top of page

শিল্পী এসএম সুলতান, শিশু স্বর্গ ও পালিতা কন্যা



গ্রেট ব্রিটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ১৯৮৩ সালের ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশ সফরে এসে এস এম সুলতানের সাথে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

সবার মাথায় হাত!

কে এই এসএম সুলতান?

খোঁজ নিয়ে জানা গেল তাঁর বাড়ি নড়াইল। ছবি আঁকেন। এর বেশি কেউ কিছু জানে না।

কিন্তু রাণী তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্পী সুলতানকে পড়ানো হয়।

রাণী দেখা করতে আসবেন শিল্পী সুলতানের সাথে! কিন্তু কিভাবে আসবেন! রাস্তা ঘাটের বালাই নেই!

রাতারাতি রাস্তা তৈরি করা হল। রাণী‌ এলেন। বাংলাদেশের মানুষ জানল তাঁদের কৃতিসন্তান এস এম সুলতানের কথা!



তাঁর জন্ম ১০ আগস্ট ১৯২৪ (২৬ শ্রাবণ ১৩৩১) নড়াইলের মাসিমদিয়া গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক-পরিবারে। মা মোছাম্মৎ মেহেরুননেসা ও বাবা শেখ মোহাম্মদ মেসের আলী। কৃষিকাজই ছিল তাঁর বাবার মূল পেশা, পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। সুলতান ছিলেন পরিবারের একমাত্র সন্তান। শৈশবে পরিবারের সবাই তাকে লাল মিয়া বলে ডাকতো। বিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো সামর্থ্য তাঁর পরিবারের না থাকলেও ১৯২৮ সালে নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে তাকে ভর্তি করানো হয়। তবে মাত্র পাঁচ বছর অধ্যয়নের পর তিনি সেই বিদ্যালয়ে ছেড়ে বাড়ি ফিরে বাবার সহযোগী হিসেবে রাজমিস্ত্রীর কাজ শুরু করেন। এ সময় বাবার ইমারত তৈরির কাজ সুলতানকে প্রভাবিত করে এবং তিনি রাজমিস্ত্রীর কাজের ফাঁকে আঁকাআঁকি শুরু করেন।


তাঁর ১০ বছর বয়সে বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আশুতোষ মুখার্জির ছেলে ড. শাম্যপ্রসাদ মুখার্জি নড়াইলে ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল পরিদর্শনে এলে সুলতান তার একটি পেন্সিল স্কেচ আঁকেন। শাম্যপ্রসাদ তার আঁকা স্কেচ দেখে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন এবং এই পেন্সিল স্কেচের মাধ্যমেই শিল্পী হিসেবে সুলতানের প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে।


৭০ বছরের বোহেমিয়ান জীবনে চিত্রশিল্পী সুলতান তার তুলির আঁচড়ে দেশ, মাটি, মাটির গন্ধ আর ঘামে ভেজা মেহনতি মানুষের সঙ্গে নিজেকে একাকার করে সৃষ্টি করেন বিশ্ববিখ্যাত সব ছবি।

১৯৫০ সালে ইউরোপ সফরের সময় যৌথ প্রদর্শনীতে তার ছবি সমকালীন বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো, ডুফি, সালভেদর দালি, পল ক্লি, কনেট, মাতিসের ছবির সঙ্গে প্রদর্শিত হয়। কালোত্তীর্ণ এই শিল্পী ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে সরকারের রেসিডেন্সিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক পান। বরেণ্য এই শিল্পী ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।


বাংলাপিডিয়ায় তাঁর জীবনীর লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন:

তাঁর কাছে অবয়বধর্মিতাই প্রধান। তিনি আধুনিক, বিমূর্ত শিল্পের চর্চা করেননি; তাঁর আধুনিকতা ছিলো জীবনের শাশ্বত বোধ ও শিকড়ের প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ফর্মের নিরীক্ষাকে গুরুত্ব দেননি, দিয়েছেন মানুষের ভেতরের শক্তির উত্থানকে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং ঔপনিবেশিক সংগ্রামের নানা প্রকাশকে তিনি সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপন করেছেন। এটাই তাঁর কাছে ছিলো 'আধুনিকতা', অর্থাৎ তিনি ইউরো-কেন্দ্রিক, নগর নির্ভর, যান্ত্রিকতা-আবদ্ধ আধুনিকতার পরিবর্তে অন্বেষণ করেছেন অনেকটা ইউরোপের রেনেসাঁর শিল্পীদের মতো মানবের কর্মবিশ্বকে।


পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আধুনিক চিত্রকলার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছিলো। অনেক শিল্পীই সেখানে নব নব শৈলী, গড়ন এবং মিডিয়া নিয়ে উপস্থিত হচ্ছিলেন। কিন্তু এস এম সুলতান সেসময়ও নড়াইলে থেকে যান, অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে। এর কারণ অবশ্য গ্রামীণ জীবনের প্রতি তার চিরন্তন আকর্ষণ এবং সহমর্মিতা। তার শিল্পকর্মের স্বরূপটিও খুঁজে পাওয়া যায় এই গ্রামীণ জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপটে। তার সে সময়কার ছবিগুলোতে গ্রামীণ কৃষকদের দেখা যায় পেশীবহুল এবং বলশালী হিসেবে। এর কারণ হিসেবে তাঁর বক্তব্য হলো:

তার ছবিতে গ্রামীণ রমণীদের দেখা যায় সুডৌল ও সুঠাম গড়নে। নারীর মধ্যে উপস্থিত চিরাচরিত রূপলাবণ্যের সাথে তিনি শক্তির সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। একই সাথে তার এ ছবিগুলোতে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের শ্রেণী-দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির কিছু ক্রূর বাস্তবতা উঠে এসেছে। তার এরকম দুটি বিখ্যাত ছবি হচ্ছে হত্যাযজ্ঞ (১৯৮৭) এবং চরদখল (১৯৮৮)।

কোরআনখানি, মিলাদ মাহফিল এবং সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা। করোনার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বল্প পরিসরে এসব কর্মসূচি পালিত হবে।

৯৭ তম জন্মবার্ষিকীতে শিল্পী এসএম সুলতানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে মাসিক বাঙলাকথা পরিবার। বাঙলাকথার পক্ষ থেকে শিল্পীর পালিতা কন্যা নিহার বালার বিশেষ একটি সাক্ষাতকার ধারণ করা হয়েছে। সাক্ষাতকারে তিনি শিল্পীর সকল সৃষ্টিকর্ম সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও শিশুস্বর্গের পূর্ণ বাস্তবায়নের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আমরাও মনে করি, মহান এই শিল্পীর সকল শিল্পকর্ম বৈজ্ঞানিক উপায়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা হোক। আমৃত্যু অকৃতদার এই মহান শিল্পীর স্বপ্নের "শিশুস্বর্গ" পূর্ণ রূপে বাস্তবায়িত হোক।




Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page