top of page

শেষ মুহূর্তগুলো || সৈয়দ আহমেদ তাহমিদ​

Updated: May 11, 2021

নভেম্বর ১১, ১৯১৮ সাল। রাইনের ট্রেঞ্চ এ বসে আলবার্ট । ৪ বছর আগে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল রোমাঞ্চের নেশায়। তখন বয়স ছিল মাত্র ১৭। রাতের আধারে ৩ বন্ধু মিলে বাসা থেকে পালিয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। তবে আলবার্ট ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই। বাকি দুইজন এর লাশ অনেক আগেই গলে পচে গিয়েছে যুদ্ধের ময়দানে। তবে সেইসব ভাবনা আলবার্ট এর মাথায় নেই এখন। হাতে থাকা পকেট ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে চরম উদ্দীপনা নিয়ে তাকিয়ে আছে। ঘড়িতে সময় ৯ টা বেজে ৩২ মিনিট। আর বাকি দেড় ঘণ্টা ! টেলিগ্রাম যোগে সমস্ত পোস্টে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে সকাল ১১ টায় যুদ্ধ শেষ। ট্রিটি অব ভারসাই সমাপ্ত হয়েছে। সমস্ত ট্রেঞ্চ জুরে সৈন্যদের প্রবল উচ্ছাস। বিগত ৪ বছরে অনেক দেখেছে তারা। খুব কাছ থেকে দেখেছে মৃত্যু! এবার ফেরার পালা। বাড়িতে ফিরে যাবে সবাই ! সে যে কি অনুভুতি ! আলবার্টের মনে পড়ে ছোট্ট শহর ব্রানাউ এর কথা। যেখান থেকে সে এসেছে। তার মনে পড়ছে মায়ের মুখ। মা কি বেঁচে আছে ? আলবার্ট বিচলিত হয়ে পড়ে। আর তর সয়না। মাথা উঁচু করলে ওপারে দেখা যায় ফরাসি সৈন্যদের ট্রেঞ্চ। উভয় পক্ষে খুশির জোয়ার। জার্মান সৈন্যরা বিয়ার দিয়ে উদযাপন করছে। আলবার্ট এর বন্ধু রুডলফ ফিরে আসে। ট্রেঞ্চ এর ওপারে গিয়েছিল সংবাদ নিয়ে। রুডলফ এর সাথে আলবার্ট এর পরিচয় যুদ্ধক্ষেত্রে। যুদ্ধক্ষেত্রে যেই বন্ধুত্ব হয় তা ঠুনকো নয়। যুদ্ধের জাহান্নামে কাধে কাধ রেখে যেই যুবকেরা যুদ্ধ করে তাদের বন্ধুত্ব আর অন্য কোন বন্ধুত্বের শামিল নয় ! রুডলফ এর উচ্ছ্বাস ততটা দেখা যাচ্ছেনা। যুদ্ধ শুরুর সময় বয়স ছিল ১৫। এখন ১৯। গত ৪ বছর আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধের মাঝে বড় হয়েছে। মর্টার শেলের শব্দে ঘুম থেকে উঠেছে আর নিঃশ্বাস নিয়েছে বারুদের গন্ধে। যুদ্ধই যেন বাড়ি হয়ে গিয়েছে তার। যুদ্ধক্ষেত্র এমন জায়গা যেখানে কোন কিছুই লুকায় না। সাথী সৈন্যদের সঙ্গে এমন ভ্রাতৃত্ব তৈরি হয়েছে যা অবর্ণনীয়। এরাই তার পরিবার। যুদ্ধ শেষ হওয়া মানে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। রুডলফ এর নিরাশ মুখ দেখে আলবার্ট তিরস্কার করে ওঠে , " কিরে যুদ্ধ শেষ বলে দুঃখে আছিস বুঝি। আহারে তুই কই যাবি যুদ্ধের পর। তোকে তো দেখার কেউ নাই । তুই তুচ্ছ কীট। পৃথিবীর কেউ তোর খোজ রাখেনা " । আলবার্ট এর কথায় রুডলফ এর হাসি পায়। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যরা এমন নির্মম তামাশাই করে থাকে বইকি! বলতে বলতে আলবার্ট এর মনে পড়ে যুদ্ধের প্রথম দিককার কথা ।


সবার পরিবার থেকে চিঠি আসত। সৈন্যরা লাইন ধরে যেত চিঠি আনতে , চিঠি পাঠাতে । এরপর একে একে চিঠি জমা হতে থাকে । উত্তর দেবার কেউ নাই। চিঠির প্রাপক যে সৈন্যরা তারা কিনা ওপারে পৌঁছে গেছে! রুডোলফ এর ক্ষেত্রে ঘটে ঠিক উল্টো কাহিনী। তার চিঠি আসা বন্ধ হয়ে যায়। বুঝতে পারে, বাবা মা সকলে যুদ্ধে নিহত হয়েছে। সেদিন সন্ধ্যায় সৈন্যরা লাইন ধরে চিঠি হাতে ফিরছিল। কেবল রুডলফ দাঁড়িয়ে ছিল অনড়। তার কোন চিঠি আসেনি। তবে সেদিন তার চোখে পানি এসেছিল কিনা জানিনা। পাথরের তৈরি বুক বৈকি! সেদিন আলবার্ট বলেছিল " কিরে বদমাশ। ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে ফরাসিরা জার্মানি দখল করে নেবে নির্ঘাত। আর কারো বাপ মা মরেনা বুঝি! " তবে আলবার্ট এর কখনো কোন চিঠি আসেনি। যেহেতু সে পালিয়ে এসেছিল, তার পরিবারের কেউ জানত না তার ঠিকানা।


ঘড়িতে বাজে ১০ টা। আর এক ঘণ্টা ! আলবার্ট এর মনে পরে প্রথম ব্রিটিশরা ফ্রন্টে নিয়ে আসে ট্যাঙ্ক। প্রথমবার সেই দানবীয় বস্তু দেখে মনে হয়েছিল ভিনগ্রহের কোন দৈত্য। আলবার্ট এর আরো মনে পড়ে মাস্টারড গ্যাস এর কথা। প্রথম শত্রুদের ছোড়া কেমিকেলে বুক ঝলসে গিয়েছিল। হাস্পাতালের বিছানায় শুয়ে নার্স কে বলেছিল আলবার্ট

" আমাকে ছেড়ে দাও। আমি এখানে মরতে চাইনা। আমি লড়াই করতে চাই " ।




ভাবতে ভাবতে আরো কজন সেনা এসে উপস্থিত হয়। একজন বলে " কি আলবার্ট , বাড়িতে তোমার অপেক্ষায় কে আছে শুনি " । আলবার্ট পকেট থেকে একটা ছবি বার করে দেখায়। তার কিশোর বয়সের প্রেমিকা এরিকা। সেনাদের মধ্যে একজন ছবি হাতে নিয়ে বলে " এই মেয়ে দেখতে আমার দাদির মত কুৎসিত" । সঙ্গে সঙ্গে বাকিরাও অট্টহাসিতে ফেটে পরে। আলবার্ট বিরক্ত মুখে ছবিটা কেড়ে নিয়ে বলে " দেখ খুশির সময়টা নষ্ট করিসনে " । দেখতে দেখতে ১১ টার ঘণ্টা বেজে ওঠে ঘড়িতে। আলবার্ট যেমনটা ভেবেছিল , ১১ টা বাজতেই বিপুল উল্লাসধ্বনিতে মেতে ওঠবে সবাই, তেমনটা হয়নি। আলবার্ট ফরাসি ট্রেঞ্চ এর দিকে তাকায়। উভয় পক্ষে নিস্তব্ধতা। যেন হতভম্ব হয়ে গেছে সবাই। আলবার্ট ধীরে ধীরে ট্রেঞ্চ থেকে উঠে পড়ে। হাটতে হাটতে দুইজন ফরাসি সৈন্যের ঠিক সামনে এসে পড়ে । এপার থেকে নির্বাক তাকিয়ে রুডলফ। সমস্ত জার্মান ক্যাম্প হতভম্ব হয়ে আলবার্ট কে দেখছে। ফরাসি সেনা দুটি হটাত জার্মান সেনাকে চোখের সামনে পেয়ে কি করবে বুঝতে পারেনা। একে অন্যের দিকে তাকায়। আলবার্ট বলে ওঠে " ত্রাতারা, যুদ্ধ শেষ। আসুন আমরা ভাই ভাই হিসেবে .... "। কথা শেষ করার আগেই বিকট শব্দে কেপে ওঠে ফরাসি মেশিন গান। চিত হয়ে মাটিতে পড়ে যায় আলবার্ট। স্থির দুটি চক্ষু থেকে দুই ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে কাদামাটিতে।


Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page