top of page

ডঃ কাজী মোতাহার হোসেন।।‌‌‌১২৪তম জন্মবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

এম.কে. জাকারিয়া



শুভ জন্মদিন স্যার ।

আজ ৩০শে জুলাই এই বিখ্যাত মানুষটির জন্মবার্ষিকী ।

জানাচ্ছি বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালবাসা এবং কৃতজ্ঞতা অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ।

সংখ্যাতত্ত্বশাস্ত্রে (Statistics) ‘Hussain's Chain Rule’ এর উদ্ভাবক তিনি।

স্বাধীনতা পদকে ভূষিত বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, দাবাড়ু এবং লন টেনিস প্লেয়ার কাজী মোতাহার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও পরিসংখ্যান- এই তিনটি বিভাগেই অধ্যাপনা করেছিলেন অত্যন্ত সুনামের সাথে ।

১৯৫০ সালে ‘Design of Experiments’ বিষয়ে গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কাজী মোতাহার হোসেন ডক্টরেট (পিএইচ.ডি.) ডিগ্রি লাভ করেন।


তাঁর থিসিসের পরীক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত সংখ্যাতত্ত্ববিদ স্যার রোনাল্ড ফিশার। তিনিও তাঁর এই গবেষণাপত্রের উচ্চ প্রশংসা করেন।

পরবর্তীতে মোতাহার হোসেনের উদ্ভাবিত একটি পদ্ধতি সংখ্যাতত্ত্বশাস্ত্রে (Statistics) ‘Hussain's Chain Rule’ নামে পরিচিতি পায়।

বস্তুত, তৎকালীন পূর্ববঙ্গে (বর্তমান বাংলাদেশ) তিনিই প্রথম স্বীকৃত পরিসংখ্যানবিদ।

‘জাতীয় অধ্যাপক’ পদে সম্মানিত ড. হোসেন শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাবে ভূষিত হন।

১৯৬৬ সালে প্রবন্ধসাহিত্যের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার,

বিজ্ঞান চর্চায় অসাধারণ অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে দেশের “সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ” হিসাবে পরিচিত “স্বাধীনতা পুরস্কার” প্রদান করা হয় তাকে।

১৯৭৪ সালে বিজ্ঞান ও কলা বিষয়ে অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ডি.এস.সি ডিগ্রি দ্বারা সম্মানিত করে।

জাতীয় অধ্যাপক হিসাবে বাংলাদেশ সরকার তাকে সম্মানিত করে ১৯৭৫ সালে ।

উনার সন্তানদের মধ্যে সনজীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, মাহমুদা খাতুন, কাজী আনোয়ার হোসেন, কাজী মাহবুব হোসেন খুবই পরিচিত মুখ এদেশে ।

গণিতের প্রতি ছেলেবেলা থেকেই তাঁর ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। তিনি ছিলেন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও বিখ্যাত সংখ্যাতত্ত্ববিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের ছাত্র।

তিনি তাঁর ‘নজরুল কাব্য পরিচিতি’ বইটি উৎসর্গ করেছিলেন প্রিয় শিক্ষক প্রশান্তচন্দ্রকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহকর্মী ছিলেন বোস-আইনস্টাইন থিওরির জনক সত্যেন্দ্রনাথ বসু।

কাজী মোতাহার হোসেন তাঁর লেখা ‘তথ্য-গণিত’ বইটি সত্যেন বোসকে দেখানোর জন্য কলকাতায়ও গেছিলেন। আরো অনেকের সামনে সে বইয়ের ভূমিকা পড়ে বোস বলেছিলেন, “দেখ! তোমরা কেউ লিখতে পারতে? পারতে না। এ আমার ছেলে!” শুধু তা-ই নয়, সত্যেন বোস তাঁর জীবনের শেষ চিঠিটিও লিখেছিলেন মোতাহার হোসেনকে।

কাজী মোতাহার হোসেন নামের এই দুরন্ত বালক পরবর্তী জীবনে খ্যাতি লাভ করেন বাংলাদেশের প্রথম পরিসংখ্যানবিদ, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, দাবাড়ু এবং বিশিষ্ট সাহিত্যিক হিসেবে।

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁকে ডাকতেন 'মোতিহার' বলে।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-এর ভাষায় তিনি 'আপনভোলা নিরহংকার মানুষ, বিদ্বান ও গুণী'। আর গুণমুগ্ধ ভক্তদের কাছে তিনি শ্রদ্ধেয় 'কাজী সাহেব'।

আত্মভোলা কাজী মোতাহের হোসেনেকে বন্ধু হিসেবে কেমন ছিলেন কবি নজরুলের চিঠির লাইনটা বলে দেয় ।

''বন্ধু, তুমি আমার চোখের জলের মতিহার, বাদল রাতের বুকের বন্ধু। যেদিন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর আর সবাই আমায় ভুলে যাবে , সেদিন অন্ততঃ তোমার বুক বেঁধে উঠবে। তোমার ঐ ছোট্ট ঘরটিতে শুয়ে , যে ঘরে তুমি আমায় প্রিয়ার মত জড়িয়ে শুয়েছিল, অন্ততঃ এইটুকু স্বান্তনা নিয়ে যেতে পারবো , এই কি কম সৌভাগ্য আমার !''

বিজ্ঞান গবেষণার পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতি-সঙ্গীত-খেলাধুলা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে অনন্য সাধারণ প্রতিভার সমন্বয়ে যুক্তিবাদী, ধর্মপ্রাণ ও স্পষ্টবাদী কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ।

সংস্কৃতিসচেতন আদর্শ বাঙালি কাজী মোতাহার হোসেন জন্ম ১৮৯৭ সালের ৩০শে জুলাই কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে ।

নিম্ন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ক্লাসে যোগ-বিয়োগ ও গুণনের পদ্ধতি শেখানোর পর নিজে নিজেই ভাগের নিয়ম আবিষ্কার করে শিক্ষককে অবাক করে দিয়েছিলেন কাজী পরিবারের যে দুরন্ত বালক তার নাম কাজী মোতাহার হোসেন।

তিনি ছিলেন তুখোড় দাবাড়ু। অবসর সময়ে তার বাসায় জমে উঠতো দাবার আসর। প্রতিবেশী অধ্যাপকেরা খেলতে আসতেন তাঁর বাসায়।

একদিন খেলা চলছে, নিবিষ্ট মনে তিনি প্রতিপক্ষের চালের প্রেক্ষিতে কী চাল দিবেন ভাবছেন। এর মাঝেই ভেতর বাড়ি থেকে কাজের মহিলা এসে বললো, 'স্যার, বিবি সাবরে সাপে কামড় দিছে, তাড়াতাড়ি আসেন।' দাবার চাল চালত চালতেই তিনি জানতে চান, 'কার সাপ?'

১৯৩৭ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম মৌলিক প্রবন্ধসংকলন 'সঞ্চরণ' প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাজী মোতাহার হোসেনকে সাধুবাদ জানিয়ে বাংলা ১৩৪৪ সালের ২রা ভাদ্র প্রেরিত পত্রে লিখেছিলেন, "... বিচিত্র ভাবকে এবং আলোচনার বিষয়কে স্বচ্ছ প্রাঞ্জল ভাষায় রূপ দিয়ে যে প্রবন্ধগুলি আপনার 'সঞ্চরণ' গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন তা পড়ে পরিতৃপ্ত হয়েছি। আপনার বলবার সাহস এবং চিন্তার স্বকীয়তা সাধুবাদের যোগ্য। ..."

প্রমথ চৌধুরী, উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখেরও বিশেষ প্রশংসা লাভ করে 'সঞ্চরণ'।

যাঁকে নিয়ে অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছিলেন, “একজন উদারমনা মুসলমান ও সেই সঙ্গে দেশপ্রাণ বাঙালি এবং সকলের উপর একজন সৎ মানুষ।”

এই মানুষটিই বাংলাদেশে মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীলতা বিকাশের এক অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

বলা বাহুল্য যে , ১৯৬১ সালে প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবীদের বিরোধিতার মুখে ঢাকায় রবীন্দ্র-জন্মশত বার্ষিকী পালনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন তিনি।

১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালি-সংস্কৃতি খর্ব করার জন্য রেডিও-টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধের যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদজ্ঞাপন করেন।

বিজ্ঞান গবেষণা ও সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও কাজী মোতাহার হোসেন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছেন। ছাত্রজীবনেই তিনি ফুটবল, টেনিস, ব্যাডমিন্টন, দাবা ও সাঁতারে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন।

তিনি ১৯২১ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত একটানা চল্লিশ বছর অবিভক্ত বাংলা এবং পূর্ব পাকিস্তানে দাবা চ্যাম্পিয়ন ছিলেন।

তিনি 'অল ইন্ডিয়া অ্যান্ড সাউথ আফ্রিকা করেসপণ্ডেন্স চেস কম্পিটিশন'-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। 'বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন'-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং আজীবন সভাপতি ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের দাবার জগতে পরম সম্মানিত 'দাবাগুরু' হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন তিনি।

তাঁর দাবাখেলার সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন কথাশিল্পী শরত্‍চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সতীশচন্দ্র আড্ডী, কিষাণলাল প্রমুখ।

দাবাখেলা ছাড়াও তিনি ১৯৫১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত লন টেনিস প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন।

কাজী মোতাহার হোসেন; বাঙালি, বিশেষত বাংলাদেশী বাঙালিদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেবার কারণ- যে দেশ বা দেশের মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে আজীবন ‘দ্য ল্যাম্পলাইটার’ হয়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন তিনি, সে দেশের মানুষের কাছে তিনি এখন ক্রমেই ‘নাম শুনেছি বলে মনে হচ্ছে’ হয়ে উঠেছেন ।

শিক্ষাবিদ,জাতীয় অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা কাজী মোতাহের হোসেন ‘ বলতেন সমাজের অন্ধকার মুক্তির কথা।

এই দিনে মুক্তির অগ্রদূতের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

ধন্যবাদ ।


( বিঃ দ্রঃ তথ্য বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত )


Comentários


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page