বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য ।। কাজী নজরুল ইসলাম
- বাঙলাকথা
- May 26, 2021
- 6 min read
বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্যের দিকে একটু ভাল করে দেখলে সর্বাগ্রে চোখে পড়ে তার দুটি রূপ। এক রূপে সে শেলীর Skylark-এর মত, মিল্টনের Birds of Paradise-এর মত এই ধূলি-মলিন পৃথিবীর ঊর্ধ্বে উঠে স্বর্গের সন্ধান করে, তার চরণ কখনো ধরার মাটি স্পর্শ করে না। কেবলি ঊর্ধ্বে-আরো ঊর্ধ্বে উঠে স্বপনলোকের গান শোনায়। এইখানে সে স্বপন-বিহারী।
আর এক রূপে সে এই মাটির পৃথিবীকে অপার মমতায় আঁকড়ে ধরে থাকে-অন্ধকার নিশীথে, ভয়ের রাতে বিহ্বল শিশু যেমন করে তার মাকে জড়িয়ে থাকে-তরুলতা যেমন করে সহস্র শিকড় দিয়ে ধরণী-মাতাকে ধরে থাকে-তেমনি করে। এইখানে সে মাটির দুলাল।
ধূলি-মলিন পৃথিবীর এই কর্দমাক্ত শিশু যে সুন্দরকে অস্বীকার করে, স্বর্গকে চায় না, তা নয়। তবে সে এই দুঃখের ধরণীকে ফেলে সুন্দরের স্বর্গলোকে যেতে চায় না। সে বলে: স্বর্গ যদি থাকেই তবে তাকে আমাদের সাধনা দিয়ে এই ধূলির ধরাতে নামিয়ে আনব। আমাদের পৃথিবীই চিরদিন তার দাসীপনা করেছে, আজ তাকেই এনে আমাদের মাটির মায়ের দাসী করব। এর এ-ঔদ্ধত্যে সুর-লোকের দেবতারা হাসেন। বলেন: অসুরের অহঙ্কার, কুৎসিতের মাতলামি! এরাও চোখ পাকিয়ে বলে: আভিজাত্যের আস্ফালন, লোভীর নীচতা।
গত মহাযুদ্ধের পরের মহাযুদ্ধের আরম্ভ এইখান থেকেই।
ঊর্ধ্বলোকের দেবতারা ভ্রুকুটি হেনে বলেন: দৈত্যের এ-ঔদ্ধত্য কোনোভাবেই টেকেনি।
নীচের দৈত্য-শিশু ঘুষি পাকিয়ে বলে: কেন যে টেকেনি তার কৈফিয়তই তো চাই, দেবতা। আমরা তো তারই আজ একটা হেস্তনেস্ত করতে চাই।
দুই দিকেই বড় বড় রথী-মহারথী। একদিকে নোগুচি, ইয়েটস, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি Dreamers স্বপ্নচারী, আর একদিকে গোর্কি, যোহান বোয়ার, বার্নার্ড শ’, বেনাভাঁতে প্রভৃতি।
আজকের বিশ্ব-সাহিত্যে এই দুটো রূপই বড় হয়ে উঠেছে।
এর অন্য রূপও যে নেই, তা নয়। এই extreme-এর মাঝে যে, সে এই মাটির মায়ের কোলে শুয়ে স্বর্গের কাহিনী শোনে। রূপকথার বন্দিনী রাজকুমারীর দুঃখে সে অশ্রু বিসর্জন করে, পঙ্খীরাজে চড়ে তাকে মুক্তি দেবার ব্যাকুলতায় সে পাগল হয়ে ওঠে। সে তার মাটির মাকে ভালবাসে, তাই বলে স্বর্গের বিরুদ্ধে অভিযানও করে না। এই শিশু মনে করেÑস্বর্গ এই পৃথিবীর সতীন নয়, সে তার মাসি-মা। তবে সে তার মায়ের মত দুঃখিনী নয়, সে রাজরানী, বিপুল ঐশ্বর্যশালিনী। সে জানে, তারই আত্মীয় স্বর্গের দেবতাদের কোনো দুঃখ নেই, তারা সর্বপ্রকারে সুখী-কিন্তু তাই বলে তার উপর তার আক্রোশও নেই। সে তার বেদনার গানখানি একলা ঘরে বসে বসে গায়-তার দুঃখিনী মাকে শোনায়। Ñতার আর ভাইদের মত, তার অশ্রুজলে কর্দমাক্ত হয় যে মাটি, সেই মাটিকে তাল পাকিয়ে উদ্ধত রোষে স্বর্গের দিকে ছোঁড়ে না।
এঁদের দলে-লিওনিঁদ, আঁদ্রিভ, ক্লুট হামসুন, ওয়াদিশ্ল, রেমঁদ প্রভৃতি।
বার্নার্ড শ’, আনাতোল ফ্রাঁস, বেনাভাঁতের মত হলাহল এরাও পান করেছেন, এরাও নীলকণ্ঠ, তবে সে হলাহল পান করে এঁরা শিবত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন। সে হলাহল উদ্গত করেননি।
যাঁরা ধ্বংসব্রতী-তাঁরা ভৃগুর মত বিদ্রোহী। তাঁরা বলেন : এ দুঃখ, এ বেদনার একটা কিনারা হোক। এর রিফর্ম হবে ইভোলিউশন দিয়ে নয়, একেবারে রক্ত-মাখা রিভেলিউশন দিয়ে। এর খোল-নলচে দুই বদলে একেবারে নতুন করে সৃষ্টি করব। আমাদের সাধনা দিয়ে নতুন সৃষ্টি নতুন স্রষ্টা সৃজন করব।
স্বপ্নচারীদের Keats বলেন :
A thing of beauty is a joy for ever. (ENDYMION)
Beauty is truth, truth beauty.
প্রত্যুত্তরে মাটির মানুষ Whitman বলেন :
Not physiognomy alone-
Of physiology from top to toe I sing,
The modern man I sing.
গত Great War -এর ঢেউ আরব-সাগরের তীর অতিক্রম করেনি, কিন্তু এবারকার এই idea-জগতের Great War বিশ্বের সকল দেশের সবখানে শুরু হয়ে গেছে।
দশ মুÐ দিয়ে খেয়ে বিশ হাত দিয়ে লুণ্ঠন করেও যার প্রবৃত্তির আর নিবৃত্তি হল না, সেই capitalist রাবণ ও তার বুর্জোয়া রক্ষ-সেনারা এদের বলে হুনুমান। এই লোভ-রাবণ বলে, ধরণীর কন্যা সীতা ধরণীর শ্রেষ্ঠ সন্তানেরই ভোগ্যা, ধরার মেয়ে প্রজারপাইন যমরাজ প্লুটোরই হবে সেবিকা। সীতার উদ্ধারে যায় যে তথাকথিত হনুমান, রক্ষ-সেনা দেয় তার লেজে আগুন লাগিয়ে। তথাকথিত হনুমানও বলে, ল্যাজে যদি আগুনই লাগালি, আমার হাতমুখ যদি পোড়েই- তবে তোর স্বর্ণলঙ্কাও পোড়াবÑ বলেই দেয় লম্ফ।
আজকের বিশ্ব-সাহিত্যে এই হনুমানও লাফাচ্ছে এবং সাথে সাথে স্বর্ণলঙ্কাও পুড়ছেÑ এ আপনারা যে কেউ দিব্যচক্ষে দেখছেন বোধ হয় না। দেখতে পেলে চশমাটা একটু পরিষ্কার করে নিলেই দেখতে পাবেন। দূরবীণের দরকার হবে না।
রামায়ণে উল্লেখ আছে, সীতাকে উদ্ধার করার পুণ্যবলে মুখপোড়া হনুমান অমর হয়ে গেছে। সে আজো পূজা পাচ্ছে ভারতের ঘরে ঘরে। আজকের লাঞ্ছনার আগুনে যে দুঃসাহসীদের মুখ পুড়ছে-তারাও ভবিষ্যতে অমর হবে না, পূজো পাবে না-এ কথা কে বলবে?
এইবার কিন্তু আপনাদের সকলেরই আমার সাথে লঙ্কা ডিঙাতে হবে। অবশ্য, বড় বড় পেট যাদের তাঁদের বলছিনে, হয়ত তাতে করে তাঁদের মাথা হেঁটই হবে।...
এই সাগর ডিঙাবার পরই আমাদের চোখে সর্বপ্রথম পড়ে 14th December-১৮২৫ খ্রিস্টাব্দের 14th December-এইখানে দাঁড়িয়ে শুনি Merezhkovsky-র বেদনা-চিৎকার “14th December!” এইখানে দাঁড়িয়ে শুনি বর্বর রুশ-সম্রাট নিকোলায়ের দণ্ডাজ্ঞায় সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত শতাধিক প্রতিভাদীপ্ত কবির ও সাহিত্যিকের মর্মন্তুদ দীর্ঘশ্বাস। এইখানে দাঁড়িয়ে দেখি জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি পুশকিনের ফাঁসির রজ্জুতে লটকানো মৃত্যুপাণ্ডর মূর্তি।
এই দিনই নির্যাতনের কংস-কারায় জন্ম নেয় অনাগত বিপ্লবী শিশু। বীণাবাদিনী স্বরস্বতী এইদিন বীণা ফেলে খড়গ হাতে চামুণ্ডা-রূপ পরিগ্রহ করে। এর পরেই পাতাল ফুঁড়ে আসতে লাগল দলে দলে অগ্নিনাগ-নাগিনীর দল। কেতকী-বিতানের শাখায় শাখায় দুলে উঠল বিষধর ভুজঙ্গের ফণা।
এই নির্বাসনের সাইবেরিয়ায় জন্ম নিল দস্তয়ভস্কির Crime and Punishment। রাস্কলনিকভ যেন দস্তয়ভস্কিরই দুঃখের উন্মাদ মূর্তি, সোনিয়া যেন ধর্ষিতা রাশিয়ারই প্রতিমূর্তি। যেদিন রাস্কলনিকভ এই বহু-পরিচর্যারতা সোনিয়ার পায়ের তলায় পড়ে বলল, “I bow down not to thee, but to suffering humanity in you!” সেদিন সমস্ত ধরণী বিস্ময়ে-ব্যথায় শিউরে উঠল। নিখিল-মানবের মনে উৎপীড়িতের বেদনা পুঞ্জীভুত হয়ে ফেনিয়ে উঠল। টলস্টয়ের God এবং Religion কোথায় ভেসে গেল এই বেদনার মহাপ্লাবনে। সে মহাপ্লাবনে Noah-র তরণীর মত ভাসতে লাগল সৃষ্টি- প্লাবন-শেষ নতুন দিনের প্রতীক্ষায়।
তারপর এল এই মহাপ্লাবনের ওপর তুফানের মত-ভয়াবহ সাইক্লোনের মত বেগে ম্যাক্সিম গোর্কি। চেকভের নাট্যমঞ্চ ভেঙে পড়ল, সে বিস্ময়ে বেরিয়ে এসে এই ঝড়ের বন্ধুকে অভিবাদন করলে। বেদনার ঋষি দস্তয়ভস্কি বললে : তোমার সৃষ্টির জন্যেই আমার এ তপস্যা। চালাও পরশু, হানো ত্রিশূল। বৃদ্ধ ঋষি টলস্টয় কেঁপে উঠলেন। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বলে উঠলেন : That man has only one God and that is Satan! কিন্তু এই তথাকথিত শয়তান অমর হয়ে গেল, ঋষির অভিশাপ তাকে স্পর্শও করতে পারলে না।
গোর্কি বললেন: দুঃখ-বেদনার জয়গান গেয়েই আমরা নিরস্ত হব নাÑ আমরা এর প্রতিশোধ নেব। রক্তে নাইয়ে অশুচি পৃথিবীকে শুচি করব।
‘লক্ষ কণ্ঠে গুরুজির জয়’ আরাবে বাসুকীর ফণা দোল খেয়ে উঠল। নির্জিতের বিক্ষুব্ধ অভিযানের পীড়নে পায়ের তলার পৃথিবী চাকার নীচের ফণিনীর মত মোচড় খেয়ে উঠল।
দূর সিন্ধুতীরে বসে ঋষি কার্ল মার্কস যে মারণ-মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন তা এতদিনে রক্ষকের বেশে এসে প্রাসাদে-লুক্কায়িত শত্রুকে দংশন করলে। জার গেল-জারের রাজ্য গেল-ধনতান্ত্রিকের প্রাসাদ হাতুড়ি-শাবলের ঘায়ে চ‚র্ণ-বিচ‚র্ণ হয়ে গেল। ধ্বংস-ক্লান্ত পরশুরামের মত গোর্কি আজ ক্লান্ত শ্রান্ত-হয়ত বা নব-রামের আবির্ভাবে বিতাড়িতও। কিন্তু তার প্রভাব আজ রুশিয়ার আকাশে বাতাসে।
কার্ল মার্কসের ইকনমিক্স-এর অঙ্ক এই যাদুকরের হাতে পড়ে আজ বিশ্বের অঙ্কলক্ষী হয়ে উঠেছে। পাথরের স্তুপ সুন্দর তাজমহলে পরিণত হয়েছে। ভোরের পাÐুর জ্যোৎস্নালোকের মত এর করুণ মাধুরী বিশ্বকে পরিব্যাপ্ত করে ফেলেছে।
গোর্কির পরে যে কবি লেখক এসেছেন, তাঁদের নিয়ে বিশ্বের গৌরব করবার কিছু আছে কি না তা আজও বলা দুষ্কর।
রাশিয়ার পরেই আসে স্ক্যান্ডিনেভিয়া।-আইডিয়ার জগতে বিপ্লবের অগ্রদূত বলে দাবি রাশিয়া যেমন করেÑ তেমনি নরওয়েও করে। ফ্রান্স-জার্মানিরও এ অধিকারের সবটুকুই পেতে দাবি করে।
আজকের নরওয়ের ক্লুট হামসুন, যোহান বোয়ার-শুধু নরওয়ের কথাই বা কেন বলি, আজকের বিশ্বের জীবিত ছোট বড় সব Realistic লেখকই বুঝি বা ইবসেনের মানস-পুত্র। হামসুন, বোয়ারের প্রত্যেকেই অর্ধেক dreamer, অর্ধেক ঔপন্যাসিক। বোয়ারের Great Hungrer-এর Swan যেন ভারতেরই উপনিষদের আনন্দ। তাঁর The Prisoner Who Sang-এর নায়ক যেন পাপেপুণ্যে অবিশ্বাসী নির্বিকার উপনিষদের সচ্চিদানন্দ। হামসুনের Growth of the Soil-এর Pan-এর ছত্রে ছত্রে যেন বেদের ঋষিদের মত স্তবের আকুতি। যে করুণ-সুন্দর দুঃখের, যে পীড়িত মানবাত্মার বেদনা এঁদের লেখায় সিন্ধুতীরের উইলো তরুর মত দীর্ঘশ্বাস ফেলছে-তার তুলনা কোন কালের কোন সাহিত্যেই নেই।
এই দুঃসহ বেদনা আমরা লাঘব করি লেগারলফের রূপকথা পড়ে-মাতৃহারা শিশু যেমন করে তার দিদিমার কোলে শুয়ে রূপকথার আড়ালে নিজের দুঃখকে লুকাতে চায়, তেমনি।
রাশিয়া দিয়েছে Revolution-এর মর্মান্তিক বেদনার অসহ্য জ্বালা; স্ক্যান্ডিনেভিয়া দিয়েছে অরুন্তুদ বেদনার অসহায় দীর্ঘশ্বাস। রাশিয়া দিয়েছে হাতে রক্ত তরবারি; নরওয়ে দিয়েছে দু’চোখে চোখভরা জল। রাশিয়া বলে এ বেদনাকে পুরুষ-শক্তিতে অতিক্রম করব, ভুজবলে ভাঙব এ-দুঃখের অন্ধ কারা। নরওয়ে বলে, প্রার্থনা করো! ঊর্ধ্বে আঁখি তোলো! সেথায় সুন্দর দেবতা চিরজাগ্রতÑ তিনি কখনো তাঁর এ অপমান সহ্য করবেন না।
এই প্রার্থনার সব স্নিগ্ধ প্রশান্তিটুকু উবে যায় হঠাৎ কোন অবিশ্বাসীর নির্মম অট্টাহাস্যে। সে যেন কেবলি বিদ্রƒপ করে। চোখের জলকে তারা মুখের বিদ্রƒপ-হাসিতে পরিণত করেছে। মেঘের জল শিলাবৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে। পিছন ফিরে দেখি, চার্বাকের মত, জাবালির মত, দুর্বাসার মত দাঁড়িয়ে ভ্রƒকুটি-কুটিল বার্নার্ড শ’, আনাতোল ফ্রাঁস, জেসিঁতো বেনাভাঁতে। তাঁদের পেছন থেকে উঁকি দেয় ফ্রয়েড। শ’ বলেন, Love-টাভ্ কিছু নয়Ñ ও হচ্ছে মা হবার instinct-মাত্র, ওর মূলে Sex। আনাতোল ফ্রাঁন্স বলেন : কি হে ছোকরারা, খুব তো লিখছ আজকাল। বলি, ব্যালজ্যাক- জোলা পড়েছ?
বেনাভাঁতেও হাসেন, কিন্তু এ বেচারা ওঁদের মধ্যেই একটু ভীরু। হাসি লুকাতে গিয়ে কেঁদে ফেলে Leonardo-র মুখ দিয়ে বলে : ‘বন্ধু! যে জীবন মরে ভ‚ত হয়ে গেলÑ তাকে ভুলতে হলে ভাল করে কবরের মাটি চাপা দিতে হয়। মানুষের যতক্ষণ আশা-আকাক্সক্ষা থাকে ততক্ষণ সে কাঁদে, কিন্তু সব আশা যখন ফুরিয়ে যায়-সে যদি প্রাণ খুলে হেসে আকাশ ফাটিয়ে না দিতে পারে তবে তার মরাই মঙ্গল।’
তাঁর মতে হয়ত আমাদের তাজমহলÑ শাহজাহানের মোমতাজকে ভাল করে কবর দিয়ে, ভাল করে ভুলবারই চেষ্টা।
বেনাভাঁতে হাসে, সে নির্মম; কিন্তু সে বার্নার্ড শ’র মত অবিশ্বাসী নয়।
এরি মাঝে আবার দুটি শান্ত লোক চুপ করে কৃষাণ-জীবনের সহজ সুখ-দুঃখের কথা বলে যাচ্ছে-তাদের একজন ওয়াদিশ্ল রেমন্ট-পোলিশ, আর একজন গ্রাৎসিয়া দেলেদ্দা- ইতালিয়ান।
কিন্তু গল্প শোনা হয় না। হঠাৎ চমকে উঠে শুনি- আবার যুদ্ধ-বাজনা বাজছে-এ যুদ্ধ-বাদ্য বহু শতাব্দীর পশ্চাতের। দেখি তালে তালে পা ফেলে আসছে-সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিস্ত সেনা। তাদের অগ্রে ইতালির দ্যু-অনন্ৎসিও, কিপ্লিং প্রভৃতি। পতাকা ধরে মুসোলিনি এবং তার কৃষ্ণ-সেনা।
ক্লান্ত হয়ে নিশীথের অন্ধকারে ঢুলে পড়ি। হঠাৎ শুনি দূরাগত বাঁশির ধ্বনির মত শ্রেষ্ঠ স্বপনচারী নোগুচির গভীর অতলতার বাণী- “The sound of the bell that leaves the bell itself.” তারপরেই সে বলে : ‘আমি গান শোনার জন্য তোমার গান শুনি না। ওগো বন্ধু, তোমার গান সমাপ্তির যে বিরাট স্তব্ধতা আনে তারি অতলতায় ডুব দেওয়ার জন্য আমার এ গান শোনা।’ শুনতে শুনতে চোখের পাতা জড়িয়ে আসে। ধুলার পৃথিবীতে সুন্দরের স্তব-গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ি নতুন প্রভাতের নতুন রবির আশায়! স্বপ্নে শুনি-পারস্যের বুলবুলের গান, আরবের উষ্ট্রচালকের বাঁশি,- তুরস্কের নেকাব-পরা মেয়ের মোমের মত দেহ।
তখনো চারপাশে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির হোলি-খেলা চলে। আমি স্বপ্নের ঘোরেই বলে উঠি- “Thou wast not born for death, immortal bird!”
Comments