পুরান ঢাকার ঘুমন্ত ইতিহাস: হেকিম হাবিবুর রহমান ।। মোঃ জেহাদ উদ্দিন
- মো জেহাদ উদ্দিন
- Apr 2, 2022
- 3 min read

এক সময় তিনি নিজেই বেদনার সাথে লক্ষ্য করছিলেন যে, ঢাকার বহু ইতিহাস বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এবং ইতিহাসের গর্ভে এমনভাবে সেগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে যে, সেগুলো হয় তো আর কোনদিন খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই আশঙ্কা থেকে তিনি তাঁর সময় পর্যন্ত তখনো ইতিহাসের অবশিষ্টাংশ যেগুলো ছিল সেগুলো সংরক্ষণ করবার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তারই একটি উজ্জ্বল নিদর্শন হচ্ছে তাঁর লিখিত ‘আসুদাগানে ঢাকা’ যার অর্থ হলো ঢাকায় নিদ্রিত মহান ব্যক্তিবর্গ। তৎকালীন ঢাকায় যেসকল বুযুর্গানে দ্বীনের মাজার ছিল এবং সেই মাজারগুলোতে যারা শায়িত আছেন সেই মহান ব্যক্তিবর্গের ইতিহাস তিনি অত্যন্ত যত্নের সাথে তুলে ধরেছেন তার এই গ্রন্থটিতে। ঢাকায় নিদ্রিত মহান ব্যক্তিবর্গকে স্মরণে রাখবার জন্য তিনি রচনা করেছিলেন আসুদাগানে ঢাকা। সেই তিনি নিজেই শায়িত আছেন আজিমপুর দায়রা শরীফে। আমরা ক’জনই বা জানি তার নাম কিংবা তার অবদানের কথা! তিনিও আজ বিস্মৃতির প্রায় অতলে তলিয়ে গেছেন! তিনি ছিলেন আশরাফ আলী থানভী রহমাতুল্লাহ আলাইহির সরাসরি ছাত্র, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ব্যক্তিগত চিকিৎসক, ১৯০৬ সালের ৩০ শে ডিসেম্বর ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সদস্য, ১৯০৮ সালে জুন মাসে ঢাকায় গঠিত মুসলিম লীগের অঙ্গসংগঠন পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯২০ সালের ১১ ই এপ্রিল গঠিত ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট মুসলিম এসোসিয়েশন এর সম্পাদক। তিনি ১৯৩০ সালে গঠিত টাঙ্গাইল মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ১৯৪৬ সালের নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সিনেট সদস্য এবং ঢাকা জাদুঘরের উদ্যোক্তা। হাজার ১৯১২ সালের ২৫ শে জুলাই নর্থব্রুক হলে ঢাকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সভা ডাকা হয়। এ সভায় তিনি ঢাকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব কেবল সমর্থন করেন নি, বরং ২০০০ টাকা অনুদান প্রদান করেন এ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার জন্য। এর মাধ্যমে ঢাকার পুরাতন সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং অর্থাৎ বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুটি কক্ষে ১৯১৩ সালের ৭ ই আগস্ট ঢাকা জাদুঘর এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। তিনি ১৯৩৩ সালে ঢাকা জাদুঘর কে তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগ্রহ করা ২২১ টি পুরনো স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা প্রদান করেন। তিনি ১৯৪২ সালে ঢাকা পৌরসভার কমিশনার মনোনীত হন। হাজার ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুর্ভিক্ষে তিনি ছোট কাটারা নিজ বাড়িতে লঙ্গরখানা খুলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১ শ' মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি নিজ খরচে উদ্যোগে ঢাকার মহল্লায় মহল্লায় সমাজসেবামূলক ক্লাব ও রাত্রিকালীন স্কুল স্থাপন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কমিশনার হিসেবে ঢাকা পৌরসভার সকল কর্মকান্ডে অক্লান্তভাবে জনসেবায় অবদান রাখেন। তারে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন ঢাকা পৌরসভা পরিচালিত একটি প্রাইমারি স্কুলের নামকরণ করা হয় ‘শেফা-উল-মুলক ফ্রি প্রাইমারি স্কুল’ এবং চক মোগলটুলী থেকে ছোট কাটরা হয়ে সোয়ারিঘাট পর্যন্ত রাস্তার নামকরণ করা হয় তার নামে। ঢাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ঢাকার ইতিহাসে সংঘটিত তিনটি মারাত্মক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ১৯২৬ সালে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সংঘটিত দাঙ্গা, ১৯৩০ সালের মে মাসে এবং ১৯৪১ সালের মার্চ মাসের দাঙ্গা-পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪০ সালের জুলাই মাসে রথযাত্রা উপলক্ষে সংঘটিত দাঙ্গায় মদনমোহন বসাক লেনে অবস্থিত কয়েকটি মুসলমান দোকানে আগুন লাগানো হলে তিনি নিজে জনতাকে শান্ত করেন এবং দুইশত টাকা চাঁদা তুলে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদারদের ক্ষতিপূরণ করে দাঙ্গা-পরবর্তী প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডকে নিবারণ করেন। তার প্রতিষ্ঠিত তিব্বিয়া হাবিবিয়া কলেজ আমাদের অহংকার এর জায়গা। যাঁর কথা এতক্ষণ বলছিলাম তিনি হেকিম হাবিবুর রহমান। তাঁর সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ঢাকা শহরে হেকিম হাবিবুর রহমান ছিলেন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু ঢাকার একজন ভালো চিকিৎসকই ছিলেন না, ছিলেন রাজনৈতিক নেতা, ইতিহাসবিদ, সাহিত্যসেবী ও সমাজকর্মী। ১৮৮১ সালের ২৩ মার্চ ছোটকাটরায় হাকিম হাবিবুর রহমানের জন্ম। তাঁর পিতা মাওলানা মুহম্মদ শাহ পাকিস্তানের পেশোয়ার থেকে জীবিকার অন্বেষণে ঢাকায় আসেন এবং নওয়াব আহসান উল্লাহর এস্টেটে চাকরির সুবাদে ঢাকায় স্থায়ী হন। হাবিবুর রহমান ঢাকা সরকারি মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর কানপুরে হজরত আশরাফ আলী থানভীর (র.) কাছ থেকে আরবি ব্যাকরণ এবং লক্ষ্নৌ, দিল্লি ও আগ্রা থেকে ইউনানি চিকিৎসায় জ্ঞানার্জন করে ১৯০৪ সালে ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকায় এসে ইউনানি চিকিৎসা শুরু করার পর চিকিৎসক হিসেবে এত খ্যাতি অর্জন করেছিলেন যে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৯ সালে তাঁকে ‘শাফাউল্ মুলক’ উপাধিতে ভূষিত করেন। মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী হেকিম হাবিবুর রহমান নওয়াব সলিমুল্লাহর একজন রাজনৈতিক পরামর্শদাতা ছিলেন, পাশাপাশি তিনি গ্রন্থ রচনায়ও মনোনিবেশ করেন, তাঁর সব গ্রন্থই ছিল উর্দু ভাষায় রচিত। অনেক লেখার মধ্যে ঢাকা সম্পর্কিত তাঁর দুটি বিখ্যাত বই হলো—আসুদগান-এ-ঢাকা (ঢাকা-১৯৪৬) ও ঢাকা পাচাশ্ বারস্ পহেলে (লাহোর ১৯৪৯)। এ ছাড়া তাঁর কিছু অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে। ঢাকায় উর্দু সাংবাদিকতায় তিনি ছিলেন একজন পথিকৃৎ। ১৯০৬ সালে ঢাকা থেকে তিনি ‘আল মাশরিক’ নামের একটি উর্দু মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং ১৯২৪ সালে খাজা আদেলের সঙ্গে যৌথভাবে ‘জাদু’ নামের অন্য একটি মাসিক পত্রিকাও প্রকাশ করেন। ১৯৩০ সালে তিনি ‘তিব্বিয়া হাবিবিয়া কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো ইউনানি মেডিক্যাল কলেজ। উল্লেখযোগ্য হারে তিনি ঐতিহাসিক নিদর্শন ও মুদ্রা সংগ্রহ করেছেন, ১৯৩৬ সালে তিনি স্বর্ণ ও রৌপ্য মিলিয়ে মোট ২৩১টি পুরনো মুদ্রা ঢাকা জাদুঘরে দান করে যান। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশে ১৯৯৪ সালে ‘হাকিম হাবিবুর রহমান ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। চার পুত্র ও দুই কন্যার জনক হাকিম হাবিবুর রহমান ১৯৪৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন এবং আজিমপুর দায়রা শরিফে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। (কিছু তথ্য ও লেখা ইন্টারনেট থেকে গৃহীত)
Comments