সবার কবি নজরুল
- মো জেহাদ উদ্দিন
- Apr 11, 2021
- 8 min read
‘Nazrul will be found wherever poetry has been used to fight against oppression…..his appeals were general…’
(Sampling the poetry of Nazrul: William Race, Nazrul: An Evaluation, Nazrul Institute (2000), page 102)
অর্থাৎ নিপীড়নের বিরুদ্ধে যেখানেই কবিতা ব্যবহৃত হবে, সেখানেই নজরুলকে দেখা যাবে।.....আসলে তাঁর আবেদন সর্বজনীন।
সবার কবি নজরুল। শুধু কবি কেন বলব? সাহিত্যের সর্বত্রই তাঁর অবাধ ঈর্ষণীয় বিচরণ। মাত্র তেইশ বছরের সৃষ্টিশীল (১৯১৯-১৯৪২ খ্রি.) জীবন! এত অল্প সময়ের মধ্যে কতভাবে কতরূেেপই না তিনি আবির্ভূত হয়েছেন! কবিতা, সঙ্গীত (গীতিকার, সুরকার, স্বরলিপিকার, গায়ক, বাদক, সঙ্গীতজ্ঞ), প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, গল্প, অভিভাষণ, পত্রালাপ, জবানবন্দী, আত্মকথা, অনুবাদ সাহিত্য, সমালোচনা সাহিত্য, শিশু সাহিত্য, গীতালেখ্য-গীতিনাট্য রচয়িতা, সাংবাদিক, সম্পাদক, পত্রিকা পরিচালক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র-কাহিনীকার, চলচ্চিত্র-পরিচালক কোনটা রেখে কোনটা বলব? কখনো বিদ্রোহী, কখনো শান্ত-সৌম্য মৌনী-ঋষি, কখনো মাঠে, কখনো জেলে, কখনো প্রেমে কখনো বিরহে, কখনো আনন্দে কখনো বেদনায়-সর্বত্রই নজরুল।
নজরুল ‘চির উন্নত শির’। ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই মাত্র ৪৩ বছর বয়সে নজরুল চিরকালের জন্যে নির্বাক হয়ে যান। এর অব্যবহিত পূর্বে অসুস্থ অবস্থায় কাঁপা কাঁপা হাতে তিনি লিখেছিলেন ‘চির-কবি নজরুল’। ইতিহাস প্রমাণ করেছে এবং যত দিন যাবে তা তত বেশি আলোকিত সত্য হিসেবে প্রতিভাত হতে থাকবে যে, নজরুল চির দিনের কবি, চির মানুষের কবি।
মানুষ বলতে নজরুল কি বুঝতেন? মানুষের মর্যাদা কোথায়? এসব প্রশ্নের উত্তর নজরুলের জীবন ও কর্মের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। এ পর্যায়ে তাঁর ‘মানুষ’ কবিতা থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করছি:
গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান্!
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ অভেদ ধর্ম জাতি
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।-
(মানুষ: কাজী নজরুল ইসলাম)
সাহিত্যে সর্ব মানুষের এমন জয়গান দুনিয়া প্রত্যক্ষ করেছে নজরুলের দ্বারাই। এ ক্ষেত্রে নজরুল অদ্বিতীয়, অতুলনীয়।
নজরুল-কাব্যে সকল শ্রেণি-পেশা-বয়সের মানুষের উপস্থিতির কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করছি। এতে দেখা যাবে যে, সকল মানুষই সমান গুরুত্ব পেয়েছে নজরুলের সাহিত্যে এবং তাঁর জীবনের সামগ্রিক ভাবনায়।
শিশুদের জন্যে নজরুল যেমনটি লিখেছেন তেমনটি বিশ্ব সাহিত্যে বিরল। সহজ-সরল কৌতুকরসে সমৃদ্ধ তাঁর শিশু-সাহিত্য। শিশু মনের সহজাত দুরন্তপনা, ইচ্ছে-আকাঙ্খার প্রকাশ ঘটেছে রচনাগুলোয়। সাধারনত শিশু সাহিত্যের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে উপদেশের আধিক্য যা সাহিত্য না থেকে ‘সাহিত্য-ব্যবস্থাপত্রে’ রূপান্তরিত হয়ে শিশুদের কচি ঘাড়ে বোঝা হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু নজরুল শিশু সাহিত্যে জ্ঞান বিতরণ বা উপদেশের ঘনঘটা নেই, নেই অপরিশীলিত বা অমার্জিত ভাবের প্রকাশ। শিশুমনের সম্ভব-অসম্ভব সব ধরণের ইচ্ছে-আকাঙ্খার প্রকাশ ঘটেছে তাদেরই চির-চেনা ভাষায়, চাপিয়ে দেয়া কিংবা বড়দের ভাষায় নয়। এত বড় অসম্ভব কাজটি তিনি করতে পেরেছেন তাঁর বিশেষত্বের কারণেই। তিনি যখন যার জন্যে লিখেছেন তখন তারই হয়ে গেছেন, তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়ই তাঁকে অমর সব লেখার খোরাক জুগিয়েছে। আর তাঁর শিশুতোষ রচনা শিশুদের একান্ত হবার আরেকটি কারণ এই যে, রচনাগুলোর অধিকাংশই তাঁর কিশোর বয়সের রচনা। ফলে তিনি শিশুদের জন্যে যা লিখেছেন তা রীতিমত তাদের প্লাটফরম থেকেই রচিত। আর এর মাধ্যমেই নজরুলের শিশু সাহিত্য হয়ে উঠেছে একান্তভাবে শিশুদের সম্পদ।
নজরুলের অন্যতম প্রধান শিশুতোষ কবিতা ‘ঝিঙেফুল’। শিশুমনের রঙিন ভূবন যেন তাদেরই ভাষায় নব ব্যঞ্জনা পেয়েছে কবিতাটিতে। কাব্য স্রষ্টা নজরুল এখানে অনন্য। তিনি আরও অনন্য এবং অতুলনীয় যখন তিনি লিখেন-
তুমি বল-‘আমি হায়
ভালোবাসি মাটি-মায়,
চাই না ও অলকায়-
ভাল এই পথ-ভুল!
ঝিঙেফুল।।
(ঝিঙেফুল: কাজী নজরুল ইসলাম)
অর্থাৎ একজন শিশু তার কোমল মনের নির্মল আনন্দময় ভূবনে মাটি-মাতা-মানুষকে ভালবাসার খেলাও খেলছে মনের আনন্দেই। আর এভাবে মনের অজান্তেই ভালোবাসার প্রত্যয়যুক্ত একটি পৃথিবী গড়ার পথে এগিয়ে যায় শিশুরা।
শিশুমনের হাজারো জিজ্ঞাসা এবং তার রহস্যময় জগত নজরুল কাব্যে এমন বাঙময় হয়ে ওঠেছে যার দ্বিতীয় নজির খুঁজে পাওয়া অসম্ভব বললেও অত্যুক্তি হবে না। খুকি ও কাঠবেরালি, খাঁদু-দাদু, লিচু-চোর, সারস পাখি, নতুন খাবার, মটকু মাইতি বাঁটকুল রায় শিশুদের নির্মল বিনোদনের একেশটি অনবদ্য উপাখ্যান। এমন অনবদ্য বিনোদন-পাখি শিশুকেই আবার তিনি প্রভাতের গান শুনিয়েছেন-
ভোর হোলো
দোর খোলো
খুকুমণি ওঠো রে!
ঐ ডাকে
যুঁই-শাখে
ফুল-খুকি ছোটো রে!
খুকুমণি ওঠো রে!
(প্রভাতী: কাজী নজরুল ইসলাম)
হ্যামিলনের এমন বাঁশিওয়ালা যখন ডাকে, তখন দুনিয়ার তাবত শিশুর মধ্যে যেন সাড়া পড়ে যায় একসাথে-
উঠ্ল
ছুট্ল
ঐ খোকাখুকি সব,
‘উঠেছে
আগে কে’
ঐ শোনো কলরব।
(প্রভাতী: কাজী নজরুল ইসলাম)
নজরুলের এই শিশুরা হবে ‘সকাল বেলার পাখি’, তারা ‘সূয্যি মামা জাগার আগে’ জেগে উঠবে। প্রচলিত সেকেলে সমাজ যদি তাদের জাগরণের পথে বাধার সৃষ্টি করে তা তারা অতিক্রম করবে; কেননা তাদের মনে এক স্বর্গীয় জিজ্ঞাসা ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?’ তারা গাঁয়ের রাখাল হয়ে প্রকৃতির সকল সম্পদ মানবতার জন্যে চষে নিয়ে আসবে, দিনের সহচর হয়ে সকল আঁধার দূর করবে, সাত সাগড় পাড়ি দিয়ে মানব সভ্যতার জন্যে সকল সম্পদ বয়ে নিয়ে আসবে। দুঃখিনী এ জগত-মাতাকে সে কথা দিয়েছে-
‘দুঃখিনী তুই, তাই তো মা এ দুখ ঘুচাব আজ,
জগৎ জুড়ে সুখ কুড়াব-ঢাক্ব মা এ লাজ।’
(সাত ভাই চম্পা: কাজী নজরুল ইসলাম)
স্বর্গদূত শিশুদের নজরুল স্বাগত জানিয়েছেন এই বলে-
‘পার হয়ে কত নদী কত সে সাগর
এই পারে এলি তুই শিশু যাদুকর!
......................................
ছোট তোর মুঠি ভরি’ আনিলি মণি
সোনার জিয়ন-কাঠি মায়ার ননী।
তোর সাথে ঘর ভরে এল ফাল্গুন,
সব হেসে খুন হল, কি জানিস গুণ!’
(শিশু যাদুকর: কাজী নজরুল ইসলাম)
শিশুমনের চিরায়ত জিজ্ঞাসা নজরুলের যাদুর হাতে কাব্য হয়েছে এভাবে-
‘রব না চক্ষু বুজি
আমি ভাই দেখব খুঁজি
লুকানো কোথায় কুঁজি
দুনিয়ার আজব-খানার!
আকাশের প্যাঁটরাতে কে
এত সব খেলনা রেখে
খেলে ভাই আড়াল থেকে,
সে তো ভাই ভারী মজার।’
(জিজ্ঞাসা: কাজী নজরুল ইসলাম)
আর তাই তো নজরুল কাব্যে শিশুদের চিরায়ত সংকল্প ভাষা পেয়েছে এভাবে-
‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।’
(সংকল্প: কাজী নজরুল ইসলাম)
শিশুদের জন্যে নজরুল যখন কাজ করেছেন তখন যেন তিনি নিজেই শিশু হয়ে গেছেন। তাদেরই একজন হয়ে তিনি অমর সব শিশুতোষ সাহিত্য সৃজন করেছেন।
মেয়ে শিশুদের প্রতি অত্যাচার মানব সভ্যতার ইতিহাসে কম হয় নি। আজকের এই চরম উন্নতির যুগেও মেয়ে শিশুরা বিভিন্ন সমাজে চরম বৈষম্যের শিকার হয়। যেমন ভারতের কোন কোন জায়গায় এখনো মেয়ে শিশুর জন্মকে এতটাই নিরুৎসাহিত করা হয় যে, ভ্রæণ পর্যায়েই তাকে হত্যা করা হয়। আর নজরুল মেয়ে শিশুর আবির্ভাবকে স্বাগত জানিয়েছেন এভাবে-
কও দেখি বোন কোন মেয়ে এই আসলো মোদের আঙিনায়-
এত ¯েœহ উছলে পড়ে কাহার তনুর ভঙ্গিমায়?
এ যে মোদের ভারতী মা.....
(মুকুলের উদ্বোধন: কাজী নজরুল ইসলাম)
মেয়েদেরকে ‘ঘরের লক্ষী’ আখ্যা দিয়ে নজরুল পৃথিবীর স্বর্গ-সুখের যে চিত্রটি এঁকেছেন সেখানে মেয়েদের জীবন নির্মল আনন্দে ভরপুর-
ছোট ছোট বোনগুলি সব আহ্লাদে আজ আটখানা,
কচি হাসির বাঁশি কাঁপায় পুলক দিয়ে মাঠখানা।
(মুকুলের উদ্বোধন: কাজী নজরুল ইসলাম)
শিশুর পর আসে কিশোর। নজরুল কিশোরদের মাঝে নিজেকে খুঁজে ফিরেছেন এভাবে-
ভিড় করে কে আসলি তোরা বাজিয়ে বেণু!
তোদের মাঝে কিশোর আমার দেখতে এনু।।
হারিয়ে গেছি অনেক দূরে
যৌবনের এই রৌদ্র-পুরে;
ধেনু-চরা তোদের সুরে
আমায় আবার ফিরে পেনু।।
(কিশোর-স্বপন: কাজী নজরুল ইসলাম)
নজরুলের কিশোরেরা নতুন যুগের অভিযাত্রী, সমাজের যাবতীয় কুসংস্কার ও অচলায়তন ভাঙার সৈনিক। কেবল স্কুলে যাওয়া আর চাকরি করা তাদের আদর্শ নয়। তারা দেশমাতার মুক্তিপ্রত্যাশী হিসেবে সম্ভাব্য সকল সংগ্রামের আপোষহীন কর্মী। তাই তো তাদের কণ্ঠে দৃপ্ত উচ্চারণ-
‘মা! আমারে সাজিয়ে দে গো বাইরে যাওয়ার দেশে,
রইব না আর আচল-ঢাকা গÐী-আঁকা দেশে।
মা! এখানে নাই যে জীবন প্রাণের আবীর-খেলা,
আপনাকে যে আপনি মোরা হানছি অবহেলা।
‘স্কুলে যাও, চাকরি কর’-
আদর্শ নাই ইহার বড়,
সকাল বেলা জেগে ওঠা, ঘুমিয়ে সন্ধ্যাবেলা,
দেশ কোথা মা! এ যে শুধু শ্মশান-শবের মেলা।’
(কিশোর স্বপ্ন: কাজী নজরুল ইসলাম)
শিশুরা বিদ্যাশিক্ষার জন্যে ছাত্রজীবনে প্রবেশ করে। একজন ছাত্রের সাধনা কি হবে তা অসাধারণ কুশলতায় নজরুল এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যার দ্বিতীয় উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে কেন, বিশ্বসাহিত্যের আছে কি না সন্দেহ। ছাত্রদের জন্যে নজরুল রচিত ‘ছাত্রদলের গান’ কবিতাটিই এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে যথেষ্ট। নজরুলের চোখে ছাত্ররা অপরিমেয় শক্তির আধার, বিশ্বমানবতার মুুক্তির জন্যে তারা যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে জানে। আকাশ-পাতাল-মর্ত্য জয় করে তারাই সৃজন করে ‘ভালবাসার আশার ভবিষ্যৎ’। তাদের জ্ঞানের মশালে আলোকিত হয় আঁধার পৃথিবী, তাদের চোখেই স্বপ্ন দেখে গোটা পৃথিবী। কয়েকটি চরণ উদ্ধৃত করছি-
আমরা শক্তি আমরা বল
আমরা ছাত্রদল।
মোদের পায়ের তলায় মুর্ছে তুফান
ঊর্দ্ধে বিমান ঝড়-বাদল
আমরা ছাত্রদল।।
.................................
মোদের চক্ষে জ্বলে জ্ঞানের মশাল
বক্ষে ভরা বাক,
কন্ঠে মোদের কুন্ঠাবিহীন
নিত্যকালের ডাক।
................................
আমরা রচি ভালবাসার
আশার ভবিষ্যৎ
মোদের স্বর্গ-পথের আভাস দেখায়
আকাশ-ছায়পথ।
মোদের চোখে বিশ্ববাসীর
স্বপ্ন দেখা হোক সফল
আমারা ছাত্রদল।
(ছাত্রদলের গান: কাজী নজরুল ইসলাম)
তরুণ মনের আশা-আকাঙ্খা আর তাদের অপরিমেয় শক্তিমত্তা নজরুল যেমন করে আবিষ্কার করতে পেরেছেন তা সাহিত্যে আর কেউ পেরেছেন বলে আমাদের জানা নেই। তরুণদের তিনি চিত্রিত করেছেন দুনিয়া বদলের হাতিয়ার হিসেবে। তাদের সেই শক্তির উদ্বোধন তিনি কামনা করেছেন যার মাধ্যমে সকল অন্যায় অনাচার বৈষম্য বানের জোয়ারের মত ভেসে যায়, পৃথিবীজুড়ে জেগে ওঠে সবুজ প্রাণের স্পন্দন। অত্যাচারী শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে তারা দৃপ্ত কন্ঠে উচ্চারণ করে-
যখন জালিম ফেরাউন চাহে মুসা ও সত্যে মারিতে ভাই,
নীল দরিয়ার মোরা তরঙ্গ, বন্যা আনিয়া তারে ডুবাই;
আজো নম্রুদ ইব্রাহিমেরে মারিতে চাহিছে সর্বদাই,
আনন্দ-দূত মোরা সে আগুনে ফোটাই পুষ্প-মঞ্জরী।।
কিংবা
মোদের পথের ইঙ্গিত ঝলে বাঁকা বিদ্যুত কালো মেঘে,
মরু-পথে জাগে নব অঙ্কুর মোদের চলার ছোঁয়া লেগে,
মোদের মন্ত্রে গোরস্থানের আঁধারে ওঠে গো প্রাণ জেগে,
দীপ-শলাকার মত মোরা ঘরে ঘরে আলো সঞ্চরি।।
(তরুণের গান: কাজী নজরুল ইসলাম)
ভয়-ভীতি দূর করে, জরা-জীর্ণতার বিপরীতে আলোকিত পৃথিবী গড়ে দেয় এই তরুণেরা। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় অনবদ্য গান-
ভরসার গান শুনাই আমরা ভয়ের ভূতের এই দেশে,
জরা-জীর্ণেরে যৌবন দিয়া সাজাই নবীন বর-বেশে।
মোদের আশার ঊষার রঙে গো রাতের অশ্রু যায় ভেসে’,
মশাল জ্বালিয়া আলোকিত করি ঝড়ের নিশীথ-শর্বরী।।
(তরুণের গান: কাজী নজরুল ইসলাম)
তরুণদের আত্মত্যাগের ফলেই রচিত হয় নবযুগ, নবপথ, আসে স্বাধীনতা। তাদের চলার পথ ও তারা হাসিমুখে প্রাণ বিসর্জন দিতে পারা এই তরুণদের চলার পথের চিত্র এবং তাদের মঞ্জিলে মকসুদ নজরুল-কাব্যে উঠে এসেছে এভাবে-
নূতন দিনের নবযাত্রীরা চলিবে বলিয়া এই পথে
বিছাইয়া যায় আমাদের প্রাণ, সুখ, দুখ, সব আজি হ’তে।
ভবিষ্যতের স্বাধীন পতাকা উড়িবে যেদিন জয়-রথে
আমরা হাসিব দূর তারা-লোকে, ওগো তোমাদের সুখ স্মরি।।
(তরুণের গান: কাজী নজরুল ইসলাম)
নজরুলকে যদি বলা হয় একজন শ্রমজীবি তাতে ভুল বলা হবে না। তিনি শিশু বয়সে বাস্তব প্রয়োজনেই কর্মের পথ বেছে নেন। তাঁর জন্ম ১৮৯৯ সালে, আর তাঁর পিতা মারা যান ১৯০৮ সালে। শিশু বয়সে পিতাকে হারিয়ে তিনি কেবল এতিম হন নি, তাঁর মা ও ভাই-বোনকে নিয়ে মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়ে যান। কিন্তু অতি স্বাভাবিক ব্যাপার হ’ল, যে মহামানব পরিণত বয়সে সমাজের হাল ধরবেন, সেই মহামানব তাঁর পরিবারের প্রতিও দায়িত্বশীল হবেন-তা যত অল্প বয়সেই হোক না কেন! নজরুল তাই করেছেন। মক্তবে শিক্ষকতা, মসজিদ ও দরগা’র খাদেমগিরি, লেটোদলে যোগদান এবং পরবর্তী সময়ে রুটির দোকানে চাকরি-এত বৈচিত্র্যময় কর্মময়তা দিয়েই কিন্তু এই মহামানবের মহাজীবনের সূচনা। পৃথিবীর কোন্ কবি-সাহিত্যিকের জীবন এমন বৈচিত্র্য এবং বাস্তবতায় ভরা? সম্ভত একজনেরও না!
কর্মময় জীবনের কঠোর বাস্তবতা থেকে নজরুল রস নিংড়ে এনেছেন এবং গোটা মানব সভ্যতার জন্যে তা অকাতরে বিলিয়েছেন। বিশ্বের সকল শ্রমজীবি মানুষ তাঁর কাব্য থেকে রস ও শক্তি আহেরণ করে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর নিরন্তর প্রেরণা লাভ করে থাকে। তাঁর সর্বহারা, কৃষাণের গান, শ্রমিকের গান, ধীবরদের গান, ফরিয়াদ, কুলি-মজুর কবিতা, অসংখ্য গান, অনেক প্রবন্ধ, অভিভাষণ, সম্পাদকীয় ইত্যাদি মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠতম সম্পদের মধ্যে অগ্রগণ্য যেগুলোর মাধ্যমে বিশ্বের নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। এদিক থেকে নজরুল বিশ্ব মানবতার অন্যতম শ্রেষ্ঠতম বন্ধু-যে অভিধায় বিশ্বের খুব কম সংখ্যক কবি-সাহিত্যিককে অভিহিত করা যায়।
নজরুল সাম্যের কবি। অন্যভাবে বলতে গেলে পৃথিবীর কোন কবি-সাহিত্যিক তাঁর মতো করে সাম্যের এমন জয়-গান গাইতে পারেন নি। নজরুলকে যদি বিশ্বসমাজ অধিকতর আবিষ্কার, লালন ও ধারণ করতে পারে তবে সাহিত্যের মধুর অস্ত্রে বিশ্ব সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবার সুযোগলাভে ধন্য হবে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, সাহিত্য যদি নির্যাতন-নিপীড়িন বন্ধের হাতিয়ার আর সকল মানুষের অধিকার ও সাম্য প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেক্ষেত্রে বিশ্বে প্রথম স্থানে থাকবেন একজন-যিনি বাংলা মায়ের তিলকরতœ, আমাদের প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
নজরুল হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি-সকল ধর্মের মানুষের কবি। নজরুল প্রত্যেকের ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতিকে সমান মর্যাদা দিয়েছেন। এমন উদারতা এবং সাহিত্যিক-শ্রেষ্ঠত্ব বাংলা সাহিত্যে এবং বিশ্বসাহিত্যে আর কেউ দাবি করার যোগ্যতা রাখেন না।
নজরুলকে নিয়ে যেমন মসজিদে যাওয়া যায়, তেমনি যাওয়া যায় মন্দিওের। এখানেই নজরুলের শ্রেষ্ঠত্ব। নজরুলের খালেদ, উমর ফারুক ইত্যাদির কাছে যেমন ‘শিবাজী’ নিষ্প্রভ, তেমনি তাঁর অসাধারণ মনের অবিনশ্বর সৃষ্টি ইন্দু-প্রয়ান, শরৎচন্দ্র, রবি-হারা, দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহনের তিরোধান, বাঙলার মহাত্মা, অশ্বিনীকুমার, সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি, আশু-প্রয়াণ-গীতি, ইন্দ্রপতন ইত্যাদি তাঁকে করেছে মহত্বের মানদন্ডে অতুলনীয়। তিনি যেমন লিখেছেন অসংখ্য ইসলামি সংগীত, তেমনি তিনি অমর-অজর-অব্যয় হয়ে আছেন হিন্দুধর্মীয় অগণিত সংগীতের জন্যে। একজন মুসলিম যেমন তাঁর ধর্মীয় রচনা পড়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, চোখের পানি সংবরণ সংবরণ করতে পারেন না, একেকজন একেকটি খাঁটি মুসলিমে পরিণত হন, ঠিক তেমনি একজন হিন্দু নজরুলের হিন্দু ধর্মীয় লেখা পড়ে আবেগাপ্লুত না হয়ে পারেন না। এ যেন রীতিমত অবিশ্বাস্য বিষয়। কিন্তু তা কতটা বাস্তব তা নজরুলকে চর্চা না করলে বিষয়টি সঠিকভাবে উপলব্ধি করা যাবে না।
শুরুতেই বলেছিলাম নজরুল সবার কবি। তিনি যখন দরিদ্র মানুষের কবি, তখন তিনি দারিদ্রের জয়গান গেয়েছেন-
হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান!
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান
কন্টক-মুকুট শোভা!- দিয়াছ, তাপস,
অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;
উদ্ধত উলঙ্গদৃষ্টি; বাণী ক্ষুরধার,
বীণা মোর শাপে তব হ’ল তরবার!
(দারিদ্র্য: কাজী নজরুল ইসলাম)
দারিদ্রের এমন বন্দনা এবং দারিদ্রকে জয় করে সামনে এগিয়ে যাবার এমন টনিকরূপ প্রেরণা বিশ্বে ক’জন সাহিত্যিকের সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া যায়? এক্ষেত্রেও নজরুল অনন্য এবং বিশ্বের সকল হত-দরিদ্র মানুষের আশার আলো।
আবার ধনিক-শ্রেণিকে তিনি বারংবার সতর্ক করেছেন যেন তাদের সম্পদ মানবতার কাজে ব্যয়িত হয়। অবৈধ অর্থ আহরণকারীদের তিনি রীতিমতো ‘অর্থ-বেশ্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানমুক্ত একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার সাধনা করেছেন তাঁর জীবনের সকল শক্তি দিয়ে। ব্যাপক অর্থে তিনি সকল মানুষের কবি, বিশ্ব মানবতার কবি, মানুষকে তিনি মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার কবি। বিশ্বমানবের এ বন্ধু যে কেবল তাঁর সাহিত্য সাধনা দিয়ে মানুষের জন্যে কাজ করেছেন তা কিন্তু নয়। মানবতার এ বন্ধু কেবল একজন কবি-সাহিত্যিক হিসেবে নন, বরং সৈনিক, সাংবাদিক, সম্পাদক, পত্রিকা-পরিচালক, রাজনীতিক, ধর্ম, সমাজ ও শিক্ষা-সংস্কারক, দার্শনিক, ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুক্তিযোদ্ধা ইত্যাদি কত না চরিত্রে তিনি মানবতার জন্যে কাজ করেছেন তার হিসেব করাও আমাদের পক্ষে বোধ হয় প্রায় অসম্ভব। তিনি সকল মানুষকে মানুষের মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত করার নিরলস সাধনা করেছেন যার মধ্য দিয়ে রচনা করে গেছেন বিশ্ব সাহিত্য ভান্ডারের অমূল্য সব সম্পদ। তিনি সকল দেশের সকল কালের সকল মানুষের জন্যে রেখে গেছেন সঞ্জীবনী শক্তি, জীবনের রসসুধ- যা পান করে প্রতিটি মানুষ স্বীয় জীবনকে অর্থবহ করার প্রেরণা লাভ করতে পারে, গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর পৃথিবী।
(লেখক: নজরুল গবেষক, নজরুল বিষয়ক টিভি অনুষ্ঠান পরিচালক ও সঞ্চালক। বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক, ১৯৯১ সালে কুমিল্লা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথমস্থানসহ ডাবল বোর্ড স্ট্যান্ড, এলএল.বি (অনার্স), এলএল.এম (প্রথম শ্রেণি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), পরীক্ষক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। উপসচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়। ই-মেইল: jehaduddin77@gmail.com)
Comments