সংবাদপত্রের নজরুল এবং ধূমকেতুর বিজ্ঞাপন নীতিমালা ।। মোঃ জেহাদ উদ্দিন
- বাঙলাকথা
- May 9, 2021
- 9 min read
Updated: May 9, 2021

কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁকে কত বিশেষণেই না অভিহিত করা যায়! এক বিদ্রোহী কবিতাতেই তিনি ১৫৬ বার আমি শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁর বিচিত্র পরিচয় ও শক্তির স্বরূপ তুলে ধরেছেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কবিদের একজন বাংলার জাতীয় কবি বাঙালির জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনেকগুলো পরিচয়ের মধ্যে একটি পরিচয় হল, তিনি ছিলেন পত্রিকার সম্পাদক। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি-অর্থনীতি, সমাজ সংস্কার, ধর্ম সংস্কার ইত্যাদি সকল জায়গায় তিনি মৌলিক অবদান রেখেছেন। এক কথায় অনন্য অবদান রেখেছেন। বিংশ শতাব্দীর অসম্ভব সম্ভাবনার যুগে জন্মগ্রহণকারী কবি এই শতাব্দীর মহানায়ক। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। তিনি যেহেতু গণমানুষের কবি, গণমুক্তির কবি, তাই গণমাধ্যমকে তিনি এমনভাবে গণমানুষের কাছে তুলে ধরেছেন যা প্রকৃত অর্থেই গণমানুষের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হয়ে ওঠে। মানুষের মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিকে তিনি যেমন অত্যুচ্চ নান্দনিক এবং কার্যকর অবলম্বন হিসেবে উপস্থাপন করেন, ঠিক তেমনি গণমাধ্যমকেও তিনি এমন একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যা সঠিক পথের সন্ধানীদের চিরকাল পথের দিশা দিবে।

পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক ও কর্ণধার হিসেবে তিনি চিরকাল স্মরণীয়, বরণীয় হয়ে থাকবেন। সম্পাদক, প্রকাশক, কর্ণধার, প্রধান পরিচালক, যুগ্ম সম্পাদক, লেখক ইত্যাদি নানান ভূমিকায় বহু সংবাদপত্রের সাথে যুক্ত ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। অর্ধ সাপ্তাহিক ধূমকেতু, দৈনিক নবযুগ (প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়), সাপ্তাহিক লাঙল, গণবাণী-এসব পত্রিকার মূল কারিগর ছিলেন তিনি।

এই পত্রিকাগুলো দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, দেশ ও জাতির পুনর্গঠন, মানবিক চিন্তা চেতনার উন্মেষ ও বিকাশ এবং সকল মানুষের সামগ্রিক মুক্তির কাজে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখে যেগুলো কেবল ভারতবর্ষের নয়, বরং গোটা বিশ্বের মানবমুক্তির দর্পণ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে কবি যখন ফিরে আসেন, তখন তিনি সরাসরি চুরুলিয়া গিয়ে মা জাহেদা খাতুনের সাথে দেখা করেন এবং যুদ্ধ ফেরত সৈনিক হিসেবে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক তাঁকে প্রদত্ত সাব-রেজিস্ট্রার পদে চাকুরির বিষয়টি অবহিত করেন। মা তাতে খুব খুশি হলেও নজরুল সাফ জানিয়ে দেন যে, তাঁর দ্বারা চাকুরি করা সম্ভব হবে না। স্বাধীনভাবে থেকে তিনি দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য লড়ে যাবেন। এরপর কবি কলকাতায় এসে তাঁর বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় নিজের পরিচয় লুকিয়ে একটি হিন্দু মেসে ওঠেন। কিন্তু তাঁর পরিচয় খুব তাড়াতাড়িই প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে সেই মেস ছাড়তে হয়। পরে তিনি ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। তার সাথে বসবাস করতেন এই সমিতির অন্যতম কর্মকর্তা মুজফ্ফর আহমদ। এখান থেকেই কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য-সাংবাদিকতা জীবনের মূল কাজগুলো শুরু হয়। যুদ্ধের ময়দান থেকেই কবি কলকাতার কাগজে লেখা পাঠাতেন এবং সেগুলো ছাপা হতো। কলকাতায় বসবাস শুরু করার পর প্রথম দিকে মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তার কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে উপন্যাস বাঁধন হারা এবং কবিতা বোধন, শাত-ইল-আরব, বাদল প্রাতের শরাব, আগমনী, খেয়া-পারের তরণী, কোরবানি, মোহরর্ম, ফাতেহা-ই-দোয়াজ্দম্। এই লেখাগুলো সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এর প্রেক্ষিতে কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার মোসলেম ভারত পত্রিকায় তার খেয়া-পারের তরণী এবং বাদল প্রাতের শরাব কবিতা দুটির প্রশংসা করে একটি সমালোচনা প্রবন্ধ লিখেন। এ থেকেই দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমালোচকদের সাথে নজরুলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় শুরু হয়। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে কাজী মোতাহার হোসেন, মোজাম্মেল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আফজালুল হক প্রমুখের সাথে পরিচয় হয়। তৎকালীন কলকাতার দুটি জনপ্রিয় সাহিত্যিক আসর গজেনদার আড্ডা এবং ভারতীয় আড্ডায় অংশগ্রহণের সুবাদে পরিচিত হন অতুলপ্রসাদ সেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, শিশির ভাদুড়ী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মেলন্দু লাহিড়ী, ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ করমতুল্লা খাঁ প্রমুখের সাথে। ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শান্তিনিকেতনে যেয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল। কাজী মোতাহার হোসেনের সাথে নজরুলের বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।

১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই তারিখে নবযুগ নামক একটি সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নবযুগ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও রাজনীতিবিদ কমরেড মুজফ্ফর আহমদের যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকা। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন শের-এ-বাংলা এ. কে. ফজলুক হক। তিনি নিজ অর্থে এই পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে এ পত্রিকায় কাজী নজরুল ইসলামের অনেক কবিতা ও প্রবন্ধ ছাপা হয়। "মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে" শিরোনামে কবি একটি প্রবন্ধ লিখেন যার জন্য ব্রিটিশ সরকার এ পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করে ও পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। শের-এ-বাংলা এ. কে. ফজলুক হকের চেষ্টায় পত্রিকাটি আবার প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে নজরুল ও মুজফ্ফর আহমদ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করলে পত্রিকাটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪২ সালে ফজলুল হক বাংলার প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁর উদ্যোগে এবং কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় পুনরায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। এ এসময় এ পত্রিকায় প্রকাশিত বেশকিছু কবিতা পরবর্তীতে কবির সওগাত কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়। সম্পাদকীয় নীতিতে শেরে বাংলার সাথে মতবিরোধের জেরে কবি নবযুগ থেকে সরে দাঁড়ান। এ সময় কাজী নজরুল ইসলাম দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নীরব হয়ে যান। খুলনার মাওলানা আহমদ আলী তখন পত্রিকাটি সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দুবছর পত্রিকাটি চালু থাকার পর পত্রিকাটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

পৃথিবীতে নবযুগ আনার মহান ব্রত নিয়ে কবি নবযুগে যোগদান করেছিলেন। নবযুগে তাঁর অগ্নিঝরা রাজনৈতিক লেখাগুলো একটি ঘুমন্ত জাতিকে যেন চাবুকাঘাত করে জাগিয়ে দিচ্ছিল। নবযুগে প্রকাশিত কবির সম্পাদকীয়গুলো এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, বছর দু’য়েক পর এ লেখাগুলোকে একত্রিত করে প্রকাশিত হয় কবির অমর গ্রন্থ ‘যুগবাণী’।

নবযুগ ছেড়ে কবি চলে যান দেওঘর। এরপর কলকাতায় ফিরে এসে কিছুদিন পর আলি আকবর খানের সাথে চলে আসেন কুমিল্লায়। প্রায় আড়াই মাস তিনি অবস্থান করেন খান সাহেবের গ্রামের বাড়ি দৌলতপুরে। দৌলতপুরে আসার প্রাক্কালেই কুমিল্লা শহরে একরাত অবস্থান করেছিলেন ইন্দ্রকুমার সেন গুপ্তের বাড়িতে যেখানে পরিচয় হয় আশালতা সেনগুপ্ত (পরবর্তীতে প্রমিলা নজরুল ইসলাম) এর সাথে। কবি প্রায় আড়াই মাস দৌলতপুরে অবস্থান করেন। এ সময় নার্গিস আসার খান (কবি প্রদত্ত নাম নার্গিস) এর সাথে কবির আকদ সম্পন্ন হয়, কিন্তু বিয়ের রাতেই কবি দৌলতপুর ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তাঁর জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে। নার্গিসের বিরহ কবিকে দারুণভাবে আহত করে। কবি ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে কলকাতার তালতলার ৩/৪ সি লেনের বাড়িতে কোন একরাতে সুবেহ সাদিকের সময় লিখেন তাঁর শ্রেষ্ঠতম কবিতা ‘বিদ্রোহী’। বিদ্রোহীর ঝড় চলতে চলতেই কবি আরেক বিস্ফোরণ ঘটান। ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট কবি প্রকাশ করেন অর্ধ-সাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকা।

ধুমকেতু নানা কারণে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রথমত ধূমকেতু কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা উদ্যোক্তা এবং মালিক ছিলেন তিনি নিজেই। দ্বিতীয়তঃ ধূমকেতু পত্রিকাতেই বাংলা ভাষায় কাজী নজরুল ইসলাম সর্বপ্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করেন এর ১৯২২ সালের ১৩ অক্টোবর সংখ্যায়। ধূমকেতুর তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে। এই কবিতাটি লেখা ও প্রকাশের কারণে কবিকে ব্রিটিশ সরকার রাজদ্রোহে অভিযুক্ত করে এবং কুমিল্লা থেকে কবিকে গ্রেফতার করা হয়। সেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় কবিকে এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছিল। ধূমকেতুর আয়ুস্কাল ছিল পাঁচ মাস ষোল দিন। প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১১ আগস্ট ১৯২২ এবং শেষ সংখ্যা ২৭ জানুয়ারি ১৯২৩ (১৩ মাঘ ১৩২৯ বাংলা)। ধূমকেতুর বিজ্ঞাপন নীতি আমরা জানি পত্রিকা প্রকাশের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন তার প্রধান জোগান আসে বিজ্ঞাপন থেকে অর্থাৎ বিজ্ঞাপন হচ্ছে একটি পত্রিকার অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি। তৎকালীন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ভারতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অর্ধ সাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিলেন। সঙ্গত কারণেই তিনি সরকার থেকে কোনো ধরনের আর্থিক বা কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাননি এবং সেটি আশাও করেননি। কারণ কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন আজন্ম সৈনিক এবং তিনি স্বাধীনতার প্রতীক। তিনি পরাধীন ভারতের স্বাধীনতার ঘোষক। সুতরাং ব্রিটিশ সরকার থেকে তিনি কোন ধরনের সহযোগিতা নিতে পারেন না সেটিই স্বাভাবিক। তাই একমাত্র বিজ্ঞাপন অর্থাৎ বেসরকারি বিজ্ঞাপনই ছিল ধূমকেতু পত্রিকার অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি, যদিও কাজী নজরুল ইসলাম কখনই অর্থের কাঙাল ছিলেন না। যারা অর্থ সঞ্চয় করে এবং মানবকল্যাণে ব্যয় করে না তাদেরকে কবি অর্থ-বেশ্যা বলতেন। কাজী নজরুল ইসলামের ধূমকেতু পত্রিকার বিজ্ঞাপন নীতিমালা ছিল নিম্নরূপ: ১। দেশের অনিষ্টকর কোন বিলাতী বিজ্ঞাপন লওয়া হয় না। ২। মদের বিজ্ঞাপন লওয়া হয় না। ৩। কোনরূপ অশ্লীল বিজ্ঞাপন লওয়া হয় না। ৪। দেশীয় বিজ্ঞাপনের মধ্যে যদি এমন কোন ঔষধ বা জিনিস থাকে যাহাতে দেশের লোকের আর্থিক বা নৈতিক ক্ষতি হইতে পারে, সেরূপ কোন বিজ্ঞাপন লওয়া হয় না। ৫। হিন্দু-মুসলমান বিদ্বেষমূলক কোন বিষয়ের বিজ্ঞাপন লওয়া হয় না বা কোন আলোচনা করা হয় না। ৬। মফঃস্বলবাসী ক্রেতাগণ বিজ্ঞাপন-দাতাগণের নিকট প্রতারিত হইয়া আমাদিগকে জানাইলে আমরা তৎক্ষণাৎ সেই বিজ্ঞাপন বন্ধ করিয়া দিব এবং সঙ্গে সঙ্গে দেশবাসীকে সতর্ক করিয়া দিব। ৭। অনাথা বিধবা ও দেশের জন্য যাঁহারা জেল খাটিয়া আসিয়া সামান্য মূলধনের কারবার করিতেছেন, প্রয়োজন হইলে তাঁহাদের বিজ্ঞাপন বিনামূল্যে প্রকাশ করা হয়। ৮। ভারতবর্ষীয় শ্রম, অর্থ ও শিল্পজাত দ্রব্যের বহুল প্রচার উদ্দেশ্যে প্রাপ্ত দ্রব্যের নিরপেক্ষভাবে দোষ-গুণ সমালোচনা করা হয়। ৯। আমাদের কাগজের সোল এজেন্ট বা সাব এজেন্ট নির্দিষ্ট মূল্যের বেশি বা কম লইলে তাহাদের এজেন্সি ছাড়াইয়া দেওয়া হয়। ১০। তিন মাসের বেশি সময় এর জন্য কোনো বিজ্ঞাপনের চুক্তি (contract) করা হয় না।

কাজী নজরুল ইসলাম ধূমকেতু পত্রিকার বিজ্ঞাপন এর জন্য এমন একটি নীতিমালা জারি করেন যা ভাবতে গেল অবাক হতে হয়। যেখানে অর্থ ছাড়া একটি পত্রিকা বের করার প্রশ্নই আসেনা, যেখানে একটি পত্রিকা বের করার সাথে অনেক অর্থ জড়িত থাকে এবং সেই অর্থ সংগ্রহের জন্য যেখানে সরকারের কোনো সহযোগিতা চাওয়া হয়নি, বরং ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাই ছিল যে পত্রিকার মূল কাজ, সেখানে সহযোগিতার একমাত্র জায়গাটি ছিল বেসরকারী বিজ্ঞাপন। কিন্তু কবি তাঁর নীতি ও আদর্শ থেকে কখনো বিন্দু পরিমাণ পিছপা হননি। আর সেজন্যেই ধূমকেতু পত্রিকায় যেখানে বেসরকারি পর্যায় থেকে বিজ্ঞাপন নেয়ার কথা, ঠিক সেই জায়গাটিতে কাজী নজরুল ইসলাম কতগুলো শর্ত জুড়ে দেন এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জারি করেন। সেই নীতিমালা বিশ্লেষণ করলে নজরুল মানসকে পরিষ্কারভাবে আমরা বুঝতে পারি। পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, তিনি কখনো কোন ধরনের অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি। অন্যায়কারী বা যারা অবৈধ অর্থ উপার্জনকারী তাদের কাছ থেকে তিনি কোনো ধরনের সহযোগিতা গ্রহণ করেননি। তার নীতিমালাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সেই বিজ্ঞাপন নীতিমালার মধ্যে তিনি দেশের স্বাধীনতাসহ একটি মানবিক চেতনাসম্পন্ন জাতিগোষ্ঠী তৈরি করার জন্য যা যা করা দরকার সব কিছু মানুষের সামনে পেশ করেছেন। যেমন, তিনি বলছেন যে, মদের কোনো বিজ্ঞাপন নেয়া হয় না; অনাথা, বিধবা ও দেশের জন্য যারা জেল খেটে সামান্য মূলধন নিয়ে কাজ শুরু করছেন তাদের বিজ্ঞাপন প্রয়োজনে বিনামুল্যে প্রকাশ করা হয় ইত্যাদি। এই নীতিমালা একটু খেয়াল করলে আমরা বুঝতে পারবো যে, মাত্র ২৩ বছরের একজন যুবক, যার অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল না, এক কথায় বলতে গেলে যার মাথার উপরে ছাদ বা পায়ের নিচে মাটি নেই, সেই রকম একজন মানুষের কতটা চারিত্রিক দৃঢ়তা, কতটা দূরদর্শিতা, কতটা মানসিক শক্তি থাকলে এই ধরনের বিজ্ঞাপন নীতিমালাসহ একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে পারেন! এখানেই নজরুলের বিশেষত্ব, নজরুলের আকাশ-ভেদী উচ্চতা। কাজী নজরুল ইসলাম আজ থেকে প্রায় একশত বছর আগে আমাদের সামনে নৈতিকতার যে আদর্শিক মাইলফলক স্থাপন করে দিয়ে গেছেন, সেই পথ ধরে যদি আমরা অগ্রসর হতে পারি, তাহলে আমরা সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, আমরা এমন একটি জাতিগোষ্ঠী উপহার দিতে পারব যা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। ধূমকেতু পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্র যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাব যে, বিজ্ঞাপনগুলো ছিল সেই সময়ের স্বাধীনতা আন্দোলনের একেকটি প্রতিচ্ছবি। ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত তিনটি বিজ্ঞাপন নিয়ে আমরা আলোচনা করব। প্রথমটি হলো ঢাকাই জামদানি, ধূতি ইত্যাদি সংক্রান্ত স্বদেশী এজেন্সি; দ্বিতীয়টি অরবিন্দ, বারীন্দ্র ঘোষের বইয়ের প্রকাশক আর্য্য পাবলিশিং হাউস এবং তৃতীয়টি ঝিনুকের অলঙ্কার। প্রথমটি নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। কারণ নামকরণ থেকে স্পষ্ট যে এর মধ্যে স্বদেশী চেতনা এবং বিপ্লববাদের প্রকাশ আছে। বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল: “আমাদের স্বদেশী কারখানায় নতুন ডিজাইনে প্রস্তুত অলংকারগুলি দেখিতে অতি সুন্দর। দেশমাতৃকাগণ ব্যবহারে প্রীতি লাভ করিলে সকল সফল জ্ঞান করিব।” মহিলাদের মাতৃকা হিসেবে উপস্থাপন করা এবং মাতৃকার আগে দেশ শব্দের যোগ আসলেই তৎকালীন সময়ের বিশেষ প্রবণতা যা প্রকৃতপক্ষে কাজী নজরুল ইসলামের আবিষ্কার। ধূমকেতুতে কাজী নজরুল ইসলাম প্রবর্তিত বিজ্ঞাপনের এই যে বৈশিষ্ট্য তার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়েছে অর্থাৎ প্রতিটি সংখ্যায় এই বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাই কিছু কিছু বিজ্ঞাপনের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বদেশী বা শব্দ সেগুলো স্বাধীনতা আন্দোলনের এক একটি প্রতিচ্ছবি। জবাকুসুম তেল এর বিজ্ঞাপন সরাসরি জাগ্রত ভারতের কর্মবীরদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। প্রথমে তো বেশ বড় হরফে একেবারে উপরে লেখা থাকত “আজ ত ভারত জেগেছে”। তার ঠিক নিচেই সেই সময়ের আন্দোলনের মূল দাবি গুলোর কথা- স্বায়ত্ত্বশাসন চাই, দেশীয় শিল্প বাণিজ্যের উন্নতি চাই, দেশের গৌরব বৃদ্ধি করতে চাই, কর্ম্মবীর এই ত’ সুযোগ, মাথা স্থির রেখে অগ্রসর হ’ন। এর নিচে জবাকুসুম তেলের শিশি আর বাক্সের ছবি, তারপর আবার কর্মবীরদের কথা জবাকুসুম তেল অনেক কর্মবীরের মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করতে সাহায্য করছে। সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি সুবিবেচক এর কীর্তি লাভ করতে হলে আপনারও জবাকুসুম তেল চাই। কাজী নজরুল ইসলাম একসময় গান্ধীজির চরকায় সুতা কাটার আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন এবং চরকার গান তিনি রচনা করেছিলেন। ধূমকেতু পত্রিকায় চরকার প্রতীক সম্বলিত বিজ্ঞাপন ছাপা হতো। যদিও কবি পরবর্তীতে বাস্তবসম্মত কারণে স্বরাজ-টরাজ নামীয় আন্দোলনের অসারতা অনুধাবন করে এইসব পথ পরিহার করে নিজের শুদ্ধ পথেই অগ্রসর হন। আমরা আগেই বলেছি, ধুমকেতু পত্রিকায় পরিষ্কারভাবে কাজী নজরুল ইসলাম বলে দিয়েছিলেন যে, আমরা কোন বিলাতি পণ্যের বিজ্ঞাপন ছাপাই না। সে বিষয়ের প্রতিফলন আমরা দেখেছি একটি বিজ্ঞাপনের মধ্যে। শাড়ির দোকান বাসন্তী ভান্ডার তাদের বিজ্ঞাপনে বলছে, কেহ দোকান হইতে বিলাতি অথবা জাপানি কাপড় বাহির করিতে পারিলে অর্থদণ্ড দেয়া হইবে। এ বিজ্ঞাপনের একেবারে উপরে লেখা আছে ৫০০ টাকা পুরস্কার। সেই আমালে ৫০০ টাকা মানে বিপুল পরিমাণ অর্থ। এ বিজ্ঞাপন থেকে দেখা যায় যে, যারা দিত তাদেরকেও তিনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন যে, তারাো তাদের দোকানে বিদেশি পণ্য যেন না রাখে। দেখা যাচ্ছে, তারাও কাজী নজরুল ইসলামের পথ নির্দেশনা মাথা পেতে মেনে নিয়েছিলেন। আর সেরকম অসামান্য শক্তির অধিকারী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ধূমকেতু পত্রিকার বিজ্ঞাপন নীতিমালার মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলাম দেশীয় শিল্পের বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। যেমন হিমানী বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল, “হিমানী বিলাতী স্নোর পাশে সগর্ব্বে দাঁড়াইবার মত জিনিস অথচ সমস্তই দেশীয় উপাদানে প্রস্তুত।“ দেশীয় শিল্পের বিকাশে কতটা নিবেদিতপ্রাণ হলে কাজী নজরুল ইসলাম বিজ্ঞাপনের এমন একটি ধারার প্রচলন করতে পেরেছিলেন তা সহজেই অনুমেয়।
ধূমকেতুর বিজ্ঞাপন নীতি ছিল ১০ টি। প্রথমটি ছিল: “দেশের অনিষ্টকর কোন বিলাতী বিজ্ঞাপন লওয়া হয় না।” এ নীতি প্রকাশের মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলাম ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রকারান্তরে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। ব্রিটিশ পণ্য তথা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে এমন কথা নিজের সম্পাদিত পত্রিকায় লেখার মতো বুকের পাঠা তখন একমাত্র নজরুলেরই ছিল। ধূমকেতুর বিজ্ঞাপন নীতিমালার দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ নীতি অনুযায়ী, ধূমকেতুতে কাজী নজরুল ইসলাম মদের বিজ্ঞাপন নিতেন না, নিতেন না কোন অশ্লীল বিজ্ঞাপন এবং দেশের জনসাধারণের আর্থিক বা নৈতিক ক্ষতি হতে পারে এমন কোন ঔষধের বা উপাদানবিশিষ্ট পণ্যের বিজ্ঞাপন ধূমকেতুতে গ্রহণ করা হতো না। সুদৃঢ় নৈতিক এবং শক্ত ও সমতাভিত্তিক আর্থিক ভিত্তির উপর দেশ-জাতির বিনির্মাণের লক্ষ্যে কাজী নজরুল ইসলাম কতটা নিবেদিতপ্র্রাণ ছিলেন এ থেকে তা সহজেই অনুমান করা যায়। গোটা ভারতবর্ষ যখন সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে অতিষ্ট হয়ে ত্রাহি ত্রাহি করছে, যখন একজন ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় তৃষিত ছিল গোটা ভারতবর্ষের জমিন, সেই সময়টিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অমোঘ বাণী নিয়ে ভারতবাসীর সামনে আবির্ভুত হলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ধূমকেতু পত্রিকার পঞ্চম বিজ্ঞাপন নীতিতে তিনি জানিয়ে দিলেন, ধূমকেতুতে “হিন্দু-মুসলমান বিদ্বেষমূলক কোন বিষয়ের বিজ্ঞাপন লওয়া হয় না বা কোন আলোচনা করা হয় না।” বিজ্ঞাপনের দ্বারা কেউ যেন প্রতারিত না হন সেই বিষয়ে কাজী নজরুল ইসলাম সর্বদা সজাগ থাকতেন। তাঁর নীতিতে সবার উপরে ছিল মানুষ। এজন্যে ধূমকেতুর বিজ্ঞাপন নীতিমালার ৬ নম্বর নীতিতে তিনি পরিস্কারভাবে জানিয়ে দেন, “মফঃস্বলবাসী ক্রেতাগণ বিজ্ঞাপন-দাতাগণের নিকট প্রতারিত হইয়া আমাদিগকে জানাইলে আমরা তৎক্ষণাৎ সেই বিজ্ঞাপন বন্ধ করিয়া দিব এবং সঙ্গে সঙ্গে দেশবাসীকে সতর্ক করিয়া দিব।” জনস্বার্থ এবং ক্রেতা অধিকার ছিল কবির কাছে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। তিনটি বিশেষ শ্রেণির জন্য কবি বিনামূল্যে বিজ্ঞাপন প্রকাশের ঘোষণা দেন। তিনি ঘোষণা করেন: “অনাথা, বিধবা ও দেশের জন্য যাঁহারা জেল খাটিয়া আসিয়া সামান্য মূলধনের কারবার করিতেছেন, প্রয়োজন হইলে তাঁহাদের বিজ্ঞাপন বিনামূল্যে প্রকাশ করা হয়।” এতিম, অসহায়, বিধবা এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য জেল-খাটা বীর সৈনিকদের প্রতি কাজী নজরুল ইসলামের এহেন সহযোগিতা, সমর্থন, উৎসাহ, অনুপ্রেরণা নজিরবিহীন। কবি জানতেন, পলাশী ট্র্যাজিডির পর সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার যাঁতাকলে পিষ্ট পরাধীন ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা যারপরনাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দেশের রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আনয়নের রোড-ম্যাপ তৈরি করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তারই নমুনা মেলে তাঁরই মালিকানা ও সম্পাদনায় প্রকাশিত অর্ধ-সাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকার এ বিজ্ঞাপন নীতিতে: “ভারতবর্ষীয় শ্রম, অর্থ ও শিল্পজাত দ্রব্যের বহুল প্রচার উদ্দেশ্যে প্রাপ্ত দ্রব্যের নিরপেক্ষভাবে দোষ-গুণ সমালোচনা করা হয়।” ধূমকেতু পত্রিকার পেশাগত স্বচ্ছতার কিঞ্চত নমুনা দেখা যেতে পারে এ দু’টি নীতির মধ্যে, “আমাদের কাগজের সোল এজেন্ট বা সাব এজেন্ট নির্দিষ্ট মূল্যের বেশি বা কম লইলে তাহাদের এজেন্সি ছাড়াইয়া দেওয়া হয়” এবং “তিন মাসের বেশি সময় এর জন্য কোনো বিজ্ঞাপনের চুক্তি (contract) করা হয় না।”
এতক্ষণের আলোচনার সারমর্ম হল এই যে, নজরুল নজরুলই। নজরুলের তুলনা নজরুলই। তিনি অনন্য।
লেখক: নজরুল গবেষক। সরকারের উপসচিব।
Σχόλια