top of page

ভুলি কেমনে (জোসেফ কমল রড্রিক্স স্মরণে) -মোঃ জেহাদ উদ্দিন


৩১ জানুয়ারি ২০২১ বিকাল ৩ টা ১৫ মিনিটে শ্রদ্ধেয় জোসেফ কমল রড্রিক্স আমাদেরকে চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে গেলেন। খবরটি আমার কাছে বজ্রপাতের মত মনে হল। আমার শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। এখন ভোররাত ৫ টা। আমি কোনভাবেই স্বাভাবিক হতে পারছি না। অন্তরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বিরহের ঝড়, কান্নার ঝড়। দু’চোখের পাতা এক করতে পারছি না। ঘুম আসছে না, দাদা।

কত কাজ, কত স্মৃতি মহান এই শিল্পীর সাথে আমার! সময় পেলে লিখব। আজ কেবল বিচ্ছিন্ন ক’টি কথা লেখার চেষ্টা করছি।

২০১০ থেকে ২০১২ কি ১৩’র কথা বলছি। তখন আমি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে ডেপুটি কমিশনার অব ট্যাক্সেস হিসেবে কাজ করি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাকে আচ্ছন্ন করে আছেন। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর সন্ধ্যায় শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেট চষে বেড়াই কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গীত, বই-পত্র ইত্যাদি সংগ্রহ করার কাজে। নীচতলার একটি সিডির দোকানে ভারত থেকে আমদানিকৃত নজরুল সঙ্গীতের বেশ কিছু ভাল ভাল সিডি পাওয়া যেত। সিডিগুলোর বেশিরভাগই নজরুলের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল। সব ক’টি সিডি যথন আমার কেনা শেষ হয়ে গেল তখনও আমি প্রতিদিনই নতুন সিডির সন্ধানে দোকানে যেতাম। এক পর্যায়ে দোকানী হেসে বলতেন, ভাই প্রতিদিন কি আর নতুন সিডি পাওয়া যায়! আমিও হেসে দিতাম। কিন্তু তারপরই আমাদের মাঝে চলত নজরুল সঙ্গীত নিয়ে নানান ধরনের আলাপচারিতা।

একদিন বললাম, আমাকে জোসেফ কমল রড্রিক্স এর ফোন নাম্বারাটা থাকলে দিন অথবা জোগাড় করে দিন। তাঁর সাথে আমি একটু পরিচিত হতে চাই। অনেক বড় মাপের শিল্পী। কিন্তু কোন মিডিয়াতে তাঁকে দেখতে পাই না। অথচ ছোটবেলায় তাঁর কণ্ঠে নজরুল সঙ্গীত কত শুনতাম, বিশেষত রেডিও এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে।

আমার কথার মধ্যেই দোকানী তার রেজিস্ট্রার খাতা ঘাটতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর মন খারাপ করে বললেন, অনেক আগে তিনি আমার দোকানে মাঝে মাঞেঝ আসতেন। তাঁর ফোন নাম্বারটিও ছিল। কোথায় যে লিখে রেখেছি!

ভগ্ন মনোরথে আমি ফিরে এলাম। কিন্তু হাল ছাড়িনি।

আমি যেই সময়ের কথা বলছি তা খুব আগের কথা নয়। এখন থেকে মাত্র একদশক আগের কথা। কিন্তু এই এক দশকে বাংলাদেশে নজরুল চর্চায় কিছু লক্ষ্যণীয় ঘটনা ঘটেছে। অন্যভাবে বলতে গেলে, এ সময়ে নজরুল চর্চায় যুগান্তকারী কিছু ঘটনা ঘটেছে। আর এসবের সাথে যে নামটি অপরিহার্যভাবে জড়িয়ে আছে তা হল জোসেফ কমল রড্রিক্স।

কি এবং কিভাবে-তা বলার চেষ্টা করছি।

নজরুল নিয়ে কাজ করার তীব্র বাসনা থেকে প্রথমেই আমি উপলব্ধি করলাম আমাদের মিডিয়াতে নজরুল মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত। সরকারের মালিকানাধীন বাংলাদেশ টেলিভিশনের নজরুল বিষয়ক একটি-দু’টি অনুষ্ঠান বাদ দিলে অন্য কোন টিভি চ্যানেলে নজরূল বিষয়ক নিয়মিত কোন অনুষ্ঠান আমার অনুসন্ধানে আমি খুঁজে পাইনি। বিষয়টি আমাকে তীব্রভাবে ভাবিয়ে তুলল।

গণমানুষের কবি নজরুলকে গণমাধ্যমে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারলে বাংলাদেশে নজরুল চর্চায় একটি গতি আসবে বলে আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। সেই বিশ্বাসের তাড়না থেকে আমি অক্লান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম কোন টিভি চ্যানেলে নজরুল বিষয়ক ধারাবাহিক কোন অনুষ্ঠান করা যায় কি না।

এক পর্যায়ে আমি সেই সুযোগটি তৈরি করেছিলাম বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টিভিতে। এ বিষয়ে সবিস্তারে অন্যত্র লেখার চেষ্টা করব।

একুশে টিভির সুবিশাল প্লাটফরমটি নজরুল চর্চায় খুব ভালভাবেই আমরা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। আমার শিক্ষক অধ্যাপক ইরশাদ আহমেদ শাহীন এর গবেষণা ও সঞ্চালনায় শুরু হল সাপ্তাহিক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান ‘সম্পূর্ণ নজরুল’। নজরুল চর্চায় উন্মোচিত হল নতুন দিগন্ত। প্রতিটি পর্বে নজরুলের জীবন-দর্শন ও সৃষ্টি-কর্ম যথাযথভাবে তুলে ধরা হতে লাগল অত্যন্ত নিপুণভাবে।

সম্পূর্ণ নজরুলের পাশাপাশি আমার নিজের গবেষণা ও সঞ্চালনায় একুশে টিভিতে শুরু হল প্রতিদিনের অনুষ্ঠান ‘যে আল্লাহর কথা শোনে’। রমজান মাসে প্রতিদিন ভোর রাতে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হত। প্রতি পর্বে তিনটি করে নজরুলের ইসলামী সঙ্গীত থাকত। সেই বিবেচনায় আমাকে প্রায় ১০০টি ইসলামী নজরুল সঙ্গীত শ্যুট করার কাজে নামতে হল। বিশাল কর্মযজ্ঞ। কিন্তু আমি মোটেই ক্লান্ত নই। আনন্দ-স্রোতে ভেসে ভেসে আমি কাজ করেছি। কারণ, এটি যে আমার জন্য সুবিশাল সুযোগ। আর এমন সুযোগের অপেক্ষা-ই তো করেছি এতদিন, এত বছর!


‘যে আল্লাহর কথা শোনে’ অনুষ্ঠানটি রেকর্ডিং এর মাস ছ’য়েক আগে কাকতালীয়ভাবে জোসেফ কমল রড্রিক্স-এর সাথে আমার পরিচয় হয়ে গেল। তবে সরাসরি নয়, টেলিফোন আলাপচারিতা।

ঘটনাটি ছিল এরকম। ২০১৩ সালের দিকে সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ব্রাদার ডঃ হ্যারল্ড বিজয় রড্রিক্স-কে আমার বাসায় ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আমি এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য। সে জন্য খ্রিষ্টান কমিউনিটির সাথে আমার বেশ ভাল যোগাযোগ তৈরি হয়। আমার বাসায় যখন ব্রাদার ডঃ হ্যারল্ড বিজয় রড্রিক্স-এর সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম, তখন এক পর্যায়ে জানতে চাইলাম যে, আমি অনেক দিন যাবত জোসেফ কমল রড্রিক্স-কে খুঁজে ফিরছি, আপনি তাঁকে চিনেন কি-না-বিশেষত আপনিও তো রড্রিক্স!

আমার কথা শেষ না হতেই ব্রাদার বিজয় মুচকি হেসে বললেন, কমল তো আমার মামাত ভাই। কথা বলবেন নাকি?

আমি চমকে ওঠলাম। একেবারে মেঘ না চাইতেই জল! এমন আচমকা মহান এই শিল্পীকে পেয়ে যাব বুঝতে পারি নি।

সেদিন কমল দা’র সাথে ফোনে অনেক কথা বললাম। নজরুল নিয়ে আমার আবেগ-উচ্ছ্বাসে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন এবং আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে, নজরুল নিয়ে আমার প্রতিটি কাজ-কর্মে তিনি থাকবেন এবং শুধু থাকবেন তা নয়, বরং নজরুলই যে তাঁর ব্রত তা তিনি প্রথম টেলিফোনিক আলোচনায়ই আমাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।

এর প্রায় মাস ছ’য়েক পর ‘যে আল্লাহর কথা শোনে’ অনুষ্ঠানে নজরুলের ইসলামী গান রেকর্ড করার জন্য যখন কমল দা’কে আমন্ত্রণ জানালাম তখন আমার মধ্যে একটু শংকা কাজ করছিল, ইসলামী গান রেকর্ডের বিষয়টি তিনি কিভাবে নিবেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেবেন কি- না ইত্যাদি। কিন্তু তিনি যে কতটা আন্তরিকতার সাথে গানগুলো রেকর্ড করেছিলেন তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। রমজান মাসে দিনের বেলায় গানগুলো রেকর্ড করার সময় তিনি রোজার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে পানাহার করতেন না। অথচ, কোন কোন মুসলিম শিল্পীকেও তখন দেখেছি সবার সামনে পানাহার করতে।

রমজানের অনুষ্ঠানের শেষ পর্বটি শ্যুট করেছিলাম ঈদের রাতের জন্য। স্বাভাবিকভাবেই নজরুলের অবিস্মরণীয় ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটি করতে হয়েছে। কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া হঠাৎ করেই আমি সেটে উপস্থিত চার জন লিজেন্ডারি শিল্পীকে অনুরোধ করলাম, গানিটি কোরাস করতে চাই, যদি আপনারা অনুমতি দেন। সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলেন শ্রদ্ধেয় জোসেফ কমল রড্রিক্স, ফাতেমা-তুজ-জোহরা, এম এ মান্নান এবং ডঃ নাশিদ কামাল।

গানটি করার সময় সবার সাথে কমল দা’র যে আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস দেখেছি তা বর্ণনাতীত।

রমজান মাস শেষ হয়ে যাবার পর অনুষ্ঠানটিকে দৈনিকের পরিবর্তে সাপ্তাহিক হিসেবে চালু করলাম। প্রতি শুক্রবার সকাল ৯ টা ৩০ মিনিটে তা সম্প্রচারিত হত। এ অনুষ্ঠানেরও অধিকাংশ পর্বে কমল দা’কে নিয়ে কাজ করেছি। তিনি খুব আনন্দ ও উৎসাহ নিয়ে কাজগুলো করতেন।

একদিন দাদাকে বললাম, ‘দাদা, একুশে টিভির অত্যন্ত জনপ্রিয় লাইভ অনুষ্ঠান ‘একুশের রাত’ এর একটি পর্ব নজরুলের জন্য বুক করেছি। আপনি, নাসিম ভাই (বাংলাদেশ নজরুল আবৃত্তি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি) এবং আমি নজরুল নিয়ে আলোচনা করব নজরুলের জন্মজয়ন্তীতে (২৫ মে ২০১৫)। অনুষ্ঠানটি করতে পেরে দাদার যে কী আনন্দ আমি প্রত্যক্ষ করেছি তা ভাষাতীত।

বলে রাখা ভাল। আমাদের এই সব অনুষ্ঠান কিন্তু সাদামাটা বা নামকাওয়াস্তে কোন টিভি অনুষ্ঠান ছিল না। বরং প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানকে সাজাতাম নজরুলময় করে, নজরুলের সৃষ্টি-কর্ম ও জীবন দর্শনকে যথাযথভাবে তুলে ধরার ব্রত নিয়ে।

চ্যানেল নাইনে নজরুল বিষয়ক অনুষ্ঠান করেছি ‘তোমার নামের গান’ এবং ‘চির উন্নত মম শির’। সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সত্তর পর্বের মত। কমল দা’কে কখনো দূর থাকতে দেই নি, কিংবা অন্যভাবে বলতে গেলে তাঁকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠান আমি চিন্তাও করতাম না। আমার বেশিরভাগ অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়।

বাংলাভিশনে মাসব্যাপী প্রতিদিনের একটি অনুষ্ঠান করেছিলাম সম্ভবত ২০১৫ সালের দিকে। সেই অনুষ্ঠানে নজরুল সঙ্গীতায়োজনের দায়িত্ব ছিল কমল দা’র উপর। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে সেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

চ্যানেল নাইনের ‘তোমার নামের গান’ অনুষ্ঠান থেকে কমল দা’কে ‘নজরুল এ্যাম্বাসেডর’ পদক দিয়েছিলাম। দাদা আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, ‘নজরুলকে নিয়ে কাজ করার দায়বদ্ধতা আরও বাড়িয়ে দিলেন’।

(চলবে)

Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page