মহাকবি কায়কোবাদ।। এখনও মেলেনি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা
- মো জেহাদ উদ্দিন
- Feb 13
- 7 min read
সাহিত্যে মহাকবি কায়কোবাদের অবদান
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মহাবিস্ময়কর প্রতিভা মহাকবি কায়কোবাদ তাঁর বহু মৌলিক অবদানে সমৃদ্ধ করেছেন এ ভাষা ও সাহিত্যকে। বাংলা মহাকাব্যের অস্তোন্মুখ এবং গীতিকবিতার স্বর্ণযুগে মহাকবি কায়কোবাদ মুসলমানদের গৌরবময় ইতিহাস থেকে কাহিনী নিয়ে ‘মহাশ্মশান’ মহাকাব্য রচনা করে যে দুঃসাহসিকতা দেখিয়েছেন তা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় আসনে স্থান করে দিয়েছে।
কায়কোবাদ সম্পর্কে কয়েকটি চুম্বক তথ্য:
Ø বাংলা সাহিত্যে মহাকবি হিসেবে যে নামটি সবচেয়ে বেশি স্বীকৃত, প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় সেটি হ’ল মহাকবি কায়কোবাদ;
Ø বাংলা সাহিত্যের প্রথম মৌলিক মহাকবি তিনি। তাঁর আগের অন্য মহাকবিগণ রামায়ণ, মহাভারতের ঘটনা থেকে মহাকাব্য তৈরি করেছেন। আর কায়কোবাদ যে মহাশ্মশান মহাকাব্য সৃষ্টি করেছেন তা কোনো মহাকাব্যের চর্বিত চর্বণ নয়, বরং পানিপথের তৃতীয় যু্দ্ধকে নিয়ে নিজের মৌলিক সৃষ্ট এক মহাকাব্য।
Ø বাঙালি মুসলমানদের জাতীয় জাগরণ ও জাতীয়তাবোধের উদ্বোধক;
Ø আধুনিক মহাকাব্য রচনায় বাঙালি মুসলমানদের মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ও প্রধান;
Ø আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি;
Ø বাঙালি মুসলিম কবিদের মধ্যে প্রথম সনেট রচয়িতা;
Ø পাঠ্যপুস্তকে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তাঁর সাহিত্য-কর্ম পড়ানো হয়;
Ø মহাশ্মশান মহাকাব্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মুনীর চৌধুরী রচনা করেন বিখ্যাত ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটক।
কায়কোবাদের জন্ম ও বংশ পরিচয়
কায়কোবাদের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ কাজেম আল কোরেশী, ‘কায়কোবাদ’ তাঁর সাহিত্যিক ছদ্মনাম। ১৮৫৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা পূর্বপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ হাফিজ উল্লাহ আল কোরেশী বাগদাদ থেকে ভারতের দিল্লীতে এসে বসতি স্থাপন করেন। বাদশাহ শাহজাহান তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে দিল্লীর জামে মসজিদের সহকারী ইমাম পদে নিযুক্ত করেন। হাফিজ উল্লাহর পুত্র এনায়েত উল্লাহ আল কোরেশীও দিল্লীতেই জীবন অতিবাহিত করেন। তাঁর পুত্র মাহবুব উল্লাহ আল কোরেশী দিল্লী ত্যাগ করে বাংলাদেশে চলে আসেন এবং ফরিদপুর জেলার গোড়াইল গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। কায়কোবাদ ছিলেন তাঁরই প্রপৌত্র। তাঁর পিতামহ নেয়ামত উল্লাহ আল কোরেশী এবং পিতা শাহামতউল্লাহ আল কোরেশী। তিনি ভাঙ্গা কোর্টে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকার জেলা-জজ আদালতে আইন পেশায় যুক্ত হন। কায়কোবাদের মাতা জরিফউন্নেছা খাতুন। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁর অপর দুই ভাই আব্দুল খালেক ও আব্দুল বারী যথাক্রমে সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ঢাকা মিটফোর্ড (বর্তমানে সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ) হাসপাতালের হাউস সার্জন ছিলেন।
পড়ালেখা
অল্প বয়সে বাড়িতেই কায়কোবাদের পড়ালেখা শুরু হয় আরবী কায়দার মাধ্যমে। ঢাকার পোগোজ স্কুল এবং সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর বয়স যখন মাত্র ১১ বছর তখন তাঁর মা ইন্তেকাল করেন এবং ঠিক ১ বছর পর পিতাও ইন্তেকাল করেন। পিতৃ-মাতৃহীন অসহায় কায়কোবাদ অগত্য নিজগ্রাম আগলায় চলে আসেন। কিন্তু জ্ঞানার্জনের জন্য উন্মুখ কায়কোবাদ ১ বছরের মাথায়ই ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ঢাকা মাদ্রাসায় ভর্তি হন। মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাবু রাজেন্দ্র চন্দ্র দত্ত এবং সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর পিতা মৌলভী ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দী সোহরাওয়ার্দী। কবি এখানে এন্ট্রান্স পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।
সাহিত্য-প্রতিভার স্ফূরণ
বাংলা ভাষার প্রতি কায়কোবাদের প্রীতি আজন্ম। ছাত্রজীবনেই তিনি লিখেন:
এসেছি আমরা মায়ের প্রাঙ্গণে ভাই ভাই মিশি/হিন্দু মুসলমান
গাইতে মোদের জন্ম ভূমির মাতৃ ভাষার/মঙ্গল গান।
সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলা মোদের/জন্মভূমি,
গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র পদ্মা ও মেঘনা বহিছে যাহার/চরণ চুমি।
অতি অল্পবয়স থেকে কায়কোবাদের সাহিত্য-প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। ছাত্রজীবনেই মাত্র তেরো বছর বয়সে ঢাকার বাংলাবাজার থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ বিরহবিলাপ (১৮৭০) এবং ‘কুসুম কানন’ (১৮৭০)। বই দু’টো পড়ে কাশিম বাজারের মহারাণী দশ টাকা এবং কাশীর ভূবন মোহিনী চতুর্ধারিণী পাঁচ টাকা পাঠিয়ে কিশোর কবিকে অভিনন্দিত করেছিলেন। কিশোর কবির এ স্বীকৃতি সে সময়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিশোর কবি কায়কোবাদ এন্ট্রান্স পরীক্ষা বিসর্জন দিয়ে সাহিত্য সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
মহাকবি কায়কোবাদের রচনাপঞ্জি
মহাকবি কায়কোবাদের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ১৩টি। তন্মধ্যে বিরহ বিলাপ (১৮৭০), কুসুম-কানন (১৮৭৩), অশ্রুমালা (১৮৯৫), মহাশ্মশান (১৯০৪), শিব-মন্দির বা জীবন্ত সমাধি কাব্য (১৯২২), অমিয়ধারা (১৯২৩), শ্মশান-ভস্ম (১৯২৪) ও মহরম শরীফ (১৯৩২)-এই ৮টি কাব্য/মহাকাব্য কবির জীবদ্দশায় এবং প্রেমের ফুল (১৯৭০), প্রেমের বাণী (১৯৭০), প্রেম-পারিজাত (১৯৭০), মন্দাকিনী-ধারা (১৯৭১) ও গওছ পাকের প্রেমের কুঞ্জ (১৯৭৯)-এই ৫টি কাব্য কবির ইন্তেকালের বহু পরে প্রকাশিত হয়। বাংলা একাডেমী কায়কোবাদ রচনাবলী (৪ খন্ড, ১৯৯৪-৯৭) প্রকাশ করেছে।
মহাশ্মশান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মুসলিম কবিদের লেখা বাংলা ভাষায় রচিত সর্বপ্রথম মহাকাব্য। শুধু তাই নয়। জাতীয় আখ্যান কাব্যগুলোর মধ্যে সবচাইতে সুপরিচিত মহাকাব্য হলো মহাশ্মশান। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ নিয়ে লেখা সম্পূর্ণ অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত মহাশ্মশান একটি সুবিশাল মহাকাব্য যার পৃষ্ঠাসংখ্যা প্রায় নয়শত। বাংলা সাহিত্যের অনন্য সম্পদ মহাশ্মশান মহাকাব্য বাংলা ভাষাভাষী সকলের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। মহাশ্মশান মহাকাব্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মুনীর চৌধুরী রচনা করেন বিখ্যাত ‘কবর’ নাটক। বাংলা মহাকাব্যের অস্তোন্মুখ এবং গীতি কবিতার স্বর্ণযুগে মহাকবি কায়কোবাদ মুসলিমদের গৌরবময় ইতিহাস থেকে কাহিনী নিয়ে ‘মহাশ্মশান’ মহাকাব্য রচনা করে যে দুঃসাহসিকতা দেখিয়েছেন তা-ই তাকে বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
কায়কোবাদের মূল্যায়ন
‘কবিতার দ্বারা বিলাসিতা করিতে আমি চাহি নাই, গীতিকবিতার মেয়েলীপনা আমার কখনোই পছন্দ হইত না। আমি চিরদিন বলিয়াছি, অদ্যও বলিতেছি যে, সৌন্দর্যসৃষ্টিই কবিতার প্রধান উদ্দেশ্য নয়, কবিতা নীতিপূর্ণ হইবে এবং বিশেষ কিছু শিক্ষা দিবে।’---মহাকবি কায়কোবাদের অভিভাষণ (১৯৪৪), ঢাকা।
কায়কোবাদ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি বাংলার অপর দুই মহাকবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও নবীনচন্দ্র সেনের দ্বারা মহাকাব্য রচনায় তিনি অনুপ্রাণিত হলেও তিনি কাউকে নকল বা কপি করেন নি।। তাঁর রচিত মহাকাব্য মৌলিকত্বের মহিমায় উদ্ভাসিত। ‘মহাশ্মশান’ মহাকাব্য তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা এবং এর দ্বারাই তিনি মহাকবিরূপে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর গীতিকবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ পেয়েছে।
কায়কোবাদের কাব্যসাধনার মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চাৎপদ মুসলমান সম্প্রদায়কে তার অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করা এবং তা পুনরুদ্ধারে উদ্বুদ্ধ করা। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী, যার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বিভিন্ন রচনায়। তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন।
কাব্যকলা সম্বন্ধে তাঁর ধারণাও ছিল অনন্য। মহৎ আদর্শ ব্যতীত উদ্দেশ্যবিহীন নিছক রসসৃষ্টির আদর্শকে তিনি ঘৃণা করতেন। কায়কোবাদের নিজস্ব মহৎ আদর্শ ছিল। সে-আদর্শ রূপায়ণের লক্ষ্যে তিনি মহাকাব্য রচনায় হাত দেন। তাঁর জীবনাদর্শের তিনটি সুস্পষ্ট ধারা ছিল। সে-তিন ধারা-স্বাজাত্য ও ঐতিহ্যবোধ, জগৎ ও জীবন-জিজ্ঞাসা এবং জীবন ও প্রেম। স্বাজাত্য ও ঐতিহ্যবোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে মহাশ্মশান, মহররম শরীফ ও অমিয়ধারায়। বৃত্রসংহার-এর কবি হেমচন্দ্র বা পলাশীর যুদ্ধের কবি নবীন সেন অথবা পদ্মিনী কাব্যের কবি রঙ্গলালকে পাশাপাশি রেখে বিচার করলে, কায়কোবাদের শক্তি, আবেগ ও তেজস্বিতার প্রমাণ মিলবে। স্বদেশপ্রেমে ও স্বাজাত্যবোধে এবং প্রকাশ-প্রতিভায় কায়কোবাদ এঁদের চেয়ে কম ছিলেন না।
বাঙলা সাহিত্যের তিন ক্ষেত্রে যে- তিনজন শক্তিমান পুরুষ আত্মবিস্মৃত দিশেহারা জাতিকে পথের দিশা দিয়েছিলেন, তারা হচ্ছেন–মীর মশাররফ হোসেন, মহাকবি কায়কোবাদ ও আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। অবশ্য এঁদের সহযোগী ছিলেন আরো কয়েকজন। কিন্তু এঁরাই ছিলেন পুরোভাগে। মীর মশাররফ হোসেন গদ্য-সাহিত্যে, কায়কোবাদ কাব্যে এবং আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মধ্যযুগের বাঙলা-সাহিত্যে মুসলিম অবদান ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জনসাধারণের পরিচয় ঘটিয়ে বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যে মুসলিম প্রভাব ও অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। এভাবে নতুন করে মুসলমানেরা বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের ধারক, বাহক ও সাধক হয়ে ওঠেন। সাহিত্য জাতির প্রাণ। এইজন্যে বাঙালি মুসলমান তাঁদের মরা দেহে প্রাণসঞ্চারকারী বলে এই তিন মহাসাধকের কাছে চিরদিন ঋণী থাকবেন। কবি কায়কোবাদ আধুনিক বাঙলা-সাহিত্যের মুসলিম ধারার অন্যতম প্রবর্তক, বাঙালি মুসলমানদের জাতীয় জাগরণ ও জাতীয়তাবোধের উদ্বোধক এবং আধুনিক মহাকাব্য রচনায় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ও প্রধান। একইসাথে মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি অগাধ ভালোবাসা, আধ্যাত্মবাদ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবতাবাদ, তাঁর সাহিত্যে সমভাবে সমুজ্জ্বল।
ড. কাজী মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে ১৯৪৪ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় পূর্ববঙ্গ সাহিত্য সংসদ কর্তৃক মহাকবি কায়কোবাদকে প্রদত্ত সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে ‘সম্বর্ধনা পত্রে’ যা উল্লেখ করেছিল, তা অল্প কথায় কায়কোবাদকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সহায়ক বিবেচনায় উল্লেখ করা হ’ল:
‘কবিবর, যে যুগে আমরা পরানুকরণ করিয়া বাঁচিবার সাধনা করিয়াছিলাম, সেই যুগেই তোমার অভ্যুদয়। তুমি আমাদের মধ্যে প্রাণ সঞ্জীবন করিয়াছিলে, সংকট মুহূর্তে আমাদের শিরে পরাইয়াছিলে জয়ের মুকুট। বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্য স্রষ্টাদের মধ্যে তোমার আসন অক্ষয় হইয়া থাকিবে। তোমার পূর্বগামীদের সঙ্গে তোমার পার্থক্য এই যে, তাঁহারা লিখিয়াছিলেন দেবতাদের কথা, তাঁহারা অন্বেষণ করিয়াছিলেন অপৌরুষের বাণী; আর তুমি লিখিয়াছ ধরণী নিবাসী মানুষের কথা। সুখ দুঃখ সম্বলিত, হাহাকার-আনন্দ-উদ্বেলিত বিচিত্র জীবনের সকল কাহিনী তোমার তুলির আখরে স্বর্ণাভ হইয়া রহিয়াছে।’
মাহে নও পত্রিকার সম্পাদকীয়তে মহাকবি কায়কোবাদ সম্পর্কে লেখা হয়:
‘বাংলা সাহিত্যের নিশানবর্দার ‘মহাশ্মশান’ , ‘অশ্রুমালা’ , ‘শিবমন্দির’ প্রভৃতি কাব্যের রচয়িতা মহাকবি কায়কোবাদ। সহজ এবং অকুণ্ঠ বর্ণনা ও আবেগপ্রধান কাব্য ভঙ্গির প্রাচীন ধারাকে তিনি কয়েকটি যুগের সাম্প্রতিক দিকচিহ্ন অতিক্রম করে আজকের দিন পর্যন্ত ব’য়ে এনেছেন। এদিক দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যের একটি বিরাট ঐতিহ্যের প্রধারক। বাংলা মুসলিম সমাজের তিনি গৌরব স্বরূপ। সেকালে উচ্চাঙ্গ বাংলা ভাষায় সাহিত্য-কৃতি মুসলমানের পক্ষে অসম্ভব বলে অনেকে মনে করতেন। মহাকবি কায়কোবাদই তখন সেই অপবাদের সুযোগ্য প্রত্যুত্তর হস্তে আবির্ভুত হন।’ (মাহে নও, ৩য় বর্ষ ৫ম সংখ্যা, আগস্ট ১৯৫১)
ড. আহমদ শরীফ লিখেন:
কায়কোবাদের মাধ্যমেই মুসলমানদের আধুনিক বাংলা কাব্য সাহিত্যে হাতে-খড়ি হয়। আশ্চর্য প্রথম প্রচেষ্টতেই অক্ষমতার কোন স্বাক্ষর নেই। কায়কোবাদের আশ্রুমালা, মহাশ্মশান ও অমিয়ধারা সেদিনকার বাংলা সাহিত্য ইমরতে তিনটি সুদৃশ্য ও সুদৃঢ় স্তম্ভরূপে শোভা পেয়েছিল। (ড. আহমদ শরীফ, মহাকবি কায়কোবাদ, মাসিক মোহাম্মদী, বর্ষ ২২, সংখ্যা ১১)
সম্মাননা ও স্বীকৃতি।। এখনও মেলেনি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রধান পুরোধা ব্যক্তিত্ব মহাকবি কায়কোবাদ আগাগোড়া একজন শুদ্ধ বাঙালি, বিশুদ্ধ বাংলাদেশি। তাঁর জন্ম-মৃত্যু ঢাকায়। তিনি পুরো কর্মজীবন কাটিয়েছেন ডাক বিভাগে; ময়মনসিংহ এলাকার বিভিন্ন ডাকঘরে এবং অবসরের পরেও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে দেশ গঠনে কাজ করেছেন তাঁর নিজ এলাকার ডাকঘরে। তিনি শেষ শয্যা গ্রহণ করেছেন ঢাকার আজিমপুর গোরস্তানে।
কিন্তু এই মহামানব মহাকবিকে বাংলাদেশ এখনও কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করেনি।
১৯৩২ সালের ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা কাব্যসাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য নিখিল ভারত সাহিত্য সংঘ তাঁকে ‘কাব্যভূষণ’, ‘বিদ্যাভূষণ ও ‘সাহিত্যরত্ন’ (১৯২৫) উপাধিতে ভূষিত করে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ অগ্রজ অনুজ সকল কবি সাহিত্যিক তাঁকে অভিভাবকতুল্য সম্মান করতেন। অনল প্রবাহের কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী মহাকবিকে সোনার দোয়াত-কলম উপহার দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
ইন্তেকাল
১৯৫১ সালের ২১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মহাকবি কায়কোবাদ পরলোক গমন করেন। আজিমপুর গোরস্তানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
মহাকবি কায়কোবাদের চারটি বহুল পাঠক নন্দিত কবিতা
বঙ্গভূমি ও বঙ্গভাষা
বাংলা আমার মাতৃভাষা
বাংলা আমার জন্মভূমি।
গঙ্গা পদ্মা যাচ্ছে ব’য়ে,
যাহার চরণ চুমি।
ব্রহ্মপুত্র গেয়ে বেড়ায়,
যাহার পুণ্য-গাথা!
সেই-সে আমার জন্মভূমি,
সেই-সে আমার মাতা!
আমার মায়ের সবুজ আঁচল
মাঠে খেলায় দুল!
আমার মায়ের ফুল-বাগানে,
ফুটছে কতই ফুল!
শত শত কবি যাহার
গেয়ে গেছে গাথা!
সেই-সে আমার জন্মভূমি,
সেই-সে আমার মাতা!
আমার মায়ের গোলা ছিল,
ধন ধান্যে ভরা!
ছিল না তার অভাব কিছু,
সুখে ছিলাম মোরা!
বাংলা মায়ের স্নিগ্ধ কোলে,
ঘুমিয়ে রব আমি!
বাংলা আমার মাতৃভাষা
বাংলা জন্মভূমি!
সুখ
‘সুখ সুখ’ বলে তুমি কেন কর হা-হুতাশ,
সুখ ত পাবে না কোথা, বৃথা সে সুখের আশ!
পথিক মরুভূ মাঝে খুঁজিয়া বেড়ায় জল,
জল ত মিলে না সেথা, মরীচিকা করে ছল!
তেমতি এ বিশ্ব মাঝে, সুখ ত পাবে না তুমি,
মরীচিকা প্রায় সুখ, – এ বিশ্ব যে মরুভূমি!
ধন রত্ন সুখৈশ্বর্য কিছুতেই সুখ নাই,
সুখ পর-উপকারে, তারি মাঝে খোঁজ ভাই!
‘আমিত্ব’কে বলি দিয়া স্বার্থ ত্যাগ কর যদি,
পরের হিতের জন্য ভাব যদি নিরবধি!
নিজ সুখ ভুলে গিয়ে ভাবিলে পরের কথা,
মুছালে পরের অশ্রু – ঘুচালে পরের ব্যথা!
আপনাকে বিলাইয়া দীনদুঃখীদের মাঝে,
বিদূরিলে পর দূঃখ সকালে বিকালে সাঁঝে!
তবেই পাইবে সুখ আত্মার ভিতরে তুমি,
যা রুপিবে – তাই পাবে, সংসার যে কর্মভূমি!
দেশের বাণী
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী?
এ দেশের লোক যারা,
সকলইতো গেছে মারা,
আছে শুধু কতগুলি শৃগাল শকুনি!
সে কথা ভাবিতে হায়
এ প্রাণ ফেটে যায়,
হৃদয় ছাপিয়ে উঠে – চোখ ভরা পানি।
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী!
এ দেশের লোক যত
বিলাস ব্যসনে রত
এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা।
দেশ গেল ছারেখারে,
এ কথা বলিব কারে?
ভেবে ভেবে তবু মোর হয়ে গেছে সারা!
প্রাণভরা হাহাকার
চোখ ভরা অশ্রুধার,
এ হৃদি যে হয়ে গেছে মরুভূমি-পারা!
আযান
কে ওই শোনাল মোরে আযানের ধ্বনি।
মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কি সুমধুর
আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।
কি মধুর আযানের ধ্বনি!
আমি তো পাগল হয়ে সে মধুর তানে,
কি যে এক আকর্ষণে, ছুটে যাই মুগ্ধমনে
কি নিশীথে, কি দিবসে মসজিদের পানে।
হৃদয়ের তারে তারে, প্রাণের শোণিত-ধারে,
কি যে এক ঢেউ উঠে ভক্তির তুফানে-
কত সুধা আছে সেই মধুর আযানে।
নদী ও পাখির গানে তারই প্রতিধ্বনি।
ভ্রমরের গুণ-গানে সেই সুর আসে কান
কি এক আবেশে মুগ্ধ নিখিল ধরণী।
ভূধরে, সাগরে জলে নির্ঝরণী কলকলে,
আমি যেন শুনি সেই আযানের ধ্বনি।
আহা যবে সেই সুর সুমধুর স্বরে,
ভাসে দূরে সায়াহ্নের নিথর অম্বরে,
প্রাণ করে আনচান, কি মধুর সে আযান,
তারি প্রতিধ্বনি শুনি আত্মার ভিতরে।
নীরব নিঝুম ধরা, বিশ্বে যেন সবই মরা,
এতটুকু শব্দ যবে নাহি কোন স্থানে,
মুয়াযযিন উচ্চৈঃস্বরে দাঁড়ায়ে মিনার ‘পরে
কি সুধা ছড়িয়ে দেয় উষার আযানে!
জাগাইতে মোহমুগ্ধ মানব সন্তানে।
আহা কি মধুর ওই আযানের ধ্বনি।
মর্মে মর্মে সেই সুর বাজিল কি সমধুর
আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।
Comments