top of page

ব্রাদার হ্যারল্ড বিজয় রড্রিক্স: দূর আকাশের ধ্রুবতারা।। মোঃ জেহাদ উদ্দিন

Updated: May 26, 2021




২০১৩ থেকে ২০২০-দীর্ঘ প্রায় সাত বছর আমি ব্রাদার ডঃ বিজয় হেরাল্ড রড্রিক্স, সি.এস. সি’র ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে ছিলাম, তাঁর সাথে বিভিন্ন ধরনের কাজ করার সুযোগলাভে ধন্য হয়েছি। একজন মানুষকে বুঝবার জন্য সাত বছর নেহায়েত কম সময় নয়। সুদীর্ঘ এই সময়ে আমি ক্ষণকালের জন্যও তাঁর ছায়া থেকে দূরে সরতে পারিনি। তাঁর অসামান্য ব্যক্তিত্ব, কর্মস্পৃহা, স্নেহ-ভালোবাসা, মানবিক মূল্যবোধ, সাংগঠনিক দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি ইত্যাদি আমার মতো অগণিত গুণগ্রাহীকে তাঁর কাছে টেনে নিয়ে আসত। তাঁর সাথে আমি অনেক কাজ করেছি, কাজের টানে অনেক জায়গা ভ্রমণ করেছি। কিন্তু তাঁর সাথে আমার আরো অনেক অনেক কাজ অসম্পন্ন রয়ে গেছে। যদি তিনি কিংবা আমি কেউ বুঝতে পারতাম যে, পরপারের আহ্বান এত তাড়াতাড়ি চলে আসবে, তাহলে হয়তো আরও দ্রুত আরও অনেক কাজ সম্পন্ন করে ফেলতাম। যাই হোক, এখানেই মানুষের সীমাবদ্ধতা, এখানেই মানবজীবনের ট্র্যাজেডি। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, স্রষ্টার ইচ্ছাই আসলে সর্বক্ষেত্রে চূড়ান্ত। তাঁর ইচ্ছের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়াই মানবজীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা।


ব্রাদার ডঃ বিজয় হেরাল্ড রড্রিক্স, সি.এস. সি-কে নিয়ে লেখার মতো যোগ্যতা আমার নেই। তবুও তাঁর প্রতি আমার অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ থেকে আবেগের তাড়নায় আমি তাঁকে নিয়ে কিছু লেখার দুঃসাহস করছি।

তাঁকে আমি প্রথম দেখি ২০১৩ সালে সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসেবে। আমার ছেলে রাজিন শারাফি এ বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। সেই সুবাদে সৌজন্য সাক্ষাত করতে গিয়েছিলাম। ভর্তি পরীক্ষার দিনে তাঁকে দেখেছিলাম দূর থেকে। ধূলার মাটিতে দাঁড়িয়ে দূর আকাশের ধ্রুব তারা দেখার মতো। বাচ্চারা মাঠে পরীক্ষা দিচ্ছে। তিনি কিছুটা দূর থেকে পরীক্ষা কার্যক্রম তদারকি করছিলেন। আমি একজন অভিভাবক হিসেবে আমার বাচ্চার পরীক্ষার চিন্তা মাথা থেকে ঝেরে ফেলে দিয়ে নিবিষ্ট নয়নে দূরের সেই শ্বেত-শুভ্র-বসন মানুষটিকে দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম, একজন মানুষ কত প্রশান্তিদায়ক হতে পারেন।


তাঁর সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় আমি সেদিনের সেই অনুভূতির কথা তাঁকে বলেছিলাম। তিনি স্মিত হেসে বলেছিলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমাদের ঢেলে সাজাতে হবে। শিক্ষার্থীরা আনন্দের সাথে পড়ালেখা করবে। তাদেরকে ভীতিকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষক হবে শিক্ষার্থীদের প্রিয় বন্ধু। শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। তারপর তিনি জানোলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার উপরই তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পিএইচ.ডি অর্জন করেছেন। তাঁর লব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তিনি কাজে লাগিয়ে এখানে গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসবেন।


আমি মুগ্ধ হয়ে তাঁর স্বপ্নের কথা শুনছিলাম। পরবর্তীতে আমি বেশ কাছ থেকে দেখেছি তিনি কতটা আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার সাথে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ করেছেন।

ব্রাদার বিজয়ের সাথে আমার প্রথম যেদিন সাক্ষাত হল, তার ঠিক দু’দিন পরেই আমি একটি ফোন কল পেলাম। সকালে আমার কর্মস্থল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মোবাইল ফোনটি বেজে ওঠল। রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে শোনা গেল, ‘আমি সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মহোদয়ের একান্ত সচিব বলছি। অধ্যক্ষ মহোদয় আপনার সাথে কথা বলতে চান’।

আমি চমকে ওঠলাম। শুরু হল তাঁর সাথে আমার টেলিফোনে প্রথম আলাপচারিতা। তিনি জানতে চাইলেন যে, তিনি আমার সাথে একটি বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে চান। আমি সময় দিতে পারব কি না।


আমি সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেলাম। এমন বড় মানুষের এমন বিনয় দেখে আমি মুগ্ধ হলাম।

পরদিনই তাঁর অফিসে গেলাম। তিনি প্রস্তাব করলেন, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদে আমাকে তিনি অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে পেতে আগ্রহী।

আমি জানালাম, আপনার মতো একজন মহৎ মানুষের সাথে কাজ করতে পারার আনন্দই আলাদা। আমি রাজি।


তারপর থেকে তাঁর সাথে শুরু হল আমার প্রত্যক্ষভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা। শুধু এই বিদ্যালয় নয়, বরং মিশনারী সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল সংস্থার আয়কর, ভ্যাট, জয়েন্ট স্টকজনিত বিভিন্ন ধরনের জটিলতার সমাধানকল্পে আমরা দু’জন ওতপ্রোতভাবে কাজ করেছি।


সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ব্রাদার বিজয়ের সময়কাল অতি সামান্য। এমনকি তিনি তাঁর পূর্ণ মেয়াদও শেষ করতে পারেননি। কিন্তু কেন? তাঁর কি কোন অন্যায় ছিল?

একজন কর্মপাগল মানুষ, একজন শিক্ষানুরাগী পরম সাধক কাজ করতে গিয়ে একধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বেনামী পত্র চালাচালি হয়েছিল। এমনসব অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল যা এককথায় সর্বৈব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। চির অভিমানী এ মানুষটি নীরবে তা সয়ে গেছেন। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মাথা পেতে মেনে নিয়েছেন। কারো বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটিও উচ্চারণ করেননি।


আমার বিশ্বাস, এমন একজন মহৎপ্রাণ মানুষকে যারা বিনা দোষে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিলেন, তারা তাদের অপকর্মের ফল এ পৃথিবীতেই ভোগ করবে।

সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ব্রাদার বিজয়ের অপ্রত্যাশিত বিদায়ের পর আমার মনটা ভেঙে গেল। আমি বললাম, ব্রাদার, আপনি আমাকে এনেছিলেন, কিন্তু যেহেতু আপনি চলে গেছেন, তাই আমার আর থাকতে মন চাইছে না।

আমাকে ব্রাদার বিজয় বললেন, দেখুন সব কিছুর মালিক উপরওয়ালা। আপনি কাজ করতে থাকুন। আর তাছাড়া আমি তো এ ক্যাম্পাসেই থাকব। সুতরাং আমাদের মধ্যে দেখা সাক্ষাত, কাজ-কর্ম সবই হবে।

এরপর ব্রাদার বিজয় প্রভিন্সিয়াল নিযুক্ত হলেন। তাঁর কাজের পরিধি আরও বেড়ে গলে। প্রভিন্সিয়াল হিসেবে তিনি সেন্ট যোসেফের ক্যাম্পাস এলাকাতেই অফিস করেন। তাঁর আরেক সহকর্মী ব্রাদার রতন। প্রায় সময়ই আমি তাঁর অফিসে যেতাম এবং বিভিন্ন কাজ কর্ম করতাম।

তিনি সব সময় কমিউনিটির উন্নয়নের কথা ভাবতেন এবং সর্বদা কাজে ব্যাপৃত থাকতেন। তাঁর মধ্যে আমি কখনও অলসতা বা নিষ্ক্রিয়তা দেখিনি। যে কাজ হয় তো তাঁর না, সেই কাজও তিনি আগ বাড়িয়ে করে ফেলতেন। অনেক প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের কোন কোন সমস্যা তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে সমাধান করে দিয়েছেন। তিনি কেবল হেডকোয়ার্টার্সে বসে না থেকে নিজে সারা দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন। তাঁর অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তিনি সকলের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন।

ব্রাদার বিজয় অনেক উঁচু মাপের শিক্ষা গবেষক ছিলেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি পিএইচ.ডি গবেষণায় সহ-তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেছেন। মাঝে মাঝে তিনি তাঁর সেই সব অভিজ্ঞতা আমার সাথে শেয়ার করতেন। তিনি খুব বড় মাপের একজন প্রশিক্ষকও ছিলেন।


আমৃত্যু শিক্ষাপাগল ব্রাদার বিজয়কে যখন নারিন্দা টেকনিক্যাল স্কুলের দায়িত্ব প্রদান করা হল, তখন আমি মাঝে মাঝেই সেখানে যেতাম। একদম ভিন্ন একটি জগত সেটি। সেখানে গিয়ে আমি দেখেছি তিনি কিভাবে বিভিন্ন আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি তৈরি তথা ওয়ার্কশপের কাজের সাথে নিজেকে একাকার করে দিতে পারেন। প্রথম দর্শনে আমি হোঁচট খেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে স্বাভাবিক করে দিলেন এই বলে, দেখুন, এখানে যারা কাজ করে বা পড়াশোনা করে তারা সমাজের অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া ছেলেপেলে। তাদের হাতকে আমি কর্মীর হাত হিসেবে তৈরি করে দিচ্ছি। এ কী কম আনন্দের?

এ কথা শোনে আমি অবনত মস্তকে তাঁর দিকে কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছিলাম।

নারিন্দা টেকনিক্যাল স্কুলে তাঁর সাথে আমার অনেক সময় কেটেছে। সেখানে বহুবার তাঁর সাথে আমি খাওয়া-দাওয়া করেছি। আর তাঁর বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা শুনেছি।

এই নারিন্দা টেকনিক্যাল স্কুলেই আমি তাঁকে জীবনের শেষ দেখাও দেখেছি। করোনা মহামারির কালে যখন আইসোলেশন/লকডাউনে জনজীবন থমকে গেছে, তখন (এপ্রিলের মাঝামাঝি) সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ব্রাদার রবি পিউরিফিকেশন একদিন আমাকে সকাল বেলা ফোন দিয়ে বললেন, ব্রাদার বিজয়ের অবস্থা বেশি ভাল না। চলেন উনাকে নারিন্দায় গিয়ে একটু দেখে আসি।

আমি সাথে সাথেই প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। ব্রাদার একটি মাইক্রোবাস নিয়ে ধানমণ্ডিতে আমার বাসার সামনে এলেন। আমি গাড়িতে উঠলাম। গাড়িতে আরও কয়েকজন ছিলেন। ব্রাদার হাসতে হাসতে বললেন, গাড়িতে যেহেতু এখন সরকারী লোক আছেন, তাই আমাদেরকে রাস্তায় নিশ্চয়ই কেউ আটকাবে না।

আমি বললাম, ব্রাদার, আমরা তো রোগী দেখতে যাচ্ছি। নিশ্চয়ই কোন অসুবিধা হবে না।

সকাল সাড়ে এগারটার দিকে আমরা নারিন্দা টেকনিক্যাল স্কুলে পৌঁছলাম। সোজা চলে গেলাম তৃতীয় তলার উত্তর-পূর্ব কোণার কক্ষে যেখানে শায়িত আছেন ব্রাদার বিজয়।

আমরা সকলে একসাথেই ব্রাদার বিজয়ের কক্ষে ঢুকলাম। একটি সিঙ্গেল খাটে পশ্চিম দিকে মাথা ও পূর্ব দিকে পা মেলে তিনি শুয়ে আছেন। আমাদের দেখে তিনি খুব খুশি হলেন।

ব্রাদার রবিসহ আমরা সবাই তাঁর স্বাস্থ্যের খোঁজ খবর নিলাম। বেশ কিছুসময় তাঁর সাথে কাটানোর পর সবাই যখন বেরিয়ে গেলেন আমি তখন একান্তে তাঁর সাথে আরও কিছু সময় কাটালাম।

বললাম, ব্রাদার, আপনি তো খুব আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ। এ আঁধার কেটে যাবে। আসলে আপনার জীবনে একটু বিশ্রাম দরকার….

আমার কথার সূত্র ধরে তিনি বললেন, জেহাদ সাহেব, আপনি ঠিকই বলেছেন। আসলে আমাদের যে জীবন, তাতে পঁচিশ বছরে অন্ততঃ এক বছর বিশ্রাম নিতে হয়। সেই হিসেবে এ বছর আমার বিশ্রাম নেয়ার সময়।

ব্রাদার কথায় আমি এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করলাম। দুরারোগ্য ক্যান্সার তাঁকে কাবু করতে পারবে না-সেই বিশ্বাস তাঁর অটুট রয়েছে।

মনে পড়ছে এক বছর আগের কথা। যখন তাঁর অসুস্থতা প্রথম ধরা পড়ল, তখন থেকেই তাঁর চিকিৎসার কোন ত্রুটি করেনি কেউ। তাঁকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হল। খুব ভালোভাবেই চলছিল চিকিৎসা। ভারতে যাওয়া-আসার সময়টিতে বিমানবন্দরে তাঁর সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করার কাজটি আমি সব সময় যথাসম্ভব করেছি। চিকিৎসায় তাঁর বেশ ভালোই উন্নতি হচ্ছিল। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চের শেষ দিক থেকে করোনা মহামারির কারণে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। বিমান যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে আর ভারতে নেয়া-আসা করা সম্ভব হল না। ঐ সময়টিতে ভারতের চিকিৎসকগণের পরামর্শে স্থানীয় আজগর আলী হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। অসুস্থতার শুরুর দিকে এই আজগর আলী হাসপাতাল থেকেই তাঁকে ভারতে শিফট করা হয়েছিল। করোনাজনিত বিপর্যয়ের কারণে আবার এই হাসপাতালেই তাঁর ঠাঁয় হল। এখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ মে ২০২০ সকাল ১১:১৫ টার সময় তিনি ইহলোক ত্যাগ করে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর। ১৯৫৮ সালের ৭ জুলাই তিনি গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর মা সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যে অবশ্য তাঁর মমতাময়ী মা-ও পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।


মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ব্রাদার বিজয় সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঢাকার পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। এর আগে তিনি সুনামের সাথে হলিক্রস ব্রাদার্স ইন বাংলাদেশ-এর প্রভিন্সিয়াল সুপিরিয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি নিয়মিত জাতীয় দৈনিকসমূহে কলাম লিখতেন।

ইস্টার সানডে, বড়দিন ইত্যাদি বিশেষ কোন দিবস আসার প্রাক্কালে তিনি আমাকে অবধারিতভাবে কয়েকটি লেখা পাঠিয়ে বলতেন, আপনার সুবিধামতো পত্রিকাসমূহে এগুলো ছাপিয়ে দিবেন। তবে তার আগে আমি যেন লেখাগুলো পড়ে নিই, সেই বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করতেন।

আমি হেসে বলতাম, ব্রাদার, আপনার লেখা পত্রিকায় ছাপা হবার পরই পড়ব।

তাঁর অনেক লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। পত্রিকাসমূহ তাঁর লেখা ছেপে কৃতার্থ হতো।

ব্রাদার বিজয়ের সাথে আমার কত স্মৃতি, কত কথা! আমাদের উভয়ের জন্মতারিখ ৭ জুলাই। মাঝে মাঝে একত্রেই আমরা জন্মদিন উদযাপন করেছি।

চট্টগ্রামে মিশনারী স্কুলসমূহে আয়কর বিষয়ক জটিলতা তৈরি হয়েছে জেনে তিনি আমাকে নিয়ে ছুটলেন চট্টগ্রামে। কাজ শেষ করে আনোয়ারায় মরিয়ম আশ্রম ছুটে গেলাম তাঁর সাথে। সেখানে কোরিয়ান ইপিজেডের সাথে আশ্রমের কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছিল। তিনি বারবার সেখানে ছুটে গেছেন সমাধানের জন্য। যেখানে কমিউনিটির স্বার্থ, সেখানেই ছিল তাঁর ত্বরিৎবেগে ছুটে চলা।

২০১৮ সালে রমজান মাসে ঈদের ছুটিতে আমি তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আমার গ্রামের বাড়িতে। হঠাৎ তাঁর ফোন পেলাম। ‘জেহাদ সাহেব, আমি একটা টিম নিয়ে আগরতলা যাচ্ছি। আপনার বাড়ির সামনে দিয়েই যাব।’

তিনি এ কথা বললে তারপরের প্রতিক্রিয়া কি হবে তা তিনি জানতেন। আমি অবশ্যই তাঁকে বাধ্য করাবো আমাদের বাড়িতে নামতে। কিন্তু সেইবার তিনি আমাকে অন্য কথা বললেন। বললেন, যেহেতু রমজান মাস, আপনারা রোজা রাখছেন, তাই আপনাদের বাড়িতে নামব না। কারণ নামলেই আপনারা আমাদেরকে খাওয়ানোর জন্য অস্থির হয়ে যাবেন।

আমি বললাম, ব্রাদার, আপনি নামতে না চাইলে আমরা রাস্তায় বেরিকেড নিয়ে আপনাদেরকে নামাব।

আমার কথা শুনে ব্রাদার হেসে বললেন, না, আপনার সাথে পারা গেল না।

ব্রাদার তাঁর টিম নিয়ে আমাদের বাড়িতে পৌঁছালেন সূর্য ওঠার আগেই। আমরা তাঁদের পছন্দমতো এবং আমাদের সাধ্যমতো খাবার-দাবারের আয়োজন করলাম। ব্রাদার খুব মজা করে খাচ্ছিলেন আর তাঁর টিমের সকল সদস্যকে বলছিলেন, ওনাদের পাগলামি আরও দেখতে পাবেন ঢাকার বাসায় গেলে।

ব্রাদারকে আমার পিতা-মাতা, ভাই-বোন সবাই একটি কথা বারবার বলছিলেন যে, এটি আপনার নিজের বাড়ি। যখনই সময় পান, আপনার এ বাড়িতে চলে আসবেন।

সেদিন আমাদের বাড়িতে সত্যিকারের ঈদের আনন্দ নেমে এসেছিল।

ব্রাদার বিজয়, ব্রাদার রবি, ব্রাদার চন্দন, ব্রাদার রতনসহ অনেকের পদধূলিতে ধন্য হয়েছে আমাদের ঢাকার বাসা। আমার সহধর্মিণী তাঁদের জন্য খুব আনন্দের সাথে রান্না-বান্না করতেন। আবার আমরাও মাঝে মাঝে ব্রাদার হাউজে গিয়ে খেয়ে আসতাম। আমাদের সম্পর্কটি এক অপার্থিব মধুময় সম্পর্ক। এ সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ব্রাদার বিজয়।

আমি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে কাজ করার সুবাধে একদিন ব্রাদারকে বললাম, ব্রাদার আপনি একজিন সংস্কৃতিমনা মানুষ। আপনি কি কাজী নজরুল ইসলামকে কাছ থেকে দেখেছেন?


আমার কথা শোনে ব্রাদার চমকে ওঠলেন। বললেন, হ্যাঁ, আমি তো কবিকে একদম তাঁর পাশে বসে তবলা বাজিয়ে শুনিয়েছি। সেটি ঐ সময়ের কথা যখন বঙ্গবন্ধু কবিকে জাতীয় কবির মর্যাদায় বাংলাদেশে সপরিবারে এনে ধানমন্ডিতে একটি বাড়ি বরাদ্দ দিলেন। সেই কবি ভবনেই তাঁকে আমি দেখতে গিয়েছি এবং তবলা বাজিয়ে শুনিয়েছি।

এ বিষয়ে ব্রাদার বিজয় পরবর্তীতে আমার অনুরোধে একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা তৈরি করলেন যা আমার সহধর্মিণীর সম্পাদিত মাসিক বাঙলাকথা পত্রিকায় মুদ্রিত হয়।

আমি একদিন ব্রাদারকে বললাম, বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট প্রবীণ নজরুল সঙ্গীত শিল্পী জোসেফ কমল রড্রিক্স-কে কি আপনি চিনেন? তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ করা দরকার। কেন তিনি সঙ্গীত থেকে হারিয়ে গেলেন আমার তা জানা দরকার।

এ কথা শুনে ব্রাদার বললেন, আরে, উনি তো আমারই আত্মীয়। এ কথা শোনে আমি খুব পুলকিত হলাম। ব্রাদারের কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে তাঁর সাথে যোগাযোগ করলাম। এরপর আমার প্রত্যেকটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে আমি তাঁকে আমন্ত্রণ জানোতে লাগলাম। আমি জাতির সামনে তাঁকে এমনভাবে উপস্থাপন করলাম যে, এই সেই মহান শিল্পী যিনি ১৯৭২ থেকে ৭৫ সাল পর্যন্ত নিয়মিত কবিভবনে গিয়ে জাতীয় কবিকে গান শোনাতেন। ব্যস্ । সবাই যেন চমকে ওঠলেন। এমন গুণী শিল্পীকে জাতি আড়ালে ফেলে দিয়েছিল!

এরপর থেকে জোসেফ কমল রড্রিক্স নিয়মিত মঞ্চে, টেলিভিশনে আসতে লাগলেন। তিনি নজরুল সঙ্গীত পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। তাঁকে জাতির সামনে পুনরায় নিয়ে আসার ব্যাপারে ব্রাদার বিজয়ের প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে।

ব্রাদার বিজয় একজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির একটি উদাহরণ দিতে চাই। ২০১৫ এর শেষ কিংবা ২০১৬ এর প্রথম দিকে তিনি এবং ব্রাদার রবি গেলেন ভ্যাটিক্যান। সেখান থেকে তিনি আমাকে ফোন করলেন। আমি মনের অজান্তেই বলে ফেললাম, ব্রাদার! আপনি সেখানে প্রার্থনা করে আসুন যেন আমিও এরপর সেখানে যেতে পারি।

ব্রাদার বললেন, আপনি খুব শীঘ্রই আসবেন।

আমি চমকে ওঠলাম। আমার যাবার কোন সুযোগ বা সম্ভাবনাই আমি দেখতে পাচ্ছি না। সরকারী চাকুরিতে সীমান্ত অতিক্রম করাই যেখানে দুরূহ, সেখানে সুদূর ভ্যাটিক্যানে আমার যাওয়া যে সুদূরপরাহত তা বলাই বাহুল্য। তবে যেহেতু ব্রাদার বিজয় আশ্বাস দিয়েছেন, তাই আমি অলৌকিক কিছু প্রত্যাশা করছিলাম।

এর মধ্যেই একদিন মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত স্যারের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা শাহেদ রহমান আমাকে বললেন, এনবিআর-এর চেয়ারম্যান মহোদয় নাকি তাকে বলেছেন, আমি জেহাদকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করতে চাই। সে কোথাও যেতে চায় কি না তা জেনে আমাকে জানাবা।

আমি সুযোগের সদ্ব্যবহার করলাম। সোজা গিয়ে চেয়ারম্যান মহোদয়কে বললাম, স্যার আমি ইতালিতে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্স ক্রাইম একাডেমিতে একটি কোর্সে যেতে চাই, সাথে আমার পরিবার।

সাথে সাথে প্রস্তাব গৃহীত হলো। তবে শর্ত হল, ইতালি যদি আমাকে গ্রহণ করতে রাজি থাকে।

আমি পত্র লিখলাম। রোমের উপকণ্ঠে অস্টিয়ায় অবস্থিত গার্ডিয়া দ্য ফিনাঞ্জা ক্যাম্পাসে অবস্থিত ওইসিডি’র প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্স ক্রাইম একাডেমি আমার প্রস্তাব গ্রহণ করল।

তারপর পরিবারসহ আমি ইতালি গেলাম এবং ভ্যাটিক্যান পরিদর্শন করলাম। আমি বিশ্বাস করি, আমার ভ্যাটিক্যান পরিদর্শনের পেছনে ছিল ব্রাদার বিজয়ের আশীর্বাদ।

ব্রাদার বিজয়ের কাছ থেকে আমি যেসব বিষয় শেখার চেষ্টা করেছি, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কেউ কোন দাবি বা আবদার নিয়ে আসলে তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে করার চেষ্টা করা এবং কাউকে প্রত্যাখ্যান না করা। তিনি বলতেন, একজন যখন আপনার কাছে আসে, তখন তাকে আশাহত করবেন না। আপনার সাধ্যমতো তার জন্য চেষ্টা করবেন। যদি তার ভাগ্যে থাকে তবে কাজটি হবে। আর না থাকলে হবে না। কিন্তু আপনি তাকে হতাশ করবেন না।

ব্রাদার বিজয়ের মতো শুদ্ধ চিত্তের মানুষ সমাজে বিরল। তাঁর সাথে আমার এবং আমার পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের যে অপার্থিব সম্পর্ক ছিল তা চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। আমার ছেলে (যে তাঁর সময়কালে সেন্ট যোসেফে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল) রাজিন শারাফি তো মনে হয় এখনও পথচেয়ে বসে থাকে, কখন ব্রাদার বিজয় আসবেন আর তাঁকে বিভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মিক গান গেয়ে শোনাবে। আমার ছোটবোন সাবরিনা শাওন সরকারী মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তার হয়ে বের হচ্ছে-এ সবই ব্রাদার বিজয়ের অবদান। অর্থাৎ তাঁর অব্যাহত আশীর্বাদের ফসল।

ব্রাদার বিজয় ছিলেন সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সম্মানিত চেয়ারম্যান। তাঁর ‍মৃত্যুর পর বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভায় সভাপতিত্ব করতে হয়েছে আমাকে। তাঁর অনুপস্থিতি আমি এবং আমরা কেউ যেন মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার বুক ফেটে কান্না আসছিল। আহা জীবন! জীবন এত ছোট কেন!


লেখক: উপসচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। পরিচালনা পর্ষদ সদস্য, সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঢাকা।

Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page