও উদ্ভাবন, গণযোগাযোগ ও গণমাধ্যম, তথ্যপ্রযুক্তি, সমাজবিদ্যা ও ব্যবসাবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে। পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হবে রবীন্দ্রনাথের দর্শন ও চিন্তাধারার আলোকে। এ বিশ্ববিদ্যালয় সৃজনকলার ক্ষেত্রে গবেষণা ও প্রশিক্ষণকে এমনভাবে গুরুত্ব দেবে, যাতে এখানকার শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধার বিকাশ ঘটিয়ে এই ধারার শিল্পের নানা ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের জন্য উচ্চতর যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে ওঠে।

আমাদের জনজীবনে শিক্ষাজীবী, গবেষক, চারুশিল্পী, বিন্যাস-পরিকল্পক কিংবা পরিবেশন-শিল্পীগণ স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় থাকলেও পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকেন না। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনভাবেই এসব বিষয়ে শিক্ষাকার্য পরিচালিত হবে যাতে শিক্ষার্থীগণ পরস্পরের সংযোগের মধ্য দিয়ে নিজ নিজ শিল্পের কর্মবাস্তবতায় উপযোগিতার প্রসার ঘটাতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে যাতে স্ব স্ব ক্ষেত্রের দিকপাল ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা, উপদেশ ও কার্যকর সহযোগিতা পেয়ে ছাত্রছাত্রীরাও নিজেদের পাঠ্যবিষয়ে গভীর ও বাস্তব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠে দেশ ও বিদেশের সমসাময়িক সৃজনক্ষেত্রে উজ্জ্বলতার স্বাক্ষর রাখতে পারে।

এসব লক্ষ্যকে সামনে রেখে রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয় গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে বিদ্বান ব্যক্তিদের অঙ্গীকার ও গভীর অভিনিবেশ দ্বারা এর পাঠক্রম ও পাঠ্যসূচি সাজানো এবং শিক্ষাদানের চেষ্টা করবে।

লক্ষ্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শনে সঞ্জীবিত রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়কে সৃজনকলার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রগণ্য বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে বিকশিত করা।

উদ্দেশ্য

সৃজনশীলতার পরিচর্যার মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের আত্মবিশ্বাসী, ক্ষমতায়িত ও উদ্ভাবনমনস্ক করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে উত্তীর্ণ করা।

মূলনীতি

এমনভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ পরিচালনা করা হবে যাতে রবীন্দ্র-প্রভাবিত দর্শন, আদর্শ এবং সৃজনকলার মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক ক্রিয়াশীল থাকে এবং শিক্ষার্থীগন কর্মজগতের বাস্তবানুগ কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভ করে।

অ্যাক্রেডিটেশন

রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয় (Tagore University of Creative Arts) বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) দ্বারা অনুমোদিত।”

রবীন্দ্রমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

রবীন্দ্রমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়টি মূলত: কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ডিন ডঃ মোহাম্মদ জহুরুল ইসলামের উদ্যোগে ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে প্রস্তাবিত লিজেন্ড ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির পরিবর্তিত রূপ। এ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তাদের ওয়েবসাইটে (http://www.rmu.ac.bd/)বলা হয়েছে:

“The Rabindra Maitree University was proposed for approval to the Ministry of Education, Government of Bangladesh as Legend Trust University in 2011. It was the brain child and under an active nourishment of Professor Dr. Mohammad Johurul Islam, presently the Chairman of the Department of Law of Islamic University and formerly Dean of Faculty of Law of Islamic University, Kushtia-the then Chairman of the Board of Trustees of the proposed Legend Trust University. The proposed university campus was duly inspected by two member committee of the University Grants Commission headed by the then UGC member Professor Dr. Atful Hye Shible. They gave a very positive report to the Ministry of Education for approval of the proposed Legend Trust University. But the proposal met an unexpected delay for its approval. In 2015 the Honourable Minister for Information Mr. Hasanul Huq Inu MP, who hails from Kushtia approached and brought the matter before Prime Minister Sheikh Hasina. Honorable Prime Minister advised Mr. Hasanul Haq Inu to establish a university by the name of the Great Nobel Laureate Poet Rabindranath Tagore. On 8th May 2015, Prime Minister Sheikh Hasina avowed to give approval to a private university by the name of Rabindranath Tagore at Kushtia during a public meeting after inauguration of Rabindra University Bangladesh at Sahzadpur, Sirajgong. Concurrently Mr. Hasanul Haq Inu brought the declaration of PM before the audience in a public meeting at Shilaidah Rabindra Kuthibari, organized by the local administration marking the birth anniversary of the Great Poet Rabindranath Tagore. On 11 May 2015, during cabinet meeting Mr. Hasanul Huq Inu drew the kind attention of the Honorable Prime Minister Sheikh Hasina about the proposal of the university. In a note-chit, Mr. Hasanul Haq Inu proposed four names of the proposed university relating to the Great Poet’s name, out of which the Honorable Prime Minister selected Rabindra Maitree Univeristy. The selection was warmly welcomed by the Board of Trustees of the proposed Legend Trust University and Board of Trustees took a decision in a general meeting to substitute ‘Rabindra Maitree University’ in the place of proposed ‘Legend Trust University’. In line with the process Mr. Hasanul Haq Inu MP boosted up the proposal by writing a DO letter to the Ministry of Education. The Board of Trustees proposed and earnestly requested Mr. Hasanul Haq Inu MP to become Chairman of the Board of Trustees of the newly proposed Rabindra Maitree University. He cordially accepted the proposal and after a long process on 29 December 2015, the Ministry of Education issued a GO letter to the Chief promoter Professor Dr. Mohammad Johurul Islam as founder regarding approval of the proposed Rabindra Maitree University. In March 2016 as many as 16 programs were submitted to the UGC and after completing the formalities, on principle UGC approved 7 undergraduate programs under 7 different departments including Bengali in September 2017.”

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক নজরুল চর্চা

স্বাধীন বাংলাদেশ তার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে স্থায়ীভাবে পেয়েছে ১৯৭২ সালের ২৪ মে থেকে। ঢাকার তৎকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দরে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনতা তাদের জাতীয় কবিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর জন্যে বরাদ্দকৃত সরকার বাসভবন ধানমণ্ডিতে কবিকে নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সেখানে গিয়ে কবিকে সম্মান প্রদর্শন করেন। ঠিক এর একদিন পর অর্থাৎ ২৫ মে, ১৯৭২ জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তীতে প্রদত্ত বাণিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান উল্লেখ করেন:

“নজরুল বাংলার বিদ্রোহী আত্মা ও বাঙালির স্বাধীন ঐতিহাসিক সত্তার রূপকার। বাঙলার শেষ রাতের ঘনান্ধকারে নিশীথ নিশ্চিন্ত নিদ্রায় বিপ্লবের রক্তলীলার মধ্যে বাংলার তরুণরা শুনেছে রূদ্র বিধাতার অট্টহাসি, কালভৈরবের ভয়াল গর্জন—নজরুলের জীবনে, কাব্যে, সঙ্গীতে, নজরুলের কণ্ঠে। প্রচণ্ড সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের মত, লেলিহান অগ্নিশিখার মত, পরাধীন জাতির তিমির ঘন অন্ধকারে বিশ্ববিধাতা নজরুলকে এক স্বতন্ত্র ছাঁচে গড়ে পাঠিয়েছিলেন এই ধরার ধূলায়।”

“সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে নজরুলের অগ্নিমন্ত্র বাঙালি জাতির চিত্তে জাগিয়েছিল মরণজয়ী প্রেরণা-আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ হওয়ার সুকঠিন সংকল্প।”

“শুধু বিদ্রোহ ও সংগ্রামের ক্ষেত্রেই নয়, শান্তি ও প্রেমের নিকুঞ্জেও কবি বাংলার অমৃতকণ্ঠ বুলবুল। দুঃখের বিষয় বাংলা ভাষার এই বিস্ময়কর প্রতিভার অবদান সম্বন্ধে তেমন কোন আলোচনাই হলো না। বাংলার নিভৃত অঞ্চলে কবির বিস্মৃত প্রায় যে সব অমূল্য রত্ন ছড়িয়ে আছে তার পুনরুদ্ধারের যে কোন প্রচেষ্টাই প্রশংসার যোগ্য।”

প্রধানমন্ত্রীর অবিস্মরণীয় এই বাণী থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায়, নজরুল চর্চা যথাযথভাবে না হবার কারণে প্রধানমন্ত্রীর অনেক ক্ষোভ এবং কষ্ট ছিল। তিনি কষ্টের সাথে উচ্চারণ করেন: “দুঃখের বিষয় বাংলা ভাষার এই বিস্ময়কর প্রতিভার অবদান সম্বন্ধে তেমন কোন আলোচনাই হলো না।”

১৯৫৩ সালে করাচির প্রবাসী বাঙালিরা প্রথম নজরুল একাডেমী নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৬১ সালে আমীর হোসেন চৌধুরীর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ‘আন্তর্জাতিক নজরুল ফোরাম’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এর নির্বাহী পরিষদের সভাপতি ছিলেন এ.কে ব্রোহী এবং সম্পাদক ছিলেন মিজানুর রহমান। এ প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর নজরুল-জয়ন্তী পালন এবং ইংরেজি ভাষায় দু’একটি বই প্রকাশ করত।

১৯৬৪ সালে কবি তালিম হোসেন এবং অ্যাডভোকেট এ.কে.এম নূরুল ইসলাম (বিচারপতি এবং বাংলাদেশের উপ রাষ্ট্রপতি) ‘নজরুল একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাঁদের উদ্যোগে সেই বছরের ২৪ মে নূরুল ইসলামের ১১ নং র‌্যাংকিন স্ট্রিটের বাসভবনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রথম নজরুল-জন্মবার্ষিকী উদ্যাপিত হয়। এ অনুষ্ঠানেই নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত ও একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলামের বাড়ির একটি কক্ষ একাডেমির অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এর চার বছর পর ১৯৬৮ সালের ২৪ মে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন -এ আয়োজিত এক সভায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী কাজী আনোয়ারুল হক নজরুল একাডেমির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এছাড়া ১৯৬৮ সালের ১লা জুলাই একাডেমির উদ্যোগে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন -এ একটি হামদ-নাতের জলসার আয়োজন করা হয়।

১৯৬৭ সালের ২৭ আগস্ট সাংগঠনিক কমিটির এক সভায় একাডেমির গঠনতন্ত্র প্রণীত হয় এবং সে অনুযায়ী পরবর্তী সভায় নির্বাচনের মাধ্যমে একটি কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। এ পরিষদের সভাপতি ছিলেন বিচারপতি আবদুল মওদুদ এবং সাধারণ সম্পাদক তালিম হোসেন। নজরুল একাডেমী পরবর্তীতে তার স্থায়ী ঠিকানা মগবাজারে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে নজরুল একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক মিন্টু রহমান।

নজরুল ইনস্টিটিউট

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে Nazrul Institute Ordinance 1984 অনুযায়ী ধানমণ্ডির ২৮নং সড়কের ৩৩০-বি বাড়িতে নজরুল ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ‘কবি নজরুল ইনস্টিটিউট আইন ২০১৮’ আইনের অধীনে ‘কবি নজরুল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইনস্টিটিউটের লক্ষ্য ও উদ্যেশ্য- ১. সংগীত ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম দেশ ও বিদেশ হতে সংগ্রহ, সংকলন, সংরক্ষণ এবং প্রকাশ করা। ২. সকল সাহিত্যকর্ম অনুশীলনে উৎসাহিত করা। ৩. সাহিত্যকর্মের উপর গবেষণা, প্রকাশনা এবং প্রচারণার ব্যবস্থা গ্রহণ। ৪. সাহিত্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কবির অবদান সম্পর্কে সম্মেলন, বক্তৃতা, বিতর্ক ও সেমিনারের আয়োজন করা। ৫. সংগীত ও সাহিত্য সম্পর্কিত পুস্তক, রেকর্ড, টেপ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য লাইব্রেরি/আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করা। ৬. সংগীত সঠিকভাবে চর্চা ও প্রচারের জন্য স্বরলিপি তৈরি করা এবং গ্রহণযোগ্য মর্যাদায় গ্রামোফোন রেকর্ড, বাণিজ্যিক টেপ, চলচ্চিত্র এবং বাংলাদেশে প্রকাশিত স্বরলিপি বইয়ের উপস্থাপনা ও তদারকি করা। ৭. সংগীত ও নজরুলের কবিতা আবৃত্তির যথার্থ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ৮. সকল লেখক কবির সাহিত্যকর্মের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন তাঁদের পুরস্কার এবং পদক প্রদান করা।

নজরুল ইনস্টিটিউটকে ২০১৮ সালে ‘কবি নজরুল ইনস্টিটিউট’ হিসেবে নামকরণ করা নিয়ে নজরুল অনুরাগীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রবীন্দ্রভারতী যে কারণে ‘কবি রবীন্দ্রভারতী’ হয় না, ঠিক একই কারণে নজরুল ইনস্টিটিউটকে ‘কবি নজরুল ইনস্টিটিউট’ করাও সঙ্গত নয় বলেই আমরা মনে করি। কারণ, নজরুল স্রেফ একজন কবি নন, তিনি জাতীয় কবি এবং তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী।

নজরুল চেয়ার ও নজরুল গবেষণা কেন্দ্র

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল চেয়ার এবং কোথাও কোথাও নজরুল গবেষণা কেন্দ্র আছে বলে শোনা যায়। কিন্তু বর্তমানে এগুলোর অস্তিত্ব আছে কি না তা জানা সম্ভব হয়নি। এদের কোন কর্মকাণ্ডও চোখে পড়ে না।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ময়মনসিংহের ত্রিশালে বটতলা নামক স্থানে ৩৫ একর জমির উপর বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত। এই বটতলায় কবি তাঁর শৈশবের অনেকগুলি দিন কাটিয়েছেন। বৃহৎ ময়মনসিংহের বিদ্বৎসমাজ দীর্ঘদিন যাবৎ একটি সংস্কৃতি কেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছিল। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৪ সালে প্রকল্প হিসেবে সংস্কৃতি কেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু ২০০৬ সালের জাতীয় সংসদে জারিকৃত ১৮ নং আইনের অধীনে এটি একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং ২০০৭ সালের ১ জুন এর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। (বাংলাপিডিয়া)

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ইংরেজিতে এ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বলা হয়েছে:

“Jatiya Kabi Kazi Nazrul Islam University was established by the Government of Bangladesh on 09 May 2006, though the initiative for its establishment was taken some years before, firstly by a non-official group of socio-cultural local elites, namely Greater Mymensingh Cultural Forum. The university was originally conceived to be built as the first cultural university in Bangladesh, but the JKKNIU Act enacted in 2006 made it a general university with a special focus on liberal-cum-performing arts education and research.”

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়। এটি নজরুল বিষয়ক বিশেষায়িত কোন বিশ্ববিদ্যালয় নয়। এটি হবার কথা ছিল জাতীয় কবির জীবন, দর্শন ও সৃষ্টিকর্ম বিষয়ক দেশের প্রথম সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় । কিন্তু তা হলো না! তবে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্য একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত না হলেও, দেশে এ পর্যন্ত তিনটি রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা  পালনের জন্য প্রয়াত ড. আনিসুজ্জাানের নাম বারংবার উচ্চারিত হবে।


(ঢাকা: ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ১৪ মে, ২০২০)

 

Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page