নজরুল চেতনায় দেশপ্রেম।। মোঃ জেহাদ উদ্দিন
- মো জেহাদ উদ্দিন
- Jun 22, 2021
- 6 min read
(সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে নজরুল ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২২তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে প্রদত্ত বক্তব্য )

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২২তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে নজরুল ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনায় আজকের এই সেমিনারের সম্মানিত সভাপতি কবি-পৌত্রী জনাব খিলখিল কাজী, প্রধান অতিথি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব কে এম খালিদ এমপি, বিশেষ অতিথি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মানিত সচিব জনাব মোঃ বদরুল আরেফীন, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক জনাব এএফএম হায়াতুল্লাহ, নজরুল গবেষক ও অতিরিক্ত সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, নজরুল ইনস্টিটিউটের সম্মানিত নির্বাহী পরিচালক, নজরুল গবেষক অতিরিক্ত সচিব জনাব মোহাম্মদ জাকীর হোসেন, সম্মানিত আলোচকবৃন্দ সুধীবৃন্দ।
আসসালামু আলাইকুম, শুভ অপরাহ্ন।

কে এম খালিদ, এমপি, প্রতিমন্ত্রী, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক মহোদয় নজরুল চেতনায় দেশপ্রেম বিষয়টি খুব চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর তথ্যবহুল আলোচনা-পর্যালোচনায় আমরা হৃদ্ধ হয়েছি, সমৃদ্ধ হয়েছি। এজন্য তাঁর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
‘নজরুল বাঙলার বিদ্রোহী আত্মা ও বাঙালির স্বাধীন ঐতিহাসিক সত্তার রূপকার’- হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিস্মরণীয় উক্তিখানা আজ বিশেষভাবে স্মরণ করছি।
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতুর্য-কাজী নজরুল ইসলাম প্রেম ও বিদ্রোহের কবি। তবে তাঁর বিদ্রোহের পেছনেও রয়েছে মূলত প্রেম।
কাউকে ভালোবাসার অর্থ যেমন কেবল তার বন্দনা বা গুণকীর্তন করা নয়, বরং তার দুর্দিনে পাশে থাকা, অন্যের আক্রমণ থেকে তাকে সুরক্ষা দেওয়া এবং প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করা। যে প্রেমিক তার প্রেয়সীকে অন্যের হাতে তুলে দেয় কিংবা প্রেয়সীকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করতে সচেষ্ট নয়, সে কেমন প্রেমিক তা বলাই বাহুল্য।

কবি-পৌত্রী খিলখিল কাজী
কাজী নজরুল ইসলামের দেশপ্রেম নির্ভেজাল, নিখাদ। তিনি অকৃত্রিম দরদ দিয়ে দেশকে ভালোবেসেছেন, দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। দেশের মানুষকে, প্রকৃতি, প্রতিটি ধূলিকণার বন্দনা করেছেন তাঁর সমগ্র সৃষ্টি-কর্মে। বাংলাদেশ শব্দের প্রথম সার্থক প্রয়োগ করেছেন, জয় বাংলা শব্দের উদ্ভাবন করেছেন। বাংলাদেশের রূপ-সৌন্দর্য্য ঐশ্বর্য্য অকৃত্রিম অতুলনীয়ভাবে তুলে ধরেছেন, বিশ্বের দরবারে পল্লীজননী বাংলাদেশের ব্রান্ডিং করেছেন, বিশ্বসভায় নেতৃত্বের আসনে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেছেন।
নজরুল একদিকে যেমন লিখেছেন, একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী; নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম/চির মনোরম চির মধুর, ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি কিংবা আমার শ্যামলা বরণ বাংলা মায়ের রূপ দেখে যা আয় রে আয়; অপরদিকে দেশের দুঃখ-দুর্দশায় সবচেয়ে বেশি ক্রন্দন করেছেন তিনিই; স্বাধীনতার লিখিত ঘোষণাপত্র জারি করেছেন, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষকে সুসংগঠিত করেছেন; স্বাধীনতা, সাম্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অবিসংবাদিত বাণী নিয়ে দেশের সর্বত্র চষে বেড়িয়েছেন; কাব্য, সাহিত্য, সঙ্গীত, সাংবাদিকতা, চলচ্চিত্র, বক্তব্য বিবৃতি, অভিভাষণ-সবকিছুতেই দেশের মঙ্গলের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন; দেশের জন্য জেল খেটেছেন, সব ধরনের জুলুম নির্যাতন হাসিমুখে বরণ করেছেন। তাঁর দেশপ্রেম ভীরু-কাপুরুষের দেশপ্রেম নয়, ভণ্ড-প্রতারকের দেশপ্রেম নয়, মাতৃভূমিকে পরদেশি দস্যু-ডাকাতের হাতে বন্দি রেখে আকাশচারী কাব্য রচনার দেশপ্রেম নয়।
শ্রীযু্ক্ত আশুতোষ নারায়ণ চৌধুরী ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে লিখেছেন ‘কবি বিশ্বের, বসন্তের ও আকাশের, এই আমরা জানতাম; কিন্তু কবি যে সঙ্গে সঙ্গে দেশের, শীতের ও নীড়ের হতে পারে তা আমরা জেনেছি সেদিন যখন নজরুলের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে নেহাত অপ্রত্যাশিতভাবে। নজরুলই আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়েছেন “বহু হইতে একের দিকে, বিশ্ব হইতে ঘরের দিকে, আকাশ হইতে নীড়ের দিকে।”
নজরুলের কথা যখন ভাবি তখন মনে হয় তাঁর বিদ্রোহ কেবল অত্যাচারের বিরুদ্ধে নয়-আকাশচারী কবিত্বের বিরুদ্ধেও তাঁর অভিযান।’
দৈনিক বঙ্গবাণী পত্রিকার ৪ আষাঢ় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ জুন ১৯২৩ সংখ্যায় বিপিনচন্দ্র পাল বলেন, আগেকার কবি যাঁহারা ছিলেন তাঁহারা দোতলা প্রাসাদে থাকিয়া কবিতা লিখিতেন। রবীন্দ্রনাথ দোতলা হইতে নামেন নাই। কর্দমময় পিচ্ছিল পথের উপর পা পড়িলে কেবল তিনি নন, দ্বারকানাথ ঠাকুর পর্যন্ত শিহরিয়া উঠিতেন।’
নজরুল ইসলাম কোথায় জন্মিয়াছেন জানি না; কিন্তু তাঁহার কবিতায় গ্রামের ছন্দ, মাটির গন্ধ পাই। দেশে যে নূতন ভাব জন্মিয়াছে তাহার সুর পাই। তাহাতে পালিশ বেশি নাই; আছে লাঙলের গান, কৃষকের গান।….মানুষে মানুষে একাত্ম সাধন এ অতি অল্প লোকেই করিয়াছে। কাজী নজরুল ইসলাম নূতন যুগের কবি।…
নজরুল ছিলেন পরাধীন দেশের স্বাধীন কবি। তিনি তাঁর দায়িত্ব ও অঙ্গীকার সম্বন্ধে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। দেশবাসীকে তিনি সাহসের সঙ্গে তাঁর উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন: বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এর অভিযান সেনাদলের তূর্য-বাদকের একজন আমি-এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
তবে আমরা লক্ষ্য করলে দেখব, উনবিংশ শতকে জাতীয়তা ও স্বদেশপ্রেমের মন্ত্র নানানভাবে উচ্চারণ করছিলেন মাইকেল-হেম, বঙ্কিম-নবীনচন্দ্র রাজ নারায়ণ বসু, সুরেন্দ্রনাথ, আনন্দমোহন বসু, বিপিনচন্দ্র পাল, চিত্তরঞ্জন দাশ, শ্রী অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখ। স্বদেশি চেতনা এ সময় জন্ম দিয়েছে বহু কবি-সাহিত্যিকের বহু দেশাত্মবোধক কবিতা, গান, নাটক, গল্প ও উপন্যাসের। তবে এই স্বাধীনতাবোধ ছিল দ্বিধান্বিত—এই জাতীয়তাবোধ ছিল খণ্ডিত। আমরা লক্ষ্য করলে দেখব, গোটা উনিশ শতক জুড়ে তারা স্বাধীনতা বলে ধ্বনি দিয়েছেন। রঙ্গলাল তো স্বাধীনতাহীন জীবনকে জীবন বলেই স্বীকার করেননি, হেমচন্দ্র ‘গোলামের জাতি’কে রীতিমতো তরবারি ধারণ করে ‘ভারত উদ্ধার’ করার আহ্বান জানান---কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার এইসব স্বাপ্নিক ইংরেজ সরকারকে দেখেছেন বিধাতার আশীর্বাদ হিসেবে। আনন্দমঠের বিজ্ঞাপনে বঙ্কিম লিখেনঃ ‘ইংরেজ বাংলাদেশকে অরাজকতা হইতে উদ্ধার করিয়াছে।’ প্রিন্স অব ওয়েলস-এর ভারত আগমন উপলক্ষে হেমচন্দ্র রচনা করেন ‘ভারত-ভিক্ষা’ (ডিসে ১৮৭৫), নবীনচন্দ্র লিখেন ‘ভারত উচ্ছ্বাস’ (১৮৭৫)। এ রকম নজির রয়েছে ভুরি ভুরি। অবশ্য একটি বাস্তব বিষয়ও এখানে কাজ করেছে বলে অনেকে মনে করেন। এসব কবি-সাহিত্যিক ছিলেন মধ্যবিত্ত শ্রেণির। জীবিকার জন্য ইংরেজ সরকারের ক্ষমতা ও প্রতাপ চিরস্থায়ী জ্ঞান করতেন তারা এবং এদের উৎখাত করা যাবে এরকম চিন্তাও করতেন না। তবে বিদেশি সরকারের অত্যাচার-উৎপীড়ন তাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেনি এ কথা বলা যাবে না। অনেকের লেখায় ক্ষীণভাবে তা ফুটে ওঠেছে। কিন্তু স্পষ্টভাবে সরকারের বিরোধিতা করার ঝুঁকি তারা নিতে চান নি। ব্যতিক্রম নীলদর্পণ। তবে তাতেও ভূমিকায় মহারাণী ভিক্টোরিয়া ও লর্ড ক্যানিং এর প্রশংসা বাদ পড়েনি। তা সত্ত্বেও দীনবন্ধু সততা ও সাহসে সমুজ্জ্বল।
ইংরেজ সরকারের স্থায়িত্ব কামনা করেছেন-উনিশ শতকে এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই। ইংরেজ শাসনের প্রতি ছিল তাদের অবিচল আস্থা, ইংরেজের সুবিচারের প্রতি ছিল অগাধ ভক্তি। ফলশ্রুতিতে নিয়মতান্ত্রিকতা রক্ষা করাই ছিল তাদের পবিত্র ব্রত। গোটা উনিশ শতকের ভারতের রাজনীতি এমন নিয়মতান্ত্রিক পথ ধরেই অগ্রসর হচ্ছিল। তবে এ শতকের শেষের দিকে মধ্যবিত্তের চেতনায়ও বিদ্রোহ প্রকাশ পেতে থাকে। তারা বুঝতে পারে, ‘নানা কায়দায় লুঠ করে নেওয়া বৃটেনে যে সম্পদ চলে যাচ্ছে তা বন্ধ হওয়া খুবই জরুরি।
পরববর্তীতে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ডামাডোলের মধ্যে ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলিম লীগের অভ্যূদয় নতুন মাত্রা যুক্ত করে। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার পথ ধরে এসময় অনেক দেশাত্মবোধক গান রচিত হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের পরিণতি তথা বঙ্গভঙ্গ রদ হলে ১৯১১ সালে ইংরেজ রাজা পঞ্চম জর্জকেই বন্দনা করে গান লিখতে দেখা গেছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজ সরকার নানান-সুযোগ সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েই ভারতবাসীর সাহায্য পেয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ জয়ের পর তারা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার পরিবর্তে ভারতবাসীকে কুখ্যাত রাউলাট আইনের শৃঙ্খলে বাঁধার ব্যবস্থা করে। প্রায় দেড়শ’ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দুঃশাসনে ভারতের তখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা; নজরুলের ভাষায়-‘অন্নদা-সুত ভিক্ষা চায়, কী কহিব এরে কপাল বৈ”!
কাজী নজরুল ইসলাম এলেন, দেখলেন এবং দেশমাতার মুক্তির জন্য সোচ্চার হলেন। ইংরেজের দুঃশাসন, স্বাধীনতার জন্য অকার্যকর, অস্পষ্ট ভুল পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন; বজ্রনিনাদে ঘোষণা দিলেন:
ভারত হবে ভারতবাসীর—এই কথাটাও বলতে ভয়
সেই বুড়োদের বলিস নেতা—তাদের কথায় চলতে হয়!
দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করলেন: সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝিনা। কেননা এ কথাটার মানে একেক মহারথি এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাককে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশির মোড়লী করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যারা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এদেশে মোড়লী করে দেশকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করেছেন, তাদের পাততাড়ি গুটিয়ে বোঁচকা-পুটুলি বেঁধে সাগড় পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন-নিবেদন করলে তারা শুনবেন না। তাদের অতটুকু সুবুদ্ধি এখনও হয়নি। আমাদের এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকু দূর করতে হবে। (অর্ধ-সাপ্তাহিক ধূমকেতু, ১৩ অক্টোবর, ১৯২২)
দেশের স্বাধীনতার জন্য নজরুলের অবদান বলে বা লিখে শেষ করা যাবে না। দেশপ্রেমিক এই মহামনীষী ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৫/৬ এপ্রিল কলিকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির রজত জুবিলী উৎসবে সভাপতি হিসেবে জীবনের শেষ অভিভাষণে বলেছিলেন, ‘যদি আর বাঁশি না বাজে-আমি কবি বলে বলছিনে-আমি আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছিলাম সেই অধিকারে বলছি-আমায় আপনারা ক্ষমা করবেন-আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি-আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম-সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।
হিন্দু মুসলমানে দিন-রাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র্য, ঋণ, অভাব-অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষাণস্তুপের মতো জমা হয়ে আছে—এই অসাম্য এই ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে, সঙ্গীতে, কর্মজীবনে অভেদ সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম—অসুন্দরকে ক্ষমা করতে, অসুরকে সংহার করতে এসেছিলাম-আপনারা সাক্ষী আর আর সাক্ষী আমার পরম সুন্দর।
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর কাজী নজরুল ইসলামকে প্রদত্ত জাতীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিজ্ঞানাচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বলেছিলেন, আজ নজরুল ইসলামকে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলে শ্রদ্ধা নিবেদন করিতেছেন। কবিরা সাধারণত কোমল ও ভীরু; কিন্তু নজরুল তা নন। কারাগারে শৃঙ্খল পরিয়া বুকের রক্ত দিয়া তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহা বাঙালির প্রাণে এক নতুন স্পন্দন জাগাইয়া তুলিয়াছে।’
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর বক্তব্যে বলেন, স্বাধীন দেশে জীবনের সাথে সাহিত্যের স্পষ্ট সম্বন্ধ আছে, আমাদের দেশে তা নেই। নজরুলকে তার ব্যতিক্রম দেখা যায়। নজরুল জীবনের নানাদিকে থেকে উপকরণ সংগ্রহ করেছেন। তার মধ্যে একটা আমি উল্লেখ করবো। কবি নজরুল যুদ্ধের ঘটনা দিয়ে কবিতা লিখেছেন। কবি নিজে বন্দুক ঘাড়ে করে যুদ্ধ করেছিলেন, কাজেই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সব কথা লিখেছেন তিনি। আমাদের দেশে এইরূপ ঘটনা কম, অন্য স্বাধীন দেশে খুব বেশি। এতেই বোঝা যায় যে, নজরুল একটা জ্যান্ত মানুষ।
কারাগারে আমরা অনেকেই যাই, কিন্তু সাহিত্যের মধ্যে সেই জীবনের প্রভাব কমই দেখতে পাই। তার কারণ অনুভূতি কম। কিন্তু নজরুল যে জেলে গিয়েছিলেন, তার প্রমাণ তাঁর লেখার মধ্যে অনেক স্থানে পাওয়া যায়। এতেও বোঝা যায় যে তিনি একটি জ্যান্ত মানুষ। তাঁর লেখার প্রভাব অসাধারণ। তাঁর গান পড়ে আমার মতো বেরসিক লোকেরও জেলে বসে গাইবার ইচ্ছা হতো। আমাদের প্রাণ নেই তাই আমরা এমন প্রাণময় কবিতা লিখতে পারি না।
নজরুলকে বিদ্রোহী কবি বলা হয় এটা সত্য কথা। তাঁর অন্তরটা যে বিদ্রোহী তা স্পষ্টই বোঝা যায়। আমরা যখন যুদ্ধে যাবো—তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাবো, তখনও তাঁর গান গাইবো।
আমি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সর্বদাই ঘুরে বেড়াই। প্রাদেশিক ভাষায় জাতীয় সঙ্গীত শুনবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’র মতো প্রাণ-মাতানো গান কোথাও শুনেছি বলে মনে হয় না।
কবি নজরুল স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটা শুধু তাঁর নিজের স্বপ্ন নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির স্বপ্ন।’
সবশেষে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে আমাদের মনে রাখতে হবে, নজরুলের স্বদেশপ্রেম সংকীর্ণ কোনো বিষয় নয়। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলেই আমি এই দেশেরই এই সমাজেরই নই, আমি সকল দেশের সকল মানুষের।’ আর তাই, তাঁর দেশপ্রেমের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে গড়ে তোলা যায় একটি সুন্দর পৃথিবী। সেই প্রত্যাশায় আমার বক্তব্য শেষ করছি। সকলকে ধন্যবাদ।
বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা। ২০ জুন ২০২১ খ্রি.।
Comentarios