রহমত ও ক্ষমার মাস মাহে রমজান।। ডক্টর মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন
- ডক্টর মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন
- Apr 9, 2022
- 4 min read
মসজিদে নববীতে লেখক।পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বনকারী হতে পারো। ’ (সুরা : বাকারা)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘...সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস (রমজান) পাবে, সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয় বা সফরে থাকে, তবে অন্য সময় সে সমান সংখ্যা পূরণ করবে। ’ (সুরা : বাকারা)
মসজিদে নববীতে লেখক।
আবু হুরায়রা (রা) বলেন, যখন রমজান মাসের আগমন ঘটল, তখন নবীজি (সা.) ইরশাদ করলেন, ‘তোমাদের কাছে বরকতময় মাস রমজান এসেছে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন ...। ’ (মুসনাদে আহমদ)
পুরো রমজান মাস জুড়ে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে প্রত্যেক মুসলিম আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। আর সারাদিন সিয়াম সাধনার পর একজন রোজাদারের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ইফতারের সময়। ইফতারির মাধ্যমে একজন রোজাদার তার রোজা শেষ করেন। তবে সব খানে বা সব দেশে কিন্তু ইফতার এক না।
রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.) খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করতেন নতুবা কয়েক ঢোক পানি পান করতেন। বলা হয়ে থাকে, থারিদ মহানবী হজরত মুহম্মদ (স.)-এর অন্যতম প্রিয় খাবার। থারিদ একধরনের মাংসের ব্রথ বা স্যুপ জাতীয় খাবার, যা সহজেই হজম হয়। তাই গোটা আরব বিশ্বেই রোজার মাসে থারিদ খুবই জনপ্রিয় একটি খাবার।
মানুষের প্রত্যেকটি আমল বৃদ্ধি করে দেওয়া হয় এ মাসে। একটি নেকী ১০ গুণ থেকে (ক্ষেত্র বিশেষে) ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: কিন্তু রোজার ব্যাপারটি ভিন্ন। কারণ রোজা আমার জন্য। সুতরাং তার প্রতিদান আমি নিজেই প্রদান করব। (বুখারি) কেন এতটা ফজিলতের মাস সেই বর্ণনায় আসছি-
কোরআন নাজিল রমজান মাস কোরআন নাজিলের মাস।
এ মাসেই পূর্ণ কোরআন লাওহে মাহফুজ থেকে একসঙ্গে প্রথম আসমানে ‘বাইতুল ইজ্জতে’ অবতীর্ণ হয়। এবং রাসুল (সা.)-এর ওপর ওহি অবতরণের সূচনাও হয় এ মাসেই। ইরশাদ হয়েছে, ‘রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত ও সুপথ প্রাপ্তির সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এবং হক-বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী। ’ (সুরা : বাকারা)
শুধু কোরআন নয়, ইবরাহিম (আ.)-এর সহিফা, তাওরাত, জাবুর, ইঞ্জিলসহ সকল আসমানি কিতাব এ মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে। কোরআন তিলাওয়াত এটি যেমন কোরআন নাজিলের মাস তেমনি কোরআন তিলাওয়াতেরও মাস। কোরআন শেখা ও শেখানোর মাস। কোরআন শুদ্ধ করার মাস। কোরআন মুখস্থ করা ও ইয়াদ করার মাস। কোরআন শোনা ও শোনানোর মাস। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রোজা ও কোরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে আল্লাহ! আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও যৌন সম্ভোগ থেকে পূর্ণ বিরত রেখেছি। তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। আর কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছি। কাজেই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। অতঃপর তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। ’ (মুসনাদে আহমাদ)
আমলের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি
এ মাস ঈমানদারের নেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধির মাস। আখিরাতের সওদা করার শ্রেষ্ঠ সময়। ব্যবসায়ীদের যেমন বিশেষ বিশেষ মৌসুম থাকে—যখন খুব জমজমাট ব্যবসা হয়। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় আয়-উপার্জন বেশি হয়, তেমনি আখিরাতের ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসার শ্রেষ্ঠ মৌসুম রমজান মাস। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাসের যেকোনো নফল ইবাদত অন্য মাসের ফরজ ইবাদতের সমান এবং যেকোনো ফরজ ইবাদত অন্য মাসের ৭০টি ফরজ ইবাদতের সমান।
কল্যাণের ঘোষণা
এ মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যখন রমজান মাসের প্রথম রাতের আগমন ঘটে, তখন দুষ্ট জিন ও শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, তার একটি দরজাও খোলা হয় না এবং জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, তার একটি দরজাও বন্ধ করা হয় না। আর একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকে— হে কল্যাণের প্রত্যাশী! অগ্রসর হও। হে অকল্যাণের প্রার্থী! থেমে যাও। আল্লাহ তাআলা এ মাসের প্রতি রাতে অসংখ্য জাহান্নামিকে মুক্তি দান করেন। (তিরমিজি)
দোয়া কবুল ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি
এ মাসে অসংখ্য মানুষের দোয়া কবুল করা হয়। আবেদন মঞ্জুর করা হয়। জাহান্নামির নাম জাহান্নামের তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়, দোখজ থেকে মুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। তাই এ মাসে বেশি বেশি নেক আমল করতে হবে। তাওবা-ইস্তিগফার করতে হবে। জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাইতে হবে। যাবতীয় দরখাস্ত দয়াময় আল্লাহর দরবারে পেশ করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ তাআলা রমজান মাসের প্রত্যেক দিন ও রাতে অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। এবং প্রত্যেক মুমিন বান্দার একটি করে দোয়া কবুল করেন। ’ (মুসনাদে আহমদ)। তিন ব্যক্তির দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না : রোজাদারের দোয়া-ইফতার পর্যন্ত। ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া। মজলুমের দোয়া। (সহিহ ইবনে হিব্বান)
ক্ষমা লাভ করা
এটি পাপ মোচন ও গুনাহ থেকে ক্ষমা লাভের মাস। রাসুল (সা.) বলেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে আরেক জুমা এবং এক রমজান থেকে আরেক রমজান মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহগুলো মুছে দেয় যদি সে কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। ’ (মুসলিম)
সারা বছরের জন্য ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ
মাসগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ মাস রমজান। বারো মাসের সর্দার রমজান মাস। নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর কসম! মুসলমানদের জন্য রমজানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি এবং মুনাফিকদের জন্য রমজান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি। কেননা মুমিনরা এ মাসে (সারা বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গনিমত আর মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ। ’ (মুসনাদে আহমদ)
দানশীলতার মাস-
নবীজি (সা.) এমনিতেই প্রচুর দান করতেন। এ মাসে দানের পরিমাণ আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলে আকরাম (সা.) ছিলেন মানুষের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। তার দানশীলতা অধিকতর বৃদ্ধি পেত রমজান মাসে, যখন জিবরাঈল (আ.) তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। জিবরাঈল (আ.) রমজানের প্রতি রাতে আগমন করতেন এবং তারা পরস্পর কোরআন শোনাতেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) তখন কল্যাণবাহী বায়ুর চেয়েও অধিক দানশীল। (মুসলিম)
রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার (রোজাদারের) অনুরূপ প্রতিদান লাভ করবে। তবে রোজাদারের প্রতিদান থেকে বিন্দুমাত্রও হ্রাস করা হবে না।’
লাইলাতুল কদরের রজনী
এ মাসে রয়েছে হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মাস, লাইলাতুল কদর। এ রাতে ইবাদত করলে হাজার রাতে ইবাদত করার চেয়ে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘লাইলাতুল কদর এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ (জিবরাঈল আ.) তাদের পালনকর্তার আদেশক্রমে প্রত্যেক কল্যাণময় বস্তু নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। যে রাত পুরোটাই শান্তি, যা ফজর হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ’ (সুরা : কদর, আয়াত ৩-৫)
এতসব নেয়ামতের মাসে আল্লাহ তুমি আমাদের সকল সুযোগ গ্রহণ করার সুযোগ দান কর। আমাদের সকল চেষ্টাকে তুমি কবুল কর। আমাদের ক্ষমা করে দাও-আগামী রমজান পর্যন্ত তুমি হায়াত বৃদ্ধি ও উত্তম রিজিক দান কর-
৯ এপ্রিল ২০২২।। শনিবার
Comments