রাণী মা , আমরাও কাঁদছি !
- শাহজালাল খান
- Sep 17, 2022
- 2 min read

সোমবার আপনার মহাসমারোহে আনুষ্ঠানিক মহাযাত্রা । আমাদের শোক শেষ হলেও কান্না শেষ হয়নি । আমাদের সবচেয়ে কদর পাওয়া বাংলা পত্রিকাটি লিখেছে আপনার মৃত্যুতে সারা পৃথিবীর মানুষ কাঁদছে । সত্যিই আমরাও কাঁদছি । আপনার মায়ের মৃত্যুতে আমরা কেঁদেছিলাম । আপনার বাবা, কাকা ও দাদীর মৃত্যুতেও আমরা কেঁদেছিলাম । তিতুমীর -পাণ্ডের বংশধরদের অশ্রুধারা প্রবল । অনবরত ঢেউ বইতে থাকে তাদের অনন্ত শোকাশ্রুর ।
আপনি বাংলাদেশে এসে পৃথিবীর সপ্ত আশ্চর্যের এক আশ্চর্যজনক খাবার, মুড়ি খেয়েছিলেন । আমরা জানতে পারিনি আপনার পূর্বপুরুষেরা আসলে কী গলধঃধরণ করতো । পৃথিবীর পঞ্চম আশ্চর্যের একটি হচ্ছে মাছ ধরার জাল । যা দেখে আপনি চক্ষু শীতল করেছিলেন । আমরা জানতে পারিনি, আপনার পূর্বপুরুষ জালুয়ারা কোন প্রক্রিয়ায় মৎস শিকার করতো । পৃথিবীর প্রথম আশ্চর্যের মহা আশ্চর্য হলো ধান ভানা ঢেঁকি । আপনি সেটিও এসে পর্যবেক্ষণ করে আমাদেরকে ধন্য করেছিলেন । আমরা অসীম ব্যক্তিত্ববোধ সম্পন্ন জাতি জানতে পারিনি, আপনাদের ল্যাঙট পরা পূর্বপুরুষেরা কেমনে ধান মাড়াই করে চাল বানাতো !
আমরা মীরাটের বন্দিশালার প্রজন্মরা দারুণ কাঁদতে পারি । এদেশের বাহাদুর শাহ পার্কের মৃত্যুকূপের মধ্যে উঁকি দিলে কিংবা আন্টাঘর মাঠের ঝুলন্ত বাঙালির পচন দেহের কথা মনে হলে ,আপনাদের পবিত্র মুখচ্ছবির জন্য আমরা কাঁদতে থাকি । অমৃতসরের সেই বাগানের মালির সন্তানেরাও আপনাদের জন্য কাঁদে । ইলামিত্রের ভাই আমরা । বোনদের যৌনাঙ্গে গরম ডিম ঢুকানোর বাষ্প আমাদের চোখ থেকে বের হয়, তাই আমরা কাঁদি ।
পাটগ্রামের মোগলহাটের ঘাসে ছিটে থাকে রক্ত থেকে উৎপন্ন নুরুলদিনের রক্তবীজেরা, শুধুই কাঁদে আর কাঁদে ।
নিম্বালি গ্রামটি বুকের ভিতর জেগে থাকে রাজমাতা ! সেখানে বটগাছে ঝুলন্ত গুলাব সিং ,আর শাহমল ও তাদের বন্ধুদের ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু আমাদের চক্ষুতে শুকায় না । সেটিই বর্ষিত হয় । ঠেকাতে পারি না রাণী মা । আমরা কাঁদি ।
বিজরৌলের কৃষক গ্রামটি শুধুই কাঁদুনে । আপনাদের কিছু হলেই বিজরৌলতে শোকাশ্রু ধারা বইয়ে দিই ! চৌগাছার বিষ্ণুচরণ ও দিগম্বর বিশ্বাসেরা তাদের হাসিটুকু ঝেড়ে ফেলে , সমস্ত অশ্রুবৃষ্টি আপনাদের দুঃখে কাঁদার জন্য জমিয়ে রাখে । আমাদের মহেশ বাবু, রফিক মণ্ডল, মেঘাই সর্দার, কাদের মোল্লা ও রফিক মোল্লা, বৈদ্যনাথ , বিশ্বনাথ সর্দারেরা যে প্রজন্ম রেখে গেছেন , তাদের চোখে অশ্রুর অভাব নেই ! মোপালার কানহাগাজী , মোহাম্মদ আলীর বংশধরেরা অশ্রুর মর্যাদা দিতে জানে রাণী মা !
আপনার পূর্বসূরীদের ডায়েরি থেকে জেনোছিলেন কিনা জানি না , স্বর্ণফলানো এই বাংলায় আপনাদের মাত্র এক যুগের শাসনের মাথায় আমরা না খেয়ে হাড় ও চামড়া এক করে কঙ্কালে পরিণত হয়ে আপনাদের জন্য ভালবাসার গল্প বানিয়েছিলাম, সেটা তো ইতিহাস জানে । চুনের ঘরে বন্দীত্ব জীবন, বাঁশের সাথে লম্বদণ্ড, বাঁকানা পিঠে ইটের বোঝা,পা ফাঁক করে হস্তে পাথরের বোঝা , নিতম্ব উঁচু করে নাসিকা ঘর্ষণ এর কষ্টে আমরা কাঁদি । স্বামীর সামনে পোয়াতি বউদের সম্ভ্রম উল্লাসের জন্য আমরা কাঁদি । পাদুকা দিয়ে বক্ষ পেষণের যন্ত্রণায় আমরা কাঁদি ।
আমরা বিশ্বাস ঘাতক জাতি নই । আপনাদের দুঃখে আমরা এলিজি রচনা করবো । ইত্তেফাক, মানবজমিন, প্রথম আলো পত্রিকার মতো এলিজি এপিক তৈরি করে শুধুই বন্দনা আর চন্দন বাক্যে অশ্রুনিপাত করতেই থাকবো রাজমাতা ! যুগে যুগে আপনাদের মৃত্যুতে আমরা শেকাশ্রু বইয়ে দেব !
খাচ্ছে সবে বুনো কচু , না বুঝে,
এখন তেঁতুল… কোথা পাই খুঁজে ???
১৭ সেপ্টেম্বর
শনিবার ,
বুড়িগঙ্গার আঙ্গিনা থেকে ।
Comments