top of page

বিদ্রোহী কবিতার ১০০ বছর ।। রফিক সুলায়মান

বিশ্বের আর কোন ভাষার একক একটি কবিতা এতো পঠিত হয়েছে কিনা আমাদের জানা নেই। নজরুল আর বিদ্রোহী আজ সমার্থক। অথচ কবিতাটি লিখিত হয়েছিলো কবির ২২ বছর বয়সে।

১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কবিতাটি লিখিত হলেও প্রকাশ পায় ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি বিজলী পত্রিকায়। এরপর আরো একাধিক পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হতে থাকে আগস্ট ১৯২২ পর্যন্ত। অভূতপূর্ব ছন্দ আর অনন্য শব্দালংকারের মূর্ছনায় বাঙালি গত ১০০ বছর ধরে বুঁদ হয়ে আছে 'বিদ্রোহী' কবিতায়।

এই কবিতা যখন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তখন নজরুলের কোন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় নি। তবে বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর কিছু কবিতা এবং গদ্য রচনা 'বাঁধন হারা' প্রকাশিত হয়েছিলো। এর মধ্যে 'বাদল প্রাতের শরাব' এবং 'খেয়া পারের তরণী' কবিতাদুটো নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখে ফেলেছিলেন কবি-প্রাবন্ধিক মোহিতলাল মজুমদার। এই প্রবন্ধের কল্যাণে নজরুলের নামটি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত পৌঁছায়। 'বিদ্রোহী' প্রকাশের আগে ডক্টর শহিদুল্লাহ'র সাথে নজরুল একবার শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদও নিয়ে এসেছিলেন।

আসানসোলের বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সাহিত্যিক অরুণাভ সেনগুপ্ত জানান, '১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের একরাতে রচিত হয়েছিল এই বিদ্রোহী কবিতা। সেই রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি নেমেছিল। খুব দ্রুততার সঙ্গে নজরুল এই লেখা সেই রাতে শেষ করেছিলেন। শোনা যায় দোয়াতের কালি শেষ হয়ে আসছিল তাঁর লেখনীর সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে । আর সেই কারণে তিনি পেন্সিলে এই কবিতা লিখেছিলেন। একটি টেলিগ্রাফ কাগজের উপর এই কবিতা রচনা করেন তিনি। ১৯২২ সালের জানুয়ারি মাসে 'বিজলী' পত্রিকায় এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। কিন্তু বিজলি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরেই তুমুল আলোড়ন উঠেছিল কবিতাটিকে নিয়ে। এমনকী প্রকাশকালে একই সপ্তাহের মধ্যে দু'বার ওই কবিতাটি ছাপতে হয়েছিল। এক সপ্তাহে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ এই কবিতাটি পড়েছিলেন। একদিকে যেমন তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দেয় নজরুলকে। তেমনি তিনি পরিচিত হন 'বিদ্রোহী' কবি হিসেবে।'


কী আছে বিদ্রোহী কবিতায়? কী নেই বিদ্রোহী কবিতায়! এই দ্রোহ কার বিরুদ্ধে? এটিই কী বাংলা ভাষার প্রথম অসাম্প্রদায়িক কবিতা! - এরকম অনেক অনেক প্রশ্নের উদয় হবে কবিতাটি পাঠ করলে। ইংরেজ সরকার কবিতাটির অনুবাদ করিয়েছিলো। অনুবাদক এবং প্রশাসন কিছু হিন্দু মিথ ছাড়া কবিতাটিতেই 'দ্রোহের' কিছুই খুঁজে পায় নি! অসাম্প্রদায়িক চেতনা তো কবিতার পরতে পরতে। ক্ষ্যাপা দূর্বাসা'র সাথে ইসরাফিলের সিঙ্গা, তেজী বোরাকের সাথে উচ্চঃশ্রৈবার ব্যবহার কবির অসাম্প্রদায়িক চেতনার তীব্র প্রকাশ।


বিদ্রোহী কবিতার প্রকাশ অভিনব। আল কোরানে শরীফে 'পড়ো' এবং 'বলো' দিয়ে পাঁচটি সুরা শুরু হয়েছে, আমরা জানি। বিদ্রোহী কবিতাও 'বলো' দিয়ে শুরু হয়েছে। পড়ো এবং বলো কোরানে এসেছে কোমল নির্দেশ স্বরূপ, এখানে কবির আত্মা কবিকে নির্দেশনা দিচ্ছেন 'বলো বীর / বলো উন্নত মম শির।' এই কবিতা রচনার দশককাল আগেই রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির' কবিতাটি। বিদ্রোহী কী এই কবিতার তরঙ্গায়িত বিস্তৃত রূপ!


বিদ্রোহী কবিতা যতোটা জনপ্রিয়, বস্তুত ততোটা সহজ অনুধাবনযোগ্য নয়। কোন সাধারণ পাঠক এর শব্দমালার ঝনঝনানিতে যতোটা মুগ্ধ হবেন, ততোটা অনুধাবন করতে পারবেন না। এটি সহজ 'জল পড়ে পাতা নড়ে' টাইপ কবিতা নয়। মহাসমুদ্র মন্থন করে রচিত হয়েছে এর ১৩৯টি পঙক্তি। পঙক্তিসমূহ আবার নানান ভাগে ভাগ করা। বিদ্রোহীকে ব্যাখ্যা করতে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন মহাবিশ্বের সকল পুরাণের। ভগবান শিবকে নিয়ে এসেছেন রুদ্র, নটরাজ, ধুর্জটি, পিনাক ইত্যাদি রূপে। হিন্দোল রাগকে ব্যবহার করেছেন তিন তিন বার। ভৃগুর পুত্র জমদগ্নিকে নিয়ে এসেছেন, কারণ তিনি জ্বলন্ত প্রদীপকে কখনো নিভতে দেন না। কবির দ্রোহ যেন আমৃত্যু চলমান থাকে এই একটি পৌরাণিক চরিত্রই তা প্রকাশ করে দিয়েছে।


কবির দ্রোহ কার বিরুদ্ধে? রাজবন্দির জবানবন্দীতে কবি তা স্পষ্ট করেছেন। অবশ্য গোলাম মুর্শিদ তা জানেন না। তবে আশার কথা হলো পণ্ডিত শিবনারায়ণ রায় স্পষ্ট করে বলেছেন, সমাজের নির্যাতিত উৎপীড়িতের পক্ষে এর আগে কেউ কলম ধরেন নি। নজরুল এ ক্ষেত্রে অনন্য। 'যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না' - এই চরণেই কবি সব বলে দিয়েছেন কেন তিনি 'বিদ্রোহী।'


বিদ্রোহী কবিতার ১০০ বছর - ২


এ বছর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' কবিতা রচনার ১০০ বছর। কিছুদিন আগে এ নিয়ে একটি উপক্রমণিকা পত্রস্থ করেছি। আজ আমরা বাংলা কবিতার দিক পরিবর্তনকারী এই কবিতাটিতে ব্যবহৃত কতিপয় শব্দের অর্থ জেনে নেয়ার চেষ্টা করবো। অনেকেই হয়তো জানেন, তবু একবার আমাদের স্মৃতি নবায়ন করে নিচ্ছি।

আগের লেখায় উল্লেখ করেছিলাম যে বহুলপঠিত কবিতা হলেও 'বিদ্রোহী' কোন সহজবোধ্য কবিতা নয়। এটি বেশ জটিল, দীর্ঘ, মিথ ও উপমানির্ভর কবিতা।

নেহারি - দেখা

রুদ্র - ভগবান শিব

নটরাজ - শিব

ধূর্জটি - শিব

বিদ্রোহী-সূত - বিদ্রোহী-জাতক / পুত্র

হাম্বীর, ছায়ানট, হিন্দোল - সঙ্গীতের রাগবিশেষ

সাগ্নিক - যিনি প্রদীপ নিভতে দেন না

জমদগ্নি - ভৃগুর পুত্র [তিনি প্রদীপকে কখনো নিভতে দেন নি]

ব্যোমকেশ - মহাদেবের কেশ

গঙ্গোত্রী - হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত গাড়োয়াল রাজ্যে প্রবাহিত গঙ্গার উৎসমুখ

ওঙ্কার - আদি ধ্বনি [এই নামে প্রখ্যাত লেখক আহমদ ছফা'র একটি উপন্যাস আছে]

ইস্রাফিল - মহান রবের দূত, শিঙ্গা হাতে অপেক্ষমান। তিনি কিয়ামত সৃষ্টি করবেন রবের নির্দেশে।

সরসিজ - পদ্মফুল

দুর্বাসা - মহান মুনি ঔর্বা'র কন্যাকে পুড়িয়ে মেরেছিলেন যিনি

প্রভঞ্জন - ঝড়

পিনাক - শিব

বারিধির - সাগর

আঁচর - আঁচল

কাঁচুলি - অন্তর্বাস

নিচোর - শরীরের নিম্নভাগে পরিধেয় পোশাক

অনিল - বাতাস

তুরীয়ানন্দে - প্রাণখোলা আনন্দে

বোরাক - উড়তে সক্ষম এমন ঘোড়া [ইসলাম পর্যায়]

উচ্চৈশ্রবা - উড়তে সক্ষম এমন ঘোড়া [হিন্দু পর্যায়], ইন্দ্রঘোটক নামেও পরিচিত। দেবাসুরের সমুদ্রমন্থনকালে এর সৃষ্টি।

হাবিয়াহ - একটি ভয়াবহ টর্চার সেল / দোজখ

অর্ফিয়াস - গ্রীক সুরদেবতা

যুগলকন্যা - লক্ষ্মী-স্বরসতী

এই কতিপয় শব্দের অর্থ জানা থাকলে 'বিদ্রোহী' কবিতাটি পাঠ করে আরো আনন্দ পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস। উল্লেখ্য, 'বিদ্রোহী' ছাড়া পূজারিণী, মানুষ, ইন্দ্রপতন, সব্যসাচী ও বারাঙ্গনা কবিতায় নজরুল হিন্দু-মুসলিম মিথ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন।


বিদ্রোহী কবিতার ১০০ বছর - ৩


নজরুল যখন বিদ্রোহী লিখেছিলেন, সে সময় তিনি কী করতেন? আমরা জানি যে আঠারোর ঘরে যখন তিনি, তখনই জীবিকার প্রয়োজনে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। সময়টি ১৯১৭ সাল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যৌবনকাল।

তাঁর ব্যাটেলিয়নের নাম ছিলো ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট। প্রথমে ফোর্ট উইলিয়ামে, এরপর প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায়। এই ব্যাটেলিয়ন এক পর্যায়ে ইরাক যাওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় সেটি আর হলো না। স্রষ্টাকে ধন্যবাদ, যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় আমরা সৈনিক নজরুল থেকে কবি নজরুলকে পেয়েছিলাম।


গোলা-বারুদের পাশাপাশি সে-সময় কবির সাথে ছিলো আরো কয়েকটি মূল্যবান জিনিষ। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আর হাফিজের কবিতার বই। এভাবেই পঠনপাঠনের মধ্য দিয়ে নজরুল নিজেকে কিছু একটার জন্য তৈরী করছিলেন। সাথে শিখছিলেন ফার্সি ভাষা, নিজ ব্যাটেলিয়নের এক মৌলভীর কাছে।


যুদ্ধ শেষ হওয়ায় বৃটিশ বাহিনী ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টকে টানার প্রয়োজনীয়তা মনে করে নি। এখানেও অনড় বিধিলিপি। তিন বছরেই সৈনিক জীবন শেষ। কর্পোরাল সৈনিক থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার হয়েছিলেন তিনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এই সৈনিকের অসাধারণ একটি আলোকচিত্র আমরা দেখতে পাই। করাচী সেনানিবাসে থাকার সময় তিনি কলিকাতার বেশকিছু সাময়িকীর গ্রাহক হয়েছিলেন। প্রবাসী, ভারতী, মর্মবাণী, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, সওগাত ইত্যাদি। এক পর্যায়ে সৈনিক জীবন শেষ করে কলিকাতায় ফিরে এলেন তিনি। উঠলেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার এক কর্মকর্তার কক্ষে, যাঁর নাম মুজাফফর আহমেদ। শুরু হলো নজরুলের সাংবাদিকতা ও সাহিত্য জীবন। এ-সময় বেশকিছু গদ্য ও কবিতা লিখে ফেললেন। গুরুত্বপূর্ণ গদ্য বাঁধনহারা, কবিতা শাত-ইল-আরব, মোহররম, বাদল প্রাতের শরাব, ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম, খেয়াপারের তরণী সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল মানুষের নজর কাড়ে।


এ-সময়ে সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার অসামান্য এক কাজ করে ফেললেন। বাদল প্রাতের শরাব এবং খেয়া পারের তরণী কবিতা দুটোর ভাষা, ছন্দ, শব্দালংকার, শৈলী নিয়ে প্রশংসাসূচক নিবন্ধ প্রকাশ করেন মোসলেম ভারত পত্রিকায়। বাংলার সুধীকূল নড়েচড়ে বসলেন। নজরুলের নাম রাতারাতি পৌঁছে গেল রবীন্দ্র-বলয় থেকে শুরু করে সকল মহলে। ভাষাবিদ শহিদুল্লাহ'র সাথে একবার শান্তিনিকেতনও ঘুরে এলেন রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ আনতে। এই পরিচয় আমৃত্যু অটুট ছিলো।

এরপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। শতবর্ষ আগে ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কলিকাতার তালতলা লেনের একটি বাড়ীতে নজরুলের হাতে রচিত হলো ঐশ্বরিক ১৩৯টি পঙক্তি। বাঙালি এর আগে কবিতা বলতে যা বুঝতো, এর ভাষা একেবারেই ভিন্নধর্মী। মহাসমুদ্র মন্থন করে কবি 'বিদ্রোহী'র শব্দমালা হাজির করেছেন। কোন অচিনলোক থেকে কোন দিব্যশক্তি কবির হাত দিয়ে যেন লিখিয়ে নিয়েছে কবিতাটি। যথার্থই যেন 'জাগিয়ে দে রে চমক মেরে আছে যারা অর্ধচেতন।' মাত্রাবৃত্ত ও মুক্তক ছন্দের এক মিলিত প্রবাহ 'বিদ্রোহী।' কাজী সব্যসাচী'র কণ্ঠে যাঁরা কবিতাটির পাঠ শুনেছেন তাঁরা দয়া করে এই অংশটুকু আরেকবার শুনবেন :

'আমি বসুধা বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি বাড়ব-বহ্নি কালানল

আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথার কলরোল কল কোলাহল

আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ

আমি ত্রাস সঞ্চারী ভুবনে সহসা সঞ্চারি ভূমিকম্প।' - এই অংশটুকুতে ছন্দের সঙ্গে লয়ের এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়েছেন কবিপুত্র কাজী সব্যসাচী।


কবি কলিকাতায় এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন।


কবি প্রতিকৃতি : Aloptogin Tushar

Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page