top of page

শেখ ইউসুফ হারুনঃ যে কথা হয়নি বলা

Updated: May 13, 2021


কয়েক বছর আগে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে একটি চেনা দৃশ্য ছিল এরকম: আপনি সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে গিয়েছেন। সাথে হয়তো আপনার কোন প্রিয়জন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার পিছু নিল একজন, দু’জন কিংবা ততোধিক প্রায় বস্ত্রহীন শিশু বা কিশোর। ওরা আপনার পায়ের স্যান্ডেল কিংবা হাতের ব্যাগ টানতে চাইছে। কিংবা আপনাকে প্রখর রোদ থেকে বাঁচানোর জন্য আপনার মাথায় ছাতা ধরতে চাইছে। কেউ বা আপনার জন্য পানি বা ডাব নিয়ে আসছে। আপনি বিরক্তিবোধ করলেও তারা নাছোড়বান্দা। আপনাকে সেবা দেওয়ার জন্য তারা মরিয়া। বিনিময়ে আপনি হয়তো তাদের কিছু অর্থকড়ি দিবেন-যা দিয়ে তাদের ক্ষুধার্ত পেটে আহার জুটবে, আহার জুটবে কুটিরে তাদের জন্য অপেক্ষমান অপর ভাই-বোন এবং অসহায় বাবা-মায়ের।

কেবল দেশি পর্যটকের পেছেনে নয়, বিদেশি পর্যটকের পেছনেও তাদের এমনিভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যেত। বিদেশি পর্যটকদের সাথে ঘুরতে ঘুরতে কোন কোন পর্যটকের সাথে থাকা বিশেষ একটি জিনিসের দিকে কারো কারো দৃষ্টি নিবদ্ধ হতে থাকে। সেই বিশেষ জিনিসটি দেখতে একখণ্ড পাতলা কাঠের মতো-যা বগলদাবা করে হাঁটতো বিদেশিরা। সেই কাষ্ঠখণ্ডটিকেই আবার দেখা যেত বিদেশিরা নৌকার মতো ব্যবহার করছে। অভিনব সেই নৌকায় চড়ে বিদেশিরা যখন বড় বড় ঢেউ-এর সাথে খেলা করত তখন তা দেখে উৎফুল্লে ভরে উঠত সেই সব শিশু-কিশোরের মন। হয়তো নানান স্বপ্ন দানা বাঁধত তাদের অবুঝ মনে।

তাদের মধ্যে কেউ হয়তো একদিন সাহস করে ইশারা ভাষায় জানতে চাইলো, তারা পাতলা কাঠে চড়ে ঢেউয়ের সাথে যে খেলা করে তার নাম কি? বিদেশি উত্তরে বললো, সার্ফিং। -আর পাতলা কাঠটি? বিদেশি হয়তো স্মিত হেসে উত্তর দিল- ‘এর নাম সার্ফিং বোট’।

সমুদ্র-শিশুরা সার্ফিং শব্দ শুনে সেদিন কী স্বপ্ন দেখেছিল তা আমাদের জানা নেই। তবে বিদেশি পর্যটকরা তাদেরকে ভালোবেসে কেউ কেউ তাদের প্রিয় সার্ফিং বোট তাদেরকে উপহার স্বরূপ দিয়ে গেছেন। আর সেভাবেই অংকুরিত হয়েছিল বাংলাদেশে বিশ্বের নন্দিত জলক্রীড়া সার্ফিং এর সম্ভাবনা ।

গত কয়েক বছরে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের উপরে বর্ণিত চিরচেনা চেহারাটি পাল্টে গেছে। যে শিশু-কিশোররা আগে সামান্য একটু করুণার জন্য সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের পিছু পিছু ঘুরতো, তাদের হাতে এখন শোভা পাচ্ছে সার্ফিং বোট। করুণার পাত্র থেকে তারা একেকজন হয়ে উঠেছে জীবন রক্ষাকারী দলের সদস্য-লাইফগার্ড। সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকগণকে সমুদ্রের পানিতে অনাকাঙ্খিত বিপদ থেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসছে তারা। সমাজের দায় থেকে তারা পরিণত হয়ে উঠছে সম্পদে। সমুদ্র সৈকতকেন্দ্রিক শিশু-কিশোর-যুবকদের এই যে সামাজিক ইতিবাচক বিবর্তন ঘটছে এসবের পেছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সার্ফিং এসোসিয়েশন। এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়ির সচিব শেখ ইউসুফ হারুন বাংলাদেশে সার্ফিং এর বিকাশ ও উন্নয়ন এবং সমুদ্র সৈকতের শিশু-কিশোর-যুবকদের জীবনমান উন্নয়নে যে অপরিসীম ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন তা এককথায় অতুলনীয়। পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং বিদেশে বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়টি তো রয়েছেই।

বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশ সার্ফিং এসোসিয়েশনের যাত্রা শুরু হয়েছিল বেশ আগেই। সভাপতি সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমানে জাতীয় সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ, সহ-সভাপতি বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান আখতারুজ জামান খান কবির ও আমি এবং সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীসহ একটি কমিটির আওতায় পরিচালিত হচ্ছিল এসোসিয়েশনের কার্যক্রম। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের প্রথম দিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) শেখ ইউসুফ হারুন বাংলাদেশ সার্ফিং এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সার্ফিং এর সাথে শুরু হয় তাঁর পথচলা। একজন সুদক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক হিসেবে তিনি সার্ফিং কার্যক্রমে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি হয়ে উঠেন বাংলাদেশ সার্ফিং এর একজন আরাধ্য ব্যক্তিত্ব ও সংগঠক। তাঁর সুদক্ষ দিক-নির্দেশনা ও সক্রিয় সহযোগিতায় বাংলাদেশ সার্ফিং এসোসিয়েশেন প্রতি বছর কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে জাতীয় সার্ফিং টুর্নামেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের সার্ফিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে; বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের সার্ফারগণ বাংলাদেশকে গৌরবের সাথে প্রতিনিধিত্ব করছে; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে, হল্যান্ড, জার্মান, ফিনল্যাণ্ড, অষ্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সার্ফার এবং সার্ফিং সংগঠকগণ বাংলাদেশ সফর করে বাংলাদেশ সার্ফিং-কে কারিগরি সহায়তা প্রদান করছেন।

২০২০ এবং ২০২১ এ করোনার করালগ্রাসে অন্যান্যদের মতো বিপর্যের সম্মুখীন হয় বাংলাদেশের সার্ফারগণও। কিন্তু শেখ ইউসুফ হারুনের সময়োপযোগী আন্তরিক সহযোগিতায় সার্ফারগণ ‍ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি-সাহস পান। সংগত কারণেই এ সময় কোন টুর্নামেন্ট বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না। করোনার কারণে বিদেশি সার্ফারগণ একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও বাংলাদেশে আসতে পারছেন না। করোনার সুদীর্ঘ এ সময়টিতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত কেন্দ্রিক সার্ফারদের যেন কোন অসুবিধা না হয়, সেজন্য তাঁর উদ্যোগে তাদেরকে খাদ্য ও আর্থিক অনুদানসহ বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা হচ্ছে।

এ লেখার শিরোনাম ‘শেখ ইউসুফ হারুন: যে কথা বলা হয়নি।’ কেন এমন শিরোনাম? এর উত্তরে দু’টি কথা বলা আবশ্যক। বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শেষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব পদ থেকে চাকুরির স্বাভাবিক নিয়মে ১৪ মে ২০২১ তারিখে অবসর গ্রহণ করছেন শেখ ইউসুফ হারুন। তাঁর মতো একজন সৎ, সুদক্ষ, পরিচ্ছন্ন, সুযোগ্য, দেশপ্রেমিক, জনবান্ধব ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তার অবসরগ্রহণকালে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন নিয়ে সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্রে তাঁর মতো একজন কর্মকর্তার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কোন চেষ্টা না করে স্বাভাবিক নিয়মে অবসরগ্রহণ করে জনপ্রশাসনে যে আদর্শ স্থাপন করেছেন তা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। অবশ্য এখনও সচেতন মহল মনে করেন, দেশ ও জাতিকে তিনি যে কোন ফর্মেই হোক না কেন যদি সেবাদান অব্যাহত রাখেন তবে তা দেশের চলমান অগ্রযাত্রায় যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

শেখ ইউসুফ হারুনকে নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে যে আলোচনা কেউ করেন নি তা হল বাংলাদেশে বিশ্বের নন্দিত পর্যটন-বান্ধব জলক্রীড়া সার্ফিং এ তাঁর ব্যাপক অবদানের কথা। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত-কেন্দ্রিক খেটে খাওয়া শিশু কিংবা কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের হাতে এখন শোভা পায় সার্ফিং বোট; কেবল দু’বেলা দু’মুঠো আহারের জন্য সৈকতে আসা পর্যটকদের পিছু নেওয়া অবলা অসহায় সেই মানবসন্তানগুলো এখন একেকজন সার্ফার হয়ে উঠছে, ঢেউয়ের তালে তালে সার্ফিং বোটে সমুদ্রে তাারা উড়াচ্ছে লাল-সবুজের পতাকা; অলিম্পিকে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার অদম্য স্বপ্নও উঁকি দিচ্ছে তাদের কারো কারো মাঝে। সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকগণের জীবনের নিরাপত্তা বিধানেও তারা এখন কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। সমুদ্রস্নানে কোন পর্যটক বিপদের সম্মুখীন হলে তাকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রে লাইফগার্ডের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে তারা।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এই যে পরিবর্তনসমূহ দৃশ্যমান-তার নেপথ্যে রয়েছেন শেখ ইউসুফ হারুন। সার্ফারদের কাছে তিনি দেবতাতুল্য-একজন আদর্শ অভিভাবক। সার্ফিং এর মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সার্ফিং সিটি হিসেবে পরিচিতি পাবে আমাদের কক্সবাজার। দেশের পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে সার্ফিং। কক্সবাজারে গড়ে উঠবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিশ্বমানের সার্ফিং কমপ্লেক্স। সেই স্বপ্ন নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ সার্ফিং এসোসিয়েশন, সেই স্বপ্নের জাল বুনন ও তা বাস্তবায়নে নিরলস ভূমিকা রাখছেন শেখ ইউসুফ হারুন। বাংলাদেশ সার্ফিং এর প্রাণ-পুরুষ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শেখ ইউসুফ হারুনের প্রতি সব সময় আমাদের শুভকামনা। মোঃ জেহাদ উদ্দিন সহ-সভাপতি বাংলাদেশ সার্ফিং এসোসিয়েশন

Commentaires


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page