top of page

'হামাস' কি শিয়া হয়ে গেল।। অধ্যাপক ডঃ যোবায়ের মুহাম্মদ এহসানুল হক

সুন্নী সংগঠন হামাস সহায়তা নেয় শিয়া রাষ্ট্র ইরানের। তাই বলে কি হামাস শিয়া হয়ে গেল? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত একজন অধ্যাপক ফেসবুকের আরবী প্রতিবর্ণায়নের [فَيَسَبُّوكَ] একটি বিশেষ পাঠ গ্রহণ করেছেন, যা সংক্ষেপ করলে এই প্লাটফর্মকে ‘গালিবুক’ বলে আখ্যা দেয়া যায়। ফেসবুকের আবিষ্কার দুনিয়াটাকে ‘গালিময়’ করে দিয়েছে। তো এমন একটি গালিময় মিথ্যাচার হল ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন ‘হামাস’ একটি শিয়া সংগঠন। প্রথমে যখন আমি এই অভিযোগ শুনি তখন কেঁপে উঠি। শত শত বছর ধরে ফিলিস্তিন একটি সুন্নী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপদ বলে জানি, এটি কবে শিয়া হয়ে গেল? পরে বুঝতে পারলাম ইরানের সাথে সহযোগিতার সম্পর্কের কারণে হামাসকে শিয়া বলে গালি দেয়া হচ্ছে। অথচ এই বিশুদ্ধ গালিবাজরা একথা বলে না, ইসরাইলের সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইহুদি হয়ে গেছে। না, ইরানের সাথে নিজেদের সম্পর্কের বিষয়টি হামাস কখনো গোপন করেনি, প্রতিবার প্রতিরোধ যুদ্ধের সমাপ্তির পর তারা যাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাদের মাঝে ইরান অন্যতম। কিন্তু ফিলিস্তিনের সুন্নী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস কেন শিয়া রাষ্ট্র ইরানের সহায়তা গ্রহণ করে? ইরানও বা কেন সুন্নী সংগঠনকে সহায়তা করে? আমরা এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব। ইরানের সাথে ফিলিস্তিনের সম্পর্ক বহু পুরনো। উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে ফিলিস্তিনে মিশন খুলেছিল ইরান, নিজেদের বণিকদের সুযোগ-সুবিধা দেখভাল করার জন্য। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনে যখন ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয় তখন ইরান ছিল রেজা শাহ পাহলভির শাসনাধীন। শাহ-এর ইরানের সাথে ইসরাইলের সুসম্পর্ক ছিল। বাণিজ্যিক সম্পর্ক তো ছিলই; সাভাক-মোসোদের মাঝেও ছিল সহযোগিতা ও তথ্য শেয়ারের সম্পর্ক। মিশরের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায়ও সহযোগিতা করে ইরান। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানে বিপ্লব হওয়ার পর সম্পর্কের বিপরীতযাত্রা শুরু হয়। ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ইরান ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সংগঠন পিএলও-এর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। অচিরেই ইরান-পিএলও সম্পর্কে ভাটা পড়ে। ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন পিএলও ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র' ইরানের এজেন্ডা বাস্তবায়নের উপযুক্ত হাতিয়ার নয়। তার ওপর আরব জাতীয়তাবাদী চেতনায় প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইয়াসির আরাফাত সমর্থন দেন সাদ্দাম হোসেনকে। এতে ইরানের সাথে পিএলও-এর সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছে যায়। তবে ফিলিস্তিনে বিকল্প খুঁজে পেতে দেরি হয়নি ইরানের। ইরান পিএলও কে ছেড়ে প্রথমে সমর্থন দেয় ইসলামিক জিহাদকে। কিন্তু অচিরেই ফিলিস্তিনে আরেকটি শক্তিশালী প্রতিরোধ আন্দোলনের অদ্ভ্যুদয় হয়। ১৯৮৭ সালে শেখ আহমদ ইয়াসিন প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাদারহুডের অফশুট হামাস। ১৯৯২ সালে ইসরাইল হামাসের শত শত নেতাকে দক্ষিন লেবাননে নির্বাসন দেয়। এটিই ইসরাইলের জন্য ক্ষতি ডেকে আনে, লাভবান হয় ইরান। হামাসের সাথে দক্ষিণ লেবাননকেন্দ্রিক ইরানপন্থী সংগঠন হিযবুল্লাহ-এর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। ইরানের সাথেও হয় যোগাযোগ। ইরান হামাসকে কৌশলগত সামরিক সহযোগিতা প্রদান করে। হামাসের সাথে ইরানের যোগাযোগ কখনো গোপন বিষয় ছিল না। ইসরাইল কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর শেখ আহমদ ইয়াসিন ১৯৯৮ সালে ইরান সফর করেন। তাঁর সাথে খামেনি ও খাতামির সাক্ষাৎ হয়। ২০০৬ সালে অনুষ্ঠিত ফিলিস্তিনের পার্লামেন্ট নির্বাচনে হামাস অভূতপূর্ব জয়লাভ করে। বিষয়টি ইসরাইল ও তাঁর পশ্চিমা দোসরদেরকে চরম দুঃশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। পরে হামাসের সাথে ফাতাহ দলের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। হামাস নিয়ন্ত্রিত গাযা অবরোধের শিকার হয়। এই পরিস্থিতি উপায়হীন হামাসকে আরো বেশি ঠেলে দেয় ইরানের দিকে। আরব বসন্তের সূচনা হলে হামাসের সাথে ইরানের সম্পর্ক অভূতপূর্ব সঙ্কটে নিমজ্জিত হয়। এই জনআন্দোলনের প্রতি ইরানের দৃষ্টিভঙ্গীতে ছিল দ্বিচারিতা। তারা ইয়েমেন, মিশর ও তিউনিসিয়ার বসন্তকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বলে সমর্থন করে। কিন্তু সিরিয়ার গণআন্দোলনকে চিহ্নিত করে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র বলে। সিরিয়ার বিরোধী গ্রুপগুলোর সাথে হামাসের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। অনেক হামাস যোদ্ধা তাদের পক্ষে যুদ্ধও করেছে। পক্ষান্তরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদ হলেন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র। সিরিয়ার রাজধানী দামেশকে হামাসের দপ্তর। তাই সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হামাস দীর্ঘদিন নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু আসাদ প্রকাশ্য সমর্থন দাবি করলে হামাসকে দামেশকের অফিস ছেড়ে দিতে হয়। আসাদ-বিরোধীদের প্রতি হামাসের সমর্থনকে ইরান প্রকাশ্য খিয়ানত বলে অভিহিত করে। ২০১২ সালে ইসরাইলি আগ্রাসান দৃঢ়ভাবে বুক চেতিয়ে ঠেকিয়ে দিলে ইরান আবারো হামাসের প্রতি সমর্থনের ঘোষণা দেয়। তবে এবার হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক শাখার সাথে ইরানের ভিন্ন আচরণ প্রকাশ পায়। সামরিক শাখাকে অর্থ, অস্ত্র ও প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করলেও হামাসের রাজনৈতিক শাখার ব্যাপারে ইরান নিষ্পৃহতা প্রদর্শন করে। সম্ভবত হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান খালিদ মেশালের সাথে কাজ করতে ইরান স্বস্তিবোধ করত না। এই সুযোগে হামাসকে ইরানবিমুখ করতে মরিয়া চেষ্টা করে সৌদি আরব। ২০১১ সালে কায়রো চুক্তি ও ২০১২ সালের দোহা চুক্তি ছিল এই প্রচেষ্টার ফসল। কিন্তু ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়তে হলে ভাত-কাপড়ের পাশাপাশি অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি দরকার। এক্ষেত্রে সৌদি আরব হামাসকে ইরানের কোন বিকল্প উপহার দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে হামাসকে ইরানবিমুখ করার সৌদি প্রচেষ্টায় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। মিশরে মুরসির পতন হলে হামাস চরম সঙ্কটে পড়ে যায়। এ সময় তারা দ্বিরাষ্ট্র সমাধান মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে অন্ধভাবে ইসরাইলের দাবিগুলো একের পর এক মেনে নিতে থাকলে হামাস শান্তিপূর্ণ উপায়ে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানে উপনীত হওয়ার আশা হারিয়ে ফেলে। তদুপরি আরব রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিন ইস্যু জলাঞ্জলি দিয়ে একে একে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে হামাসের পিঠ এমন দেয়ালে ঠেকিয়ে দেয়, যার পর আর কোন দেয়াল নেই। তখন হামাসের আবারো ইরানমুখী হওয়া ছাড়া কোন বিকল্প রইল না। এক্ষেত্রে ইতিবাচক বিষয় ছিল, হামাসের রাজনৈতিক শাখার দায়িত্বে খালিদ মেশালের পরিবর্তে ইসমাঈল হানিয়ার অভিষেক, যাকে ইরানের ব্যাপারে উদার বলে মনে করা হয়। অতি সম্প্রতি যে যুদ্ধ হয়ে গেল, এরপরে হামাস প্রকাশ্যে ইরানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ইরান ও হামাসের পারস্পরিক সম্পর্কে দু’পক্ষের উদ্দেশ্য দুই রকম। ইরান বিপ্লব রপ্তানি করতে চায়। সেজন্য যুদ্ধ লাগাতে চায়। কিন্তু কখনো নিজ ভূখণ্ডে যুদ্ধ টেনে আনতে চায় না। ইরাক, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে যুদ্ধ চলুক। সিরিয়ায় যুদ্ধ শেষ। এখন ফিলিস্তিনের যুদ্ধকে ইরান নিজের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। অভ্যন্তরীণভাবেও ইরানের ফায়দা আছে। ফিলিস্তিনি ইস্যুতে জোরালো ভূমিকা রেখে ইরানের কট্টরপন্থীরা জনগণের সহানুভূতি নিয়ে বারবার ক্ষমতায় আসতে চায়। কিন্তু হামাসের বিষয়টি ভিন্ন। হামাসের ইরানমুখীতা বাঁচার তাগিদে। ডুবন্ত মানুষ যদি কোন হাতের নাগাল পায়, সে কখনো জিজ্ঞেস করবে না, এটা কি শিয়ার হাত না সুন্নীর হাত। হামাস কখনো ফিলিস্তিনের শিয়াকরণ মেনে নেবে না। অতীতে এর প্রমাণ রেখেছে আন্দোলনটি। আল-জিহাদ আল-ইসলামী ভেঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হারকাহ আল-সাবিরীন গাজায় একটি হুসায়নিয়্যাহ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এরা শিয়াবাদে ঝুঁকে পড়েছিল। হামাস তাদেরকে নির্মমভাবে দমন করেছিল। হামাসের ইরানমুখীতা কোনভাবেই শিয়াবাদের প্রতি অনুরক্তি নয়। সৌদির ভাত-কাপড় যদি প্রতিরোধ লড়াইয়ে বিন্দুমাত্র কাজে লাগত হামাসকে ইরানের দ্বারস্থ হতে হত না। ডুবন্ত মানুষের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে যারা ধর্ম বিচার করে তারা কেমন মানুষ? উপরের প্রশ্নটি আপনাদের সামনে রেখে, হামাস কি শিয়া হয়ে গেল(?) এ প্রশ্নের উত্তর না হয় না-ই দিলাম।

Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page