মারিসা নদী || সৈয়দ আহমেদ তাহমিদ
- সৈয়দ আহমেদ তাহমিদ
- May 3, 2021
- 5 min read
মারিসা নদীর তীর ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছে ইশ্মাঈল । নদীর স্বচ্ছ টলটলে পানি , পাথুরে পাড়। বড় নজর কাড়া বটে । ফোরাত এর করদ নদী এটি । বিদেশীরা ডাকে ইউফ্রেটিস। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে আসছে । চারিদিকে পাহাড় ঘেরা নদীর স্বচ্ছ পানির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইশ্মাঈল। তার মনে পড়ছে ছেলেবেলার কথা । পাহাড় চূড়ায় বন্ধুরা মিলে যেত সূর্যাস্ত দেখতে । দূর প্রান্তে সূর্য যেন পাহাড়ের পেছনে লুকিয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে । ইশ্মাঈল নিষ্পলক তাকিয়ে রয়। সে এখানকার লোক নয় । তার বাড়ি ইজমির। গ্রীকরা যাকে বলে স্মিরনা । ইশ্মাঈল সম্ভ্রান্ত পরিবারের পুত্র । তার পিতা ইব্রাহীম বে উসমানীয় সাম্রাজ্যের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন । তুর্কি অভিজাত দের রীতি অনুযায়ী ইশ্মাঈলও সাম্রাজ্যের সেবক হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। সে বহুদিন আগের কথা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইশ্মাঈল তরুণ অফিসার। আগাসি বা লেফটেন্যান্ট পদে তাকে পদায়ন করা হয় আনাতোলিয়া ওরদুসু বা আনাতোলিয়ার বাহিনীতে। এটা ছিল ইশ্মাঈল এর প্রথম প্রত্যক্ষ করা যুদ্ধ। তাই তরুণ জোয়ানের মাঝে কাজ করছিল এক অব্যক্ত উদ্দীপনা এবং একই সাথে অজানার ভয়। ইশ্মাঈলের প্লাটুনের মোতায়েন হয় এই মারিসা পাড়ের ছোট্ট শহর কাফেদোশিয়ায়। ১৯১৫ সালের ব্যর্থ সারিহামিশ অভিযানের পর আনাতোলিয়া তুর্কি ও আর্মেনীয় তে বিভক্ত হয়ে যায়। আর্মেনীয়রা অস্ত্র হাতে ধরে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ইশ্মাঈলের রেজিমেন্ট মারিসা নদীর আশেপাশের শহরগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। ইশ্মাঈলের মনে পড়ে , কোম্পানি কমান্ডার আহমেত বে এসে তাকে জানায় , আমেরিকার কোন এক মিশনারীর সদস্যরা ইস্তাম্বুল পৌছেছে। তাদেরকে নিরাপদে নিয়ে আসতে হবে কাফেদোশিয়া। নিরাপত্তাদলের দায়িত্বে অতিসত্বর ইশ্মাঈলকে ইস্তানবুল যেতে হবে। লম্বা ট্রেন সফর শেষে ইশ্মাঈলের প্লাটুন পৌঁছে সিজারের শহর। পরদিন মরহুম সুলতান আব্দুলহামিত এর প্রতিষ্ঠিত সিরকেশি রেলস্টেশনের পাশে আলবা হোটেলে এসে পৌছায় তারা।

এতক্ষনে সূর্য ডুবে গেছে। অন্ধকার মেঠোপথ ধরে ফিরে আসতে আসতে ইশ্মাঈল তার ভাবনায় ফিরে আসে। তার মনে পরে সেদিন হোটেলের লবি তে প্রথম দেখা হয়েছিল এপোলোনিয়ার সাথে।
"আসসালামু আলাইকুম " - ইশ্মাঈল অভ্যর্থনা জানায়
- " সেলাম, বেন এপোলোনিয়া"
মেয়েটির তুর্কি বলার প্রচেষ্টা দেখে হাসি পায় ইশ্মাঈল এর
- " আমি ইংরেজি পারি আপনি আমার সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন"
- " তাই নাকি! ", এপোলোনিয়ার চোখে মুখে বিস্ময়।
- " জী , আমি ইংল্যান্ড এ মিলিটারি কলেজে পড়াশুনা করেছি । আপনি বুঝি তুর্কি জানেন? "
- " না আমার শুধু ঐ পরিচয় পর্ব জানা আছে " , এপোলোনিয়া হাসতে হাসতে জানায়।
ইশ্মাঈলের কাছে তার হাসি কেমন অপরূপ লাগে।
সেদিন রাতে মিশনারী দলের যাত্রা শুরু হয় তুরস্কের মফস্বলের অভিমুখে। রাতের খাবার খেতে খেতে ইশ্মাঈল জানতে পারে তারা পেন্সিল্ভানিয়ার ওল্ড ট্রিনিটি চার্চ থেকে এসেছে। যুদ্ধবিদ্ধস্ত আনাতোলীয়ায় তারা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করছে। এপোলোনিয়া একজন সার্জন। চার্চের পক্ষ থেকে যুদ্ধাহতদের সেবায় সে মিশনারীদের সঙ্গে ভিনদেশে পদার্পণ করেছে। খাবার শেষে ট্রেনের কাবুজে ইশ্মাঈলের সঙ্গে দেখা হয় তার। এপোলোনিয়া ইশ্মাঈল কে আসতে দেখেও কিছু বলেনা। শুধু এক দৃষ্টিতে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইশ্মাঈল বলে ওঠে " আপনার মনবল দেখে আমি সত্যিই বিস্মিত। হাজার মাইল পথ পাড়ি দেওয়া.... "
- " আমার
সাথে আমার ভাই আছেন , সার্জন ওয়াটস। আমি একা নই " ইশ্মাঈলকে থামিয়ে দেয় এপোলোনিয়া।
- "যুদ্ধক্ষেত্র নারীদের জায়গা নয় " উদাস ভঙ্গিতে বলে ওঠে ইশ্মাঈল
- " আপনি ঠিক বলেছেন। তবে কি না যুদ্ধক্ষেত্র পুরুষদের জন্যেও নেহাত উপযোগী স্থান নয়! আচ্ছা আমি চললাম। শুভরাত্রি"
ইশ্মাঈল ট্রেনের করিডরের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটির শেষ বাক্য তাকে ভাবিয়ে তুলে।
পরদিন সকালের নাস্তার পর শুনতে পাওয়া যায় যে কায়সেরির পর রেল লাইন অচল হয়ে গেছে।
রাতের আধারে আর্মেনীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বোমা হামলা করেছিল। তবে কায়সেরি আরো এক দিনের পথ। কামরায় ফি
রে গিয়ে ইশ্মাঈল চিন্তিত হয়ে পরে কি করে নিরাপদে মারিসা পৌঁছানো যায়। এমন সময় কামরায় আসে এপোলোনিয়া। খানিকটা সংশয় নিয়ে বলে " আমি শুনেছি আমাদের পথে নাকি গণ্ডগোল হয়েছে? "
- " এ আবার আশ্চর্যের কি । যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ হবেনা?" ইশ্মাঈল কে কিঞ্চিৎ বিরক্ত দেখায়।
এপোলোনিয়া হাসতে হাসতে বলে " তবে ভালোই। সড়কপথে গ্রামীণ তুরস্কের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাবে "
- " আপনাদের দেশে গ্রাম নাই বুঝি " ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলে ইশ্মাঈল
- " আছে তবে কি না এদেশের মত এতো সুন্দর নয় "
এমন সময় একজন সেন্ট্রির প্রবেশ " আগা, টেলিগ্রাম এসেছে " । ইশ্মাঈল টেলিগ্রামটি হাতে নেয়। কায়সেরি তে গাড়ি প্রস্তুত আছে। বাকি পথ সড়কপথে যেতে হবে। পরদিন ৪ টি গাড়িতে করে সড়কপথে রওয়ানা হয় ইশ্মাঈল ও মিশনারী দল। পেছনে সেনারা ট্রাকে করে । আর্মেনীয় অধ্যুষিত এলাকার বুক চিরে চলে গাড়িবহর। তবে এপোলোনিয়ার কথামত তুরস্কের সৌন্দর্য উপভোগের বদলে যুদ্ধের ক্ষত প্রত্যক্ষ করতে হয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে নারী শিশু বৃদ্ধ । কিছুদূর পরপর পরিত্যক্ত আর্মেনিয় গ্রাম। এমনকি রাস্তায় লাশও পড়ে থাকতে দেখা যায়। মারদিন সেনাঘাটিতে পৌঁছালে ইশ্মাঈল সেখানে রাতের জন্য বিরতি ঘোষণা করে। অন্ধকারে আর এগুনো নিরাপদ হবেনা। এশার সালাতে ইশ্মাঈল সৈন্যদের ইমামতি করে। সালাত শেষে প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হয়। ইশ্মাঈল ক্যাম্পের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। এপোলনিয়া এসে বলে " আমি এই প্রথম কোরান recitation শুনলাম "
ইশ্মাঈল বিস্মিত হয়ে বলে " আপনি তেলাওয়াত শুনেছেন ! "
- " জী। কি পড়ছিলেন বলুন তো "
- " আসসালামু আলাইয়া ইয়াওমা উলিত্তু ওয়া আমুতু ওয়া ইয়াওমা ইউবয়াসু হাইয়া । পয়গম্বর ঈসা বলছেন শান্তি বর্ষিত হয়েছে সেইদন যেদিন আমি জন্মেছিলাম , যেদিন মারা যাব এবং যেদিন আমি ফিরে আসব |"
- " মুসলিমরা কি মেরিতে বিশ্বাস করেন !"
- " জী "
- " কি সুন্দর বৃষ্টি । চলুন ভিজতে যাই " হটাত আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেয় এপোলোনিয়া।
- " আশ্চর্য ! আপনার ঠান্ডা লাগবে। আমাদের সফরে বিলম্ব হতে পারে। আর তাছাড়া এই ঘোর অন্ধকারে কি দেখবেন? "
- " আপনি না আসলে আমি একাই যাব " আহ্লাদের সুরে বলে এপোলোনিয়া। অনিচ্ছা সত্তেও রাজী হতে হয় ইশ্মাঈল কে। ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে তারা ক্যাম্প পেরিয়ে গ্রামের পথে চলে আসে। হাটতে হাটতে এপোলোনিয়া হঠাৎ বলে ওঠে " আমি জানি আপনার সঙ্গে প্রথম দেখা থেকেই আপনি আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছেন "
- " তাই বুঝি। আমার জানামতে খ্রিষ্টধর্মে বিধর্মী দের সঙ্গে প্রণয় করা নিষিদ্ধ " নির্বিকার কণ্ঠে বলে ইশ্মাঈল। যেন সে বলতে চায় এ
পোলোনিয়ার প্রতি তার আবেগে কিছু যায় আসেনা।
- " ইসলামে জায়েজ আছে কি? " এপোলোনিয়া জিজ্ঞেস করে
- " ইহুদি এবং খ্রিষ্টান দের ক্ষেত্রে জায়েজ" , ইশ্মাঈলের কণ্ঠ এখনো নির্বিকার শোনায়। কথা বলতে বলতে হটাত ঘোড়ার খুরের শব্দ পাওয়া যায় । " সন্ত্রাসী ! সন্ত্রাসী ! " চিৎকার করে ওঠে ইশ্মাঈল। তারা আর্মেনীয় ডাকাতদের কবলে পড়েছে বুঝতে দেরি হয়না তার ।
- " এপোলোনিয়া ! আমাদের দ্রুত ফিরতে হবে "
- " আমি অটোমান সেনাবাহিনীর আগাসি ইশ্মাঈল। আমাদের কোন ক্ষতি করলে ভাল হবেনা!!" ডাকাতদের উদ্দেশ্যে বলতে বলতে রিভলভার থেকে ফাকা গুলি ছোড়ে ইশ্মাঈল। প্রথমে দুইজন ডাকাত ফিরে যায়। ইশ্মাঈল এপোলোনিয়ার হাত ধরে বলে " দ্রুত আমাদের ফিরতে হবে তারা আবার আসবে। চলুন " । বজ্রপাতের মধ্যে তারা দুইজন দ্রুতগতিতে হাটতে থাকে। ইশ্মাঈল এর রিভলভার হাতে। তবে নিস্তার পায়না। ডাকাতদল ফিরে আসে । এবার দশ বারোজন একসঙ্গে আসে। তারা দুইজন বনের মধ্যে ঢুকে পড়ে। পেছন থেকে শোনা যায় আর্মেনীয় দস্যুদের গুলির আওয়াজ। দৌড়াতে দৌড়াতে হটাত তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এপোলোনিয়া পিছনে পড়ে গিয়েছিল তবে ইশ্মাঈল খেয়াল করেনি। ইশ্মাঈল কে অনুসরন করতে করতে পথ হারিয়ে ফেলে এপোলোনিয়া। কিছুদুর গিয়ে ইশাঈল লক্ষ্য করে মেয়েটি তার সঙ্গে নেই। পশ্চাতে পরে যাওয়া এপোলোনিয়া ডাকাতদের নাগালে চলে আসে। দূর থেকে ইশ্মাঈল শুনতে পায় এপোলোনিয়ার কন্ঠ - " ইশ্মাঈল ! ইশ্মাঈল !! " মরিয়া হয়ে ছুটতে থাকে ইশ্মাঈল। ছুটন্ত অবস্থায় দেখতে পায় এপোলোনিয়া কে ধাক্কা দিয়ে মারিসা নদীতে ফেলে দেয় একজন আর্মেনিয়ান যুবক। আরেকজনের হাতে এপোলোনিয়ার গলার ব্রেসলেট। দ্রুত গতিতে ঘোড়ার পিঠে উঠে পালিয়ে যায় তারা।
নদীর পাড়ে বসে ইশ্মাঈল ভাবে , বহুবছর আগে সেই রাতে এপোলোনিয়া যখন বৃষ্টিতে ভিজতে বেরুবার কথা বলেছিল, তখন তাকে আমি যদি আটকাতে পারতাম !!
Comentários